Monday, 26 November 2018

প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের দুই জীবনশিল্পীর সেতু




দীপেন্দু চৌধুরী 
উনবিংশ শতাব্দীর ভারতে রেনেসাঁ বা নবজাগরণের উৎস ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ কলোনী অধ্যুষিত সভ্যতা। এবং সেই সভ্যতা নির্ভর বাংলা থেকে পাশ্চাত্য ভাবধারার জীবনশৈলীর খোঁজে ঝাঁকে ঝাঁকে লেখক, শিল্পী, সমাজকর্মী, বুদ্ধিজীবীর দল আমাদের নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে এসেছেন। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির নেতৃত্বে ‘’নবজাগরণ’’ নামে পরিচিত চিরায়ত সেই আন্দোলনের ভিত্তি ছিল আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত, স্বচ্ছ ভাবাদর্শ, যুক্তি নির্ভর বস্তুবাদী জীবনদর্শন, সুগভীর মানবতাবোধ এবং আন্তর্জাতিকতায় বিশ্বাস রাখা। এই আন্দোলনের প্রথম সারির ঋত্বিক তথা সামজিক মহানয়ক ছিলেন রামমোহন রায়, বিদ্যসাগর থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত একধিক প্রথমসারির বিদ্বজ্জন। বিংশ শতাব্দীতে এসে উনবিংশ শতাব্দীর জ্ঞানের আলোয় বিচ্ছুরিত মনন, লেখনী, মানবতার আবেদন রবীন্দ্রনাথ আমাদের দিতে থাকলেন। তাঁর আকাশ ছোঁওয়া সীমাহীন ব্যক্তিত্বের স্পর্শে। বাঙালি তথা ভারতের অনুন্নত সাংস্কৃতিক সমাজ সমৃদ্ধ হতে থাকল।
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শেষ দিকে অর্থাৎ ১৯১৯ সালের ২৪ জুন কবিগুরুর হাতে এসে পৌঁছল একটি চিঠি। না সেটা ‘রাশিয়ার চিঠি’ নয়। বা ব্রিটেনের রানীর চিঠি নয়। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর চিঠিও নয়। চিঠিটা পাঠিয়েছিলেন বিশিষ্ট ফরাসী ঔপন্যাসিক, জীবনের গদ্যশিল্পী, মানবতাবাদী ভাবুক, দার্শনিক রম্যাঁ রলাঁ। তিনি রবীন্দ্রনাথকে আবেদন করেছিলেন ‘মুক্তমনের স্বাক্ষরপত্র’-তে সই করার মানবিক আবেদন নিয়ে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ, ‘ছেলেটা’, ‘সাধারণ মেয়ের’ কবি, ‘গোরা’, ‘ঘরেবাইরে’ উপন্যাসের জীবনশিল্পী বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সই  করে দিয়েছিলেন সেই ‘মুক্তমনের স্বাক্ষরপত্র’-তে। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের দু’ই জীবনশিল্পী সেতু রচনা করলেন। মানবিক বিশ্বের সেতু। শুরু হল এক ধ্বংসোন্মুখ পৃথিবীকে বাঁচানোর ‘পটকথা’। যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা দুই মানবতাবাদী ভাবুকের কথোপকথন। ঘুমিয়ে থাকা বিশৃঙ্খল একমেরুর ঝঞ্জা থেকে বিশ্বমানবতাকে বাঁচানোর দায় দায়িত্ব তুলে নিলেন তাঁরা দুজনে। ভারতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ফ্রান্সে রঁম্যা রলাঁ। অধ্যাপক, কবি ফরাসি ভাষাবিদ চিন্ময় গুহ বলছিলেন প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের দুই ‘নিখিলেশ’-এর দেখা হল। মিলন হল। বিশ্ব পেল আরও স্বচ্ছ কাঁচের পেয়ালা ভর্তি মানবতার আলো। বন্ধনহীন, সীমহীন সঙ্গীতের মূর্ছনা।  
যদিও রবীন্দ্রনাথ তখন ভীষণ ক্লান্ত। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে কবি ‘নাইটহুড’ খেতাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি তখন ক্ষুব্ধ, বিষণ্ণ, অবসন্ন। সেই সময় পেলেন আন্তর্জাতিক মানবতার রক্ষার দাবিপত্র। পাঠিয়েছেন নোবেলজয়ী ঔপন্যাসিক, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দের জীবনীকার রম্যাঁ রলাঁ। আমরা এতটা জানতে পারলাম একটি বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে। ২২ নভেম্বর আলিয়াঁস ফ্রাঁসেজ সভাঘরে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হল অধ্যপক চিন্ময় গুহ সম্পাদিত ‘ব্রিজিং ইষ্ট অ্যান্ড ওয়েস্টঃ রবীন্দ্রনাথ টেগোর অ্যান্ড রম্যাঁ রলাঁ করেসপন্ডেস’ ১৯১৯-১৯৪০ গ্রন্থটি। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে। বইটি উদ্বোধন করেন চলচ্চিত্র এবং নাট্য ব্যাক্তিত্ব সৌমিত্র চট্টোপাধায়। ১৪৯ পাতার বইয়ে দুই মানবতাবাদী বিশ্বপথিকের মোট ৫৬টি চিঠি এবং ৩টি সংলাপ আছে। সৌমেন্দ্রনাঠ ঠাকুরের বিস্ফোরক চিঠি আছে (১৯১৯-১৯৪০)। গাঁধি বিষয়ে। চিন্ময় গুহ জানাচ্ছিলেন, দু-দু’টো বিশ্বযুদ্ধের সময়ের অস্থির বিশ্বের ছবি ধরা আছে এইসব চিঠির ছত্রে ছত্রে।
চিন্ময় গুহ বললেন, ‘’রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘হে আমার অতি প্রিয় বন্ধু’, কবির ভাষায় ‘আমি তো মহাত্মা গাঁধির হাতে হাত রাখতে চাই, যাতে জনসাধারণ খুশি হয়। কিন্তু আমি তো বেশিদিন লুকিয়ে রাখতে পারব না যে আমাদের সত্যানুসন্ধান ও ভাবনা সম্পূর্ণ আলাদা।’ আবার তাঁর উত্তরে ১৯২৫ সালে রলাঁ লিখছেন, ‘আমরা যে ঘর বেঁধেছি অনন্ত বৃক্ষের উপর।’ লক্ষ করুণ রবীন্দ্রনাথ ‘হে আমার অতি প্রিয় বন্ধু’ সম্বোধন করে চিঠি লিখছেন। বিশ্বকবি কতজনকে এই সম্বোধনে চিঠি লিখেছেন? খুব পরিষ্কার ছবি আমাদের সামনে নেই।‘’
