Wednesday, 23 May 2018

ভারতে ঘোড়া কেনা-বেচার বাজার কি সঙ্কুচিত হচ্ছে?



দীপেন্দু চৌধুরী
ভারতের রাজনীতিতে গত কয়েক মাসে সদ্য ঘটে যাওয়া কয়েকটি চলমান দৃশ্য ভবিষ্যৎ ইতিহাস লেখকদের কাজে লাগতে পারে। সমাজ বিঞ্জানীরা আগামিদিনে এই ঘটনা একটা উচ্চতা থেকেই দেখবেন সম্ভবত। দ্রুত ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সাংবাদিক, সংবাদ মাধ্যমের ডেস্ক, সম্পাদকীয় দপ্তর তাল সামলে উঠতে পারছিল না বলেই মনে হয়। ২০১৪ সালের পর সাম্প্রতিক কালে এরকম রাজনৈতিক বাঁক খুব একটা দেখা যায় না। যে বাঁকের সঙ্গে পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদরাও ক্লান্ত বোধ করছিলেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক সর্বভারতীয়স্তরের কয়েকজন ব্যস্ত নেতার সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানতে পেরেছি। আমি নিজে কোনওদিন ‘ঘোড়া কেনা-বেচা’-এর বাজার দেখিনি। কলকাতায় রেসের মাঠ আছে জানি।
বাইরে থেকে অনেকবার দেখেছি। সাংবাদিকতার সুবাদে দু’একবার ভেতরেও গিয়েছি। ঘোড়ার দল ছুটছে। সেই ঘোড়দৌড় আর তাগড়াই ঘোড়ার পেশী দেখে ফিরে আসতে হয়েছে। একটা দু’টো বাইট নিয়ে ফিরতে হয়েছে। তারপর ঘোড় দৌড়ের বিষয়ে জেনেছি সমরেশ মজুমদারের লেখা উপন্যাস ‘দৌড়’ পড়ে। তার অনেক আগে মুজতবা আলি তাঁর পূর্ববঙ্গের কুট্টিদের কথা লিখেছেন। সেখানে তিনি মাঝে মাঝে কুট্টি রিকশা চালকের বলা মুখের কথ্য ভাষা আমাদের বলে গেছেন। মুজতবা আলির লেখায় তিনি বলছেন ‘দ্যাখেন কত্তা ঘুড়ায় হাসে।’  
সম্প্রতি দক্ষিণ ভারতের একটি রাজ্যের রাজনৈতিক আকাশে ঘটে যাওয়া বিষয়কে আমরা কি বলব? ভারতে সংসদীয় গণতন্ত্রের পরীক্ষা নিরীক্ষায় ‘ঘোড়া কেনা-বেচা’ একটা কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে রয়েছে। এই অধ্যায় থেকে মুক্তি চাইছে ভারতের মানুষ। অনেকদিন পর সম্প্রতি কলকাতায় একটি বিদেশি দূতাবাসের সামনের পাতাঝরা কাঞ্চন ফুলের গাছে হুতোম বসেছিল। দিনটা ছিল কর্ণাটক বিধান সভার মুখ্যমন্ত্রী পদে ইয়েদুরাপ্পার শপথ নেওয়ার দিন। হুতোমের রাতচরা দেহের গন্ধ আমি চিনি। আমাকে চিনতেও হয় না। হুতোম নিজেই আমাকে ডেকে কথা বলে। সেদিনও তাই হল। হুতোম বলল, ‘’আজকাল তোর বড় দেমাক হয়েছে। সাহেব-মেমদের সঙ্গে ওঠা বসা করিস। আমাদের মত জেলার জংলীদের চিনবি কেন?’’
আমি হাসলাম। জানতে চাইলাম, ‘এই সব কথা এখন বলছ কেন?’
হতোম ঠোট বেঁকিয়ে বলল, ‘’আজকাল তোর কি দেমাক? বাপরে বাপ! তোর বন্ধু কমলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। কমল আমাকে বলল, ‘আচ্ছা হুতোম ভাই এটা বুলতে পারবা? ভারতের লোকসভা, বিধানসভায় ঘোড়ার বাজার বসে?’ আমি বললাম সেটা আমি জানি না। কেন জানতে চাইছ? তোর বন্ধু কমল বলল, ‘ভারতে সরকার পক্ষ বা শক্তিশালী দলের সরকার গঠন করার মত প্রয়োজনীয় সংসদীয় সদস্য না জিততে পারলে ঘুড়া কিনে। ঘুড়া দিং কি করবে? দ্যাশের আইনসভায়? কেমন ধুয়াশা লাগছে লয়? বুলো?’ আমি বললাম তোমাদের সমাজের কথা আমি কি করে বলব? তোমার বন্ধুকে জিগ্যেস করব।‘’
আমি আবার হাসলাম। বললাম, ‘কমল সব জানে তোমার সঙ্গে মজা করেছে।’
হুতোম বলল, ‘’সেটাই আমি বলব। আমার আর কমলের কথা শুনে ফড় ফড় করে কিছু লিখিস না। আর লিখলে তো ঘোড়া কেনা-বেচা নিয়ে লিখবি। কিন্তু একচোখে লিখিস না। ঘোড়ার এক চোখে ঠুলি থাকে জানিসতো?‘’
‘’হাই, হাও আর ইউ? হু ইস দেয়ার? আর ইউ টকিং?’’
 বিদেশী দূতাবাসের এক মহিলা কর্মী এসে আমাকে বাঁচিয়ে দিল। আমি বললাম, ‘হি ইজ হুতোম। মাই ফ্রেন্ড। নাইট বার্ড। হুয়াইট আউল।’ হুতোম ততক্ষণে চলে গেছে। আমিও রেহাই পেলাম।
আজ এই প্রসঙ্গে লেখার সময় হুতোমের কথা মনে পড়ল। আমার এক বরিষ্ঠ সাংবাদিক বন্ধু আছেন। প্রায় পঞ্চাশ বছর সাংবাদিকতা করছেন। রাজনৈতিক সাংবাদিকতায় অত্যন্ত দক্ষ। তবু উদ্বেগে থাকেন। ভুল সিদ্ধান্তের সঙ্গে লড়াই করেন। আস্থা হারিয়ে ফেলেন।  সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোক। গুজরাটে রাজ্যসভার ভোটের সময় আহমেদ প্যাটেলের জয় নিয়ে উদ্বেগে ছিলেন। মাঝরাত পর্যন্ত জেগে ছিলেন। আমাকে মাঝে মাঝে ফোন করতেন। আমি আস্থা জাগাতাম। শেষে আমার কথা মিলে যায়। কর্ণাটক বিধানসভায় ইয়েদুরাপ্পার নেতৃত্বে বিজেপি সরকার গঠনের  তোড়জোড় শুরু করতেই সেই বরিষ্ঠ সাংবাদিক বন্ধু সব আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘আর কিছু হবে না।’ আমি তাঁকে অপেক্ষায় থাকতে বলে বলেছিলাম, কংগ্রেসের যেমন রাহুল গাঁধি আছেন তেমনি এবার ময়দানে সিপিএম নামক একটি দলের দ্বিতীয়বারের জন্য সদ্য নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েছুরি আছেন। তিনি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। দু’একটি আন্তর্জাতিক বিষয়ের উল্লখে করেছিলাম। সেই বিষয়গুলি এখানে তোলাটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেতে পারে। বরিষ্ঠ সাংবাদিক বন্ধুকে আরও বলেছিলাম, সীতারাম ইয়েচুরি আছেন আড়াল থেকে। এবং সিপিএম নামক দলের বঙ্গ ব্রিগেডের প্রভাব রয়েছে জে ডি (এস) দলের শীর্ষনেতা এইচ ডি দেবগৌড়ার উপর। আজ কি আমাদের আরও একবার জ্যোতি বসুর প্রসঙ্গ মনে পড়ার কথা নয়? বর্তমান সময়ে কর্ণাটক বিষয়ক আলোচনায়, কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধিকে আমরা ১৯৯৬ সালের জ্যোতি বসুর সঙ্গে তুলনা করলে কি বাতুলতা হবে? তার থেকেও বেশি প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে আলোচ্য বছরের মহাভারতের যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের পান্ডব দলের সারথী কংগ্রেস সভাপতির সুচিন্তিত পাশার চালে কুপোকাত ভারতের নতুন মহাকাব্যের সেনাধ্যক্ষের দল।        
কর্ণাটক বিধানসভায় সরকার গড়তে পারল না বিজেপি। ঘোড়া ‘কেনা-বেচা’ করতে গিয়ে মুখ পুড়ল বিজেপির। আধুনিক ভারতে উল্কার গতিতে সাম্রাজ্য বিস্তারের সফল জুটি ‘নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ’ এই প্রথম বড় ধাক্কা খেলেন। বিরোধী শিবির ভাঙার সবরকম চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত আধুনিক ভারতের বিজেপি দলের রাজনীতির অন্যতম সেনানায়ক তথা কৌটিল্য অমিত শাহ সহাস্যে বলছেন ১৫ দিন সময় পেলে তিনি সফল হতেন। হ্যাঁ অমিতজি আপনি সফল হতেন। আমরাও মানছি। কারণ এর আগের অভিঞ্জতা আমাদের সেই সত্য মানতে বলছে। আপনার নেতৃত্বে ছলেবলে কৌশলে ‘বিজেপি’ নামক একটি দল মাত্র চার বছরে (১৪-১৮) সারা ভারতে প্রথম এবং অবশ্যই প্রাসঙ্গিক দল হয়ে উঠতে পেরেছে। আপনার দলের মাত্র ৩৮ বছর বয়স। সেই দলকে আপনি সভাপতি হিসেবে এই উচ্চতায় নিয়ে এসেছেন। কর্ণাটক নামক রাজ্যের ‘সরকার গড়া’-র প্রাক মুহূর্তে দক্ষ নেতার মত আপনি নির্দেশ দিলেন। কর্ণাটক বিধানসভায় ভোটাভুটিতে হেরে গেলে হিমালয় উচ্চতায় থাকা ‘বিজেপি’ নামক একটি সর্বভারতীয় দলের আত্মমর্যাদা ধু-লুন্ঠিত হতে পারে। এই কারণে দলের তরফে নির্দেশ যায় ইয়েদুরাপ্পার কাছে। সম্মান বাঁচিয়ে ইস্তফা দাও। ‘এক্সিট গ্রেসফুলি’। এর জন্য আপনার দলের সাধারণ সদস্য থেকে বর্তমান উচ্চতম নেতৃত্ব আপনার কদর করে। অমিতজি আপনি প্রমাণ করেছেন আপনি একজন দক্ষ সংগঠক।
