Wednesday, 17 October 2018

আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে পণ্য বসতি শুল্ক



দীপেন্দু চৌধুরী
আজও যদি গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে যান তাহলে ‘বিনিময় প্রথা’-এর প্রচলন দেখতে পাবেন। শুধু গ্রাম বাংলা কেন ভারতে তথা ভারতীয় উপমহাদেশ, এশিয়া, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ক্ষেত্র সমীক্ষা করলে ‘পণ্য বিনিময়’ প্রথা অথবা পণ্যের বিনিময়ে মুদ্রা নেওয়ার চল আমরা দেখতে পাব। গ্রাম ভারতে এই সময়ে আরও বেশি নজরে পড়তে পারে। কারণ শরৎ ঋতুর পরেই হেমন্তকাল। হেমন্তকাল থেকে শুরু হবে ফসল কাটা। ধান কাটার মরশুম। চলবে বসন্তকাল পর্যন্ত। শ্রমজীবী মানুষ ধান কেটে যে মুদ্রা বা অর্থ পাবে সেই অর্থ দিয়ে শহরগঞ্জ থেকে সংসারের প্রয়োজনে অন্যান্য যে মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী লাগে সেগুলি অর্থের বিনিময়ে কিনতে অভ্যস্ত। ধান কাটা অথবা ফসল কাটার সময় ক্ষেতমজুররা জমি থেকে কিছু ধান সংগ্রহ করে থাকে। আবার অন্য রকম ব্যবস্থাও দেখা যায় ৫ বিঘা জমির মালিক থেকে ৩০ বিঘার জমির মালিক ক্ষেতমজুরকে তাঁর শ্রম থেকে প্রাপ্য মজুরির পুরোটা টাকায় দিতে চায় না। কিছুটা নগদ অর্থে বাকিটা এক দু’কিলো ধান দিয়ে দেয়। আলোচ্য নিবন্ধের ক্ষেতমজুরটি গ্রামগঞ্জের স্থানীয় মুদির দোকানে সেই ধান দিয়ে সংসারের দৈনন্দিন চাল, আলু, পিঁয়াজ, তেল, লবণ এসব সামগ্রী ক্রয় করে থাকে। এক্ষেত্রে ক্ষেত মজুরটির দু’দুবার তাঁর শ্রমের প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন পদ্ধতির পরিবর্তন এসেছে। মানবসভ্যতায় ‘গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন যাপন’-র উদাহারণ আদিম সমাজেও ছিল আজও আছে। সামাজিক উৎপন্নের উপর নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সামাজিক অধিকার যতদিন আমরা মেনে নিয়েছি, ঠিক ততদিন ওদের নিয়মে বন্টনপ্রথার ব্যপক প্রচলন ছিল। পাশাপাশি শ্রম বণ্টনও গোষ্ঠীর নিয়মে হত। বর্তমানে সেই জায়গা দখল নিয়েছে বিভিন্ন উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন নামক সংগঠন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরাম্পরা মেনেই ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার আরও শক্তিশালী হল। পুঁজির বিকাশের ফলে এই নীতি বা কৌশল বৃহৎ ব্যবসায়ীগোষ্ঠী বিঞ্জান, প্রযুক্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তিকে প্রয়োজনীয় সময়ে প্রত্যুৎপন্ন মেধা তথা মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে শ্রম এবং পুঁজির দ্বন্দকে নিজেদের মত করে ব্যবহার করেছে। বামপন্থী নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে তাত্বিক লড়াইকে সামনে রেখেই ধনতান্ত্রিক বিশ্ব এই কাজে সফল হয়েছে। হয়ত সেই কারণে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। বাস্তবে একথা উল্লেখ করা মানে আমি ‘মানবিক মঞ্চ’ থেকে নেমে আসছি এমন ভেবে নেওয়াটা আরও একটা পদস্খলনের সম্ভাবনা থেকে যায়।             
 প্রাচীন মানব সভ্যতার ‘বিনিময় প্রথা’-এর যে সংস্কৃতি আমরা চিনি সেই সংস্কৃতি আজও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিশ্বের অনুন্নত কিছু দেশে। এবং কিছু উন্নয়নশীল দেশেও। সামন্ত ব্যবস্থার পুরনো সেই আর্থিক কাঠামো বিশ্বায়ন উত্তর বিশ্বে জোড়ালো একটা ধাক্কা দিতে চাইছে। আধুনিক মোড়কে। ২০০৮ সালে আমেরিকার ‘লে-ম্যান ব্রাদার্স’-এর পতনের পরে বিশ্ব অর্থনীতির টাল মাটাল অবস্থা হয়েছিল। ২০০৮ সালের পরে এটা ২০১৮ সাল। বিশ্ব অর্থনীতি ১৯২৯ সালের মহমন্দার পরের অবস্থা যে ভাবে সামলে ছিল