চিন্ময় গুহ আবেগ প্রবণ হয়ে বলে চলেন, জীবন এবং চলচ্চিত্রকে একটা বন্ধনে বেঁধেছেন সৌমিত্রদা। তিনি এখানে আছেন। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। স্মৃতি, সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং ধর্মীয় বিষয় নিয়ে রলাঁর বক্তব্য। ঘুমের দরজাকে উপেক্ষা করে আমার বক্তব্য নয়। রম্যাঁ রলাঁ বলছেন। ১৯১৪ সালে কোনও নোবেল পুরষ্কার ছিল না। যুদ্ধের কারণে। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ পুরস্কার পান। ১৯১৫ সালে রম্যাঁ রলাঁ পেলেন নোবেল পুরস্কার। তাঁরা দু’জনে এক তরঙ্গ লহমায় থাকেন পরস্পরকে না দেখেও। পাশ্চাত্যের ‘নিখিলেশ’-এর চরিত্র তিনি এঁকেছেন। সংগীতের সমন্বয় বিষয় নিয়ে দু’জনে কথা বলেছেন। সংস্কৃতির ঐতিহ্য আলো। জ্বলে উঠল আলো ঐ নীল দিগন্তে। আনন্দের জ্বলন্ত শিখা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন নাটকীয়তাকে আমি ঘৃণা করি।
এই বইয়ে চিন্ময় গুহ মূল ফরাসি থেকে রলাঁর চিঠিগুলির নতুন করে অনুবাদ করেছেন। সম্পূর্ণ পত্রাবলি সম্পাদনা করে দীর্ঘ এক ভূমিকা এবং টীকা লিখেছেন অধ্যাপক গুহ। যে কাজ বর্তমান সময়ের মানদন্ডে চিরকালীন হয়ে থাকবে। এই বইয়ে আছে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের ঋষিতুল্য মানবতাবাদী দু’ই লেখকের টেলিগ্রাম, রথীন্দ্রনাথের চিঠি। মুসোলিনি-বিতর্ক। এই বিতর্ক প্রসঙ্গে অধ্যাপক গুহ তাঁর সমৃদ্ধ মেধার মাধ্যমে আমাদের শোনালেন রবীন্দ্রনাথের দৃঢ় ব্যক্তিত্বের কথা। ইংরেজিতে লেখা বইটিতে আরও আছে দু’জনের সম্পর্কিত ঘটনাবলি, গাঁধি-রবীন্দ্রনাথ-রলাঁর সম্পর্ক বিষয়ক লেখা এবং তথ্য। এই বিষয়ে পাশ্চাত্যের সমকালীন বিশিষ্টজনদের চিঠিপত্রের উধৃতি।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘’চিন্ময় সেতু তৈরি করছে নতুন ভাষায় নতুন আঙ্গিকে। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের দু’জন মহান শিল্পীর সম্পর্কে আমাদের সামনে আরও তথ্য চিন্ময় তুলে ধরেছে। ভারতীয় হিসেবে ফ্রান্সের সঙ্গে চিন্ময়ের  দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। একই সঙ্গে উল্লেখ করতে হয় রম্যাঁ রলাঁও আমাদের দেশকে জেনেছেন, বূঝেছেন একজন বিশ্বনাগরিক হিসেবে। আর রবীন্দ্রনাথ? তিনি আমাদের নীল আকাশ যেমন চিনিয়েছেন, চিনিয়েছেন সাগর পারের আমন্ত্রণের ভাষা। নদীর ঘাটের খেয়া টানার গান। সেই দু’ই মহান ব্যক্তির সংলাপ চিন্ময় নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরেছে। রম্যাঁ রলাঁ রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দের জীবনীও লিখেছেন।‘’
এদিনের আলোচনা থেকে অধ্যাপক চিন্ময় গুহের বক্তব্যে আরও পাওয়া গেল, রলাঁ বলছেন, আমরা একই চিন্তা করেছি। ওদের নয়, আমাদের নয়, সবার। অনেক বামপন্থীরা ভেবেছিলেন রলাঁ বামপন্থী। কিন্তু তিনি মানে রম্যাঁ রলাঁ বলছেন ‘আমি সম্পূর্ণ মুক্ত মানুষ।’ রলাঁ র‍্যাডিক্যাল ছিলেন। সনাতন ভারতকে তিনি বুঝতে চেষ্টা করেছেন। মানুষের মধ্যে খুঁজছেন সীমাহীন এক পৃথিবী। রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে তাঁর কথায় উঠে এল, রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘আমার সঙ্গে যত মানুষের দেখা হয়েছে তাঁদের মধ্যে রলাঁ আমার সব থেকে কাছের মানুষ। আমরা দু’জনেই স্বদেশী এবং জাতীয়তাবাদী।‘’ অচেতনভাবে রবীন্দ্রনাথ বলছেন আমাদের জয় হবেই আমরা করব জয়।
অধ্যাপক গুহ আরও বলেন, ‘’রবীন্দ্রনাথ স্ত্রোত্র পাঠ করেছিলেন। মন্ত্র পাঠ করেছিলেন। সেটা সংগীতকে ছাপিয়ে যায়। যেন প্রাচীন মনের মৌচাক। আনন্দের জ্বলন্ত শিখা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। পৃথিবীর ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের জাপান সফরের বক্তব্য সারা বিশ্বের কাছে একটা বাঁক। যে বক্তব্য রবীন্দ্রনাথ রেখেছিলেন সেই বক্তব্যে তিনি মানবধিকারের কথা বলেছিলেন, যেমনটা তিনি করেছিলেন জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যার প্রতিবাদে। রলাঁর এক বান্ধবী রলাঁকে বলছেন রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’ পড়তে। এই বইয়ের কবিতা গান নয়, গানের উপরের স্তরের  আরও উচ্চতায়, আরও বাঙময়।‘’
ধ্যানমগ্ন ঋষির অন্তর থেকে প্রস্ফুটিত শব্দের ডালি। ‘গানের ঝর্ণাতলায় তুমি সাঁঝের বেলায়/ এলে ঝর্ণাতলায়। ......যে সুর গোপন গুহা হতে/ ছুটে আসে আপন স্রোতে’। রবিন্দ্রনাথের অশ্রু মিশে গেল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে।
কলকাতায় ফ্রান্সের কনসাল জেনারেল ভার্জিন কর্টিভেল (Virginie Coteval) বলেন,  ‘’গত শতাব্দীর দুটো দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ে দু’জন শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী লেখকের আলোচনার বিষয় আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন অধ্যাপক চিন্ময় গুহ। ফ্রান্স সরকারের কাছেও এই কাজ সম্মানজনক বিষয়। বাংলা, ইংরেজি এবং ফরাসি ভাষায় দক্ষ চিন্ময় গুহ। বর্তমান শতাব্দীতেও এই বইয়ের বিষয় দু’টো গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে সেতু রচনা করবে।‘’
