Monday, 3 September 2018

ছোট্ট ছোট্ট পায়ে ছোট্ট ছোট্ট ছবি


দীপেন্দু চৌধুরী
ছোট ছোট ঘটনার, ছোট ছোট কথার বিনিসুতোর মালা গেঁথে গড়ে ওঠে ‘ছোট গল্প’-এর খন্ড চিত্র। একটা সফল ছোট গল্প পড়তে পড়তে মনে হয় যা শেষ হয়েও হয় না শেষ। আমি একজন লেখকের কথা জানি ১২ টা ছোট গল্প নিয়ে ২১ বছর অপেক্ষা করছেন। ছোট গল্পের সংকলন প্রকাশ করার জন্য। আবার বলতে পারি ‘যা শেষ হয়েও হয় না শেষ’। সেই স্বঘোষিত লেখক ২০১৪ সালে আবার একটা বিনিসুতো টেনে নিয়ে মালা গাঁথতে শুরু করেছিল। না শেষ হয়নি। ছোট ছোট কথা ছোট ছোট খন্ড চিত্র বড় হয়ে থেমে গেল। থেমে রয়েছে। যা শেষ হয়েও হয়নি। এটাও একটা ছোট গল্প হতে পারে। ‘সাত সাগর আর তের নদীর উপাখ্যান’-র কথা সম্প্রতি একটি চিঠিতে লিখেছি। আজ আবার বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, ২১ টা রঙিন সুতো আর ১২ টা সাগরের ঢেউ গোনার চিত্র মালার উপাখ্যান। কিন্তু সময় কোথায়? সামাজিক অবসর কোথায়? সামাজিক ছাড়পত্র, সামাজিক স্বীকৃতি, আর্থিক সহায়তা, সক্ষমতা এতগুলির এবং ছোট গল্পের লেখকের জনপ্রিয়তা থাকলে তবে না এগতে পারা সম্ভব! আপনি বা আপনারা কি বলেন?
আমরা ছোট গল্প, বড় গল্প, উপন্যাস এসবের ইতিহাস বা কাহিনি শোনাতে চাইছি না। সাহসও নেই, দায় আছে।  দায়িত্বের কথা সমাজ ভাবতে শেখাবে। আজ আমরা পাঁচটা খন্ড খন্ড হ্রদয়ের থুড়ি পাঁচজন চলচ্চিত্র শিল্পীর কথা বলতে এসেছি। পাঁচটা ছোট ছবি দেখার বিষয় আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে আমার এই গৌরচন্দ্রিকা। সম্প্রতি কলকাতার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ থেকে ই-মেলে একটি আমন্ত্রণপত্র পাই। ২৯ অগস্ট সন্ধ্যে ৬টায় পাঁচটি ছোট ছবি বা ‘সর্ট ফিল্ম’ দেখার সঙ্গে তিন্নি ভট্টাচার্যের আলাপন। আমার ধারণা ছিল তিন্নি ভট্টাচার্যের নিজের তৈরি পাঁচটা ছোট ছোট ছবির ঠাসবুনোট মালার বহু বর্ণের গ্রন্থন দেখতে পাব। কিন্তু ই-মেলের বিষয় থেকেই জানতে পারি পাঁচজন ভিন্ন ভিন্ন পরিচালকের পৃথক পৃথক ছবি। আমরা জানি ‘চুরি বিদ্যা মহা বিদ্যা’ যদি না পড়ি ধরা। আসুন আমরা সৌজন্য বজায় রেখে কিছুটা ফাঁকিবাজির রাস্তায় হাঁটি। একটু চুরি, না চুরির কাছাকাছি ছোট ছোট শব্দ, বাক্য আড়াল থেকে সামনে নিয়ে আসি। আমি আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, কলকাতার পাঠানোর ই-মেলের বয়ানটা এখানে ছেপে দিতে চাইছি। আপনাদের রাগ হবে নাতো? অবঞ্জা করবেন? কি আর করা যায় বলুন ওই যে চুরি বিদ্যা মহা বিদ্যা। ফাঁকিবাজ শুনতে হবে। কত কথা শুনতে হয়। শুনতে হয়েছে। ছোট্ট ছোট্ট পায়ে এগিয়ে আসা। ছোট্ট চোট্ট চোট্ট শব্দের চাপানউতোর, টানাপড়েন শুনতে শুনতে বড় হওয়া। নাগরিক কলকাতায় জলনুপূরের তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ দেখতে দেখতে সামনে আসা। তাই অপেক্ষা না করে ছেপে দি। আপনারা কী বলেন?
                     

Join us for the screening of a series of short films followed by an interesting seminar with film director Tinni Bhattacharya.

The topic of discussion is Technology vs. Concepts in the film. 

'Film as an Art' cannot survive without technology. To create film 'ideation' does not suffice; it is backed up by various technical tools- camera, editing,
etc.
 While watching any film are we moved by the technical inputs or the conceptualization? Or both? In this new era of technology, it may seem like the idea is lost, and that it is the technical gimmick which is taking over..

Programme:

1) Aissa by Clément Tréhin-Lalanne (2014, 8 min)
2) Le Banquet de la Concubine (2012, 13 min)
3) Blindspot by Simon Rouby (2014, 3 min, Animation)
4) Le Bucheron des mots (2009, 11 min, Animation)
5) Les chiens isolés by Rémi Bastie (2011, 6 min. Animation)
6) Brises by Enrique Ramirez (2008, 13 min)
7) La Chair et les volcans (2014, 20 min)
 
 About Tinni Bhattacharya

"I have been exposed to Worldwide Advertising from a very tender age. As a film scholar, I have contributed articles in some of the leading newspapers of the country.  In 2013 I made a short film named ‘Indispensables’, which was shown at the Kolkata International Film Festival, and Delhi International Film Festival.
Now I am working on my next script and teaching Film and Advertising as a freelance lecturer in various institutes. Along with this, I am engaged in conducting workshops in different cities across the world such as Bangalore, Kolkata, and Paris."