যদিও আপনি মোদীভাই ছাড়া এতটা পথ এগতে পারতেন না। আপনাদের দলের শাখা সংগঠনের প্রাসঙ্গিক এবং অপ্রাসঙ্গিক কাজ বা কর্মসূচী নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক রয়েছে। মতামত রয়েছে। ভারত নামক একটি উন্নত গণতন্ত্রের দেশে সেই বিতর্ক থাকা স্বাভাবিক। পাশাপাশি এটাও সত্যি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতি ছাড়া বিজেপি এতটা উচ্চতায় কি আসতে পারত?  তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর উন্নত গণতন্ত্রের কাঠামো প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গাঁধি করে দিয়ে গেছেন। সেই কাঠামোকে ধরে বিশ্বায়ন উত্তর ‘স্মার্ট সিটি’ নির্ভর এক উজ্জ্বল ভারত নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে এন ডি এ সরকার গড়ে তুলতে চাইছে। সেখানে সীমাবদ্ধতা ব্যপক। কংগ্রেসের নেতৃত্বে বিরোধীরা অনবরত বলছে, ‘আপনার প্রতিশ্রুতির কি হল? দেশের প্রতিটি নাগরিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লাখ টাকা থাকার কথা সেটার কি হল? কালো টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার কি হল? বছরে এক কোটি বেকারের চাকরির কি হল?’ আমি নিজের কথা বলতে পারি একটি বেসরকারি বিমা সংস্থার কাছে আমার তিন-চার লাখ টাকা পাওনা আছে। গত চার বছর মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও সে টাকা উদ্ধার করতে পারলাম না। যেমন আমার আর আমার স্ত্রীর ভোটার কার্ড পরিচয় পত্র করতে ১৯ বছর লেগেছিল। অবশ্যই ‘বামফ্রন্ট সরকার’-এর আমলে। অমিতজি আপনি তথা আপনারা আধুনিক গণতন্ত্রের কথা বলছেন অথচ প্রাচীন এক সভ্যতায় চলে আসা খেলোয়ার ‘কেনা-বেচা’-এর মত রাজনীতির ময়দানে সাংসদ বিধায়ক কিনছেন? কেন? প্রশ্ন তুললে খুব কি অপরাধ হবে? সৎ সাংবাদিক, কলম লেখক, প্রতিবেদক, ব্লগার (স্বঘোষিত) হিসাবে জীবনে অনেক মূল্য চুকিয়েছি। আজ আবার রাজনৈতিক প্রসঙ্গে কলম নয় জং ধরা ‘কি বোর্ড’- এ হাত দিলাম। জানিনা সামনের দিনে কি পরিস্থিত হবে? ‘শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই আর সবই গেছে......’।   
অতীত অভিঞ্জতা থেকে বলা যায় কংগ্রেস সহ সমস্ত আঞ্চলিক দলের ‘ঘোড়া কেনা-বেচা’-এর সংস্কৃতি চলে আসছে। মায় আমাদের সংস্কৃতিসম্পন্ন পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যেও সাম্প্রতিককালে আমরা সেই খেলা প্রত্যক্ষ করেছি। রাজনীতি এমনই এক বিষম বস্তু। ‘’অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে’’। এবারে কর্ণাটক বিধানসভায় আস্থা ভোট এবং পরবর্তী গঠনমূলক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ভূমিকা অবশ্যই সুপ্রীম কোর্টের। পাশাপাশি কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধির। কর্ণাটক বিধানসভায় কংগ্রেস নিয়ন্ত্রিত জোট সরকার গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে চাননি কংগ্রেস সভাপতি। তাঁর নিজস্ব সংস্কৃতি মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করা। কর্ণাটক ভোটের ফল বেড়নোর পর থেকে ত্রিশঙ্কু বিধানসভায় কিভাবে সরকার করা যায় সেটা নিয়ে ঠান্ডা মাথায় রাহুল গাঁধি ভেবেছেন। তাঁর ‘মাস্টার স্ট্রোক’ ছিল ফোনে কথা বলা। তিনি কথা বলেন এইচ ডি দেবগৌড়ার সঙ্গে। জেডি(এস)-এর থেকে কংগ্রেসের ঝুলিতে দ্বিগুণ আসন রয়েছে। তবুও বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে দেবগৌড়ার ছেলে কুমারস্বামীকে মুখ্যমন্ত্রী করে জোট সরকার গড়ার প্রস্তাব দেন রাহুল। রাহুল গাঁধির উদার এই সিদ্ধান্তে ভারতের গণতন্ত্র আরও পোক্ত হতে বাধ্য। এবং কংগ্রেস নামক শতাব্দী প্রাচীন দলটি নিজেদের মঞ্চকে আরও মজবুত করতে পারবে। নতুন এক অধ্যায় শুরু করতে পারবে। শুধুমাত্র ‘ কংগ্রেস জোট’ নয়। ‘ন্যুনতম সাধারণ কর্মসূচী’ নয়। প্রয়োজন আধুনিক ভারতীয় ঘরানা এবং পুরনো ভারতের সামাজিক মূল্যবোধের মিশ্রণ। একটি জোটের গোষ্ঠীভুক্ত দলের স্বার্থের থেকে অনেক বড় দেশের স্বার্থ। দশের স্বার্থ।    
এই প্রসঙ্গে ২০০৮ সালের ইউ পি এ-র আস্থা ভোটকে আমরা মনে করতে পারি। ওই বছরের ‘২২ জুলাই’ ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক দিন হিসেবে লেখা রয়েছে। ‘২২ জুলাই ইউ পি এ সরকারের পক্ষে আস্থা প্রস্তাব পেশ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ। সেদিনের কলঙ্কিত সেই অধ্যায়ের কথা সকলের মনে আছে। ইউ পি এ সরকার সেদিন ২৭৫-২৭৬ ভোটে জিতেছিল। ২২ শে জুলাই ৮ জন সাংসদ ভোটদানে বিরত বা অনুপস্থিত ছিলেন। ক্রসভোট দিয়েছিলেন ২০ জন সাংসদ। ২২ শে জুলাই ভোট দিতে না এসে যারা সুবিধা করে দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা ব্যানার্জি সহ ১০ জন সাংসদ। ওইদিন লোকসভার ফ্লোরে ঘুষের টাকার বান্ডিল দেখিয়েছিলেন কয়েকজন সাংসদ। সংসদে ঘোড়া ‘কেনা-বেচা’-এর এক অভিশপ্ত অধ্যায় প্রকাশ্যে চলে আসে। ভারতীয় আইন সভায়!       
কংগ্রেস সভাপতি তাঁর এক চালেই তিনি কর্ণাটক ভোট বাজারের ঘোড়া ‘কেনা-বেচা’ আটকাতে পেরেছেন। গণতন্ত্র এবং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন ভারতের মত উন্নত গণতন্ত্রের শীর্ষ আদালত। সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশে ১৫ দিনের বদলে মাত্র ২৮ ঘণ্টার মধ্যে কর্ণাটক বিধানসভায় শক্তিপরীক্ষা হয়েছে। আধুনিক এবং উন্নত সংসদীয় গণতন্ত্রের জয় হয়েছে। ২০১৮ সালের মে মাস ভারতীয় গণতন্ত্রে ‘মাইলস্টোন’ হয়ে থাকবে। আমরা ভারতীয়রা আশা করব আগামী দিনে ‘ত্রিশঙ্কু বিধানসভা’ বা ‘লোকসভা’ হলেও ঘোড়া ‘কেনা-বেচার’-এর মত কলঙ্কজনক অধ্যায় ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্র থেকে মুছে যাক। এই আলোচনার শেষে উল্লেখ করি বিচারপতি এ কে সিক্রির মন্তব্য। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ ‘ঘোড়া কেনা-বেচা’ যে চলছে, সেটা আশঙ্কা করে বিচারপতি সিক্রি বলেন, ‘’কংগ্রেস-জেডি(এস)এর পক্ষে ১১৭ জন বিধায়ক রয়েছে। তা হলে বিজেপি কী ভাবে ১১১ জনের সমর্থন দাবি করে?’’                                               
                  