এদিনের সন্ধ্যায় ফরাসি ভাষায় লেখা রম্যাঁ রলাঁর চিঠি পড়েন আলিয়াঁস ফ্রাঁসেজ কলকাতার ডিরেক্টর ফ্যাব্রিস প্যাল্কন এবং গ্রন্থগারিক সন্ধিয়া ভাসিউর। রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে বাংলায় কবিতা পাঠ করেন মৃন্ময়ী ধর।                                                             

Sunday, 25 November 2018

বিশ্বের যে কোনও আক্রান্ত সাংবাদিকের পাশে থাকবেন তিনি




দীপেন্দু চৌধুরী
পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ? না পথ খুঁজিতেছ? তুমি বঙ্কিমচন্দ্রের নবকুমার লহ। তবে বিশ্ব সংবাদ মাধ্যমের কাছে আজ বিশ্বপথিক। তথা বিশ্বনাগরিক। তাই আমি সঙ্গে হাটিতে চাহিতেছি। কারণ আমি পথ হারাই নাই। আমি পথ খুঁজিতেছি। তুমি আহ্বান জানাইয়াছ। তুমি আমন্ত্রণ করিয়াছ। ‘Join The Journey’.  এই যুগে আমাদের ন্যায় এই দেশে ‘নবকুমার’ হইতে গেলে অনেক কাঠখড় পোড়াইতে হয়। যাহার খবর সন্ধানে তুমি ভারতে আসিয়াছ। আমি নাগরিক সাংবাদিকতায় স্থানও পাইতেছি না। আবার প্রস্থান করিতেও দিতেছে না। তাই সব ধরণের লড়াই করিয়া টিকিয়া থাকিতে চাহিতেছি। আমাদের ন্যায়শীল পাঠকের কাছে ইহাই কহিবার থাকে যে ইহা আমার ন্যায় এক শ্রমজীবী সাংবাদিকের আত্মশ্লাঘা কহিবার নিবন্ধ নহে। শুনাইবার কোনওরূপ অহংবোধ দেখাইতেছি না। আবার সাধুভাষায় লিখিবারও আমাদিগের কোনওরূপ স্বতঃপ্রণোদিত আত্মনিবেদনের শ্রমলব্ধ কলমচির কাজ করিতে মন চাহিতেছে না। তাই চলিত বাংলায় আমেরিকান সংবাদ মাধ্যমের এক ‘পদাতিক’ সাংবাদিক প্রসঙ্গে দু’চার লাইন লিখিবার সাধ জাগিয়াছে।
খবর সংগ্রহের উপকথা
তাঁর নাম পল সালোপেক। তিনি সাংবাদিকতার ছাত্র নন। তিনি বিঞ্জানের ছাত্র। সাংবাদিকতাকে ভালোবেসে বিশ্ব পথিক হয়েছেন। পল সালোপেক আমেরিকার প্রতিষ্ঠিত লেখক এবং সাংবাদিক। তিনি কাজ করেছেন ‘চিকাগো ট্রিবিউন’, ফরেন পলিসি, দ্যা আটলান্টিক, ন্যাশন্যাল জিয়োগ্রাফিক সহ আরও নিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার হয়ে। তিনি হেঁটে বিশ্বের কয়েকটি দেশের রাজনীতি, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং লোকায়ত সংস্কৃতির সুলুকসন্ধান করতে চান। সালোপেক ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাস থেকে হাঁটতে শুরু করেছেন। আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে এসে মানুষ কী রকম ভাবে এক দেশ থেকে আর এক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে সেটা জানাটাও এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য। ‘’আউট অফ ইডেন ওয়াক’’ (‘’Out of Eden Walk’’) শিরোনামে তিনি হেঁটে বিশ্বভ্রমণ করতে চান।  এই পরিভ্রমণ প্রায় ২১ হাজার মাইল হবে। আনুমানিক প্রায় ৩৩ হাজার ৭৯৬ কিলোমিটার। তাঁর এই ভ্রমণের জন্য অর্থ দিচ্ছে ন্যাশন্যাল জিয়োগ্রাফিক সোসাইটি, দ্য নাইট ফাউন্ডেশন এবং আবুডান্স ফাউন্ডেশন। তার এই পদব্রজে ভ্রমণ শেষ হবে ২০২০ সালে দক্ষিণ আমেরিকা সফর দিয়ে। সম্প্রতি কলকাতা প্রেস ক্লাব এবং আমেরিকান সেন্টারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হল ‘স্লো জার্নালিজম’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভার।
ভারত সফরে এসে সালোপেক অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখলেন বিহারের মানুষ কীভাবে সুরাট থেকে চলে আস্তে বাধ্য হয়েছেন। কাজের সন্ধানে গিয়ে সেখানে ‘নাগরিক স্বীকৃতি’ না থাকার জন্য তাঁদের চলে আস্তে বাধ্য হতে হয়েছে। বিহারে থাকার সময় এই গল্প শোনেন দু’বার পুলিৎজার বিজয়ী আলোচ্য সাংবাদিক। সারা বিশ্বের জ্বলন্ত সমস্যা ‘মাইগ্রান্ট’ বা অভিবাসন সমস্যা নিয়ে গভীরভাবে ভাবছেন তিনি। অনুভব করছেন বিশ্ব আত্মীয়তার। যেটা তিনি পারেন অনুভব করতে কারণ তিনি পায়ে হেঁটে, পায়ে হেঁটে লাল, কালো, পাথুরে, কাদা, মাটি, জল মেখে, মরুভূমিতে হেঁটে চলেছেন। নাগরিক সভ্যতা টপকে গঞ্জ সভ্যতা তারও আগে অনেক অনেক আগে গ্রামীণ সভ্যতা। স্লাইড শোয়ের মাধ্যমে ১৯ নভেম্বর কলকাতা প্রেস ক্লাবের সভাঘরে তিনি বললেন, ‘শিকাগো থেকে ট্রাডিশনাল খবর করেছি। রাজনীতি, পরিবেশ, সামাজিকসহ বিভিন্ন বিভাগে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছি। আমি ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছি। সাংবাদিকতার প্রয়োজনে। জেনোসাইড বা গণহত্যা আমাকে গভীড়ভাবে ভাবায়।  আমি মানবতা দেখেছি। সন্ত্রাসবাদীদের মধ্যেও মানবতা দেখেছি। ফেস টু ফেস সাংবাদিকতায় অনেক কিছু বোঝা যায়। ‘Single Journalism is my life. New story in the world.’ আমি খুঁজেছি এবং খুঁজছি জীবনের নতুন নতুন উপকথা।‘’
তিনি সন্ত্রাসবাদীদের সামনে থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। আফ্রিকা এবং এশিয়ার মধ্যভাগে তাঁদের সঙ্গে সালোপেকের দেখা হয়েছে। তাই তিনি উপলব্ধি করছেন ‘মাইগ্রেশন’ নামক এক জ্বলন্ত সমস্যার। আফ্রিকা থেকে আমেরিকা হয়ে বাকী বিশ্বের একই সমস্যা। সালোপেকের আক্ষেপ নিজের দেশ আমেরিকা উন্নত গণতন্ত্রের গর্ব করলেও অভিবাসন নীতি ঠিক করতে হিমসিম খাচ্ছে। একশো বছর আগে থেকেই ‘মাইগ্রেশন’ একটা জ্বলন্ত সমস্যা। তাঁর বক্তব্যে তিনি বলছেন। ‘’In case of India, migration is a very important issue.’’   