দ্বিতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানরা। গত দশ বছরে আমেরিকা, ইউরোপ, ভারত, জাপান এবং চিনের নেতৃত্ব দ্রুত অর্থনীতিতে একটা গতি আনতে পেরেছে এমন দাবি খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদরা করছেন। আবার অনেক অর্থনীতিবিদ উল্টো কথাও বলছেন। বিশ্ব অর্থনীতি এখনও স্থিতিশীল নয়। যদিও সম্প্রতি মার্কিন  প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন তাঁর শিল্পউন্নত দেশ আজও বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতির দেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিগত একশত বছরেরও বেশি সময় ধরে আধুনিক বিশ্বে আধুনিক শিল্প এবং প্রযুক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। বিশ্বের তাবড় অর্থনীতিবিদ, বিঞ্জানী, প্রযুক্তিবিদ, ব্যাবসায়ীদের গোষ্ঠী এই অভিমত প্রকাশ করে এসেছেন। অথচ আমেরিকায় আদৌ শিল্প স্থাপন করা সম্ভব কিনা এই নিয়েই মতভেদ ছিল।        
 পুঁজির বিকাশের জন্য একটা দৃশ্যমান নীতি লাগে। আবার একটা অদৃশ্যমান নীতি প্রবলভাবে অন্তরাল থেকে শিল্প-বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটা সূর্য ওঠার মত সত্য। যে কথা ১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী লৌহ-মানবী বলে খ্যাত মার্গারেট থ্যাচার বলেছিলেন।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘’আমি যে শুধু আর্থিক নীতি পরিবর্তনের সূচনা করেছি এমন নয়। বাস্তবে আমি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের শুরু করেছি। আমরা জানি অর্থনীতির পরিবর্তন দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের হাতিয়ার। আপনি যদি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেন তা হলে আপনি জাতির হৃদয় ও আত্মার দখল নিতে চলেছেন। অর্থনীতি হল প্রকরণ; উদ্দেশ্য হ্রদয় ও আত্মার পরিবর্তন।‘’          
উত্তর বিশ্বায়ন বিশ্বে বাজার অর্থনীতি বা উদার অর্থনীতি বনাম সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতির একটা দ্বন্দ আমরা পরিলক্ষিত করেছি। এরপরেই আমরা পেয়েছিলাম সীমান্তবাণিজ্য নামক এক নতুন পুঁজিবাদী অর্থনীতি। চিনের প্রেসিডেন্ট শি চিনফিং এই ব্যবস্থাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে একটা মোক্ষম চাল চেলেছেন। ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ (ওবর) প্রকল্প। ২০১৩ সাল থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পে ৩ হাজার কিলোমিটার লম্বা সড়ক পাক অধিকৃত কাশ্মীরের উপর দিয়ে যাবে। ২০১৭ সালে চিনে অনুষ্ঠিত এই প্রকল্পের সম্মেলন ভারত বয়কট করেছিল। কিন্তু সেই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল ৩০টিরও বেশি দেশ। সংবাদ মাধ্যম সূত্রে খবর পাক অধিকৃত কাশ্মীরের উপর দিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডর তৈরির আগেই চিনের কতৃপক্ষ রাষ্ট্রপুঞ্জকে জানায়। রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে চিনের সরকার সেখানকার সামাজিক এবং পরিবেশগত মূল্যায়ন নিয়ে একটি রিপোর্ট চেয়েছিল। ২০১৭ সালের মে মাসে সংবাদ মাধ্যম সূত্রে জানা যায়, রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘ইকনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া প্যাসিফিক’ (এসক্যাপ) ৯৪ পাতার যে রিপোর্ট দিয়েছে, সেটা চিনের পক্ষে যায়নি। রাষ্ট্রপুঞ্জের ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘’কাশ্মীর নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। যেহেতু এই করিডর ওই অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, ফলে ভারতে ভূ- রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হবে। ফলে আরও বেশি রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।‘’