Monday, 21 May 2018

সীমাহীন চেষ্টায় পাওয়া যায় শুধু জীবন

পাড়ায় বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ শুনেছিলাম আমরা। কিন্তু তখন আমাদের বয়স কত আর?  মাত্র ১০ বছর বয়স আমার। আমার শৈশব আমাকে ওই বয়সে এক অবসন্ন অবসাদ থেকে মুক্তি দিতে পারেনি। উদাস চাউনি নিয়ে বড় হচ্ছি। বাবা, দাদাদের লড়াইয়ের প্রসঙ্গ ওই বয়সেই আমি অনুভব করতে শিখেছি। ঘরভাঙা, দেশভাঙা যন্ত্রণা তাঁদের চোখের ভাষায়। সীমান্তপাড়ের ক্লান্ত মন নিয়ে, অবসন্ন মেঘরোদ্দুরের ভেজা সংসার। আমার মা, ভবিষ্যৎ আলপনার স্বপ্নে সংসার আগলে রেখেছেন। কিন্তু শিকড় ছেঁড়া একটি পরিবার। আত্মীয়হীন লাল মাটির মোড়ামের ‘বার ঘর এক উঠোন’ সমাজের অব্যক্ত যন্ত্রণা চেপে নিয়ে সামাজিক থাকতে চাইছে তারা। আমি মাত্র ছ’বছর বয়সে সেই আগুন চিনেছিলাম। তাই হয়ত নীল আকাশকে কল্পনা মিশিয়ে দেখতে হয়, এটা শিখতে পারিনি। সামাজিক অসাম্যের ঠাস বুনোট মূল্যবোধে আমি আক্রান্ত। ঘামে ভেজা লবণাক্ত লোমশ চামড়ার ভেতর থেকে একবুক যন্ত্রণা শুনতে পেতাম।
ক্লান্ত অবসন্ন ‘মন’ আমাকে টানতে টানতে বারেবারে নদী, শশ্মানের কাছে নিয়ে যায়। সেই স্মৃতি আমি আজও কিছুতেই ছেড়ে বেরতে পারলাম না।  শশ্মানের দাউ দাউ আগুন। জ্বলছেতো জ্বলছে। আজও জ্বলছে। প্রখর গ্রীষ্মের কামারের শালে তপ্ত থালার মত। আকাশের দুপুর সূর্যের আগুনও শশ্মানের আগুনকে ভুলতে দিল না। বসন্তের ‘কৃষ্ণচূড়া’র গরিমাও আমাকে লালিত্য শিখতে দেয়নি। পলাশ রাঙা বসন্তের বিকেলেও আমি আগুন খুঁজি। আগুনেই আমার মুক্তি। আমাকে আগুন দাও। আমি দাউ দাউ শশ্মানের কাছে বারে বারে ছুটে যাই। কেন শশ্মান? কেন নদী? আমার মনে পড়ছে, আশির দশকের নকশাল নেতা কমরেড সন্তোষ রাণার নেতৃত্বে সিপিআই (এমএল) গোষ্ঠীর এক ছাত্রনেতার সঙ্গে আলোচনার কথা।
১৯৮৩ সাল। আমরা অন্য একটি ‘নকশালপন্থী’ গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। কলেজ স্ট্রীটের ‘ব্যাপটিস্ট মিশন’-এর ছাত্রাবাসে ভারতে বিপ্লব নিয়ে তাত্বিক আলোচনা করছিলাম। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি নিয়ে এম এ পড়ছে সন্তোষদার নেতৃত্বে চলা গোষ্ঠীটির সেই ছাত্রনেতা। অত্যন্ত উজ্জ্বল ছাত্র। সে আমার সঙ্গে আলোচনায় বসেছে। তাড়া তাড়া বিড়ির বান্ডিল শেষ হয়ে যাচ্ছে। ওরা প্রায় আট-দশজন ছাত্র। প্রত্যেকে নিজের নিজের বিষয়ে ব্যতিক্রমী ছাত্র। আমি একা গিয়েছিলাম। গ্রামের তপ্ত লাল মাটি আমার পায়ে, মনে লেগে রয়েছে। পাথর ভাঙা হাতুড়ির শব্দ। ঠুক ঠুক। ডিনামাইটের শব্দ। আদিবাসীদের গান। নিমতেলের ঘ্রাণ আমার স্মৃতিতে নতুন স্তরে জায়গা পেয়েছে। শশ্মানের আগুন সত্য খুঁজতে শিখিয়েছে। অন্তর্মুখী ‘দীপেন’ সত্য খুঁজছে। চতুর এবং দ্বিধাবিভক্ত কৌশলী বাম নেতাদের ‘পার্থক্য’-এর কারণ হাতড়ে বেড়াচ্ছি।
ষাটের দশকের প্রেসিডেন্সি কলেজের এক আগুনখেকো ছাত্রনেতার গোষ্ঠী থেকে আমি গিয়েছিলাম। আমি তখন সেই নেতার তৈরি গোষ্ঠীর ‘সর্বক্ষণের কর্মী’ (হোল টাইমার)। আলোচনায় ‘আধা সামন্ততান্ত্রিক, আধা ঔপনিবেশিক’ ভারতে বিপ্লবের নীতি, সংগঠন গড়ে তোলার রণকৌশল, ছাত্র ফ্রন্টের কাজ, যুব ফ্রন্টের কাজ, কৃষক-শ্রমিক ফ্রন্টের কাজ নিয়ে আমরা চা-বিড়ির বিপ্লব করলাম। পুঁজিবাদের সর্বোচ্চস্তর সাম্রাজ্যবাদ এসে পড়ল। সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ হাতছানি দিল। আমার মনে শশ্মান। আমার আকাশে শশ্মান। আমার চোখে আগুন। নদী খুঁজছি। আলোচনা কিছুতেই শেষ হয় না। আমি বললাম, ‘সব নদী সাগরে গিয়ে মেশে।’
সেদিনের সাগর আবার আমি খুঁজে পেলাম এদিন। কলকাতার আলিয়ঁস ফঁসেজ সভাঘরে। ১৭ মে একটি আলোচনা সভা ছিল। বিষয় ছিল ১৯৬৮ সালের সামাজিক বিপ্লব। ‘Social Revolution of May 1968.’ অবশ্যই এই বিপ্লব ফ্রান্সে। পঞ্চাশ বছর আগের ঘটনা। সেদিনের অন্যতম আলোচক অধ্যাপক চিন্ময় গুহ আমাদের মনে করিয়ে দিলেন, ‘’১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের ৫০ বছর পর ফরাসী বিপ্লব।‘’ কি অদ্ভুত তাৎপর্য দেখুন ২০১৮ সালের ১৭ মে ‘আলিয়ঁস ফঁসেজ’ আয়োজন করল ফরাসী বিপ্লবের পঞ্চাশ বছর। আলোচনা শুরু হওয়ার আগে ফরাসী বিপ্লবের উপর একটি তথ্যনিষ্ঠ তথ্যচিত্র ছিল। ‘Confrontation: Paris, 1968’ নামে তথ্যচিত্রটি শুরু হচ্ছে হাজার হাজার ছাত্র, যুবকের মিছিল দিয়ে। তাঁদের হাতে মাও সে তুং’ (‘মাও জে দং’)-এর ছবি দেওয়া প্ল্যাকার্ড। হাতে সিগারেট। লম্বা চুল, মুখে শ্লোগান। বিশ্ববিদ্যালয়ের কতৃপক্ষের গৃহীত নীতির প্রতিবাদ করতে প্যারিসের রাস্তায় ছাত্ররা নেমেছিল। ছাত্রদের দাবি ক্রমশঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর ইউরোপের সামাজিক সমস্যাকে সামনে এনে আছড়ে ফেলল।
ফ্রান্সের এই ছাত্র আন্দোলনকে আমরা জানি, ‘Radical Revolution, heritage of the world.’ যে কথা তথ্যচিত্রটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে। ফ্রান্সে ছাত্র আন্দোলন শুরু হওয়ার কয়েক বছর আগে আলজিরিয়া নামক ফ্রান্সের দখলে থাকা এক অঙ্গরাজ্য স্বাধীনতার আন্দোলন করে স্বাধীন হয়েছে। আলজিরিয়ার স্বাধীনতার এই আন্দোলনে বাস্তব সাহায্য দেওয়ার জন্য ফ্রান্সের কিছু বুদ্ধিজীবী এবং যুবকর্মী এক গুপ্ত সংগঠন গড়ে তুললেন। এই সংগঠনের নাম ছিল ‘রেজো দ্য সুতিয়াঁ’। ফরাসী থেকে বাংলা অনুবাদে আমরা পেয়েছি, ‘সাহায্যকারী দল’। ১৯৬০ সালের মুখে এই দলটি ধরা পড়ে। সামরিক আদালতে তাঁদের বিচার শুরু হয়। এই দলের নেতা ছিলেন ফ্রাঁসিস ঝাঁসঁ। জঁ পল সাত্র এই দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই অভিযোগে সর্বকালের অন্যতম  শ্রেষ্ঠ মনীষী এবং লেখক সাত্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ তোলা হয়। সামরিক আদালত তাঁকে তলব করেছিল। তিনি একটি লিখিত উত্তর দিয়েছিলেন। সেই লেখা আজ ঐতিহাসিক দলিল। তৎকালের শাসক দলের অনেক পেটোয়া সংবাদপত্র, সমাজপতি এবং তাঁদের অনুচরেরা সাত্রকে গ্রেপ্তার এবং বিচারের দাবি জানায়। কিন্তু ফরাসী সরকার সেটা করতে সাহস পাননি।