সাংবাদিকতা কোনও রকম ‘রেডিমেড ফুড’ নয়। সালোপেক মনে করেন। চট জলদি একটা খবর সংগ্রহ করে ‘বৈদ্যুতিন মাধ্যম’-এ ব্রেকিং নিউজ করলেই সাংবাদিকতার কাজ শেষ হয়ে যায়না। ‘স্লো জার্নালইজম’ বুঝতে গেলে ঞ্জান অর্জন করতে হবে। দিনে তিন চারটে খবর সংগ্রহ করে আমরা গর্ব করতে পারি কিন্তু সংবাদের গভীরে যেতে পারি কী? প্রশ্ন তুলছেন সালোপেক। তাঁর বক্তব্য, I am working from story to story for digital news. গতিশীল দুনিয়ার সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে। ‘স্লো জার্নালইজম’ বিষয়ে তিনি আরও বলছেন, ‘’I believe there is space for longer, hopefully more thoughtful storytelling in our lives, and walking accomplishes this. By moving at 5km an hour through the main stories of our time, I think I gather a better understanding.’’  আন্তর্জাতিক বিশ্বায়িত নাগরিকদের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার। আরও দেখা হবে। আমি আরও অনেকের সঙ্গে দেখা করতে চাই। কথা বলতে চাই।
ভারতের রাজনীতি প্রসঙ্গে সলোপেক বলেন ‘’আমি একটা হেডলাইন দেখেছিলাম নোট বাতিলের জন্য মানুষ কি ভাবে অসুবিধায় পড়েছে। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম এই খবরের গভীরে গিয়ে সেই গল্প আমাদের কতটা দিতে পেরেছে? এই বিষয়টা আরও বিস্তারিত গেলে তবেই বলতে পারব ‘স্লো জার্নালইজম’-র শর্ত আমরা পালন করতে পেরেছি।‘’
প্রশ করেছিলাম সি এন এন চ্যানেলের সাংবাদিকের কার্ড বাতিল প্রসঙ্গে। ট্রাম্প প্রশাসন যদিও পরে সি এন এন সাংবাদিক জিম অ্যাকোস্টার মার্কিন সরকারের দেওয়া হুয়াইট হাউসের অনুমোদিত কার্ড (Accredited) জিমকে ফেরৎ দিয়েছেন। প্রসঙ্গটি উল্লেখ করে আমি জানতে চেয়েছিলাম ‘মুক্ত সাংবাদিতা’ (Free Press) বিষয়ে তাঁর  মতামত কী? আমি প্রশ্ন করেছিলাম, ‘’According to news agency  A federal Judge on 16 November directed the White House to restore the press credentials of Jim Accosta of CNN, while White house spokeswomen Sarah Sanders, said ‘’We will also further develop rules and processes to ensure fair and orderly press conferences in the future.’’ Mr. Salopek what is your opinion about free press Rights? পল সালোপেক উত্তরে বলেন, ‘’বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ধরণের সমস্যা রয়েছে। আমি যে কোনও দেশের সংবাদ মাধ্যমের উপর আক্রমণের বিরোধী। আমার সহকর্মী আক্রান্ত হয়েছিলেন। আমরা ওর পাশে ছিলাম। এবং এখনও পাশে আছি। ভবিষ্যতেও থাকব।‘’               
  

Tuesday, 13 November 2018

উদ্বৃত্ত মানবসম্পদ নিয়ে চিন্তিত বুকারজয়ী লেখিকা




দীপেন্দু চৌধুরী
আজকের এই নিবন্ধের সঙ্গে প্রথম যে উধৃতিটি উল্লেখ করছি সেটা কতটা সাযুজ্য দাবি করতে পারে?  সেটা বিচার করার দায়িত্ব বিদগ্ধ পাঠকমণ্ডলীর।  হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় কোনও সময় একটি লেখায় লিখেছিলেন, ‘’যা দেখি খারাপ লাগে, যা শুনি খারাপ লাগে, যা পড়ি খারাপ লাগে, যার সঙ্গে কথা বলি খারাপ লাগে, কোথাও সত্যিকার বুদ্ধি, প্রঞ্জা বা প্রতিভার পরিচয় পাইনা। শুধু সমস্ত অন্ধকারের মধ্যে শিবরাত্রির সলতে হয়ে একা জ্বলছেন অন্নদাশঙ্কর। ... তাই শত রাজনৈতিক মতভেদ সত্বেও অন্নদাবাবুকে আমরা মাথায় করে রাখি।‘’
আমি এই জন্মে কোনওদিন এমন ধৃষ্টতা দেখানো বা চিন্তার করার  কথা ভাবতে পারি না। যে আমি অন্নদাশঙ্কর রায়ের সমগোত্রীয় হয়ে যাব । পরজন্মে হতে চেষ্টা করব। এমনটাও ভাবতে চাইছি না। কারণ আমার সীমাবদ্ধ ঞ্জানে আমি ‘পরজন্মে’ বিশ্বাস করি না। জীবনের কৈশোর থেকে এ পর্যন্ত আর্থ-সামাজিকভাবে এবং আর্থ-সাংস্কৃতিক মানদন্ডে পিছড়ে বর্গের মানুষ হয়ে থেকে গেলাম। অথবা অদৃশ্য এক রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক ‘জোটঘোট’ এবং তাঁদের অনুগামী দল (স্বার্থান্বেষীর দল) নোনা ঘামের স্রোত দেখতে অভ্যস্ত। আমাদের মতো ‘অপর’-দের দেখে হাসি ঠাট্টা, ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ করেই এঁরা আনন্দ পায়। আমরা আমাদের কাজ করে যাই। একদল ঠান্ডা ঘরের সুচতুর সাংস্কৃতিক ‘জোটঘোট’ আজ পর্যন্ত আমাকে ‘ক্যামেরাম্যান’, ‘অচ্ছুৎ’ (Untouched), দলিত, জোকার, ভাঁড় ইত্যাদি পদবীতে খ্যাত করেছেন। বিভিন্ন উপায়ে আমদের মতো অক্ষম ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে ঘৃণা ছড়িয়েছেন। ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। তাঁদের পরিকল্পিত আক্রমণে আমাদেরমতো ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকে না। বারে বারে কেড়ে নেওয়া হয়। তাঁদের দুর্বলতা তাঁরা নিজেরা হয়ত বর্তমান সময়ে বুঝতে পারছেন। আমাদেরমতো মানুষদের যত ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ এবং কুখ্যাত করে প্রচার বা অপপ্রচার করা হয় ততই আমাদের মতো মানুষরা, মানুষের হ্যাঁ সাধারণ মানুষের সমর্থন পাই। জনান্তে এটাও বলে রাখা যায় এইসব গোষ্ঠী তাঁদের নিজেদের অজান্তে আমাদের মতো ‘মূর্খ’-দের নামে অপপ্রচার করতে গিয়ে প্রচার করে বসে। এই প্রসঙ্গটির খুব কিছু প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু আমার পরিচিত এক দক্ষিণপন্থী ভদ্রলোক আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনি অরুন্ধতী রায়ের অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন? ভদ্রমহিলা উগ্র বামপন্থী’। আমি জানতে চাইলাম, ‘আরবান নকশাল’? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ তাই’। আমি এর পর আর কথা না এগিয়ে বলেছিলাম, ‘চলুন শুনি ওনার বক্তব্য’। অরুন্ধতী রায়ের বক্তব্য শোনার পরে আমার সঙ্গে অনুষ্ঠান দেখতে যাওয়া ভদ্রলোক মেনে নিলেন যে ‘অরুন্ধতী রায়’ একজন বিদগ্ধ লেখিকা এবং প্রতিবাদী সমাজকর্মী।                   