অনুষ্ঠানের শুরুতেই দক্ষ এবং অভিঞ্জ পরিচালক তিন্নির বক্তব্য থেকেই আমরা বুঝে যাই হেমন্তের কলকাতার সন্ধ্যেয় গঙ্গাবক্ষের পশ্চিমের হাওয়ার মেদুর আদর আমরা পেয়ে যাব। সাহিত্য, চলচ্চিত্র, সামাজিক আন্দোলন, সামাজিক বিক্ষা ইত্যাদি। চিত্রভাসের ক্যানভাস বনাম আধুনিক কারিগরি। হ্যাঁ শুরতেই তিন্নি আমাদের বললেন, ‘’আমরা কেন সর্ট ফিল্ম করি? বাজেট একটা বিষয়। ২লাখ ৩ লাখ টাকায় ডিজিটাল ছবি হয়ে যায়। watch Film and get social values. ও হেনরি যেমন উপন্যাস লেখেন। আবার ছোট গল্পও লেখেন। সিনেমা বিষয়টা তেমন নয়। How people are getting film?  আমার প্রশ্ন। সামাজিক মূল্যবোধের গল্প আছে এমন ছবি আমাদের দেখতে ভালো লাগার কথা।‘’  
এর পরে আমরা একটা করে ছবি দেখি আর তিন্নি আমাদের সামনে আসেন। না তিনি তাঁর লব্ধ প্রতিষ্ঠিত ঞ্জানের কথা বলতে আসেননি। তিনি আমাদেরমতো দর্শকদের সঙ্গে সংলাপ করলেন। আমাদের কথা শুনলেন। তারপর নিজে ব্যখ্যা দিলেন প্রতিটি ছোট ছোট ছবির গল্প, ডিটেলিং, চরিত্র, অভিনয়, সামাজিক প্রেক্ষাপট, আধুনিক কারগরি, প্রতিটি বিষয়ে বললেন। তিনি আমাদের অভিঞ্জ শিক্ষক বন্ধুর মতো করে বুঝিয়ে দিলেন। আমরা দর্শকরা আন্তরিকভাবে ‘মত বিনিময়’ সভায় অংশ নেওয়ার সাহস পেলাম।
আমরা দুটো ছবি বেছে নিচ্ছি আলোচনার জন্য। Aissa শিরোনামে প্রথম ছবি। পরিচালক Clément Tréhin-Lalanne ,ফরাসী সংস্কৃতির ধ্রুপদী ভাষায় চলচ্চিত্রের বুনোটে ছবিটির বক্তব্য আমাদের সামনে তুলে দিয়েছেন পরিচালক। ছবি শুরু হচ্ছে একজন কালো যুবতি মেয়েকে সামনে রেখে। নাম আইসা। কোনও ‘পরিচয়পত্র’ মেয়েটির কাছে নেই। সে বিউটিশিয়ান। মেয়েটি একটি ল্যাবে শারীরিক পরীক্ষা করতে এসেছে। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর ওজন নেওয়া হয়, মেয়েটি নিজে জানায় তাঁর বয়স সতেরো বছর। সেইমতো তাঁর শারীরিক বিভিন্ন পরীক্ষা শুরু হয়। ক্যামেরা এবং ক্যামেরা পরিচালকের জাদুর সামনে কালো চামড়ার মেয়েটি একটি সুডৌল স্তন পরীক্ষার জন্য দেখায়। শিল্পের দাবি মেনে সে একটা একটা করে পোশাক খুলতে থাকে। ছোট ছবির ছোট ছোট কথার মতো। ছোট ছোট শব্দের মতো, ছোট ছোট দেশী-বিদেশী বহু বর্ণের মতো করে সে পোশাক খুলতে থাকে।  গম্ভীর গভীর নদীর শান্ত ঢেউয়ের মত সদ্য যুবতী মেয়েটি তাঁর পোশাক খুলতে থাকে। না ক্যামেরা কোনরকম বেয়াড়াপনা করেনি। শিল্পের দাবি মেনে ক্যামেরা চালিয়েছেন পরিচালক।
মেয়েটির হাড়, পেশির পরীক্ষা করার পর জানা যায় মেয়েটির বয়স ২০ বছর। এবং এর পরে মেয়েটি আবার টুকরো টুকরো শব্দের মতো, টুকরো টুকরো সেলুলয়েডের ফিল্মের মতো, ছোট ছোট ফ্রেমের মতো নিজের পোশাক পড়ে নেয়। প্যাথলজিক্যাল কেন্দ্র থেকে সে যখন চলে যায়, নিজের ‘ব্রা’ বা ‘বক্ষআবরণী’ না পরে হাতে নিয়ে চলে যায়। আমরা জানতে পারি সে এসেছিল বা বা রাষ্ট্র তাঁকে আসতে বাধ্য করেছিল দেশের অভিবাসন দপ্তরে। ইমিগ্রেসন ডিপার্টমেন্টে। তারপর?
২০১৪ সালে তৈরি মাত্র ৮ মিনিটের ছবি। মাত্র ৮ মিনিটে এত কথা বলা যায়? এই ছবি না দেখলে আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়ে উঠত না। কতটা দক্ষতা, দেখার অন্তর্দৃষ্টি থাকলে তবেই বোধহয় সম্ভব হয় এমন একটা ছবি নির্মাণের। পরিচালক নতুন ভাষা উদ্যান থেকে আমাদের বিশ্বের এক চেনা, এক অচেনা ছোট গল্পের সন্ধান দিলেন।
দ্বিতীয় ছবিটি চিনের একটি রূপকথার গল্পকে অবলম্বন করে তৈরি। Le Banquet de la Concubine    শিরোনামের ছবিটির সুর বাঁধা ছিল ‘অপেরা মিউজিক’-এর তাল লয় ছন্দে। সম্রাটের পরিবার এবং তাঁর জীবন যাবনকে কেন্দ্র করে এক সামাজিক টানাপড়েন। একজন নারীর অবসাদ। অসাধারণ গ্রাফিক্স বর্ণনা উঠে এসেছে পরিচালকের সূক্ষ অনুভবী ভাষায়। পরের ছবি তিনটিও বর্তমান সমাজের সমস্যা কেন্দ্রিক, তাঁর মধ্যে অন্যতম ‘সমকাম’, ড্রাগস এবং চাকরি না পাওয়া বর্তমান প্রজন্মের গোপন দৈনন্দিন জীবনের ছন্দের গল্প। পরিচালক ত্রয়ী  আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। এইসব আধুনিক জ্বলন্ত বিষয়ের সঙ্গে। এছাড়াও ছিল আরও অন্যান্য সামাজিক প্রেক্ষাপট।
দু’টি ছবি দেখার পরে আমাকে বলতে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আমি সেদিনের আমার দেখা কলকাতার দু’টো অভিঞ্জতার কথা বলেছিলাম।
২৯ অগস্ট গোধূলি সন্ধ্যে। ঘড়িতে সাড়ে পাঁচটা বাজে। একটু আগে ফরাসী কবিতার শব্দে মধ্য কলকাতায় শরতের বৃষ্টি হয়ে গেছে। একটু আগে বৃষ্টি হয়েছে। শরতের নীলাভ আকাশের আড়াল থেকে বৃষ্টি এসেছিল।  জীবনানন্দের কাব্যের গোধূলি সন্ধ্যে ছিল সেদিন। শম্ভু মিত্রের কন্ঠের আনুনাসিক শব্দের মতো আমরা বৃষ্টির শব্দ পেয়েছিলাম। আমি মেট্রো রেলে এসে পার্কস্ট্রীট স্টেশনে নামলাম। আমার সামনে একজন মধ্য চল্লিশ বয়সের মহিলা। মধ্যবিত্ত বলি অথবা নিম্নমধ্যবিত্ত। ভদ্রমহিলা ট্রেনের টোকেনটা এক্সিট ভেন্ডার যন্ত্রে কি ভাবে দিতে হয় জানতেন না। আমি বলে দিলাম। তিনি বাইরে গেলেন। পাশের ভেন্ডিং যন্ত্রে লাল রঙ দিয়ে ক্রস (X) চিহ্ন দেওয়া রয়েছে। সেই গেট দিয়ে বাইরে যাওয়া যাবে না। ভদ্রলোক জানতেন না। বাইরে বসে থাকা নিরাপত্তা কর্মীরা আমরা যে গেট দিয়ে বাইরে এলাম ভদ্রলোকটিকে সেই গেট দেখিয়ে দিলেন। স্বামী-স্ত্রী বাইরে এলেন। মহিলা বললেন, ‘’পয়সাটা কোন ঠায় দিবার লাগে জানতাম না।‘’ স্বামী উত্তর দিলেন, ছয়মাস পর আইলামতো সব ভুইলা গেসি গিয়া।‘’ জানি না ওই দম্পতি উত্তরপূর্ব ভারতের কোনও রাজ্য থেকে এসেছেন না বাংলাদেশ থেকে? অভিবাসন সমস্যা? না নাগরিক পঞ্জি?
স্টেশনের বাইরে এলাম। কলকাতা পুলিশ ক্লাব। ফুটপাথ। বড় রাস্তা। আবার পরের ফুটপাথ। ফুটপাথে হাঁটুজল নেই। ফুট পাথে একটা পরিবার। রাস্তায় কিছুটা কালো কাদা জল। কাদা জল থৈ থৈ করছে। ফুটপাথের ওই পরিবার থেকে একটি সাত-আট বছরের বাচ্চা মেয়ে বেরিয়ে এসে জল নিয়ে খেলা করছিল। ওর কাছে জলনুপূরের খেলা। আমাদের মতো তথাকথিত ভদ্রলোক দেখলেই পায়ে করে জল ছিটিয়ে দিচ্ছে। রাস্তার কালো তেল মোবিল ধুলো মিশ্রিত নোংরা জল ছিটিয়ে ও আনন্দ পাচ্ছিল। আবার ফোঁকলা দাতে হাসছে আমাদের দিকে তাকিয়ে। আমি মুচকে হেসে মাথা দুলিয়ে নোংরা জল ছিটিয়ে না দিতে নিষেধ করলাম। দূর থেকে নিষেধ করলাম। আমার কথা শুনল না। হাসতে হাসতে যেন ‘ঘৃণা ঘৃণা’ মজার খেলা করছিল। এই খেলা জলনুপূরের মজা ওর কাছে! আর আমাদের কাছে? অভিবাসন?
তিন্নি সেদিনের ছোট ছবির মতবিনিময় সভায় আরও বলেন, ‘বলিউড-হলিউড’-এর নায়করা একমাত্র নায়ক কী? ‘মিড নাইট’, ‘কাউ বয়’, ‘বাই সাইকেল থিভস’-এর মতো ছবি আমাদের সামনে আছে। তথাকথিত বাণিজ্যিক ছবি এবং আর্ট ফিল্ম বা তৃতীয় ধারার ছবির সঙ্গে তুলনায় বর্তমান সময়ে কী ধরণের ছবি হতে পারে?’’
প্রশ্ন তুললেন পরিচালক, গবেষক এবং ছোট ছবির নির্মাতা তিন্নি ভট্টাচার্য। আমরা উত্তর খুঁজি। বাংলাদেশের চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ বলেছেন, ‘’আমরা যত মিশ্র, তত সমৃদ্ধ। এটা মানলেই সমস্যা থাকত না।‘’           
                
              

Friday, 3 August 2018

একাত্তর বছরের তরুণ ভারতে ভারতীয় জাতি! কে বলে দেবে?