১৯৬০ সালের পর থেকেই ফ্রান্সের সামাজিক আকাশে বিদ্রোহের আগুন ধিকি ধিকি জ্বলছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইউরোপের পরাজিত শাসকদের তথা শাসক দলের সামনে বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক সমস্যা এসে কড়া নাড়তে থাকে। ১৯২৯ সালের বিশ্বমন্দা সামলে উঠেছে ইউরোপ। শিল্প বিপ্লবের ফলে ইউরোপের শ্রমিক শ্রমের মূল্য চিনে নিতে চাইছে। আট ঘণ্টা কাজ, সম বেতন, সংসদীয় গণতন্ত্রের অধিকার ইত্যাদি দাবিতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট পার্টি আন্দোলন শুরু করেছে। সামনে সোভিয়েত মডেল অথবা চিনের মডেল। অদূর ভবিষ্যতে ফ্রান্সের কমিউনিস্ট পার্টী সংসদীয় পথে ক্ষমতা দখলের নীতিকে সামনে নিয়ে আসতে শুরু করবে। ওয়েস্টার্ন ফ্রান্সে আপার মিডল ক্লাস থাকত। শ্রমিক, ছাত্র যুবদের মিছিল প্রসঙ্গে ১৯৬৮ সালে ‘ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ড’ (Ebening Standard) একটি খবর করে। আমরা ‘Confrontation: Paris, 1968’ তথ্যচিত্রে দেখি সেই খবরের কাগজের কাটিং., তাতে লেখা ’35, 000 workers and student marching on the Paris.’
 সেদিনের অন্যতম বক্তা অধ্যাপক হরি বাসুদেবন বললেন, ‘’স্যুটেড অ্যান্ড বুটেড মানুষ পঞ্চাশ বছর আগে রাস্তায় নেমেছিল। ফ্রান্স বিপ্লব। এটাকেও কমিউনিজম বলতে হয়। ইউরোপিয়ান বুদ্ধিজীবীরা আধুনিক বিশ্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছেন। ভারতে নকশালপন্থী আন্দোলনে ফ্রান্স বিপ্লবের প্রভাব পড়েছে।‘’ 
ইতিহাস বলছে, ১৯৬৮ সালের ফ্রান্সের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সামনে আসার প্রধান কারণ শ্রমিক শ্রেণীর বৈপ্লবিক আন্দোলন। এই আন্দোলনে ছাত্রযুবক, বুদ্ধিজীবীদের সহযোগিতায় অল্প সময়ের জন্য সোবর্ণ, প্যারিস এবং অন্যান্য শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কারখানা, সাময়িক পুলিশ চৌকি দখল করেছিল।                       
ফরাসী সমাজের গভীর এক যন্ত্রণা ব্যপ্তি পেল সমস্ত ইউরোপ। ইউরোপ থেকে সাগর পাড়ের ঢেউ আছড়ে পড়ল ভারতে। তথা কলকাতার অভিজাত কলেজে। প্রেসিডেন্সি কলেজে। ১৭ মের আলোচনা সভায় সেই প্রসঙ্গ তুললেন অধ্যাপক শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত। আমাদের মনে করিয়ে দিলেন তিনি। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের একটি কবিতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘’ফ্রান্স বিপ্লবের প্রভাব পড়েছিল ব্রিটেন এবং ভারতে। প্রেসিডেন্সি কলেজের আন্দোলন উদাহারণ বলা যায়। ষাটের দশকে নকশাল বাড়ির কৃষক আন্দোলনকে প্রেসিডেন্সী কলেজের মেধাবী ছাত্রদের সমর্থন অবশ্যই ছিল ফরাসী বিপ্লবের ছায়ায়। আধা সামন্ততান্ত্রিক আধা ঔপনিবেশিক ভারতের আর্থ সামাজিক ছবিটা বদলে ফেলতে নকশাল বাড়ির আন্দোল ছিল একটি ব্যতিক্রমী আন্দোলন।‘’
এদিন আলোচনা সভায় অধ্যাপক শোভনলাল দত্তগুপ্ত বলেন, ‘’লক্ষ করেছেন মিছিলে যারা হাটছেন তাঁদের হাতে ‘পোস্টার অব মাও’, ১৯৬৮ সালের ছাত্র বিপ্লব। ইতালি, পোল্যান্ডের আন্দোলনও ফ্রান্স বিপ্লবে প্রভাব ফেলে। আসলে এটা ছিল তৃতীয় বিশ্বের মার্কসবাদ। তাই এটা মাও এটা চেগুয়েভারা, হো-চি-মিন। এই আন্দোলনের শুরু কিন্তু আমেরিকায়। ১৯৬৫ সালে বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়। ভিয়েতনামে আমেরিকার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন শুরু হয়। পরে ফ্রান্স কমিউনিস্ট পার্টি ফ্রান্সের এই আন্দোলনের নেতৃত্বে আসে। ১৯৬৮ সালের ফ্রান্সের ছাত্রদের বিপ্লব নতুন এক স্বাধীনতার কথা শুনিয়েছে আমাদের। নতুন গণতন্ত্রের পথ চিনতে আহ্বান করেছে।‘’
ফরাসী ভাষার অন্যতম অনুবাদক তথা লেখক অধ্যাপক চিন্ময় গুহ বলেন, ‘’এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ছাত্রদের একটাই সম্পর্ক সেটা হচ্ছে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ভাঙা। রাস্তায় নামা’। ১৯৬৮ সালে বলেন, জঁ পল সাত্র। ৩৪ জন ছাত্রের বহিষ্কারের প্রতিবাদ করেছেন সাত্র। ১৯১৭ সালের রূশ বিপ্লবের ৫০ বছর পর ফরাসী বিপ্লব। ‘শুধু জীবন’। ‘We are the power, endless try’, মে, ১৯৬৮ সাল ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র ইট ছোড়া নয়। আমি সেই সময় যুবক। কলকাতায় আমরা ছাত্র আন্দোলন দেখেছি। আমাদের দেশের আন্দোলনের তুলনায় ফ্রান্সের বিপ্লব ছিল ব্যতিক্রমী এক দিশা। ফ্রান্স বিপ্লবে সেই দেশের সব স্তরের মানুষ নেমে এসেছিল। আজকের তথ্যচিত্রে সেই দলিল আমরা দেখলাম। কিন্তু তথ্যচিত্রে ত্রুফো, গদার, জঁ পল সত্রের কথা বলা হয়নি। সত্রে ছিলেন ফ্রান্সের অন্যতম বুদ্ধিজীবী। যিনি চিরকালীন হয়ে আছেন তাঁর সামাজিক ক্ষেত্রে উজ্জ্বল ভূমিকার জন্য। ১৯৬৫ সালে তিনি নোবেল পুরষ্কারের জন্য মনোনীত হলেও সত্র পুরষ্কার প্রত্যাখ্যান করেন। রাষ্ট্র যখন দমন পীড়ন নামিয়ে আনে। সাধারণ মানুষ সেই অত্যাচারের প্রতিবাদ করলে যে কোনও দেশের বুদ্ধিজীবীরা চুপ করে থাকেন না। উত্তর আধুনিক ভারতে তথা আমাদের বাংলায় উদাহারন মৃণাল সেনের ‘ভূবন সোম’, সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’। ফ্রান্স বিপ্লব সমস্ত বিশ্বকে নতুন সূর্যের স্বপ্ন দেখিয়েছিল।’’