 সাম্প্রতিককালে ভারতের বুকারজয়ী ইংরেজি লেখিকা সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত ঞ্জান ছিল বাংলা এবং ইংরেজি দৈনিকের সংবাদের উপর। কিন্তু ১০ নভেম্বর তাঁর সঙ্গে প্রায় পৌনে দুঘণ্টা কাটানোর পর মনে হল প্রকৃত ঞ্জানী এবং সাহিত্যঋদ্ধ, শিল্পের শৈলী, সৃষ্টির উন্মাদনা যে যে লেখকের, বুদ্ধিজীবীর আছে তিনি আর যাই হোক নিজেকে ফাঁকি দিতে পারবেন বলে মনে হয় না। ব্যক্তি সচেতন এবং সমাজ সচেতন হতে বাধ্য। ‘দ্য ক্যালকাটা ক্লাব’ এবং ‘কলাম ক্লাব’ মতভেদে ‘কলম ক্লাব’ যৌথ উদ্যোগে ১০ নভেম্বর ক্যালকাটা ক্লাবে আয়োজন করেছিল মুক্তমনা লেখিকা অরুন্ধতি রায় (‘Arundhati Roy UNPLUGGED’)। আমন্ত্রণপত্রে ইংরেজিতে আরও লেখা ছিল, ‘The acclaimed of The God of Small Things and The Ministry of Utmost Happiness will be in conversation with Sandip Roy.’ এই অনুষ্ঠানে আমার আমন্ত্রণ পাওয়ার কথা ছিল না। কারণ ভিন্নতর এবং বিভিন্নতর। হঠাত আমার সঙ্গের বন্ধুর মাধ্যমে অনুষ্ঠানের বিষয়ে জানতে পারি। এবং আমন্ত্রণপত্র ‘গেমপ্ল্যান’ থেকে নিজের পরিচয় দিয়ে সংগ্রহ করি। আমার মনে ছিল না যে, ‘ক্যালকাটা ক্লাবে ভারতের জাতীয় পোশাক ‘পায়জামা, পাঞ্জাবী’ এবং  ‘ ‘জওহর কোর্ট’ পরে যাওয়া যাবে না। আমি অবশ্য সেদিন ওই তিনটি পোশাক পরেই গিয়েছিলাম। আমাকে কেউ আটকায়নি। কোনওরকম বাড়তি প্রশ্নও করেননি। কিছুটা কৌতূহল হয়ত ছিল। পোশাকের আদিখ্যেতায়। কারণ আধুনিক কলকাতার সাহেব-বিবিদের মাঝে গোলাম হয়ে ছিলাম।
আপনারা বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না। এদিন সত্যি সত্যি হুতোম এসেছিল। মুহূর্তের জন্য। মঞ্চের পিছনের দিকে ‘ডিসপ্লে বোর্ড’- এর উপরে এসে বসেছিল। আমাকে ঈশারায় বলল, ‘তুই এখানে কী করছিস?’ আমি বললাম, ‘বক্তব্য শুনতে এসেছি।’
হুতোম বলল, ‘’এইসব ‘সাহেব-বিবিদে’-র মাঝে তোকে গোলামের মতো দেখাচ্ছে। তুই ইংরেজি বই পড়তে জানিস না। এই লেখিকার একটাও বই পড়িসনি। সাহেবি আদব-কায়দা জানিস না। ‘বাপুরাম-সাপুড়ে’ হয়ে থেকে গেলি। আলকাপ-পঞ্চরসের ‘পাঁচু’ হয়ে থেকে গেলি।‘’ আমি আর উত্তর দেওয়া ঠিক হবে না বুঝে চুপ করে থাকলাম। হুতোম লেখিকা অরুন্ধতীর মাথার উপর চক্কর খেয়ে একটা গাছের ডালে গিয়ে বসে পড়ল। হয়ত ওর অনুষ্ঠান শোনার আগ্রহ আছে। গাছটা কি শিমূল গাছ ছিল? পড়ন্ত সূর্যের আলোয় হাল্কা লালছে রঙের লম্বা লম্বা ফুলের পাঁপড়ি দেখতে পেলাম।                   
জীবনের শতবর্ষ পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে ১ নভেম্বর, ১৯৯৭ সালে একটি প্রথম সারির জনপ্রিয় সাপ্তাহিক পত্রিকায়  শ্রী নীরদচন্দ্র চৌধুরী লিখেছিলেন, ‘’............এই উপলক্ষে বিশেষ উপরোধে লিখিতেছি, কিন্তু কী লিখিব ভাবিয়া পাইতেছি না। আমার মনের ভাব কী? এমন কি, স্থির বুঝিতে পারিতেছি না। তবে ইংরেজি ১৯৪৭ সালের ৫-৬ মে তারিখে কী ধারণার বশে আমার আত্মজীবনী (যাহা The autobiography of an Unknown Indian এই নামে ১৯৫১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তারিখে Macmillan কতৃক প্রকাশিত হইয়াছিল) লিখিতে আরম্ভ করি তাহার কথা বলি।‘’
‘আত্মঘাতী বাঙালি’ নীরদচন্দ্র চৌধুরীর প্রথম আত্মজীবনী প্রকাশ হয়েছিল ৫৪ বছর বয়সে। অরুন্ধতী রায়ের প্রথম আত্মজীবনী ‘The God of Small Things’ (Random House) ১৯৯৭ সালে ৪১ বছর বয়সে প্রকাশ হয়। তিনি তাঁর মধ্য যৌবনে এই উপন্যাস লেখেন। এই উপন্যাস ১৯৯৭ সালে ম্যান বুকার পুরষ্কার পায় ‘ফিকশান’ বিভাগে। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সমালোচকদের ভাষায় অরুন্ধতীর প্রথম উপন্যাস The God of Small Things একজন অপরিচিত ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যের লেখকের সব থেকে বেশি বিক্রি হওয়া বই। তাঁর প্রথম উপন্যাস The God of Small Things বিক্রি হয়েছে ছয় মিলিয়ন কপি। অনুবাদ হয়েছে চল্লিশটি ভাষায়। সমালোচকদের ভাষায় অরুন্ধতী রায় ভারতীয় সমাজের তথাকথিত মূল্যবোধের বিরোধী এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ‘India’s most anti National writer’. তাঁর লেখায় সামন্ত ভারতের ছবি, জাতপাতের ছবি, সাম্প্রদায়িক ভারতের ছবি উঠে আসে। ২০১০ সালে অরুন্ধতী রায়ের নামে ‘রাজদ্রোহ’- এর মামলা হয়। কারণ তিনি সে সময় বলেছিলেন, ‘কাশ্মীর ভারতের অংশ নয়’। যদিও পরে তিনি আত্মরক্ষার্থে বলেন, ‘’আমি কাশ্মীরের নির্যাতিত মানুষের কথা ভেবে বলেছিলাম। রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের উপর যে ধরণের চাপ তৈরি করতে চাইছে তার প্রতিবাদ করতে চেয়েছি।‘’   