দীপেন্দু চৌধুরী
২০১৮ সালের জুলাই মাস কী ভারতে নতুন বার্তা বয়ে নিয়ে আসতে চাইছে?  না হলে বিতর্কিত একটি বিষয়কে এভাবে সামনে আনতে হচ্ছে কেন? চারদিকে হৈ চৈ পড়ে গেছে। চার লাখ মানুষের ঘর ছিল, বাড়ি ছিল, সংসার ছিল, আত্মীয় ছিল। ধর্মীয় উপাচার ছিল, লক্ষ্মী-নারয়ণের সিংহাসন ছিল, লক্ষ্মীর পাঁচালী ছিল। বিজয়া দশমীর আলিঙ্গন ছিল। মন্দির, মসজিদ ছিল। ভোরের আজান, ঈদ-দুর্গা পুজোর সমাবর্তন উৎসব ছিল। ভাওয়াইয়ার গান ছিল, বাউল-ফকিরের বন্ধন ছিল। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল ছিল। বহু রঙের জোব্বা ছিল। সার্বজনীন সামাজিকতা বর্তমানে উদাস আকাশে শ্বেত পায়রা খুঁজছে। একটি সরকারি বিঞ্জপ্তির কারণে চল্লিশলাখ মানুষ ‘নেই ঘর’ আতঙ্কে জবুথবু হয়ে রয়েছে। জুন মাসের ২৬ তারিখ কলকাতায় বরাক উপত্যকার একটি উচ্চশিক্ষিত পরিবারের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। একটি বেসরকারি অতিথি নিবাসে তাঁদের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন আমাদের এক বন্ধু। আমাদের কলকাতার সেই বন্ধুটি একটি অভিজাত প্রকাশনা সংস্থা চালান এবং একটি দ্বিমাসিক পত্রিকার সম্পাদক। তার অনুরোধেই আমি গত মাসের ওইদিন মধ্য কলকাতার ওই অতিথিনিবাসে গিয়েছিলাম। পরিবারটির একটি সাক্ষাৎকার নিতে। সেই পরিবারটি আমাদের সঙ্গে যখন কথা বলছিলেন তাঁদের গলায় আতঙ্ক ঝড়ে পড়ছিল। অভিমান আছড়ে পড়ছিল। বরাক উপত্যকার ঘর-বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে হতে পারে এই আনুমানিক আতঙ্কে! রাষ্ট্রহীন সভ্যতার নাগরিক হিসেবে একটি উচ্চশিক্ষিত পরিবারকে জীবনের বাকী অংশ কাটাতে হবে! চোখে চিক চিক করছিল রূপোলী জলের বিন্দু বিন্দু অশান্ত স্রোত। একে উচ্চশিক্ষিত। মার্জিত।  তারপর আমরা সামনে দু’জন অপরিচিত সাংবাদিক। একজন প্রগতি ধারার প্রকাশনা সংস্থার মালিক। আমাদের তিন জনের সামনে তাই আবেগ চেপে নিলেন মধ্য সত্তরের পৌঢ় দম্পতি। আমরা দেখলাম তাঁদের দ্বিধা, সংকোচ, সজল লজ্জা ওদেরকে টেনে ধরে রাখল। দীর্ঘদিনের চর্চিত ভদ্রলোকের সৌজন্য দু’জনকে আগলে রাখল মানব সভ্যতার উন্নত প্রাণী হিসেবে।        
স্বামী-স্ত্রী দু’জনে নিজেদের সামলে নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন সেদিন আমাদের সামনে। তাঁরা সব বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন। এত দিনের শিক্ষা, পারিবারিক, সামাজিক বন্ধন, ভারতীয় মাটির মায়া, টান, পাহাড় সভ্যতার সারল্য ভেঙে চুরমার। উত্তর পূর্বের শ্যামল সবুজ উপত্যকার অতিথি বৎসল মাধুকরী সংস্কৃতি হারানোর অজানা ব্যাথা তাঁদের গলায়। আবেগ, মনন সব, সব কিছু কোন অজান্তে হারিয়ে গেছে তাঁদের আঙিনা, উঠোন-বারান্দা থেকে। মেঘনা, যমুনা গঙ্গার মোহনায় এসে তাঁরা আবার নিজদের খুঁজছেন। তাই রাষ্ট্রের উপর তাঁরা বিশ্বাস হারিয়েছেন। জুন মাসে তাঁদের চোখে,শারীরিক ভাষায় যে আতঙ্ক দেখেছিলাম আজ সেটাই সত্যি হয়ে আমাদের সামনে ‘বাঙালি জাতিসত্তা’ মনে আগুন লাগিয়ে দিতে চাইছে! আমরা কী বলব? ‘’ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়.........!’’ প্রবাদটা মনে পড়ছে না? উদ্বাস্তু না হলে, রাষ্ট্রহীন না হলে শিকড়ের টান ক’জনে আর অনুভব করতে পারে? স্বাভাবিকভাবেই সিরিয়া, মায়ানমারের উদাহারণ আমাদের সামনে আসে। ভুগছে বাংলাদেশ নামক আরও একটি দেশ। মানবিক কারণে সে দেশের সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ শিবির চালাচ্ছেন। রাষ্ট্রসংঘ সহ বিভিন্ন দেশ পাশে আছে। ভারতও সাহায্যের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারত, মায়ানমার এবং সিরিয়ায় তাঁদের অস্ফুট যন্ত্রণার স্রোত আরও কত দূর যাবে কে জানে সে কথা?
আমরা কিছুটা পিছনে গিয়ে যদি ফিরে দেখি। অসম নামক একটি রাজ্যে বাঙালি বসতির ভৌগলিক এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত কী? ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়কালে বিদেশী শাসকরা নিজেদের প্রশাসনিক প্রয়োজনে ইংরেজি শিক্ষার সুযোগের ব্যবস্থা করেছিল। সেই সুযোগ ঐতিহাসিক ভাবেই বেশি পেয়েছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতার বাঙালিরা। কারণ ১৯১১ সাল পর্যন্ত কলকাতাই ছিল ভারতের রাজধানী। ইংরেজি ভাষাকে রপ্ত করার পর ইংরেজি জানা নব্যশিক্ষিত বাঙালিদের মধ্যে একটি নতুন উচ্চশিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণী গড়ে ওঠে। ব্রিটিশ সরকার ইংরেজি ভাষাঞ্জান সমৃদ্ধ এই নব্য শিক্ষিত ‘বাবু সমাজ’-কে বিভিন্ন দপ্তরে কাজের সুযোগ করে দেয়। উপনিবেশ চালানোর স্বার্থে নতুন গজিয়ে ওঠা ‘বাঙালি বাবু’ শ্রেণীকে ব্রিটীশ সরকার সরকারি অফিস, রেলওয়ে, আইন-আদালতে এবং চা বাগানগুলিতে নিয়োগ শুরু করে। মধ্যবিত্ত বাঙালি বেশি সংখ্যায় উত্তর-পূর্ব ভারতের চা বাগানগুলিতে চাকরি নিয়ে চলে যেতে থাকে। মোটা টাকা উপার্জনের সুযোগকে ক’জন আর হাতছাড়া করতে চায়? কারণ তৎকালে এবং স্বাধীনতা উত্তর ভারতের উত্তরপূর্বে চাকরি বা জীবীকার জন্য কেউ যেতে চাইত না। অনুন্নত পাহাড়ি জনজাতি সমৃদ্ধ অসমও সেই আর্থ-সামাজিক সীমাবদ্ধতার জটিল সংস্কৃতির শিকার ছিল। ব্রিটিশ শাসকরা অসমের চা বাগানগুলির জন্য বাংলা, অবিভক্ত বিহার থেকে ঠিকে শ্রমিক নিয়ে যেত। আমাদের মনে আছে সেই বিখ্যাত গানের কথা। ‘চল মিলি আসাম যাব/ এ দ্যাশে বড় দুঃখ রে/ এ দ্যাশে বড় দুঃখ।’  
বাঙালিদের একটা শ্রেণী নিজেদের আর্থিক প্রয়োজনেই অসম নামক একটি স্বাধীনতা পূর্ব বাংলার অসমে চাকরির সুবাদে স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে থেকে যেতে শুরু করে। এবং এই সময়ে আরও একটি ইতিহাস নির্ভর সত্য আমাদের সামনে এসে যায়। বাঙালি ‘বাবু সমাজ’ ব্রিটিশদের চাটুকার হিসেবে নিজেদের অলিখিত আধিপত্য গড়ে তুলতে সহায়ক হয়। যদিও এর সবটা সত্য নয়। কারণ নবজাগরণের ব্যক্তিক্তদের স্মরণ আমাদের করতেই হবে। তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা আমাদের দিতেই হবে। ব্রিটিশ অধ্যুষিত উত্তর-পূর্ব ভারতে যারা বা যেসব জাতি, সম্প্রদায় কাঠ, চা, তামাক পাতার ব্যবসা করে মোটা টাকার মালিক হতে পেরেছিলেন তাঁরাই ওইসব রাজ্যের প্রথম শ্রেণীর নাগরিকের মর্যাদা পেয়েছিলেন। এবং সেই সঙ্গে ক্ষমতা ভোগ করেছেন। এই পর্বে মুষ্টিমেয় সুবিধাবাদী বাঙালিদের কথা এলেও বাঙালি এই সত্য বয়ে বেড়ায়নি। কারণ আমাদের সামনে রয়েছে দেশ ভাগের মত ইতিহাস। পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দিয়েছিল আমাদের গর্বিত বাংলা। কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে আপামর কংগ্রেস- অকংগ্রেস বাঙালি আতিথিয়তার প্রমাণ দিয়েছিলেন। পূর্ববঙ্গ এবং পাকিস্তানের সব জাতি, সব শ্রেণীর মানুষের জন্য বিভক্ত ভারতের নবীন দেশের সিংহদুয়ার খুলে দিয়েছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। গাঁধিজি, রবীন্দ্রনাথ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, শরৎচন্দ্র বসু সহ আরও বিশিষ্ট ভারতীয়দের সহযোগিতায় পূর্ববঙ্গের ‘নতুন যুগের নতুন মানুষ’ উদ্বাস্তুদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল অতিথিবৎসল পশ্চিম বঙ্গের কলকাতার উপকন্ঠ, মালদহ-মুর্শিদাবাদ, জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ির উপকন্ঠ। রবীন্দ্রাথের সেই বিখ্যাত উক্তি আজও ঐতিহাসিকদের মনে থাকার কথা। গোয়ালপাড়া প্রসঙ্গে চিনের মরণের ব্যবসার কথা উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘’Business of death of China’’, ‘‘অজগড় সাপের ঐক্য নীতি।‘’ কবির উদ্বেগ সত্বেও জয় হয়েছিল বহুত্বের মধ্যে ঐক্যের সংস্কৃতির। সব ধর্মের সব জাতির উদ্বাস্তুদের জন্য উদ্বাস্তু কলোনি সহ সমস্ত সুযোগ ভারত সরকার করে দিয়েছিল। আমাদের এই বাংলায় একটা সময় উদ্বাস্তুদের এই বঞ্চিত শ্রেণীর সাহায্যে বামপন্থীরা রাজ্যের শাসন ক্ষমতায় আসে। ১৯৭১ সালেও নতুন বাংলাদেশ জন্মের পরে বহু ‘শরণার্থী’ আশ্রয় নেয় বাংলা, অসম তথা ভারতে।            