‘নদী চলে যাবেই জানি সাগরের টানে।’ শশ্মান আমাকে টানছে। নদী আমাকে ডাকছে। ‘সৃষ্টির মহানন্দে আমি সেইদিন হব শান্ত.........’ । সীমাহীন চেষ্টায় পাওয়া যায় শুধু জীবন।                                                 

Sunday, 13 May 2018

নতুন বইয়ের নাম ‘হিউম্যান বুকস’

মঞ্চে যে মানুষটা রাজারমত দেখতে, কিন্তু রাজা নন। পড়ে আছেন ঝলমলে এক রাজার পোশাক। শেরোয়ানি বলা যায়। মাথায় ঝলমলে পাগড়ি। তিনি ম্যাজিক দেখাছেন। যে কোনও শহরের যে কোনও মঞ্চে, নামজাদা অথবা অনামী জাদুকর, মঞ্চে জাদু দেখানোর সময় ‘ওয়াটার অব ইন্ডিয়া’ নামে একটি ম্যাজিক দেখাতেন। আমরা ছোটবেলায় বিভিন্ন মঞ্চে এই জাদু দেখেছি। বাংলা তথা ভারতের মানুষের কাছে জাদু প্রদর্শনীর পরিচিত খেলা হয়ে গিয়েছিল। অনেক ম্যাজিসিয়ান জনপ্রিয় ম্যাজিকটি দেখাতেন। কিন্তু ওই জাদুটির আবিস্কারকের নাম আর কেউ বলেন না। এটাই নিয়ম। আমরা বড় হয়ে জানলাম এই জাদুটির আবিস্কারক জাদু সম্রাট প্রতুল চন্দ্র সরকার। চিনতে অসুবিধে হচ্ছে? না কোনও প্রয়োজন নেই পুরো নাম বলার। আসল নাম পি সি সরকার। এবার চিনতে পারছেন? ম্যাজিকের সেই সম্রাটকে নিয়ে সম্প্রতি একটি বই প্রকাশ হল। কলকাতার সাউথ সিটি মলের  দোতলায় ‘স্টার মার্কে’। ‘THE MHARAJA OF MAGIC’  নামে বইটি প্রকাশ হল। নিয়োগী বুকস থেকে প্রকাশিত বইটির লেখক জাদু সম্রাট পি সি সরকারের সুযোগ্য মেজছেলে আরও এক পি সি সরকার (জুনিয়ার)। পুরো নাম প্রদীপ কুমার সরকার।
পি সি সরকার বিংশ শতাব্দীর অন্যতম আলোচ্য ব্যক্তিত্ব। ভারতে হারিয়ে যাওয়া অথবা মন্থর গতিতে চলতে থাকা হাত সাফাইয়ের খেলাকে তিনি নতুন এক ভাষায় ফিরিয়ে দিয়ে গেছেন। তাঁর সৃষ্ট ম্যাজিকের নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘ইন্দ্রজাল’। এই ‘ইন্দ্রজালকে’ তিনি বিশ্বের মঞ্চে জনপ্রিয় করেছিলেন। তাঁর জাদুতে মিশে আছে মনঃস্তত্ব, দর্শন এবং অবশ্যই বিঞ্জান। আলোচ্য বইটি জাদুসম্রাট পি সি সরকারের জীবনের সময়কালের একটি মূল্যবান সময়ালেখ্য। জাদুসম্রাটের সুযোগ্য সন্তান তাঁর শৈশব, কৈশোর যৌবনে দেখা পারিবারিক অভিভাবকের ছবি যেমন লিখেছেন, পাশাপাশি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন ‘ইন্দ্রজাল’ নামক এক বিঞ্জানের স্রষ্টা  মহারাজকে। প্রদীপ চন্দ্র সরকার সাফল্যের সঙ্গে বিংশ শতাব্দীর একজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বের ক্যানভাস আমাদের সামনে এনে দিয়েছেন। যে ক্যানভাসে ধরা আছে এক অনন্য কোলাজ। ‘The Maharaja of Magic’ নামে বইটির মূল্যবান আরও একটি অধ্যায় মহারাজের বহু মুল্যবান ছবি। এছাড়া বইয়ে আছে কিছু অপ্রকাশিত পোস্টার, বিভিন্ন খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রবন্ধ, কার্টুন ছবি, পারিবারিক ছবি, ব্যক্তিগত দলিল দস্তাবেজ, সম্মানপ্রাপ্তি এবং পুরষ্কারের ছবি (ফ্যাকসিমিলি)। যে সব প্রদীপবাবু নিজের সংগ্রহ থেকে ব্যবহার করেছেন বইয়ের মান এবং উচ্চতা বোঝাতে। কারণ তিনি নিজেও একজন স্বনামধন্য ম্যাজিসিয়ান এবং উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিত্ব। বিঞ্জানমনস্ক চিরকালীন এবং মননশীল এক সামাজিক ব্যক্তিত্ব জাদুসম্রাট পি সি সরকারকে কলমের চিরন্তন ভাষায় প্রদীপ সরকার আমাদের সামনে পৌঁছে দিয়েছেন। মেদহীন অনন্য এক ধ্রুপদী বাংলা ভাষায়।
প্রদীপ সরকার বা পি সি সরকার (জুনিয়ার) প্রায়োগিক দর্শনে (Applied Psychology) এম এস সি পাশ করেছেন। কৃতিত্বের সঙ্গে। তিনি কিশোর বয়স থেকেই বাবাকে ‘ইন্দ্রজাল’ প্রদর্শনে সাহায্য করেছেন। প্রদীপ সরকারের কথায়, ‘‘আমি ছোটবেলায় বাবা নিজের ঘরে কি করতেন সেটা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম। আমি পাশের ঘর থেকে একটা টেবিলের উপর টুল অথবা চেয়ার রেখে ‘ঘুলঘুলি’ দিয়ে দেখতাম। কিছু বুঝতে পারিনি। বাবা একটা কাগজে কি সব হিজিবিজি লিখছেন। আমি ভাবতাম পড়াশোনা করছেন।‘’ বাবাকে সাহায্য করতে করতেই প্রদীপ সরকার একদিন আবিষ্কার করেন তিনি নিজেও  ভারতীয় ইন্দ্রজাল(ম্যজিকের)-এর একজন ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন। সালটা ১৯৭১। পি সি সরকার জাপানে গেছেন তাঁর প্রদর্শনীর দল নিয়ে। সেখানে পি সি সরকারের হার্ট অ্যাটাক হল। মঞ্চে হাজির হলেন তাঁর সুযোগ্য ছেলে পি সি সরকার (জুনিয়ার)। নিজের জাদুকাঠির ছোঁয়ায় তিনি সাগরপারের দর্শকদের কাছে ‘ইন্দ্রজাল’ নামক ম্যাজিকের নতুন অধ্যায় শুরু করলেন। একটি ট্রাঙ্কের ভেতরে নিজেকে বন্দী করে ট্রাঙ্কটির দরজা  তালাবন্ধ করে সাগরের জলে ফেলে দেওয়া হল। কিছুক্ষণ পরে পি সি সরকার আবার দর্শকদের সামনে ফিরে এলেন। উল্লেখযোগ্য আরও ম্যাজিক, যাত্রীসহ একটি আস্ত ট্রেনকে ভ্যানিস করে দেওয়া। তাজমহল চোখের সামনে উধাও করে দিয়ে প্রদীপ সরকার ভারতীয় জাদুকে আন্তর্জাতিক স্তরে আরও উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তিন ডজন ব্যতিক্রমী এবং জনপ্রিয় ম্যাজিক (Illusions) এখনও পর্যন্ত সৃষ্টি করেছেন সরকার পরিবারের পরম্পরা প্রদীপ সরকার অথবা পি সি সরকার (জুনিয়ার)। প্রদীপ সরকার শুধু হাত সাফাইয়ের জাদুকর নন। শব্দ এবং কথারও উল্লেখযোগ্য ভাষাশিল্পী বর্তমান ভারতের অন্যতম ইন্দ্রজাল ব্যক্তিত্ব পি সি সরকার (জুনিয়ার)। ২০ টি বইয়ের লেখক তিনি।    
১১ মে অনুষ্ঠিত বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে একটি ব্যতিক্রমী ‘কথাচারিতা’ ছিল। সরকার পরিবারের তিন প্রজন্মের পারিবারিক বন্ধু পঙ্কজ সাহার সঙ্গে পি সি সরকারের কথোপকথন। কলকাতা দূরদর্শন কেন্দ্রের প্রাক্তন অধিকর্তা এবং কবি এবং লেখক পঙ্কজ সাহা বলেন, ‘’আজকের এই অনুষ্ঠানকে ‘পরম্পরা’ বলতে পারি। এই পরম্পরা মিলনের একটি ইতিহাস হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।‘’
পঙ্কজদার চর্চিত গলায় মননশীল শব্দের এই সূত্রায়নে আমরা সংবাদ মাধ্যমের কর্মী এবং অন্যান্য উপস্থিত দর্শকরা অনুষ্ঠানে মজে গেলাম। আমাদের সামনের আসনে বসে আছেন পি সি সরকার(জুনিয়ার)-এর স্ত্রী জয়শ্রী সরকার, মানেকা, মমতাজ এবং মৌবনি তাঁর তিন মেয়ে। বিশ্বায়ন উত্তর অভিজাত বাজারের অভিজাত বিপণীর আলোকছটায় ঝলমল করছে সভাকক্ষ। ক্যামেরার ফ্ল্যাশবাল্ব ঘনঘন ‘পরম্পরা’ চেনাচ্ছে। কলকাতার অন্যতম খ্যাতনামা পরিবার তখন আমাদের সামনে। ঠিক এই সময়টাকে বেছে নিলেন একসময়ের নাম করা সাংবাদিক পঙ্কজ সাহা। তিনি ছুড়ে দিলেন প্রশ্ন, ‘’তোমার বাবা রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। তুমি ভোটে জিতলে কি করতে?’’
প্রদীপবাবু বলেন, ‘’আমি জনমনরঞ্জনের জন্য ম্যাজিক করি। আমার রাজনীতিতে যোগদান একটা প্রতিবাদ। নাক গলিয়েছিলাম এই জন্য নয় যে কারও নাক কাটতে চাই। আমি যদি দেশের কাজ করি আমি ধন্য হয়ে যাব।‘’
পরের প্রশ্ন করলেন পঙ্কজদা, ‘’আমি আশা করব মানেকা পি সি সরকার (জুনিয়ার)-এর জীবনী লিখবেন। তোমার বাবা জাপানী ভাষা জানতেন। তুমি কি জান?
প্রদীপ সরকার উত্তরে বলছেন, ‘’বাবা জাপানী ভাষা  লিখে নিয়ে বলতেন। আমি ৪৯ বার জাপান গিয়েছি। শুধু ম্যাজিক শো করার জন্য নয়। জাপানী ভাষা আমি শিখেছি। জাপানী ভাষায় আমি কবিতা লিখতে পারি। জাপান আমার আর একটা জন্মভূমি। বাবা বলতেন মাতৃভাষা ছাড়াও অন্তরের একটা ভাষা আছে।‘’
এদিনের অনুষ্ঠানের প্রারম্ভিক সুত্রায়নে আমাদের বাঙালিদের প্রঞ্জা, মনন এবং পরম্পরা বিষয়কে সামনে এনে দিয়েছিলেন ‘নিয়োগী বুকস’-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর বিকাশ দে নিয়োগী। তিনি বলেন, ‘’আমি বর্তমানে প্রবাসী বাঙালি হলেও আমার এবং আমাদের শিকড় কলকাতায়। তাই বাংলাকে আমরা ভুলে যাইনি। নিজের দেশ, নিজের শহর, মাতৃভাষা আমাদের চিরন্তনী চেনায়। পরম্পরাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে  সহায়ক হয়। আমরা সেই দায়িত্বের কথা মনে রেখেছি।‘’ 
‘নিয়োগী বুকস’ প্রকাশনা সংস্থা সূত্রের খবর, কলকাতায় বই পাড়ায় নতুন বই বিপণী শুরু করতে চলেছে এই সংস্থা। পরিকল্পনা অনুযায়ী জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহেই এই সংস্থার তাদের নিজের শহরে নিজস্ব ঐতিহ্য নিয়ে পদার্পণ করবে। আগামী দিনের ‘হিউম্যান বুক’ উপহার দেওয়ার জন্য। সারা বিশ্বের পাঠাগার শিক্ষকরা নতুন করে বই পড়ার কথা বলছেন। এই বই হবে ‘হিউম্যান বুকস’। জ্ঞানের আলোর জন্য বই ছিল। বই থাকবে। ‘ই বুকস’ হোক অথবা পুরনো ‘বাঁধাই বই’। নতুন করে চিনতে হবে ‘হিউম্যান বুকস’-এর পরম্পরা।                                             