১০ নভেম্বর শীত শুরুর সন্ধ্যায় কলকাতা শহরের সব থেকে পুরনো অভিজাত পাঁচতারা ক্লাবের খোলা মাঠে অনুষ্ঠান হচ্ছিল। কোনওরকম দ্বিধাদ্বন্দ না রেখেই বলা যায় ইংরেজি সাহিত্য পড়া অভিজাত পাঠকমণ্ডলীর সামনে অরুন্ধতী বলতে শুরু করলেন। প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন লেখক এবং সেদিনের সঞ্চালক সন্দীপ রায়। লেখিকা তাঁর বই The God of Small Things থেকে একটি পরিচ্ছেদ আমাদের জন্য পড়ে শোনালেন। তিনি লিখেছেন, বাংলায় তর্জমা করলে যেটা হয়, কিছুক্ষণ আগে সূর্য অস্তমিত হয়েছে কিন্তু সূর্যের আলো এখনও থেকে গেছে। এই বর্ণনা শোনার পর আমাদের আর অপেক্ষা করতে হয় না। লেখিকা তাঁর স্বমহিমায় নিজস্ব স্বকীয়তায় হাজির হলেন। সঞ্চালক সন্দীপ রায়ের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, ‘’হ্যাঁ ভারতে জাতপাত একটা বড় বিষয়। আমি কেরলে বড় হয়েছি। এই প্রগতিশীল রাজ্যে আজও ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র রয়ে গেছে। ‘টাচেবল’- মানুষের দল ‘আনটাচেবল’ সমাজ ব্যবস্থা কায়েম রেখেছে। আমি শুধু কেরলের কথা বলছি না। উত্তর বিশ্বায়ন ভারতে এই সমস্যা বর্তমান ‘সিস্টেম’-এও খুব জটিল।‘’
সন্দীপ রায় জানতে চেয়েছিলেন বামপন্থীদের বিষয়ে। অরুন্ধতী বললেন, ‘’কোনটা বামপন্থা বলবেন? কোনটা সামাজিক গণতন্ত্র বলবেন? কেরল রাজ্যে গণতন্ত্র মেনেই পাঁচ বছর অন্তর সরকার পরিবর্তন হয়। আবার দেখুন পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর বামপন্থীরা সরকার চালাল। এটা কী করে সম্ভব?’’ হুতোম গাছ থেকে আমাকে বলল, ‘শুনলি কিন্তু কিছু লিখবি না। লিখলে আবার ‘ভাঁড়’ শুনতে হবে। এই রাজ্যে বামপন্থীদের সমালোচনা করিস না। ওরা  ‘হুকোমুখো হ্যাংলা’ পেটুক, হাকিম কবরেজ বলবে। তুই কোনও পার্টিতে গেলে তোর খাওয়ার ছবি তুলে রাখে যে ‘বাবু মশায়’-রা।’ হুতোমের কথা শুনলাম, কিন্তু উত্তর দিলাম না।    
আলোচ্য লেখিকা মনে করেন ভারতের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতর পরিবর্তন শুরু হয়েছে ১৯৯৮ সালে। পোখরানে পরমাণু বোমা পরীক্ষার পর। তিনি মনে করেন ভারত এর পরেই আরও জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠছে। অনেকটা সংগ্রামপ্রিয় দেশপ্রেমিকেরমতো। তিনি সেই সময়ের একটি লেখায় লেখেন, ‘What wonderful, willing, well-behaved, gullible subjects.’  তিনি তাঁর ‘The End of Imagination’ নিবন্ধে আরও লেখেন, ‘’We have turned out to be.’’
ভারতের দক্ষিণপশ্চিম রাজ্য কেরালাকে তাঁর লেখা আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসের বিচরণভূমি করেছেন আলোচ্য লেখিকা। কারণ তিনি বড় হয়েছেন কেরালার সিরিয়ান-খ্রীস্টান সম্প্রদায় পরিবারে। তাঁর আসল নাম সুজানা অরুন্ধতী রায়। এই সম্প্রদায় কেরালার মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ। একটি সাক্ষাৎকারে অরুন্ধুতী বলেছেন, ‘’Kerala is home to four of the world’s great religious: Hinduism, Islam. Christianity, and Marxism.’’ 
 তাঁর সাক্ষর আমরা পাই এদিনের উপন্যাসের আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে। নিজের স্বাক্ষর নিজের ভাষায় তিনি উল্লেখ করেন। নারী বিষয়ক উপন্যাস, গল্প, ছোট গল্প রবীন্দ্রনাথ সহ একাধিক বাংলা এবং ভারতীয় ভাষার মরমী লেখকদের লেখায় পাওয়া যায়। আলোড়নকারী গ্রন্থ ফরাসি সাহিত্যিক সিমোন দ্য বোভোয়ারের ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’। ভারতীয় লেখিকা অরিন্ধতী রায় নিজের লেখা উপন্যাসে শুধুমাত্র ‘নারী’ শব্দে সীমাবদ্ধ থাকেননি। কাশ্মীরের প্রসঙ্গ বারে বারে ঘুরে ফিরে আসছিল একটি মুসলিম মহিলার চরিত্রকে কেন্দ্র করে। ইংরেজিতে বলছিলেন। অত্যন্ত সহজ এবং সাবলীলভাবে। তাঁর দ্বিতীয় বই ‘The Ministry of Utmost Happiness’ উপন্যাস, প্রথম উপন্যাস The God of Small Things  লেখার ২০ বছরে পরে এই বই লেখেন অরুন্ধতী। এই উপন্যাস প্রসঙ্গে পুস্তক সমালোচকরা বলছেন বিপ্লব দাশগুপ্ত নামে একজন বুদ্ধিদীপ্ত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভারতীয় আমলার চরিত্র আছে। তিনি কোন একটি প্রসঙ্গে বলছেন, ‘I feel a rush of anger’। আর এখান থেকেই এদিনের মতবিনিময় সভায় প্রশ্ন ছুটে আস্তে থাকল কলকাতার অভিজাত ক্লাবের খোলা আকাশের নীচের প্যাভিলিয়নের মাঠ থেকে। ‘মি-টু’ আন্দোলন থেকে ‘শবরীমালা’। বিভিন্ন বিষয়ে। ভারতে ‘মি-টু’ আন্দোলনকে অরুন্ধতী মনে করেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে অবশ্যই ‘বিপ্লব’ নয়। আন্দোলনের প্রয়োজন ছিল। ছদ্মবেশী পিতৃতন্ত্রের মুখোশ খুলে পড়ছে।
শবরীমালা বিষয়ে তাঁর অভিমত ভারতে লোকসভা ভোটের আগে বিষয়টাকে চাগিয়ে তোলা হচ্ছে। ১৯৫০ সালে যে বিষয়টা ছিল আদালতের রায়ের পরে ভারতীয় গণতন্ত্রে এই বিষয়টা নিয়ে আবার নতুন করে হৈ চৈ করার কি থাকতে পারে?