এটা যদি ইতিহাসের একটা অধ্যায় হয় আধুনিক পরিচ্ছেদে যুক্ত হয়েছে আরও একটি অধ্যায়। সেটি হচ্ছে ‘অসম চুক্তি’। আশির সশকে অসমে ‘আসু’-র ছাত্র আন্দোলনের কথা আমাদের মনে আছে। সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন প্রফুল্ল মহান্তি এবং ভৃগু ফুকন। অসমিয়া, বোড়ো, ডিমাছা, মণিপুরি (মৈতে), বিষ্ণুপ্রিয়া, আহোম। কার্বি, কুকি, মার ভাষা গোষ্ঠীর মানুষদের আত্মনিয়ন্ত্রণ সহ একগুচ্ছ দাবি নিয়ে এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল। যদিও অসমে আশির দশকের পরে ‘বোড়ো’ এবং অন্যান্য ভাষাগোষ্ঠী পৃথক আন্দোলন শুরু করে। এবং স্বশাসিত অঞ্চল আদায় করে নিয়েছে। অসম আন্দোলন শেষ হয় ১৯৮৫ সালে ‘অসম চুক্তি’ স্বাক্ষর হওয়ার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তের পরে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গাঁধির মন্থরগতির বুদ্ধিদীপ্ত কূটনীতি বর্তমান সময়েও সমান মূল্য বহন করে চলেছে। অসম নাগরিকপঞ্জি প্রকাশের আগে পরে ‘ডি’ শব্দটি নিয়ে বিতর্ক ছিল। সম্ভবত বিতর্ক পরে আরও বাড়তে পারে। ‘ডি ভোটার’ মানে ডাউটফুল ভোটার, ডিটেকশন, ডিটেনশন, ডিপোর্টেশন। ব্রহ্মপুত্র এবং বরাক উপত্যকায় সর্বমোট ১ কোটি ২০ লক্ষেরও বেশি বাংলাভাষী মানুষ থাকেন। তাঁদের থেকে ৪০ লক্ষের সঙ্গে ‘ডি’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে সম্ভবত। নাগরিকপঞ্জি তালিকাভুক্ত ৪০ লক্ষ মানুষ নিজদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে পারলে তারাও আমাদের দেশে থাকার সুযোগ পাবেন।
ভারত একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। ভারত নামক দেশটি ‘রাষ্ট্র’ হিসেবে মর্যাদা পেলেও ‘ভারতীয় জাতি’ হিসেবে কতটা স্বীকৃতি পেয়েছে? ভারতীয় জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পেতে আমাদের কতটা আগ্রহ আছে? সংকীর্ণ সংস্কৃতির উর্ধে উঠে বহু ভাষার এক বর্ণময় সহনশীল জাতির উন্মেষ কবে হবে? ভারতের মত উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে? প্রশ্ন হ্যাঁ প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। আমরা আর কবে তথাকথিত রাজনীতির কচকচানি থেকে বাইরে এসে ভারতীয় জাতিরাষ্ট্রের অহংকার গড়ে তুলতে পারব?       
অসমচুক্তির মূল বিষয় ছিল ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের মধ্যরাত পর্যন্ত যারা বাংলাদেশ থেকে শরণার্থী হিসেবে অসমে এসেছেন তাঁরা থাকতে পারবেন। ১৯৭১ সালের পরে বাংলাদেশ থেকে আসা সমস্ত শরণার্থীকে বিদেশী হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। এবং ১৯৭১ সালকে ভিত্তি বছর ধরে তারপরে যারা এসেছেন তাঁদের ফেরৎ পাঠাতে হবে। এটাই হচ্ছে অসম চুক্তি তথা অসম নাগরিক পঞ্জির মূল কথা। ফরেনার্স ট্রাইবুনাল গঠন করে চিহ্নিতকরণের কাজ শুরু করার কথা বলা হয়েছিল উল্লেখিত চুক্তিতে। সেই মোতাবেক ‘ডি ভোটার’ বা ‘ডাউটফুল ভোটার’ চিহ্নিত করা হয়েছে। এমনটাই দাবি অসম নাগরিকপঞ্জি তৈরির কতৃপক্ষের।  
অসমে ‘আসু’-র ছাত্র আন্দোলনের পরে প্রথম অগপ সরকার মোট ২, ৮৭, ৬২৫ জনকে বিদেশী বা ‘ডি ভোটার’ হিসেবে ঘোষণা করে। এবং তাঁদের চিহ্নিত করা হয় ‘ফরেনার্স ট্রাইবুনাল’-এ মামলার ভিত্তিতে। ওই ট্রাইবুনাল মাত্র ৮৬৯ জনকে বিদেশী হিসেবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। পরের ঘটনা আমাদের সামনে জ্বল জ্বল করছে। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত গঙ্গা, পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র দিয়ে দেড় দশক ‘জল-পানি’-এর খরস্রোত ধারা বয়ে চলেছে। ভারতের অসম রাজ্যের অবৈধ নাগরিক নিয়ে আবারও মামলা হয়। ৪, ০৬, ৪৫১ জনকে ‘ডি’ হিসেবে চিহ্নিত করে এই মামলা হয়। ৩০ জুলাই যে রায় আমাদের সামনে এসেছে। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরে পরেই দেশহীন, রাষ্ট্রহীন, পরিচয়হীন আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন এক বিরাট সংখ্যক অ-নাগরিক। তাঁরা এসেছিলেন অতিথিবৎসল ভারতে। প্রশ্ন উঠছে ভারতের অভিভাসন নীতিটা আসলে কী। যদিও মহামান্য উচ্চ ন্যায়ালয়ের নির্দেশে ভোট দিতে পারবেন বর্তমানে অ-নাগরিক সকলেই। কিন্তু তারপর?  
এই রায় প্রকাশের পরেই অতিথি বৎসল বাংলার দলমত নির্বিশেষে সমস্ত স্তরের নাগরিক নতুন করে সৃষ্ট শরণার্থীদের পাশে দাঁড়াতে চাইছে। স্বাভাবিকভাবেই নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাজ্যের অতিথিবৎসল অভিভাবক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশে পেয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধিকে। সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন চলছে। স্বাভাবিকভাবেই অসম নাগরিকপঞ্জির উত্তাপ সংসদে গিয়ে পড়েছে।
৩০ জুলাই সকালে এন আর সি দফতরে একটি সাংবাদিক বৈঠক ডাকা হয়েছিল। ওই বৈঠকে হাজির ছিলেন, এনআরসি সমন্বয়রক্ষী প্রতীক হাজেলা, দেশের রেজিস্টার জেনারেল (মহাপঞ্জীয়ক) শৈলেশ এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দফতরের যুগ্মসচিব সত্যেন্দ্র গর্গ। শৈলেশ বলেন, নাগরিক পঞ্জিতে নাম উঠেছে ২, ৮৯, ৮৩, ৬৭৭ জন আবেদনকারীর। তিনি একথাও উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত অসমে থাকা মানুষ এবং তাঁদের বংশধরদের নামই নাগরিক পঞ্জিতে স্থান পেয়েছে। বাদ পড়েছে ৪০, ০৭, ৭০৭ জন। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস বামপন্থী সহ বিরোধীদের চাপে সংসদে মুখ খোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ। তিনি দাবি করেন গোটা বিষয়টাতে কেন্দ্র বা রাজ্যের বিজেপির কোনও হাত নেই।
৩০ জুলাই নবান্নে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘’দেশ বা আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে আমাদের ঘরে যদি কেউ আসে, তা হলে তাঁদের উদ্বাস্তু হিসেবে দেখে সাহায্য করতে হবে।‘’
অসমের নাগরিকপঞ্জি প্রকাশের পরে বাংলাদেশ সরকারকেও মুখ খুলতে হয়েছে। কারণ যেহেতু ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’-দের দিকে বেশি করে আঙ্গুল উঠেছে। ৩১ জুলাই বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘’১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময়ে এক কোটি মানুষ ভারতে গিয়েছিলেন। পারস্পরিক চুক্তির ভিত্তিতেই ভারত তাঁদের বসবাসের ব্যবস্থা করেছিল। তার পর গত ৪৮ বছরে ভারতের কোনো সরকার এঁদের নিয়ে আমাদের কাছে অভিযোগ জানায়নি।‘’ সংবাদ সংস্থা সূত্রে আরও খবর বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী জানান, অসমের জনজাতির সমস্যাটি শতাব্দী প্রাচীন। এর সঙ্গে বাংলাদেশিদের কোনও যোগ নেই। তিনি আরও বলেন, ‘’এটি পুরোপুরি ভারতের অভ্যন্তরীণ জাতিগত বিষয়। নরেন্দ্র মোদী যথেষ্ট ধর্মনিরপেক্ষ এবং উদার নেতা। তিনি বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান করতে পারবেন বলে আশা রাখি।‘’
৩০ জুলাই কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধি একটি বিবৃতিতে জানান, ‘’১৯৮৫ সালের অসম চুক্তি মেনে মনমোহন সিংহের আমলে নাগরিকপঞ্জির কাজ শুরু হয়েছিল। এনডিএ সরকার এ নিয়ে টালবাহানা করেছে। তালিকায় নাম নেই বহু মানুষের।‘’           
 আমাদের হাতে একটি এলিট বাঙালির নামের তালিকা এসেছে। যাঁদের নাম সম্প্রতি ঘোষিত নাগরিক পঞ্জিতে নেই। তাঁরা কারা? অর্চনা পাল বিজেপি এম এল এর স্ত্রী। কমলাক্ষ বাবু প্রাক্তন এম এল এ। প্রশান্ত চক্রবর্তী কটন কলেজের অধ্যাপক। প্রকৃতিশ বড়ুয়া প্রমথেশ বড়ুয়ার ভাই, গৌরীপুরের মহারাজার ছেলে।
ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি। বড়খলার গোবিন্দ দাস নাগরিকত্বের মামলায় ১৯৮৮ এবং ২০১৫ সালে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণিত হয়েছেন আদালতেই।
মহম্মদ আজমল হক ৩০ বছর ভারতীয় সেনাবাহিনীতে জওয়ান হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
তপোধীর ভট্টাচার্য আসাম বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রাক্তন উপাচার্য এবং ওনার পিতা ছিলেন নির্বাচিত বিধায়ক।
চিন্ময় ভৌমিক হলেন কার্গিল যুদ্ধের ভারতীয় বাঙালি শহীদ।
এরা বা এঁদের মত পরিবারের সদস্যদের নামের তালিকা আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে পাচ্ছি। যাঁদের নামও আছে ৪০ লাখের ওই তালিকায়। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যদের যদি এই অবস্থা হয়। যে অভিঞ্জতার কথা আমরা প্রথমেই উল্লেখ করেছিলাম। এক অধ্যাপক দম্পতির উদ্বেগ দেখে। আমাদের উপরের তালিকায় ওই পরিবারের নামও রয়েছে। তাহলে যেসব মানুষ দিন আনে দিন খায় তাঁদের কী পরিস্থিতি হতে পারে আমরা অনুমান করতে পারি। যারা নিরক্ষর, কোনওদিন বুঝতে চায়নি, বুঝতে পারে না। তাঁদের নিজেদের জন্য, পরিবারের জন্য, সন্তানদের জন্য একটা পরিচয়পত্র প্রয়োজন। তাঁরা আজ কী করবে? কোথায় যাবে?
 যদিও আবার নতুন সময়ের কথা বলা হয়েছে। সামনের বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত উদ্বৃত্ত নাগরিকেরা আবেদন করার সুযোগ পাবেন। সেইদিন পর্যন্ত বাংলা, অসম, উত্তর পূর্বের রাজ্য তথা ভারতের রাজনীতির আকাশে অনেক রঙ, আতসবাজির উল্লম্ফন আমাদের দেখতে হবে। ভরসা বাংলার অতিথি বৎসল মানুষ। হ্যাঁ একমাত্র আমরাই পারি ওদের পাশে দাঁড়াতে।       