চিনের এই প্রকল্পের পাল্টা হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্প চালু করেছেন। কংগ্রেস সহ বিরোধী দলের বক্তব্য দেশে বেকারির সংখ্যা দেখে বলা যায় এনডিএ সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এই প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে।
ভারতে ডোকলাম নিয়ে উত্তেজনার কথা আমরা জানি। বোঝাই যায় চিনের ওবর প্রকল্পের রোডম্যাপ মেনেই ভারতের সীমান্ত ‘ডোকলাম’ চিনের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাথুলাপাশের পরে ডোকলাম। ভারত-ভূটান-চিনের ত্রিদেশীয় সীমান্ত এলাকা ‘ডোকলাম’-এ দু’মাস মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল চিন এবং ভারতের সেনা। ভারতের অভিযোগ ছিল ত্রিদেশীয় সীমান্ত এলাকাকে নিজেদের বলে দাবি করে রাস্তা তৈরির কাজ শুরু করেছিল চিনা সেনা। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। সেই সময় টুইটারে বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের কড়া সমালোচনা করেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধি। তিনি বলেন, ‘’সুষমাজির মতো এক জন ভদ্রমহিলা যে কী ভাবে চিনা শক্তির কাছে মাথা নত করে মুখে বকলস আটকে রয়েছেন, তা দেখে অবাক হতে হয়। নেতার আত্মসমর্পণ করার অর্থ, সীমান্তে বীর জওয়ানদের ঠকানো।‘’
চলতি বছরের লোকসভার বর্ষাকালীন অধিবেশনে তৃণমূলের সাংসদ সুগত বসুর একটি প্রশ্নের উত্তরে ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছিলেন, ‘’.........‘পরিণত কূটনীতি’-র মাধ্যমে ডোকলাম সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা গিয়েছে।‘’
পুঁজির বিকাশের জন্য একটা দৃশ্যমান নীতি লাগে। আবার একটা অদৃশ্যমান নীতি প্রবলভাবে অন্তরাল থেকে শিল্প-বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে। উল্লেখিত লাইন দু’টি আবার ব্যবহার করলাম। দৃশ্যমান কূটনীতি কী ছিল? আমেরিকা তথা বিশ্বের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ছিল আগামীতে ‘পরমাণু যুদ্ধ’ হতে পারে এই আশঙ্কায়। উত্তর কোরিয়ার একটার পর পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষার কারণে আমরা দুশ্চিন্তায় ছিলাম। আমেরিকা এবং চিন দু’ই বৃহৎ শক্তির টানটান স্নায়ুযুদ্ধ মার্কিন নাগরিকদের সঙ্গে সঙ্গে তামাম দুনিয়ার মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। চলতি বছরের ১২ জুন উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং উন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছে। সেই চুক্তির অন্যতম শর্ত হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। বিনিময়ে উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করবে আমেরিকা। এই ঘটনা দৃশ্যমান ছিল আমাদের কাছে।
কিন্তু অদৃশ্যমান কূটনীতি আমরা প্রথম পেলাম, ৮ জুলাই। সংবাদ সংস্থা সূত্রে খবর, ৮ জুলাই মার্কিন বিদেশ সচিব মাইক পম্পেয়ো বলেন, ‘’আমাদের অনুরোধ যদি কারও গ্যাংস্টার সুলভ মনে হয়ে থাকে, তাহলে বলব গোটা বিশ্বই গ্যাংস্টার’। কারণ রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ কিন্তু অনেক আগে থেকেই উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্র ছাড়ার কথা বলে আসছে।