Sunday, 6 May 2018

বাহুল্যহীন তথ্যের চোখ

আশির দশকে আমি কয়েকদিনের জন্য বিখ্যাত তথ্যচিত্র নির্মাতা সুরজিৎ দাশগুপ্তের সঙ্গে ঘুরেছিলাম। না এতটা স্পর্ধা আমার ছিলনা। আমি তথ্যচিত্র তৈরি করব। অথবা সিনেমা তৈরি করব। আমি সুরজিৎ দাশগুপ্তের কাছে গিয়েছিলাম ক্যামেরার কাজ শিখব এই উদ্দেশে। সিরিয়াল এবং চলচ্চিত্র পরিচালক যিশু দাশগুপ্ত যেমন বিখ্যাত পরিচালক তপন সিনহার কাছে ক্যামেরার কাজ শিখেছিলেন।  বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষের গড়চা রোডের বাড়িতেও গিয়েছিলাম ‘ক্যামেরার কাজ’ শিখব বলে। আমি লালমাটির দেশ বীরভুম থেকে এসেছিলাম। গৌতম ঘোষের বন্ধু উৎপলদার পরিচয় নিয়ে গড়চা রোডের বাড়িতে গিয়েছিলাম। উৎপলদা নলহাটি সিএডিপি (CADP) প্রকল্পের অধিকর্তা হয়ে এসেছিলেন। সেই সুবাদে তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ। তিনি আমাকে গৌতম ঘোষ এবং সুরজিৎ দাশগুপ্তের কাছে পাঠিয়েছিলেন। আরও একটি সূত্র উল্লেখ করি। আমাদের নলহাটী শহরের তৎকালীন খ্যাতনামা ডাক্তার গনেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের ছেলে গোরাদা (ব্রতীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়)। গোরাদা বিশবভারতীর ‘পাঠভবনে’- শিক্ষকতা করেন। আমাকে খুব ভালবাসতেন।   
গৌতম ঘোষের প্রথম তথ্যচিত্র (যতদূর জানি) ‘সুন্দরবনের আর্জান সর্দার’-এ মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন গোরাদা। তাঁর চিঠি নিয়ে আমি গৌতম ঘোষের কাছে যাই। কলকাতায় আমার থাকার ব্যবস্থা নেই জেনে গৌতমবাবু আমাকে তাঁদের বাড়ির গ্যরাজে থাকতে হবে বলেন। আমি রাজি হয়ে যাই। কিন্তু তিনি কোনও পারিশ্রমিক দিতে পারবেন না, এই কথা আগেই বলে দিয়েছিলেন। সুরজিৎ দাশগুপ্তও একই কথা বলেছিলেন। সুরজিৎ দাশগুপ্ত প্রতিদিনের খাবারের টাকাটা দিতেন। সেটাও ব্যবস্থা হয়েছিল লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের হস্তক্ষেপে। কিন্তু কলকাতায় মাথা গোঁজার জায়গা না থাকায় আমি সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করি। তবে তথাকথিত কয়েকজন বামপন্থীনেতা এবং বন্ধুদের সৌজন্যে আমি ‘ক্যামেরামযান’ হিসেবে সুখ্যাতি পাই। সাংবাদিক হিসেবে নয়। ক্যামেরাম্যান হিসেবে। সাংবাদিকতায় সরকারী অ্যাক্রিডিটেড কার্ড থাকা সত্বেও পরিকল্পিতভাবে এই কথা প্রচার করা হয়েছিল। প্রায় দু’ই দশক এই সম্মান আমি বয়ে বেড়াই। কারণ ২০০১ সালে আমি সোনি কোম্পানীর ‘পি সি ৯ ই’ মডেলের একটি ভিডিও ক্যামেরা কিনি। তখনকার সময় ওই ক্যামেরার দাম ছিল এক লাখ টাকা। তাই ‘ক্যামেরাম্যানের’ যন্ত্রণা আমার কৈশোর-যৌবন এবং পৌঢ়ত্বে লেপ্টে আছে। প্রসঙ্গ আমার ব্যক্তিগত জীবন বা পেশাদারি জীবন নয়। প্রসঙ্গ ভারতীয় তথ্যচিত্র এবং.........।
সম্প্রতি একটি তথ্যচিত্রের প্রদর্শন এবং আলোচনাসভার আয়োজন করেছিল কলকাতার ফরাসী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ। আমন্ত্রণপত্রে লেখা ছিল ‘’Allinca Francaise du Bengale and Charles Wakeman Films welcome you to ‘Nemai Ghosh: A Ray of Light’ (the Calcutta preview of) screening of the Film directors.’’  তথ্যচিত্র নির্মাতা অনির্বাণ মিত্র এবং তীর্থ দাশগুপ্তের যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই ছবির প্রদর্শন আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ ৪মে আয়োজন করে। এই তথ্যচিত্রটি ফরাসী দূতাবাসের ২০১৮ সালের সরকারি অনুমোদিত ৮ম দাদাসাহেব ফালকে ফেস্টিভ্যালের তালিকাভুক্ত। তথ্যচিত্র শুরু হওয়ার আগে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। আলোচনাসভার শুরুতেই আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের দায়িত্ব প্রাপ্ত আধিকারিক পিয়নী সেনগুপ্ত আমাদের জানান, নিমাই ঘোষ এবং সত্যজিৎ রায়ের ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়ে। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের ডাইরেক্টর ফাব্রিক প্লাঙ্কন বলেন, ‘’আমরা এই ছবির সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে গর্ব বোধ করছি। কারণ সত্যজিৎ রায় এবং নিমাই ঘোষের সঙ্গে ফরাসী দেশ তথা প্যারিস শহরের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সেই সম্পর্কের স্রোত আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্থান করে দিয়েছে।‘’      
 সেই আলোচনা সভায় ভারতের প্রবীণ ক্যামেরা শিল্পী বলেন, ‘আমি যদি মানিকদার সান্নিধ্যে না আসতাম তাহলে আমার এই চোখ বা চোখের ভাষা তৈরি হত না। ২৫ বছর মানিকদা মানে সত্যজিৎ রায়কে আমি কাছ থেকে দেখেছি। তাঁর বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি যেমন আমি তুলেছি, আমি তাঁর সঙ্গে থেকে তথ্যভিত্তিক ক্যামেরার ভাষাও শিখেছি।‘’
আলোচনা সভায় ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছবির পরিচালক অনীক দত্ত হাজির ছিলেন। তিনি তাঁর নিজের অভিঞ্জতার কথা বললেন। বিশ্ব বরেণ্য শিল্পী নিমাই ঘোষের কাছে যাওয়ার অভিঞ্জতাও তিনি আমাদের শোনালেন। অনীক এতটাই শ্রদ্ধা করেন নিমাইবাবুকে যে তিনি প্রয়োজন থাকলেও ফোন করতে চাইতেন না। কারণ তাঁর অনুভব যদি ব্যস্ত শিল্পীকে বিরক্ত করা হয়? অনীকবাবু বলেন, ‘’যদিও পরে নিমাইদা নিজেই আমাকে ফোন করতেন যেটা আমার কাছে অনেক সহজ হয়ে যায়। নিমাইদা একজন অতি সাধারণ এবং সহজ ব্যক্তি। সিনেমা শিল্পের জন্য তিনি যে কোনও সাহায্য করতে প্রস্তুত আছেন যে কাউকে।‘’
ছবির (তথ্যচিত্র) অন্যতম পরিচালক অনির্বাণ মিত্র তাঁর এই ‘Nimai Ghosh: A ray of Light’ তথ্যচিত্র তৈরির অভিঞ্জতার কথা বলেন। আমাদের সামনের পর্দায় ক্যামেরার ভাষায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্যামেরা ব্যক্তিত্ব নিমাই ঘোষকে হাজির করেন। ৪৮ মিনিটের ছবির শুরুই হয় একটি ক্যামেরা, লেন্সে নিমাইবাবুর আলতো ছোঁওয়া দিয়ে। তথ্যচিত্রে অনির্বাণের ক্যামেরা ঘুরতে থাকে আন্তর্জাতিক শিল্পীর ঘরে। সেখানে প্রাঞ্জ নিমাইবাবু বসে আছেন একটি চেয়ারে। তাঁর প্রবীণ মুখের বলিরেখা আমাদের নিয়ে যাচ্ছে সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টির ঝর্ণাবেলায়। ক্যামেরাবেলায়। সেলুলয়েডের প্রত্যয় চিনতে বলছে। তথ্যচিত্রে নিমাইবাবুর বাংলায় বলা কথাগুলি থেকে আমরা জানতে পারি নিমাইবাবু দীর্ঘদিন প্রারিশ্রমিক ছাড়া কাজ করেছেন মনের টানে। ক্যামেরা শিল্পের টানে। ধ্রুপদী শিল্পের টানে তিনি কাজ করেছেন। তাঁর প্রথমদিকে কখনও মনে হয়নি যে পারিশ্রমিক প্রয়োজন। এমনই একটি প্রসঙ্গে নিমাইবাবু তথ্যচিত্রে বলছেন, ‘’সবাই পারিশ্রমিক পান আমি পাইনা। আমি কাজ করে যাচ্ছি। মানিকদা জানতেনও না। একদিন মানিকদার বাড়িতে মানিকদার সামনে প্রযোজক সংস্থা সব শিল্পীকে পারিশ্রমিক দিচ্ছেন। আমি মানিকদার কাছে হাত পেতে বললাম, ‘মানিকদা আমাকে একটা টাকা দেবেন। আমার পারিশ্রমিক’। মানিকদা শুনে প্রযোজক ভদ্রলোককে বললেন, ‘ও তাইতো নিমাইকে তাঁর পারিশ্রমিক দিতে হবে। নিমাই এখন আমাদের ইউনিটের লোক। ওর বিষয়ে কী করা যায় একটু দেখবেন।’ এরপর থেকে আমি পারিশ্রমিক পেতে শুরু করি।‘’
এই তথ্যচিত্রের উল্লেখযোগ্য বিষয় এটি। নিমাইবাবুর মত আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন  ফটোগ্রাফারকে নিয়ে তৈরি  কালোসাদা তথ্যচিত্রে তাঁর দীর্ঘজীবনের বিভিন্ন প্রসঙ্গ এসেছে। আমরা আরও বিস্তারিত তথ্য জানতে পেরেছি পরিচালক সন্দীপ রায়ের সময়োপযোগী বক্তব্যের মাধ্যমে। তিনি নিমাইবাবুর তাঁদের পরিবারের সদস্য হয়ে ওঠার কথা আমাদের শুনিয়েছেন। সন্দীপ রায় বলেন, ‘’তখনকার সময়ে বাংলা চলচ্চিত্র ইউনিটে স্থীরচিত্রের ক্যামেরাম্যানের নিয়মিত কাজ ছিল না। বাবার সঙ্গে কাজ করার সুবাদে নিমাইকাকু এই ধারার অন্যতম নাম। একটা সময় স্টীল ক্যামেরাম্যান হিসেবে বাবার ইউনিটে নিমাইকাকু নিয়মিত কাজ করতে থাকেন।‘’
‘Nemai Ghosh: A Ray of Light’ তথ্যচিত্রে অভিঞ্জ নিমাইবাবু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অর্জিত অভিঞ্জতায় গড়ে ওঠা মননে তৈরি চোখের ভাষায় কথা বলেন। আড়ম্বরহীন সেই ভাষার পরতে পরতে এসেছে সত্যজিৎ রায়ের প্রতি কৃতঞ্জতা। বন্ধুপ্রতিম রবি ঘোষ সহ একাধিক তৎকালীন চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের কথা তিনি আমাদের বলেছেন। আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ করার কথাও আমরা শুনেছি। অনির্বাণ এবং তীর্থ এই বিষয়গুলিকে ক্যামেরা এবং সুরের সম্মিলিত আবেদনে দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তথ্যচিত্রের বিস্তারও মানে ‘ডিটেলিং’ নিয়েও আলাদা করে পরিচ্ছদ রচনা দাবি করে। আমরা প্রেস বিবৃতি থেকে জানতে পারছি, ‘’Nemai Ghosh: A Ray of Light is the product of its director’s deep admiration for Satyajit Ray, whose works have had an indelible influence on his creative outlook and sense of detailing, an appreciation of Nemai Ghoh’s candid photography, and the filmmaker’s own experience of visual storytelling. This documentary-feature, the first cinematic venture of Anirban Mitra, deals with the world of Satyajit Ray as seen by his photo-biographer Nemai Ghosh— through his lenses and unique perceptive. The subject is the beginning and progress of Ghosh’s  journey in photography in era of classic, analogue medium with all its nuances and beauty. ……….The narration of the film has been recorded in the UK by voice artist Mark Mansell.  
 পরিচালক অনির্বাণ মিত্র সম্পর্কে লেখা হয়েছে, Anirban Mitra has been working as a still photographer from 2003......................... He has photographed 40 stately homes and places in Calcutta and most of the erstwhile vice-regal palaces and estates in Bengal. His solo exihibitations have been mounted in premier galleries in Calcutta and London.
তথ্যচিত্রে নিমাইবাবু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘’ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন শহরে স্টীল ফটোগ্রাফারদের কাজ নিয়ে স্থায়ী প্রদর্শনী কক্ষ রয়েছে। ভারতে তথায় কলকাতায় এটা করা যায় কিনা সেটা আমি ভেবে দেখার অনুরোধ করছি।‘’ তথ্যচিত্র শেষ হওয়ার পরে প্রশ্ন উত্তর পর্বে আলোচ্য প্রতিবেদক পরিচালক অনির্বাণ মিত্রের কাছে জানতে চেয়েছিল অভিঞ্জ নিমাইবাবুর প্রস্তাব নিয়ে তাঁরা কি ভাবছেন? অনির্বাণ জানান, ‘’আপনার প্রশ্নটা খুব ভালো। কিন্তু এতবড় একটা কাজ নিয়ে আমাদের সামান্য ক্ষমতায় কি করতে পারি। কেন্দ্র সরকার, রাজ্য সরকার এবং ফরাসী দূতাবাস সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে এই কাজ করা সম্ভব।‘’ পরে একান্ত সাক্ষাৎকারে অনির্বাণ জানান, ‘’আমরা এই ছবি সেন্সর বোর্ডের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছি। সেন্সর বোর্ড ছাড়পত্র দিলে কলকাতায় একটি বড় প্রেক্ষাগৃহে এই তথ্যচিত্রের প্রদর্শনী করার পরিকল্পনা আছে। কলকাতার বৃহত্তর নাগরিক সমাজ ছবি দেখার পরে নিমাইদার প্রস্তাবটা নিয়ে ভাবতে পারেন।‘’      
সৃষ্টিশীল সহকর্মী তীর্থ দাশগুপ্ত যুগ্ম প্রযোজক হিসেবে একসঙ্গে কাজ করেছেন এই তথ্যচিত্রে। ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে তীর্থ বলেন, ‘’আমি দীর্ঘদিন এডিনবরায় আছি। আমরা ওই শহরে একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করছি। এছাড়া লন্ডন শহরেও আমন্ত্রণীমূলক একটি প্রদর্শনীর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। সবকিছু নির্ভর করছে সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পাওয়ার পরে।‘’

প্রেস বিবৃতিতে তীর্থ সম্পর্কে লেখা হয়েছে, ‘’In 2015, he joined forces with a friend to make a short film, titled The Paper Boy, which was selected for a number of film festivals in India, including the prestigious Dada Saheb phalke Film Festival and Calcutta International Film Festival. The film won the first prize in the BGHSAA Satyajit Ray Memorial Short Film Festival.  