                     

Wednesday, 25 July 2018

একজন ব্যক্তির মানসিক বিকৃতি? না-ক্ষয়িষ্ণু সমাজের অধঃপতনের ইঙ্গিত?




দীপেন্দু চৌধুরী
কলকাতা শহরে কুকুরের সঙ্গে ‘যৌন সংসর্গ’ (সেক্স) করার অপরাধে গ্রেপ্তার এক যুবক। ঘটনাটি ঘটেছে চলতি বছরের জুলাই মাসে। বরিষার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার প্রান্তিক চ্যাটার্জী বিষয়টি পুলিশের নজরে আনেন। তার নিজের ভাষায় ‘’Mahato tied the dog’s mouth a rope. The dog’s mouth was tied.’’
‘’আমি যখন হাতেনাতে ধরি তখন কুকুরটির মুখ বাঁধা ছিল।‘’ প্রান্তিকবাবু বলেন। কমলেশ মাহাতো নামে অভিযুক্ত যুবকটি  বিহারের বাসিন্দা। কলকাতায় শ্রমিকের কাজ করে একটি পেপার মিলে। পুলিশ সূত্রে খবর সে থাকে লেকটাউন পাতিপুকুর অঞ্চলের শ্রমিক আবাসনে। প্রান্তিক চ্যাটার্জীর এক বন্ধু ১৫ জুলাই রাত্রি ৯টার সময়ে ঘটনাটি ঘটতে দেখে। প্রান্তিক বাবুর উদ্যোগে কুকুরটিকে বেলগাছিয়া পশু হাসপাতালে নিয়ে গেলে হাসপাতালের ডাক্তার মাদি কুকুরটির শারিরীক পরীক্ষা করেন। এবং কুকুরটির যে শ্লীলতাহানি করা হয়েছে সেই রিপোর্ট অভিযোগকারী প্রান্তিক চ্যাটার্জীর হাতে তুলে দেন।
ভারতীয় পেনাল কোডের ৩৭৭ ধারায় (A case under section 377 [vouluntarily having carnal intercourse against the order of nature] was registered.) অভিযোগ জানান হয়। পুলিশ সূত্রে খবর কমলেশ তার জবানবন্দিতে স্বীকার করেছে সে আগেও মাদি কুকুরের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করেছে। পুলিশ সূত্রে আরও খবর, তাঁকে ওইদিন বারাসত কোর্টে তুললে তার দোষ প্রমাণিত হয়। পুলিশ জানায় কমলেশ বিবাহিত। তার তিনটে সন্তান আছে। অভিযুক্ত যুবকটি পুলিশের কাছে বলেছে সে একাধিকবার রাস্তার মাদি কুকুরের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করেছে। পুলিশের অনুসন্ধানে কমলেশের প্রতিবেশিরাও বলেছে যে সে আগেও এই ধরণের কাজ করেছে। কমলেশের দোষ প্রমান হলে তার যাবজ্জীবন কারাদন্ড হতে পারে।                   
 কি বিচিত্র এই দেশ! কুকুরটি যখন তার থেকে উন্নত প্রাণী মানুষের দ্বারা ধর্ষিত হচ্ছিল তখন তার মুখ বাঁধা ছিল। তদন্তে এমনটা উঠে এসেছে। তার মানে কুকুরটা চিৎকার করতে পারেনি। কি নির্মম! মানুষ কি নির্মম হতে পারে! একটি মনুষ্যেতর প্রাণীর সঙ্গে যৌন সংসর্গ? কতটা বিকারগ্রস্ত হলে এই কাজ করা সম্ভব? প্রশ্ন উঠতেই পারে। কমলেশ নামে যুবকটি বিবাহিত। তিনটে সন্তান আছে। তার মানে সে সামাজিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত। তবু সে এই কাজ করতে পারল? তার রুচিতে আটকাল না? 
ডারউইনের বিবর্তনবাদ নিয়ে লেখার জন্য সমাজ বিঞ্জানীরা আছেন। এই ধরণের অকালপক্ক বাতুলতা দেখাতে চাওয়ার সাহস কতজন অর্জন করতে পারে? কিন্তু সহজ সরল সাধারণ বুদ্ধিতে এটুকু আমরা জানি যে বিবর্তনের সময়কালকে মনে রেখেও যুগ যুগান্তধরে বিভিন্ন কর্মকান্ডের মানুষই একমাত্র প্রাণী যে শুধুমাত্র ইতিহাস সৃষ্টির বা ইতিহাসের উপাদন নয়। ইতিহাস লিখে রাখার, ইতিহাস নির্মাণের অন্যতম কারিগর। বলতে চাইছি অন্য প্রাণীর মতো মানুষও প্রকৃতির নিয়মকানুন মানতে বাধ্য। আবার এটাও ঠিক সেই সব নিয়মকানুনকে নিজের তথা সমাজ বিকাশের প্রয়োজনে প্রয়োগ করার ক্ষমতাও মানুষের থাকে। মানুষ এটা পারে কারণ প্রাজাতিকভাবেই সে উন্নত মস্তিকের অধিকারী। জীবজগতে যেটাকে তুলনাহীন বলা হয়ে থাকে। উন্নত মস্তিস্ক হওয়ার কারণে মানুষ উদ্ভাবনী শক্তির অমিতধিকারী। পাশাপাশি আত্মসচেতনতার কারণে আত্মনির্মাণেও আলোচ্য প্রায়োগিক শক্তি মানুষ কাজে লাগাতে পারে।
কিন্তু সেই আদিম বন্যযুগ থেকে আজও মানুষের মনুষ্যত্বই নিজেদের কাজের ভুল ঠিক নিয়ন্ত্রণ করছে। মনুষ্যত্বের বহুমুখী বিকাশকেও আটকে দিতে চায় মানুষ নামক উন্নত প্রজাতির প্রাণী। ঈর্ষা, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, লোভ, ভয়, মানসিক আলস্য আমাদের সহজাত প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। আমাদের সামাজিক সম্পর্ক, সহজাত অনুসন্ধিৎসা, যুক্তিবাদী মন, বিবেক, প্রেম, মানুষকে সুশৃঙ্খল বন্ধনে বেঁধে রাখে। সামাজিক সুরক্ষার চাবিকাঠি হিসেবে এই উন্নত চেতনা আমাদের সাহায্য করে। পাশাপাশি উল্টো দিকটাও রয়েছে, উন্নত প্রাণী হিসেবে মানুষ সহজাত বোধ বুদ্ধি নিয়ে সুস্থ এবং গঠনমূলক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে থাকে। সেই সুস্থ প্রতিযোগিতা একটা সময় দ্বেষ, ঘৃণা, বিদ্বেষ গড়ে তুলতে পরিসর ছেড়ে দেয়। মানুষ নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখতে সামাজিক বন্ধন ছিঁড়ে বেড়িয়ে যায়। শুরু হয় বিবেকহীনতার পর্ব যেটাকে বলা হয়ে থাকে ব্যক্তি সংঘর্ষ। এটাই বাড়তে বাড়তে সামাজিক মূল্যবোধ ভাঙতে থাকে। সমাজ নামক প্রতিষ্ঠানের সর্বনাশ অনিবার্য হতে থাকে।
আড়াইশো শব্দের এই প্রেক্ষাপট নির্মাণ করছে একজন মানুষ। করছে নয় করতে বাধ্য হচ্ছে। মাদি কুকুরকে ধর্ষণের খবরটি আমাদের কারও কারও নজরে পড়ে থাকতে পারে। আমাদের রাজ্যে একটি কুকুরকে ধর্ষণ করেছে একটি যুবক!  অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা। উন্নত প্রাণীর একজন জীব তার থেকে হীনতর এক জীবের সঙ্গে যৌনসঙ্গ করে আনন্দ লাভ করছে? আনন্দ উপভোগ করছে? এ কোন সভ্যতায় আমরা বাস করছি? মানুষের রুচি কতটা নিম্নগামী হলে এই ঘটনা ঘটতে পারে? সামাজিক বন্ধনের এ কোন অবক্ষয়! সঙ্গমের সময়ে সেই কুকুরটির কী অবস্থা হয়েছিল? অবলা প্রাণীটি নিজে কী কিছু বলতে পারবে? তার নিজের সম্প্রদায়ের ভাষায়?  কুকুরের আইনজীবীর দায়িত্ব নিয়ে সেই ব্যখ্যা কতটা প্রয়োজন আছে সেটা ভারতীয় আইন বলবে। তবে পুলিশ সূত্রে খবর ছেলেটিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এবং অভিযুক্ত ছেলেটি দোষ স্বীকার করেছে। সে নাকি আগেও এই ধরণের ঘটনা ঘটিয়েছে। ‘ঘটনা’ এবং ‘ঘটিয়েছে’ এই দু’টি শব্দ আমাদের সামনে আছড়ে পড়ল না? আমরা কী সুস্থ সামাজিক উন্নতপ্রাণী হিসেবে এটা ভাবতে পারি? আমাদের মনন, চৈতন্য, বিবেক, শুভবোধ এসব কোথায় হারিয়ে গেলে একটি পশুর সঙ্গে যৌনক্রীয়ায় মাততে পারি? প্রশ্ন কী তোলা যায় না যে ছেলেটি ‘যৌনকর্মী’-দের পাড়া চেনে না? না ওই পাড়ায় যাওয়ার মতো ওর আর্থিক স্বচ্ছলতা নেই? এটা যারা তদন্ত করছেন তাঁরা বলতে পারবেন। আবারও প্রশ্ন তোলা যায় ছেলেটি বিবাহিত। ওর তিনটে সন্তান আছে। তবু? তবু! এই ভাবে? এই ভাবে? সমাজ বলে কি সে কিছু চেনে না? না চিনতে চায় না? মনঃস্তত্ববিদ, সমাজ বিঞ্জানীরা এই ঘটনার ব্যখ্যা দিতে পারবেন। এটা কোন ধরণের মানসিক বিকৃতি? বিকৃতি বাড়তে বাড়তে আরও কত নীচে আমদের নামতে হবে? কে বলে দেবে? কার কাছে প্রশ্ন করব?
খুব সম্ভবত নব্বইয়ের দশকে বহুল প্রচারিত প্রথমসারির একটি সাপ্তাহিকের শারদীয় সংখ্যায় একটি উপন্যাস লিখেছিলেন বর্তমান সময়ের একজন লেখক। সেই উপন্যাসে ছাগলের সঙ্গে একজনের সঙ্গমের কথা উল্লেখ করেছিলেন সেই লেখক। কয়েক দশক আগে প্রচার মাধ্যমের এতটা রমরমা ছিল না। ফলে গ্রাম-গঞ্জের এই ধরণের খবর খুব একটা বাইরে আসার সুযোগও ছিল না। উপন্যাসটি প্রকাশের পরে বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়। বিভিন্ন ধরণের মত উঠে আসে। যদিও উন্নত প্রাণী হিসেবে মানুষ এই বিষয়টির চর্চা এক সময়ে ছেড়ে দেয়। কেউ কেউ ‘বটতলার সাহিত্য’ বলে উপন্যাসটাকে দেগে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু লেখক তার অভিঞ্জতার মানদণ্ডে একটা খন্ডচিত্র আমাদের সামনে যথেষ্ট মুন্সিয়ানার সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন।    
বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমে সবার নজরে পড়েনি। কয়েকজনকে বলার পরে তাঁরা সোচ্চারে চিৎকার করে ওঠে। কেউ কেউ বলে, একটা অবলা, নিরীহ, নির্জীব পশুর সঙ্গে কেউ এই ধরণের ব্যবহার করতে পারে? কতটা মানসিক বিকৃতির শিকার হলে এই কাজ করা সম্ভব? ছেলেটি কী ‘ড্রাগস’ নেয়?  তাঁরা প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে ফিরে আসে বর্তমান ভারতে শিশু ধর্ষণের মতো ঘটনায়। তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় উঠে আসে আরও একটি প্রসঙ্গ ‘ছেলেধরা গুজব’-এ মৃত্যু। ভারতে ছেলেধরার গুজবে আক্রান্তের সংখ্যা কত? বিভিন্ন রাজ্যের পরিসংখ্যান যোগ করলে দাঁড়ায় এ পর্যন্ত ৭০ জন মানুষ গণপ্রহারে আক্রান্ত। সম্প্রতি হায়দরাবাদে একজন ট্রান্সজেন্ডার খুন হওয়ার পর পরিসংখ্যান বলছে আমাদের দেশে গণপিটুনিতে গত ১৮ মাসে মৃত্যু হয়েছে ৩৪ জনের। ভারতে গণপিটুনির ঘটনায় সুপ্রীমকোর্ট উদ্বিগ্ন। ১৭ জুলাই দেশের উচ্চ আদালত গণপিটুনির ঘটনাকে তীব্র ভাষায় নিন্দা করেছে। এবং এই ঘটনার মোকাবিলায় সংসদকে বিশেষ আইন আনার পরামর্শ দিয়েছে। ২১ জুলাই কলকাতায় শহীদ দিবসের জনসভায় তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘’গণপিটুনিতে মানুষ মারা যাচ্ছে। মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি হচ্ছে।‘’ লোকসভার বর্ষাকালীন অধিবেশনে ২৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ বিবৃতি দিয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের কথা ঘোষণা করেছেন। গণপিটুনির ঘটনায় দোষীদের শাস্তির দাবি জানান কংগ্রেসের মল্লিকার্জুন খড়্গে। সিপিএম সাংসদ মহম্মদ সেলিম বলেন, ‘’গণপিটুনির নায়কদের মালা প্রালে ওই অবস্থাই হবে।‘’     
শিশু অপহরণ এবং শিশু ধর্ষণ সম্পর্কিত একটি রিপোর্ট সম্প্রতি প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় সরকারের ন্যাশন্যাল ক্রাইম ব্যুরো (এনসিআরবি)। ওই রিপোর্টে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে সারা দেশে অন্যান্য ফৌজদারি অপরাধের তুলনায় শিশু অপহরণের হার অনেক বেড়ে গেছে। ২০১২ সাল থেকে ২০১৬ এই পাঁচ বছরে শিশু অপহরণের হার দ্বিগুণ হারে বেড়েছে। সাধারণ ক্ষেত্রের অপহরণের হার বাড়লেও এনসিআরবি-র তথ্য বলছে শিশু অপহরণের হার বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। ২০০৬ সালে শিশু অপহরণের হার ছিল ২৩ শতাংশ। ২০১৬ সালে ছিল ৬০ শতাংশ। বৃদ্ধির হার উল্কার গতিতে বাড়ছে। ২০১৮ সালের এনসিআরবি-র সাম্প্রতিক এই তথ্য ক্ষয়িষ্ণু সমাজের চলমান ছবিটা আমাদের সামনে আরও প্রকটভাবে তুলে ধরেছে। রিপোর্টে আছে ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে শিশুদের উপর ধর্ষণের ঘটনা ৮২ শতাংশ বেড়েছে। এই ঘটনায় আমাদের যথেষ্ট উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে। কিন্তু উন্নত গণতন্ত্রের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘটনা দেখুন। ২০ জুলাই, ২০১৮ ইউএসটুডে সূত্রে খবর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহিও রাজ্যে ১০০-এর বেশী ছাত্র যৌন নিগ্রহের শিকার। তাঁদের অভিযোগের আঙ্গুল জনৈক প্রাক্তন টিম ডাক্তারের বিরুদ্ধে। উন্নত মানবিক এবং গণতন্ত্রের দেশেও এই অভিঞ্জতার খবরের সঙ্গে আমাদের আলাপ করিয়ে দেয় মার্কিন সংবাদ মাধ্যম।
শুধুমাত্র শিশু অপহরণ, ধর্ষণ নয়। সম্প্রতি কলকাতার উপকন্ঠে একজন মৃত শিশুর চোখ উপড়ে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে কলকাতা শহরের একটি সরকারী হাসপাতালে। এই খবরও আমরা সংবাদ মাধ্যম এবং এনজিও সূত্রে পাই। সংবাদ সংস্থা সূত্রে খবর, শিশুটির পরিবার ৮ জুলাই, ২০১৮ বেলঘড়িয়া থানায় এফআইআর করে। ১২ জুলাই ভবানীপুর থানাতেও একটি অভিযোগ দায়ের করেন তারা। তাঁদের অভিযোগ হাসপাতালে শিশুটির মৃত্যুর পরে তাঁদের হাতে যখন দেহ তুলে দেওয়া হয় তখন শিশুটির দু’চোখে মোটা, গোল ব্যান্ডেজ বাঁধা ছিল। এই অভিযোগ পাওয়ার পরে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। মর্মান্তিক এই ঘটনার জন্য কাকে বা কাদের দায়ী করবেন? এটাও কী মানবতার অবক্ষয় নয়। ক্ষয়িষ্ণু সমাজের অধঃপতনের ইঙ্গিত নয়? কার কাছে কৈফিয়ৎ চাইবেন? কে কাকে উত্তর দেবে? উন্নত মননের, উন্নত চেতনার মানুষের অঞ্জাতসারেই কী এইসব ঘটনা ঘটছে? দেশের বিবেকমান মানুষ আছেন, আইন আছে, আদালত আছে, প্রশাসন আছে তবু মানুষ এত নীচে নামছে? কেন?
সভ্যতা এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির বিকাশ হয়। একুশ শতাব্দীতে আমরা পেয়েছি ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ নামক এক শক্তিশালী মাধ্যম। যে মাধ্যমে ‘ ‘পর্ণগ্রাফি’-র যেমন রমরমা পাশাপাশি দেখলে প্রাথমিক শিক্ষার হার কতটা বেড়েছে? সমাজ কতটা সচেতন হয়েছে? কেন কমবয়সী মেয়েরা আজ আক্রান্ত? আধুনিক প্রযুক্তির যেমন আশীর্বাদ হিসেবে আমাদের কাছে আসে আবার অভিশাপের দিকটাও থাকে। একটি উন্নত অর্থনীতির দেশে ‘স্মার্টফোন’ কর্মক্ষেত্রে যতটা প্রয়োজন দাবি করে, উন্নতশীল রাষ্ট্রে কি সেই একই দাবি করা যায়? অনুন্নত দেশের অবস্থা কী হতে পারে? অথচ কম দামের সস্তার ‘স্মার্টফোন’ বাজারে সহজলভ্য। ইন্টারনেট সহযোগে বিভিন্ন পোর্টালের মাধ্যমে কমবয়সী ছেলেমেয়েরা খবরের মোড়কে পণ্য-সংস্কৃতি তথা পর্ণ-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে।       
প্রখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব এবং বর্তমানে বাংলা সাহিত্য অ্যাকডেমির সভাপতি শাঁওলী মিত্র ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে...’ নামে তার একটি বইয়ের প্রথম প্রবন্ধটি লিখেছেন নারী নিগ্রহ এবং কাপুরুষতা বিষয়ে। ‘এরকম ঘটেই থাকে’ শিরোনামে তিনি লিখছেন, ‘’ইতিহাসের যত পিছনেই হঠি না কেন, পৃথিবীর যে দেশেই যাই, তাপসীরা ছিল, থাকে। এ বড় দুর্ভাগ্যের এবং কলঙ্কের ইতিহাস। আর বর্তমান ইঙ্গিত দেয়, তাপসীরা শুধু ছিল নয়, তাপসীরা থাকবে। যে তন্ত্রের ধব্জাধারীই থাকুন না কেন শাসনপ্রক্রিয়ার কান্ডারী, নারীর এ অপমান সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে চলবেই।‘’ (পৃষ্ঠা- ১)
 শাঁওলীদি আরও লিখছেন ‘’.........কাপুরুষদের পৌরুষ দেখাবার সবচেয়ে প্রশস্ত জায়গা যে সত্যিই এইটা তা বিশ্বসুদ্ধ লোক জানেন এবং মানেন। আর সেইমতই ব্যবহার করে থাকেন জীবনে। ইবসেন কবে যেন ডাঃ স্টকমানকে দিয়ে বলিয়েছিলেন, ‘’এ দেশে পুরুষ নেই একটাও, সব কাপুরুষ!’’ তাঁরা এস্টাব্লিশমেন্ট-এর বিপক্ষে গিয়ে ডাক্তারের বৈঞ্জানিক আবিষ্কারের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে সমর্থন করতে ভয় পেয়েছিল। আমার কেমন ধারণা হয়, যারা এইরকম পদক্ষেপ নিতে ভয় পান, সাহসে ভর করে সত্যি কথা বলতে ভয় পান, তাঁদেরই নিজ নিজ পৌরুষ সম্বন্ধে এক অদ্ভুত হীনমন্যতা জন্মায়। আর সেই থেকেই বোধহয় অনেক অস্বাভাবিক মানসিকতা তৈরি হয়, যা অনেক সময়ে জন্ম দেয় বিকৃতির। মনোবিঞ্জানী বলতে পারবেন এ অনুমান অমূলক কিনা!’’ (পৃষ্ঠা- ১, প্রকাশক- অর্ঘ, পঞ্চম বৈদিক, ২০০৭)                                                                               