‘’ কিছুদিন আগে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের দাবিতে আমেরিকা ‘গ্যাংস্টারের মতো’ আচরণ করছে বলে সুর চড়িয়েছিল পিয়ং ইয়ং। সেই কথা মাথায় রেখে মার্কিন বিদেশ সচিব এ কথা বলেন। মার্কিন বিদেশ সচিবের ৮ জুলাইয়ের এই প্রতিক্রিয়ার পরে ৯ জুলাই কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি প্রথম সারির বাংলা দৈনিক লিখছে, ‘’ব্যর্থ হয়েছে যাবতীয় আলোচনা। বহু দিন ধরে চলতে থাকা হুমকি পালটা হুমকি আর দোষারোপের পরে ...... শুল্ক যুদ্ধের ময়দানে পুরোদস্তুর নেমে পড়েছে আমেরিকা এবং চিন। ৩, ৪০০ কোটি ডলারের চিনা পণ্যে ২৫% শুল্ক চাপিয়েছে আমেরিকা আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাঘাতের কথা জানিয়ে দিয়েছে বেজিং।‘’ আমরা চিনের পত্রিকায় এই প্রতিক্রিয়া লক্ষ করলাম। উল্লেখ করা যাক। অনলাইন পোর্টাল  CAIXIN এ ৮ জুন ‘Congress Can Do Little To Derail Trump’s ZTE Decision, Observers Say’ শিরোনামে দু’জন প্রতিবেদক Zhang Qi, Jiang Mengjie and Jason Tan যৌথভাবে লিখছেন, ‘’The U.S. Congress can do little to stop President Donald Trump’s decision to relax penalties on ZTE Corp., China’s second-largest telecommunication-equipment maker, industry watchers said.
The U.S. Commerce Department said Thursday that ZTE had agreed to pay a $1 billion fine, replace its board and senior management, and allow the U.S. to send in a compliance team. This is in exchange for the lifting of a seven-year ban imposed in April that prevents the company from buying American products, which sent a shock wave through the Chinese technology sector and immediately brought ZTE’s major operations to a halt.’’

অনলাইন এই যুদ্ধ চলাকালীন ৮ জুলাই মুখ খোলেন আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডারের (আইএমএফ) কর্ণধার ক্রিস্টিন ল্যাগার্দ। ইউরোপকে অত্যন্ত কৌশলী তকমা দিয়ে ল্যাগার্দে বলেন, ‘’ইউরোপীয়রা একসঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে দাঁড়ালে বৃহৎ এক শক্তি। একজোটে তাদের তোলা দাবিকে গুরুত্ব দিতে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইউরোপ বহু দেশের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।‘’
ওই একই দিনে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের তরফে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী ব্রুনো লে মেয়ার বলেন, ‘’কাল যদি গাড়ির মতো ক্ষেত্রে শুল্ক বাড়ানো হয়, তবে পালটা হিসেবে গোটা ইউরোপ জোট বেঁধে দাঁড়াবে এবং অত্যন্ত জোরালো ভাবে তার জবাব দেবে।‘’
শুল্ক যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যে চিন থেকে ব্যবসা গোটাতে শুরু করছে বিভিন্ন দেশের বহুজাতিক সংস্থা। ২৪ সেপ্টেম্বর নিউজ পোর্টাল ‘দ্য ডেইলি স্টার’ লিখছে  
‘’The imposition of US tax on Chinese goods has led to new problems. In that country, investors are taking away their business from other Asian companies in other countries.
A report by Reuters news agency said that other Asian countries including Japan and others were withdrawing their investments from China. As a result, starting from memory chips to heavy machinery manufacturing factories, other countries are moving away from China. The impact of US taxation on Chinese goods is behind this.
Japan's Mitsubishi Electronic, Toshiba Machine Company and Komatsu and South Korean SN Hynex have started leaving China since July. Also, Taiwan's computer construction company Compal Electronics and South Korean LG Electronics are also thinking of rolling out their business from China.’’ 