এই ছবি নিয়ে আলোচনাসভায় উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং খ্যাতনামা লেখক শঙ্করলাল ভট্টাচার্য। তিনি পরে আমাকে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘’নিমাইদার দু’টো বড় কাজ প্রচার পায়নি। একটি অ্যান্তোনিয়েকে নিয়ে নিমাইদার ধারাবাহিক ছবি। যে ছবিগুলি নিয়ে ইতালির দূতাবাস প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিল। দ্বিতীয় কাজটা হচ্ছে প্যারিস শহরের উপর তোলা নিমাইদের ছবি। যে কাজ শিল্পের পর্যায়ে উন্নত হয়েছে। ফরাসী দূতাবাস সেইসব ছবির প্রদর্শনী করেছে। কিন্তু এটাই শেষ কথা হতে পারেনা। আমি যে দু’টি বিষয়ে উল্লেখ করলাম সেই বিষয় দু’টি নিয়ে বই প্রকাশ করা যেতে পারে। বই দু’টির সব কাজ শেষ হলেও প্রকাশকের অভাবে বই প্রকাশ করা যাচ্ছে না। কোনও প্রকাশক এগিয়ে এলে এই বই পরবর্তী প্রজন্মের কাজে ভীষণ সাহায্য করবে।‘’
‘Nemai Ghosh A Ray of Light’ এই তথ্যচিত্রের সুর এবং আবহসঙ্গীত রচনা করেছেন শুভজ্যোতি পাল। তথ্যচিত্রের মূলভাষা এবং থিমকে মাথায় রেখে ছবির সুর সংযোজনা আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছে।                     

                                                  

Saturday, 28 April 2018

আত্মীয়হীন অচেনা সমাজকে ওরা ভুলে থাকতে চায়।

বিষয়টা আমাকে প্রথম ভাবিয়েছিল আমার কৈশোর থেকে যৌবনে উত্তীর্ণ হওয়ার সময়। নগর সভ্যতা, নাগরিক কলকাতার ভাষা আমি বুঝিনা। আজও কি বুঝি? কে বলবে? এক সুচতুর ভাষা, সুচতুর সংস্কৃতি, চতুর কৌশলে নাগরিক সমাজের এক অংশ আমাদের মত ‘মাটি মাখা’ সরল মানবের মন দখল করতে চায়। পরে নিজেদের মত ব্যবহার করে। প্রথমে আমাদের মন পাচার হয়ে যায়। পরে দেহ পাচার হয়। এটাই সম্ভবত ‘মানব পাচার’ নামক সভ্যতা। এক কথিত এবং অকথিত আদিম সভ্যতা রমরমিয়ে ব্যবসা করছে। একুশ শতাব্দীর গতিশীল এক সমাজে। সাংবাদিকতার সুবাদে গত তিন দশক ধরে ‘শিশু শ্রমিক’ বিষয়টা আমাকে ভাবিয়েছে। কিন্তু একুশ শতাব্দীর প্রথম দশকে আমদের সামনে কালবৈশাখী ঝড়ের গতিতে অচেনা এক দানব আছড়ে পড়েছে। ‘মানব পাচার’ নামক আরও এক সভ্যতার অভিশাপ। মনে পড়ছে ২০০৪ সালে ‘জি নিউজ’-এর জেলার সাংবাদিক হিসেবে আমি দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার দায়িত্বে ছিলাম। সেই বছর আমি নারী পাচার, শিশু পাচার এবং শিশু শ্রমিক নিয়ে একাধিক খবর করেছি।  
বামফ্রন্ট সরকারের আমলে পঞ্চায়েতে ব্যপক দুর্নীতির খবর যেমন আমাদের করতে হয়েছে, পাশাপাশি চমকে উঠার মত বিষয় মানব পাচার। বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে যাওয়া একটি মেয়ের আমি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সেই সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে একটি খবর করি। ৩ অক্টোবর, ২০০৪ সালে ‘দৈনিক স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় খবরটি আরও বিস্তারিতভাবে লিখি। ‘নারীপাচার নিয়ে উদ্বেগে প্রশাসন’ শিরোনামে করা খবরের কিছুটা অংশ এখানে উল্লেখ করছি, ‘’......জিন্নাইদহ জেলার যশোর থানার কোরচানপুর পোস্ট অফিস এলাকার সবদলপুর গ্রামের মহঃ ফৈজল করিম মোল্লার বড় মেয়ে চক্রান্তের শিকার হয়ে কয়েকমাস মুম্বাইয়ের নিষিদ্ধপল্লীতে কাটাতে বাধ্য হয়। ওই মহিলা সমিতি মুম্বাইয়ের ১৮, গিরগাঁও কোর্টের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে ফতিমাকে তাঁর স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দিতে চায়। সেই মত মহিলা সমিতির এক্সিকিউটিভ কমিটির এক সদস্য ভারতীয় বিদেশ দপ্তরে লিখিত অনুরোধ জানান। সেই অনুরোধের ভিত্তিতে ভারতীয় বিদেশ দপ্তর কলকাতায় বাংলাদেশের উপ রাষ্ট্রদূত তৌহিদ হোসেনকে বিষয়টা জানায়। এ বিষয়ে তৌহিদ হোসেন জানান, ‘’আমরা ভারত সরকারের চিঠি পেয়েছি। এবং আমরা ফতিমার বাড়ির ঠিকানায় যোগাযোগও করেছি। সরকারি প্রক্রিয়া শেষ হলেই আমরা ফতিমাকে দেশে ফিরিয়ে নেব।‘’           
সেই খবরকে আশ্রয় করে ২০১১ সালে আমাদের প্রেসক্লাবের স্যুভেনিয়রে ‘দুই কন্যার গল্প- যা গল্প হলেও সত্যি’  শিরোনামে আমার লেখায়  ফতিমার বলা কথাগুলি উল্লেখ করি। এই লেখায় আবার উল্লেখ করতে চাইছি।
ফতিমা বিবির পদ্মা
ওর বয়স ১৯ না ২০ ও নিজেও জানে না। প্রশ্ন করলেই এক নদী ঢেউয়ের মত খিল খিল করে হেসে ওঠে ফতিমা। বলে, আমি কেমনে জানুম?
বাংলাদেশের খাল-বিল। নদ-নদী, গাছ-গাছালির সরলতা মাখা মুখ আমাকে বিহবল করে রেখেছে। টানা টানা চোখ। ধব ধবে ফর্সা। ফতিমাকে দেখে মনে হচ্ছে কত দিনের চেনা। তখনও মুম্বাইয়ের আরব সাগরের ক্লান্তি ওকে ছুঁতে পারেনি। নিজের কাজের কথা ভেবে সুন্দরের পূজা ভুলে অসুন্দরের খোঁজে ফিরি। জানতে চাই, ‘ফতিমা তুমি মুম্বাই কি করে গেলে?
নিরক্ষর ফতিমা বলে, ‘’বাড়িতে আমরা পাঁচ বোহিন। এক ভাই। আব্বা রিক্সা চালায়ে আমাগো সকলকে খাবার দিতে পারতেসিল না। মায় মোড়ল বাড়িতে কাম করে, তায় আর কি হয়? বাপটা একদিন আমারে দালালের কাছে বেঁচে দিলে। আমি জানতাম ওই লোকটা আমাকে নিকা করবে। বড় শহরে গিয়া বুঝলাম ঠগসি। আর কী করুম? কন?’’
‘এখন তুমি কি করবে?’
‘’আমি বাড়ি যাতি চাই। মাডাও চায় শুনসি। কিন্তু ওই মিনসা আমাগো বাপটা লইয়া যাইতেছে না। আমি কী করুম কনতো?’’
‘ও আকাশ প্রদীপ জ্বেলনা—ও বাতাস আঁখি মেলনা’ গানটা এরকমই ছিল না?
ফতিমা এখনও সহজ সরল বাংলাদেশের মেয়ে। ওরা হারিয়ে কোথায় যাবে? এই সমাজ ওদের জায়গা করে দেয়। যতদূর জানি তৎকালীন বাংলাদেশের কলকাতার ডেপুটি হাইকমিশনার তৌহিদ হোসেন নিজের উদ্যোগে ফতিমাকে বাংলাদেশের বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তৌহিদ সাহেব আমায় বলেছিলেন, তিনি যেভাবেই হোক ফতিমার পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবেন। ফতিমা বাংলাদেশে ফিরে গিয়েছিল জানি। কিন্তু তারপর?
তারপর ১৩টা বছর কেটে গেল। ফতিমাদের মত কত মেয়ের গল্প প্রতিদিন বিভিন্ন দেশের সংবাদপত্রে প্রকাশ হচ্ছে। বিভিন্ন অসরকারি সংস্থা মানব কল্যাণে কাজ করছে। তাঁরাই চেষ্টা করছে মানব সভ্যতার এই অভিশপ্ত অধ্যায়ের সঙ্গে যুঝে ফতিমার মত আরও অনেক মেয়েকে বাবা-মা, দাদা-ভাই, নিজের সন্তানের কাছে ফিরিয়ে দিতে। আমেরিকান সেন্টার সূত্রে খবর, সারা বিশ্বে মানব পাচারের ঘটনায় প্রতিহিংসামূলক অত্যাচারের শিকার হয়েছেন আনুমানিক ২৫ মিলিয়ন সাধারন মানুষ।
 হাতের কাছে একটি লেখা পাচ্ছি। ‘Human Trafficking in India must end’ শিরোনামে লেখাটি ৮ নভেম্বর রমণদীপ কাউর অনলাইন পত্রিকায় লেখেন,
‘’Human trafficking is one of the major problems in India. Till date no concrete study has been conducted so far to know the exact number of trafficked kids in India. The New York Times has reported on the widespread problem of human trafficking in India especially in the state of Jharkhand. Also in the report it is stated that young girls are trafficked from neighboring Nepal to India. In another article published in The Times of India – Karnataka is the third state in India for human trafficking. Other South Indian states are also the most sought after destinations for human trafficking. Every year more than 300 such cases are reported in each of the four south Indian states. Whereas West Bengal and Bihar, on an average have 100 such cases each year. As per the data, more than half of the human trafficking cases are from these states. According to the latest report on human trafficking by the United Nations Office on Drugs and Crime reveals that Tamil Nadu has 528 such cases of human trafficking in 2012. The number is really high and more than any other state except for West Bengal (549). As per the data from Home Ministry, 1379 cases of human trafficking were reported from Karnataka in the period of four years, in Tamil Nadu the number is 2,244 whereas Andhra Pradesh has 2,157 cases of human trafficking. Recently 300 bonded labourers in Bangalore have been rescued. According to an article in Firstpost, Delhi is the hub of human trafficking trade in India and half of the world’s slaves live in India. Delhi is the hotspot for illegal trade of young girls for domestic labour, forced marriage and prostitution. Delhi is also the transit point for human trafficking.’’
বিভিন সামাজিক সমস্যার মূলে পৌঁছে কলকাতার আমেরিকান কনস্যুলেট জেনারেল অফিস কাজ করছে দীর্ঘদিন ধরে। ‘মানব পাচার’-এর বিরুদ্ধে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে সারা বছর ধরে ধারাবাহিক কর্মসূচী নিয়েছে কলকাতার আমেরিকান সেন্টার। সোশ্যাল মিডিয়ায় হ্যাসট্যাগ ব্যবহার করে ইউ এস কনস্যুলেট জেনারেল, কলকাতা, পোষ্টার, ব্যানার মাধ্যমে প্রচার করে। পোষ্টারে লেখা ছিল,
# Kolkata TIP Conclave7
Myth: Sex trafficking affects only women, while labor trafficking affects only man.
O Fact: Both men and women can be victims of sex labor trafficking.
O Trafficking target vulnerable populations around the world.
O Traffickers do not discriminate; victims can be men, women, children, Citizens and non-Citizens alike, from all Socio-economic groups.   