তিনি যত না লেখেন তার থেকে অনেক বেশি আলোচনায় থাকেন রাজনৈতিক সমাজকর্মী হিসেবে। মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট রাজ্যে তার সামাজিক কাজের ক্ষেত্র। নাগরিক সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েই তিনি কাজ করতে চান। চলতি বছরের নভেম্বর মাসের কলকাতা সফরে অরুন্ধতী এদিনের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়  উল্লেখ করেছেন। বিঞ্জান এবং তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সারা বিশ্বে মানবসম্পদ উদ্বৃত্ত হয়ে পড়ছে। এই উদ্বৃত্ত মানবসম্পদ ভবিষ্যতে সারা বিশ্বে জটিল সমস্যা ডেকে আনতে পারে। যেটাতে আমাদের এখন থেকেই সতর্ক হতে হবে। বুকার পুরষ্কারজয়ী লেখিকা ২০১৫ সালে ভারতে অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদে নিজের ‘জাতীয় পুরস্কার’ ফিরিয়ে দিয়েছেন। ১০ নভেম্বর কলকাতায় একগুছ কর্মসূচী ছিল তাঁর। সংবাদ সংস্থা সূত্রে খবর হাওড়ার টিকিয়া পাড়ার ‘সামারিটান হেল্প মিশন’- এর ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটান তিনি এবং বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন। বালিগঞ্জের ‘হোপ স্কুল’-এ অনুন্নতশ্রেণীভুক্ত ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গেও তিনি সময় কাটান। অরুন্ধতী হাওড়া এবং বালিগঞ্জের দুটি অনুষ্ঠানের পরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘’No one ever said a particular writer was a social activist because that’s what writers did. They used to write about the society in which they lived. Writers were jailed, writers were killed.’’                                               
 

Friday, 9 November 2018

প্যারিসে ‘মেকং’ নদী দেখে এলাম




দীপেন্দু চৌধুরী 

হেমন্ত ফুরায়ে গেছে পৃথিবীর ভাঁড়ারের থেকে
এরকম অনেক হেমন্ত ফুরায়েছে
                               সময়ের কুয়াশায়,
মাঠের ফসলগুলো বারবার ঘরে
তোলা হতে গিয়ে তবু সমুদ্রের পারের বন্দরে
পরিচ্ছন্নভাবে চলে গেছে।
মৃত্তিকার ঐ দিকে আকাশের মুখোমুখি যেন
                                 শাদা মেঘের প্রতিভা;
(নাবিকী, জীবনানন্দ দাশ)
কবি কবিতাটি লিখেছিলেন ১৩৫০ সালের মন্বন্তরের পরে। ইতিহাস এইভাবে উঠে আসে গানে কবিতায়, চলচ্চিত্রে, চিত্রশিল্পে। আজ থেকে কয়েক হাজার বছে আগে গুহাচিত্রে আমরা মানুষের, পশুপাখির জীবন, সমাজের ছবি দেখেছি। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্ব বিভিন্নভাবে সাহিত্যিক, লেখক, নাট্যকার লিখে যান। সামাজিক প্রেক্ষাপটকে সাজিয়ে গুছিয়ে যে লেখক লিখছেন তিনি নিজের সময়ে তুলে আনেন। যে-কালে লেখক অতীতের সামাজিক হোক বা ঐতিহসিক হোক প্রেক্ষাপট নিয়ে লিখছেন, সেই সময়ের অনুষঙ্গকে আমাদের সামনে ছবির মতো করে  তুলে ধরার দায়িত্বও তিনি নিজে নিয়ে থাকেন। দূরের নীল আকাশে পাখিদের সরল রেখার মতো ‘শৃঙ্খল’ থাকে, বন্ধন থাকে সেইসব লেখায়। জীবনানন্দের কবিতার উধৃতি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সময়ের কথা বলতে চাওয়া হয়েছে। প্রাসঙ্গিক অথবা অপ্রাসঙ্গিক সেটা পাঠক নিজের বিচারে দায়িত্ব নেবেন।      
ভারতে বাংলা থিয়েটারে ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত এই দশ বছরের সময় কালকে গিরিশ যুগ থেকে শিশির যুগের উত্তরণ বলা হয়ে থাকে। ভারতীয় থিয়েটার পঞ্চরস, খেঁউড়, পালাগান, লোকায়ত পালা, যাত্রাপালা প্রভৃতি পর্ব পার হয়ে এসে বর্তমান সময় বা রবীন্দ্রনাথ, ‘ব্রেখট’, শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, বাদল সরকার পর্ব। তারপরে বর্তমান সময়ে এসে পড়ল। আরও আধুনিক হয়ে নতুন যুগের উত্তরণ। ‘টাচ’ আছে ‘গণনাট্য সঙ্ঘ’ সমাজের কুশীলবদের আন্তরিক প্রয়াসের। কি সমাপতন দেখুন ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৫০ সাল বাংলা থিয়েটারের ‘চলমান’ যুগ। আবার ওই একই সময়ে আমরা ফ্রান্সে পাচ্ছি মার্গারেট দুরাস (Marguerite Duras) কে। তিনি লিখছেন ‘’Les Impudents’’ উপন্যাস। ১৯৪৩ সালে লিখলেন সেই কালজয়ী উপন্যাস।
আমি নিজে এই লেখিকা সম্পর্কে খুব বেশি জানি না। আগ্রহ তৈরি হল সম্প্রতি কলকাতার আলিয়সঁ ফ্রঁসেজ আয়োজন করেছিল এক ঘণ্টার একটি একক অভিনয়ের নাটকের। একুশ শতাব্দীর ফ্রান্সের অন্যতম নাট্য ব্যক্তিত্ব মাউদ আন্দ্রিয়াক্স (Maud Andrieux) নাটকটির মঞ্চায়ন করলেন সাফল্যের সঙ্গে। ৫ নভেম্বর হেমন্তের শেষ সন্ধ্যায় আমরা নাটক দেখলাম। আন্দ্রিয়াক্স নিজেও নারী। সাদা পেঁজা তুলোর মেঘেদের মতো সৌন্দর্য তাঁর। তাঁর একক অভিনয়ে তিনি আমাদের চিনের ‘মেকং’ নদীর উপত্যকায় নিয়ে গেলেন। তাই তিনিই আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন মার্গারেট দুরাসকে। তাঁর লেখা L’amant উপন্যাসকে। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসটি ফরাসি সাহিত্যে মার্গারেটকে জনপ্রিয়তা এনে দেয়। পাশাপাশি তিনি ধ্রুপদী সাহিত্যের ঘরানায় নিজের স্থান করে নিতে সক্ষম হন। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ প্রেস বিবৃতিতে লিখছে,
‘L’Amant (the Lover) is an autobiographical novel by Marguerite Duras, published in 1984. In her short and powerful novel, which won the Prix Goncourt in France in 1984, Duras recounts the largely autobiographical story of her family’s struggles in Southeast Asia.’   
এই উপন্যাসের মূল ভাষান্তর করেছেন বারবারা ব্রে। বারবারা নাম দিয়েছিলেন ‘The Lover’। অনুবাদ করেছিলেন লেঘ হাফ্রে (Leigh Hafrey)। তিনি নামকরণ করেন ‘The North China Lover’ । সেই অনুবাদকে ভিত্তি করে একক নাটকের প্রয়োজনে লিখিত সাহিত্য গুণসমৃদ্ধ নাট্যরূপ দিলেন ফ্রান্সের বর্তমান সময়ের আলোচ্য নাট্যব্যক্তিত্ব মাউদ আন্দ্রিয়াক্স। তাঁর অনুভবি কলমে উঠে এল নতুন ছন্দে শীতের শুরুর চেরি পাতার রঙের বহু স্বরের একক আলোর মূর্ছনায়। আন্দ্রিয়াক্স নাম দিলেন ‘The Lover and The North China’ । তিনি ৫ নভেম্বর সন্ধ্যেয় একঘণ্টার নাটকে অভিনয় করার আগে সকালে আমাদের সঙ্গে এক ঘণ্টার আডায় বসেছিলেন ‘মিট দ্য আর্টিস্ট’ অনুষ্ঠানে। সকালের আড্ডায় বারে বারে ফিরে আসছিলেন ফ্রান্সের উনবিংশ শতাব্দীর জনপ্রিয় লেখিকা মার্গারেটের বিষয়। আন্দ্রিয়াক্স নিজের সম্পর্কে যতটা না বলছিলেন তার থেকে অনেক বেশি তিনি বলেছেন সাহিত্যিক মার্গারেট বিষয়ে। মুক্তোরমতো দাঁত। অপরূপ সৌন্দর্যের ব্যক্তিত্ব আন্দ্রিয়াক্স। ফরাসি সভ্যতার সংস্কৃতির ধারা মেনে বিনয় আর সৌজন্যের মিশ্রণে আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিলেন তিনি সাবলিলভাবে। আমার আগ্রহ তৈরি হল সাহিত্যিক মার্গারেট বিষয়ে।
‘দ্য নিউ ইয়র্ক’ (The New York) পত্রিকায় ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসের ১০ তারিখ র‍্যাচেল কুশনার মার্গারেটকে নিয়ে ‘’A Man and a Woman, say what you like, They’re Different’’ : On Marguerite Duras শিরোনামে একটি নিবন্ধ লেখেন। সেই লেখাটির কিছুটা অংশ এখানে উধৃতি হিসেবে তুলে দিলাম।                      
‘’Marguerite wasn’t always Duras. She was born Donnadieu, but with the publication of her first novel, “Les Impudents,” in 1943, she went from Donnadieu to Duras and stayed that way. She chose, as her alias, the village of her father’s origins, distancing herself from her family, and binding herself to the emanations of that place name, which is pronounced with a regionally southern French preference for a sibilant “S.” The village of Duras is in Lot-et-Garonne, an area south of the Dordogne and just north of Gascony. The language of Gascon, from which this practice of a spoken “S” derives, is not considered chic. More educated French people not from the region might be tempted to opt for a silent “S” with a proper name. In English, one hears a lot of “dur-ah”—especially from Francophiles. Duras herself said “dur-asss,” and that’s the correct, if unrefined, way to say it.’’