চলতি বছরের ১ অগস্ট চিনা বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র গেং শুয়াং বলেন, ‘’আমেরিকার এই ব্ল্যাকমেল করার পন্থা চিনের উপর তেমন কাজ করবে না।‘’
চিনের সঙ্গে শুল্কযুদ্ধে আমেরিকা পিছিয়ে যেতে রাজি না থাকলেও ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ একটা সম্পর্কের কথা ভাবছে আমেরিকা। ৩০ অগস্ট সংবাদ মাধ্যম সূত্রে খবর শুল্কযুদ্ধ এড়াতে রফতানি পণ্যকে বেছে নিতে চায় আমেরিকা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন রফতানি পণ্যে শুল্ক এড়াতে ভারত আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি করতে চায়। সম্প্রতি মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দল দিল্লীর সঙ্গে বাণিজ্য শুল্ক নিয়ে আলোচনা করে গেছেন। এই বৈঠকের পরে দ্বিতীয়বার একই দাবি করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

বেশ কয়েক মাস ধরে চিনা পণ্যে শুল্ক চাপালেও চিনের বাণিজ্য রেকর্ড করছে। সূত্রের খবর, আমেরিকার সঙ্গে বেজিংয়ের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত সেপ্টেম্বরে ফের নতুন রেকর্ড গড়েছে। বাণিজ্য যুদ্ধে আখেরে বিশ্ব অর্থনীতিরই ক্ষতি হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডার (আইএমএফ)। এই সতর্কবার্তার পরেও শুল্ক যুদ্ধের উত্তাপ কমাতে রাজি নয় আমেরিকা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল অভিযোগ ‘বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তোয়াক্কাই করে না বেজিং। অবাধ বাণিজ্যের নিয়মের তোয়াক্কা না করে বরং চাপ খাটিয়ে হাতিয়ে নেয় সে দেশে ব্যবসা করা মার্কিন সংস্থার মেধাস্বত্ব।’ (সংবাদ সংস্থা, ১৫ অক্টোবর)  
চিনের শীর্ষ ব্যাঙ্কের গভর্নর ই গ্যাং দাবি করছেন শুল্ক যুদ্ধ সারা বিশ্বের উন্নয়ন এবং অর্থনীতির পক্ষেই খারাপ। তিনি বলতে চেয়েছেন, শুল্ক যুদ্ধের কারণে বিশ্বে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার মোকাবিলা করতে ও গঠনমূলক রফাসূত্র বার করতে সব দেশকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে।
নতুন করে তৈরি হওয়া এই বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের কত মানুষ ভুক্তভোগী হচ্ছে? একটা সূত্র বলছে ১৯৬০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল ৩০০ কোটির কিছু বেশি। সেই হিসেবে তখন প্রতি বছর ৩০০ কোটির ২.২ শতাংশ অথবা ৬.৬ কোটি মানুষ বেড়েছে। বর্তমান সময়ে বিশ্বের জনসংখ্যা ৭০০ কোটির বেশি। ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২.২ শতাংশ থেকে কমে ১ শতাংশ হলেও এখন বিশ্বের জনসংখ্যা প্রতি বছর ৭০০ কোটির ১ শতাংশ মানে ৭ কোটি করে বাড়ছে। এই বৃদ্ধির হিসেবে ১ শতাংশ ক্রিমি লেয়ার বাদ দিলে বিশ্বের ৬৯৩ কোটি মানুষ শুল্ক যুদ্ধের শিকার হচ্ছে।           
 

Monday, 15 October 2018

কলকাতা জাদুঘরে একঘণ্টার দুর্গাপুজো








                                                                                           