এদিন ছিল মানুষ পাচার রোধের একটি অনুষ্ঠান।  শুক্রবার ২৭ এপ্রিল  ‘Join us to strengthen the global fight against ‘Human Trafficking’, 7th anti-Trafficking in persons Conclave.’  শিরোনামে অনুষ্ঠানে হাজির থাকার সুযোগ আমার হয়েছিল। ব্যাতিক্রমী ছিল কলকাতার আমেরিকান সেন্টারের এই অনুষ্ঠান। সমস্ত দিক থেকে।
সকাল থেকে শুরু হয়ে সারাদিন চলে কনক্লেভ। মানব পাচার কি করে বন্ধ করা যায়? সেই বিষয়ে আমেরিকান সেন্টারে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, রাজ্যের সরকারি প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘কনক্লেভ’-এ আলোচনা হয়। আমরা আমন্ত্রিত ছিলাম দ্বিতীয় পর্যায়ে। এই পর্যায়ে একটি তথ্যচিত্র দেখানো হয়। ‘Not My Life’ নামে এই ধরণের তথ্যচিত্র আমি আগে দেখিনি। মূলত আফ্রিকার দু’তিনটি শহরকে তথ্যচিত্রে বেছে নিলেও পরিচালক রবার্ট বিল হেইমার আমাদের টানতে টানতে নিয়ে যান সমস্যার গভীরে। তথ্য পরিসংখ্যানে ভারাক্রান্ত না করে বাস্তবের ক্যানভাস সামনে আনেন রবার্ট। তিন থেকে চারজন নারীর ব্যক্তিগত জীবনে তিক্ত অভিঞ্জতার কথা তিনি শোনান। একজন পাচারকারীকে আমরা দেখি পুলিশ তার হাতে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে নিজেদের গাড়িতে তোলে। ‘Not my Life’ তথ্যচিত্রে এই দৃশ্য পরিচালক আমাদের সামনে বার কয়েক আনেন। আমরা জানতে পারি গ্রেপ্তার হওয়ার ব্যক্তির ৯৫ বছর কারাবাসের সাজা হয়েছে। অনবদ্য রবার্ট সাহেব। আপনি দীর্ঘজীবী হোন। আপনার সাহস শুধু নয় আপনার মুন্সিয়ানা আপনার কথনে। আপনার চিত্রনাট্যের ভাষায়। ‘ক্যামেরার লেন্সে’। আমরা একটি ছবি থেকে নারী পাচারের গভীরে যেতে পারি। আমরা জানতাম পাচার হওয়া মেয়েদের পরিবারের দারিদ্রের কথা। আপনার তথ্যচিত্র থেকে জানতে পারি আরও বিস্তারিত। ওরা পাচার হয়ে কোথায় যায়! কিভাবে থাকে। পুলিশ চেষ্টা করলে পাচার হয়ে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া মেয়েরা বিশ্বের কোন কুঠিতে আছে, সেটা বলতে পারে। সহজ সরল নিষ্পাপ মেয়েগুলিকে ফিরিয়ে দিতে পারে তাঁদের শৈশব, কৈশোর! মানুষ পাচার নিয়ে ‘উইকি পিডিয়া’ থেকে একটি অংশ উল্লেখ করা যাক।
Human trafficking in India, although illegal under Indian law, remains a significant problem. People are frequently illegally trafficked through India for the purposes of commercial sexual exploitation and forced/bonded labour. Although no reliable study of forced and bonded labour has been completed, NGOs[who?] estimate this problem affects[clarification needed] 20 to 65 million Indians. Men, women and children are trafficked in India for diverse reasons. Women and girls are trafficked within the country for the purposes of commercial sexual exploitation and forced marriage, especially in those areas where the sex ratio is highly skewed in favour of men. Men and boys are trafficked for the purposes of labour and may be sexually exploited by traffickers to serve as gigolos, massage experts, escorts, etc.[4][5] A significant portion of children are subjected to forced labour as factory workers, domestic servants, beggars, and agriculture workers, and have been used as armed combatants by some terrorist and insurgent groups.
India is also a destination for women and girls from Nepal and Bangladesh trafficked for the purpose of commercial sexual exploitation. Nepali children are also trafficked to India for forced labour in circus shows.[citation needed] Indian women are trafficked to the Middle East for commercial sexual exploitation. Indian migrants who migrate willingly every year to the Middle East and Europe for work as domestic servants and low-skilled labourers may also end up part of the human trafficking industry. In such cases, workers may have been 'recruited' by way of fraudulent recruitment practices that lead them directly into situations of forced labour, including debt bondage; in other cases, high debts incurred to pay recruitment fees leave them vulnerable to exploitation by unscrupulous employers in the destination countries, where some are subjected to conditions of involuntary servitude, including non-payment of wages, restrictions on movement, unlawful withholding of passports, and physical or sexual abuse.[6][unreliable source?]
Human trafficking in India results in women suffering from both mental and physical issues. Mental issues include disorders such as PTSD, depression and anxiety. The lack of control women have in trafficking increases their risk of suffering from mental disorders. Women who are forced into trafficking are at a higher risk for HIV, TB, and other STDs. Condoms are rarely used and therefore there is a higher risk for victims to suffer from an STD. Filmmaker Manish Harishankar highlights the issue of child trafficking in India in his thriller film Chaarfutiya Chhokare, showing the problem, nexus, modus operandi and repercussions. The thriller film Thira, directed by Vineet Srinivasan, also addresses human trafficking in India.
U.S. State Department's Office to Monitor and Combat Trafficking in Persons placed the country in "Tier 2" in 2017.[7] (WikiPedia) )
  
শুক্রবারের তথ্যচিত্রের শেষে ছিল লাইভ চ্যাট। প্রশ্ন উত্তরের পর্ব। পরিচালক রবার্ট বিলহেইমার নিউ ইয়র্ক শহরে বসে উত্তর দিলেন অনলাইনে। প্রশ্ন করলেন মডেল-অভিনেতা নন্দনা দেবসেন এবং আমেরিকান সেন্টারের প্রাণচঞ্চল ডিরেক্টর জেমি ড্রাগন। আমরা সেই আলোচনায় পরিচালকের বিভিন্ন অভিঞ্জতার কথা জানতে পারি। বিশেষত মানুষের দেহাংশ পাচার হওয়ার কথা উল্লেখ করেন রবার্ট।
পরের অনুষ্ঠানটি ছিল আরও একধাপ ব্যতিক্রমী। ‘কলকাতা সংবেদ’ নামে একটি নাট্যগোষ্ঠী আধুনিক ফর্মের বিপ্লবের নাচ (Dance for Revolution) দেখালেন। এবং আমাদের বলতে বাধ্য করলেন ‘Stop Human Trafficking’। কলকাতা সংবেদ নিজেদের নৃত্যনাট্যে বাংলার লোকশিল্পকে ধ্রুপদী ঘরানায় উপস্থাপনা করে বুঝিয়ে দিলেন, ইংরেজি এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ তরুণ প্রজন্ম সামনের সারিতে এগিয়ে আসতে জানে। দলটি তাঁদের নাটকে পুরুলিয়ার ছৌনৃত্য এবং বাংলার পুতুল নাচকে মুন্সীয়ানার সঙ্গে ব্যবহার করেছে।  
শুক্রবারের শেষ অনুষ্ঠান ছিল মানব পাচার নিয়ে যারা সারা দেশে কাজ করছেন তাঁদের সম্মান জানানো। কলকাতার আমেরিকান কনস্যুলেট জেনারেল ক্রেগ হল তাঁদেরই কয়কেজনকে মেমেন্টো এবং সম্মানপত্র দিয়ে সংবর্ধিত করেন।