Wednesday, 18 July 2018

পিতৃতান্ত্রিক সংসদীয় গণতন্ত্রে রাজনীতির আমলাতন্ত্র




দীপেন্দু চৌধুরী
বিংশ শতাব্দী অথবা উনবিংশ শতাব্দীর ভারতেও একটা সময় মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা আদিবাসী সমাজে প্রকট ছিল। বিংশ শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে আমি আসাম, মেঘালয়ের কয়েকটি পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করেছিলাম। সেই সময় আমার এই বিষয়ে কিছুটা অভিঞ্জতা হয়েছিল। এছাড়া আমাদের বীরভূম জেলা ছোট নাগপুর সংলগ্ন হওয়ার কারণে আমরা ছোট বয়স থেকেই আদিবাসীদের জীবন যাত্রা দেখতে অভ্যস্ত।     ইতিহাসবিদরা এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করতে পারবেন। পাহাড়ি অঞ্চলে এই ব্যবস্থা আজও অনেকটা দেখা যায়। যদিও আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক কাঠামো আধুনিক হয়ে গড়ে উঠার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার প্রসার হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রচার মাধ্যমের রমরমার কারণে তথা-কথিত ‘বাবু-সমাজ’-এর প্রভাব প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলেও পড়েছে। সময়ের নিয়মে সেইসব অঞ্চলেও পিতৃতান্ত্রিক প্রভাব বর্তমানে ব্যপকভাবে লক্ষ করা যায়।
প্রশ্নটা আসছে এইখান থেকেই। ভারতের পিতৃতান্ত্রিক সংসদীয় গণতন্ত্রে মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ নিয়ে সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে। কত বছর হবে? দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৭১ বছর অতিবাহিত। কিন্তু একটি আধুনিক গণতন্ত্রের আইনসভায় মহিলাদের আসন পুরুষদের সমানুপাতিক নয়। দেশের প্রথম সারির দুটো প্রধান রাজনৈতিক দল পরস্পরকে দোষারোপ করতে ব্যস্ত। বিজেপি আবার অভিযোগ তুলছে দলিত দলগুলির নেতৃত্ব ভোট ব্যাঙ্কের কারণে এই সংরক্ষণ চাইছে না। যদিও কংগ্রেস নিয়ে বিজেপি এই অভিযোগ করতে পারবে না। কারণ ইউ পি এ জামানায় আমরা মহিলা রাষ্ট্রপতি এবং মহিলা অধ্যক্ষ পেয়েছি। মহিলা রাজ্যপালও ওই একই সময়ে আমাদের দেশ পেয়েছে। সংসদের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে মহিলা প্রতিনিধি বসতে পেড়েছিলেন, ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের উজ্জবল ব্যক্তিত্ব সনিয়া গাঁধির উদ্যোগে। ইউপিএ সরকারের তৎকালীন চেয়ারপার্সন সনিয়া গাঁধির আন্তরিক উদ্যোগে এটা করা সম্ভব হয়েছিল। কংগ্রেসের দাবি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গাঁধি পুরসভা-পঞ্চায়েতে মহিলা সংরক্ষণে উদ্যোগী হয়েছিলেন। যদিও ভারত এর আগে কংগ্রেস দলের মহিলা প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে।  আইনমন্ত্রক সূত্রে খবর, সম্প্রতি কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ একটি চিঠিতে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধিকে লিখেছেন, ইউপিএ শরিকদের মতান্তরের কারণে ইউপিএ আমলে এই বিলটি সংসদে পাশ হয়নি। বিলটির মেয়াদ শেষ হতে দিয়েছিল কংগ্রেস।
পরের ঘটনাগুলি আমরা উল্লেখ করি। এক শ্রেণীর সামন্তপ্রভুদের রাজনৈতিক বিরোধিতায় ১৪ বছর ধরে আটকে ছিল মহিলা সংরক্ষণ বিল। ১৯৯৬ সালে বিলটি সংসদে প্রথম পাশ হয়। কিন্তু সংসদে বিরোধিতার কারণে তিন তিনবার বিলটির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এবং আটকে যায়। সনিয়া গাঁধির উদ্যোগেই ২০১০ সালে রাজ্যসভায় ওই বিল পুনর্বার পাশ হয়। সেই বছরও বিল পাশের সময় সংসদের উচ্চকক্ষ রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। বিজেপি দলেও এই বিল নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। কারণ ৩৩ শতাংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত হলে পরবর্তী নির্বাচনগুলিতে অনেক পুরুষকে প্রার্থীপদ খোয়াতে হবে। তবে বিজেপি সূত্রে খবর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সহ কয়েকজন শীর্ষনেতা এই বিল আনার পক্ষে। কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা সনিয়া গাঁধি এটা আঁচ পেয়েই একটি চিঠি লেখেন। এবং কংগ্রেসের মহিলা সেলকে স্বক্রিয় করতে মাঠে নামান। 
২০১৭ সালের শেষের দিকে সনিয়া গাঁধি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে একটি চিঠি লিখে মহিলা বিল পাশ করানোর অনুরোধ করেন। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীকে সনিয়া গাঁধি এই চিঠি লেখার পর সুস্মিতা দেব এবং প্রিয়ঙ্কা চতুর্বেদীর নেতৃত্বে পাঁচজন কংগ্রেস মহিলা নেত্রীকে দিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করান। মহিলাকংগ্রেসের যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনের বক্তব্য ছিল, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘বেটি বচাও বেটি পড়াও, তিন তালাক, মহিলা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মতো বিষয়গুলি সামনে এনে নারীদরদি ভাবমূর্তি তুলে ধরতে চাইছেন। যদি সেটা সত্যি হয় তাহলে কেন শীতকালীন অধিবেশনে মহিলা বিল পাশ করানোর কথা ভাবা হচ্ছে না? কারণ এটা সংবিধান সংশোধনী বিল। এই বিলকে কার্যকরী করা এক দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। যদিও ২০১৭ সালের শীত, ২০১৮ সালের গ্রীষ্ম থুরি বাজেট অধিবেশন পেরিয়ে বর্ষা এসে গেল। কিন্তু মহিলা সংরক্ষণ বিল আজও আলোর মুখ দেখতে পেলনা। ২০১৭ সালের মহিলা কংগ্রেসের যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে আরও বক্তব্য ছিল, এই বিল শীতকালীন অধিবেশনে পাশ করাতে না পারলে ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে আইন রুপায়ন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে লেখা চিঠিতে সনিয়া গাঁধি লিখেছিলেন, ‘’২০১০ সালে রাজ্যসভায় বিলটি পাশের পর নানা কারণে লোকসভায় পাশ করানো যায়নি। লোকসভায় আপনার সংখ্যা গরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে বিলটি পাশ করান। মহিলাদের ক্ষমতায়নের লক্ষে কংগ্রেস তা পূর্ণ সমর্থন করবে।‘’