৫ নভেম্বর সন্ধ্যেয় আন্দ্রিয়াক্স আমাদের রোমান্টিক ভাষায় হাঁটতে বললেন। তারপর তাঁর একক উচ্চারণে আমরা উত্তর চিনের ‘মেকং’ নদীর উপত্যকায় পৌঁছে গেলাম। অথবা বলা ভালো উত্তর চিনের ‘মেকং’ নদীর সভ্যতায় পৌঁছে গেলাম। আলিয়াসঁ ফ্রঁসেজ সভাঘরে মাত্র ৭০- ৮০ জন দর্শক আমরা। নাটকের সময়ে একটি ঘণ্টা বিদগ্ধ দর্শকদের মরমী উপস্থিততে পিন পড়ার আওয়াজ ছিল না। নাটকের মঞ্চ বলতে সভাঘরে একটা বেতের চেয়ার। একটি চিনের নাগরিক বা বাসিন্দাদের ঘরে যে মডেলের বাতি বা আলোক ঝুড়ি থাকে। সেই বাতি (আলোক ঝুড়ি) ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবহ সঙ্গীতে আমরা শুনতে পাচ্ছিলাম ‘চিনা অপেরা’-র সুর। আন্দ্রিয়াক্স মৃদু স্বরে  ইউরোপীয় ঘরানার নাটকের ব্যকরণ মেনে তিনি তাঁর নিজের অনুভবি কলমে লেখা সংলাপ আমাদের সামনে উচ্চারণ করলেন। আমরা মোহিত হয়ে বসে থাকলাম। তাঁর রুপে, গুণে, উচ্চারণে, দৈহিক আন্দোলনে, সামগ্রিক ঐশ্বর্যে একটি প্রেমের গল্পের প্রেক্ষাপটে উত্তর চিনের তৎকালীন আর্থ-সামাজিক টানাপড়েন জানলাম। ২০০৪ সাল থেকে সাহিত্যিক এবং সিনেমা পরিচালক মার্গারেটের উপন্যাসের ভিত্তিতে নাট্যব্যক্তিত্ব আন্দ্রিয়াক্স ফ্রান্সে অভিনয় করছেন। আন্দ্রিয়াক্সের ‘সি ওয়াল’ (Sea Wall, title originally as Un barrage contre le pacifique) এবং ‘দ্য ভাইস কনসাল’ (The Vice-Consul) নাটক দুটিও ফ্রান্সে সমান জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এইসব তিনি শুরু করেন সি ওয়াল পড়ার পরে। যখন তিনি এই গল্পের সাহিত্যিক এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট খুঁজে পান। আমাদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,      
“It was a great autobiographical account of injustice and hope in yesteryear French Indochina. 
Duras first wrote the first novel in 1984 and won the Prix Goncourt, a literary prize that made her internationally known. This novel was later adapted on the big screen by Jean-Jacques Annaud. Duras, however, rewrote the same story after the release of the film because she was dissatisfied with the film adaptation. Therefore, in the second novel, she elaborates the elements of staging and light. So I worked on these two novels to make a combined show of one hour.” 
তিনি আরও বলেন, ‘’৩৫০ পাতার একটি সম্পূর্ণ উপন্যাসকে একঘণ্টার নাটকে নিয়ে আসার কাজটা যথেষ্ট পরিশ্রমসাধ্য কাজ। তবু আমি চেষ্টা করেছি। মানুষের আবেগ খুজতে চাই নাটকে। ফরাসি সংস্কৃতির বরফের টুকরোর মতো জলতরঙ্গ খুঁজি। জলের প্রবাহের মতো করে। নাটককে আমি দেখি জীবনের ছন্দের বিষয় করে।‘’  ফরাসি দেশের মননের ধারাবাহিকতায় একটি প্রেমের গল্প তিনি শুনিয়েছেন। একজন ফরাসি নারী এবং চিনা-ভিয়েতনামী সম্প্রদায়ের যুবকের প্রেমের গল্পের প্রসঙ্গ এসেছে তাঁর নাটকে। কলোনি আছে এমন এক বসতি চিনা সমাজের প্রেমের গল্প তাঁর নাটকে উঠে এসেছে। যে কোনও দেশের বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এই লেখা। আমাদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,           
“Of course, the whole book is not there. But I always remain extremely faithful to her writing and narrative, The racism of the colonial era and the difference in social origins and skin colour make their destiny impossible. And yet both of them remember their whole life for the extraordinary love they shared,”
তিনি বলেন,  ‘’...... ‘L’Mant (The Lover) উপন্যাসের টেক্সট ভীষণ কঠিন। মার্গারেটের নিজের জীবনও ঘটনা বহুল। তাঁর কথায়, “Besides being engaged in the Second World War, she defended the rights of women in French society all her life. This text speaks about her childhood, family and her emotions — what made her a free and committed woman,”
প্যারিস শহরে ‘মেকং’ নদী দেখে ফিরলাম। আমার একান্ত প্রশ্ন ছিল  Who am I? This is the question of France Renaissance. I would like to ask you that what is your thinking regarding Impressionist movement. 12 years from 1874 to 1886, it was golden era of the creative group of the artist.  উত্তরে আন্দ্রিয়াক্স বলেন, ‘’ ওই গোষ্ঠীর তুলিতে উদার, আধুনিক মননের জীবনধারা যেমন প্রতিফলিত হয়েছে। পাশাপাশি নিজেদের প্রতিবাদকেও ক্যানভাসে তুলে ধরেছিলেন একুশ শতাব্দীর ওই শিল্পীগোষ্ঠী। আমাদের দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল এই শিল্পী গোষ্ঠীর আন্দোলন। এই আন্দোলনের প্রভাব আমাদের মধ্যেও পড়েছে।‘’
থিয়েটার চলেছিল একটা বন্ধ ঘরের মায়াবি আলোয়। চিন-ভিয়েতনামের কলোনি সভ্যতার সমাজের আয়নায় যে ছবি শুনলাম। বা যে ছবি পড়লাম তারপর কি বলব? সভাঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় মনে মনে উচ্চারণ করলাম প্যারিস শহরে মেকং নদী দেখে ফিরলাম।