পাশাপাশি বিজেপির উপলব্ধি নির্মলা সীতারামনকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী করার পর থেকে বিজেপি দলের মহিলাদের সমর্থন বেড়েছে। এবং মহিলাদের ক্ষমতায়নের পক্ষে বিজেপি নেতৃত্ব এই বারতাও দেওয়া গেছে। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে সেটাকেই এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এই বিল পাশের পুরো কৃতিত্বও নিতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিজেপির এক সাধারণ সম্পাদক বলেছিলেন, ‘’বিলটি সংসদের পরের অধিবেশনে আনার কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।‘’ তারপরেও গঙ্গা-যমুনা দিয়ে কালো-সাদা জল বয়ে গেল কিন্তু মহিলা সংরক্ষণ বিল যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরে রয়ে গেল।
বিলটি পাশ হলে তা কতটা গুরুত্ব দাবি করতে পারে সেটা কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধি আগেই টের পেয়েছিলেন। চলতি বছরের মে মাসে তিনি মহিলা কংগ্রেসকে তৈরি হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এক-তৃতীয়াংশ আসনে মহিলা প্রার্থী বাছাই করতে রাহুল গাঁধি সর্বভারতীয় মহিলা কংগ্রেসের সভানেত্রী সুস্মিতা দেবকে বিষয়টি নিয়ে তৃণমূল স্তরে সক্রিয় হওয়ার জন্য বলেন। পরে সুস্মিতা দেব বলেন, ‘’...‘পরছায়া’ প্রার্থী চান না রাহুল গাঁধি। পঞ্চায়েতে ভোটে যেমনটা হয়ে থাকে। আমাদের সভাপতির নির্দেশ বলুন বা তার ইচ্ছে কেউ স্বামী বা দাদার বকলমা হয়ে ভোটে দাঁড়াবেন না। মহিলা কংগ্রেস নেত্রী হিসেবেই সংরক্ষিত আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।‘’
ওইদিন সুস্মিতাদেবী আরও বলেন, ‘’আমাদের দল যাতে হঠাত করে কোনও সঙ্কটে না পড়ে সেই ব্যাপারে মহিলা কংগ্রেস বেশ কিছু পদক্ষেপ করার জন্য তৈরি হচ্ছে। প্রথম পর্বে থাকছে, মহিলা কংগ্রেসের বিভিন্ন উপ-শাখা গঠনে জোর দেওয়া। রাজ্যে রাজ্যে গড়ে তোলা হয়েছে মহিলাদের ‘লিগ্যাল সেল’। মহিলা কংগ্রেসের একটি রিসার্চ সেলও তৈরি করা হয়েছে। যুব কংগ্রেসের মতো ‘যুব মহিলা কংগ্রেস’ গঠন করা যায় কিনা তা নিয়েও ভাবনাচিন্তা শুরু করেছি আমরা।‘’
সিপিএম দল থেকেও একই দাবি উঠেছে। দলের ২২তম পার্টি কংগ্রেসে হায়দরাবাদে মহিলা বিল সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব আনেন সূর্যকান্ত মিশ্র। এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত এই পার্টি কংগ্রেসে সূর্যকান্ত মিশ্রের আনা প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, আইনসভায় অবিলম্বে মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণের বিলকে আইনে পরিণত করতে হবে। পার্টির ২২তম কংগ্রেস এই দাবি জানাচ্ছে। দলগতভাবে আহ্বান জানানো হচ্ছে যে, বিজেপি সরকারকে এই বিল যাতে দিনের আলো দেখতে পায় তার জন্য আইনে পরিণত করতে হবে। এটাকে বাধ্য করানোর জন্য সমস্ত অংশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের সোচ্চার হতে হবে। প্রস্তাবটি উত্থাপন করে সূর্যকান্ত মিশ্র আরও বলেছিলেন, ‘’মহিলাদের সমানাধিকার দেওয়ার দাবিটি দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত। রাষ্ট্রসঙ্ঘের বেজিং কনভেনশনে এবিষয়ে প্রস্তাব গ্রহণের পর সমস্ত রাষ্ট্রের কাছে আবেদন জানানো হয়েছিল, আইনসভায় মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণের। বিশ্বের দু’ই-তৃতীয়াংশ কাজই মহিলারা করে। যদিও তাঁরা ভোগ করে এর খুবই সামান্য অংশ। সিপিএম প্রথম থেকেই ধারাবাহিকভাবে এই প্রস্তাবের পক্ষে লড়াই করে আসছে।‘’
তৃণমূল কংগ্রেস দলগতভাবে কংগ্রেসের ডিএনএ। তারাও সংসদে ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের পক্ষে। চলতি বছরে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার ধর্মতলায় এক জনসভায় বলেন, ‘’আমরা ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ করেছি। আমাদের নির্বাচিত মহিলা প্রতিনিধি সংখ্যা হচ্ছে ৩৩ শতাংশ। বিল পাশ হওয়ার আগে আমরা করে দেখিয়ে দিয়েছি। তবে আমরাও চাই সংসদে মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ হোক।‘’
চলতি সপ্তাহে সংসদ শুরুর আগে মহিলা বিল নিয়ে সোচ্চার হলেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধি। কংগ্রেস সূত্রে খবর, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি লিখে রাহুল জানতে চেয়েছেন চলতি বর্ষাকালীন অধিবেশনে মহিলা সংরক্ষণ বিল নিয়ে সরকার কী ভাবছে? এই বিল কী পাশ হবে? সভাপতি হিসেবে দলের হাল ধরলেন নিজেই। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি। কংগ্রেসের তরফে ৩২ লক্ষ মহিলার স্বাক্ষর ইতিমধ্যে সরকারের কাছে পেশ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উচিৎ রাজনীতির উর্ধে  উঠে গণতন্ত্রের পক্ষে কথা রাখা। রাহুল গাঁধি পরে একটি টুইট করেন। টুইটে তিনি বলেন, ‘’প্রধানমন্ত্রী মহিলাদের ক্ষমতায়নের রক্ষাকর্তা বলেন নিজেকে। তিনি বিল পাস করুন, কংগ্রেস নিঃশর্ত সমর্থন করবে।‘’
প্রস্তাবিত বর্ষাকালীন অধিবেশন আজ থেকে শুরু হয়েছে। সোমবার রাহুল গাঁধির লেখা চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন একটি ‘ডিল’-এর প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সংবাদ সংস্থা সূত্রে খবর, সেই বিষয়ে আলোচনা করার জন্য চিঠিটি তিনি নিজের ক্যাবিনেটের আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদের কাছে পাঠিয়ে আলোচনার কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কথামত আইনমন্ত্রী রাহুল গাঁধিকে লেখেন ‘’আমি ‘নতুন ডিল’-এর প্রস্তাব দিচ্ছি। কংগ্রেস ও বিজেপি মিলে মহিলা সংরক্ষণের সঙ্গে সঙ্গে তিন তালাক এবং নিকাহ হালালার বিলটিও পাশ করুক। এবং পিছিয়ে পড়া শ্রেণী সংক্রান্ত জাতীয় কমিশনকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়ার বিলটিও পাশ করানো হোক।‘’
টানটান উত্তেজনার মধ্যে থাকবে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম এবং রাজনীতি। একঝাঁক নতুন এবং তরুণের নেতৃত্বে একুশ শতাব্দীর ভারতীয় কংগ্রেস দল। রাজনৈতিক আমলাতন্ত্রের উর্ধে উঠে ভারতীয় সংসদ কী ১৪ বছরের পুরনো বিল পাশ করে আধুনিক গণতন্ত্রের স্তম্ভ আরও শক্ত করতে পারবে?