                                                                                                                                                           দীপেন্দু চৌধুরী


যে নক্ষত্র মরে যায়, তাহার বুকের শীত
লাগিতেছে আমার শরীরে—
যেই তারা জেগে আছে, তার দিকে ফিরে
তুমি আছো জেগে—
(‘নির্জন স্বাক্ষর’ জীবনানন্দ দাশ, ১৯৯৩, পৃষ্ঠা- ৮২)
মানুষ সমাজে থাকে। সমাজে থাকতে চায়। একক মানুষ এক গোষ্ঠীতে জন্ম নিয়ে সেই গোষ্ঠীতে মৃত্যু হয় তার। আবার অন্য গোষ্ঠীতেও মৃত্যু হতে পারে। যদি কোনও একক মানুষ গোষ্ঠী পরিবর্তন করে। আমরা একই দেশের পরম্পরার কথা মাথায় রেখে এই কথা বলছি। মানুষের সংস্কৃতি এভাবেই পরস্পর পরস্পরের হাত ধরাধরি করে সম্মিলিত এক মিলন মঞ্চ তৈরি করে। সেই মঞ্চের ব্যাপ্তি গড়ে তোলে চিরায়ত এক সংস্কৃতি। চিরন্তন সংস্কৃতির পরতে পরতে থাকে ব্যক্তি এবং সমাজের সম্পর্ক। ব্যক্তিক সম্পর্ককে ভিত্তি করেই বৃহত্তর সমাজের মধ্যে আমাদের যেতে হয়। বাঙালি নামক একটি ভারতীয় তথা ভারতীয় উপমহাদেশের একটি মানবগোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজা। যাকে আমরা আমাদের যোগ্যতা মত শব্দ চয়ন করে বলতে পারি ‘শারদ শ্রদ্ধাঞ্জলি’, ‘শারদ উৎসব’।
বাঙালির এই উৎসবকে কেন্দ্র করে গত কয়েকশত বছর ধরে এক মোহময় মমতায় সম্মিলিত হয়। যুগে যুগে এই সম্মেলনের বাহ্যিক আবরণের পরিবর্তন হলেও ‘দুর্গা পুজার’ আচার, উপাচার, ধর্ম, চণ্ডীপাঠ, ১০৮ টা প্রদীপ, ১০৮ টা পদ্ম ফুল, আঁখ, শিউলি ফুল, কলা বৌ, সিঁদুর খেলা, বিজয়ার কোলকুলি হয়। আমরা নতুন পোশাক পরি। বাঙালির দুর্গাপুজো সমস্ত রিচুয়ালসহ আজও ভারতীয় ঘরানা তথা ঐতিহ্য মেনেই হচ্ছে। যদিও আলোচনায় আস্তে পারে পরাধীন ভারতের দুর্গাপুজোর সঙ্গে স্বাধীন তথা আধুনিক উন্নত ভারতের সমাজে দুর্গাপুজার পার্থক্য কতটা? একচালার দুর্গা পুজা থেকে বারোয়ারি দুর্গাপুজো। যাকে বলা হয় সার্বজনীন দুর্গাপুজো। বর্তমানে বনেদী বাড়ির সাবেকী দুর্গাপুজো বনাম সার্বজনীন দুর্গাপুজো। বলতে হবে বা মানতে হবে একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশের দেশপ্রীতি, স্বদেশপ্রেমকে একটি পরাধীন দেশের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। তুলনা করা সম্ভবও নয়। তবুও একথা বলাটা অত্যুক্তি হবেনা যে, ব্রিটিশ যুগের প্রথম সকাল থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথম প্রহর পর্যন্ত জননীস্বরুপা জন্মভূমির মাতৃরুপের সাধনা করেছে বাঙালি তথা ভারতীয়রা। যখন রাষ্ট্রনীতি এতটা তীব্রভাবে প্রতিনিয়ত আলোচনায় ছিল না। অথবা রাজনৈতিক আন্দোলনের ঘনঘটা এতটা পরিলক্ষিত হয়নি সেই সময়কালে ভারতের তথা বাংলার কবি সাহিত্যিক শিল্পীরা স্বদেশের ধ্যানমূর্তি রচনা করেছেন।
স্বাধীনতার পরে ‘দুর্গাপুজো’ ভারতের বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে আরও জনপ্রিয় হয়েছে একটা বৃহতের মনন হিসেবে। দ্বিধাহীন মিলন মেলার মেলামেশার মঞ্চ হিসেবে। সম্প্রীতির সম্মেলন। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে আমরা বাঙালিরা নতুন ভাষায় নতুন করে আমাদের চিনতে পারি। আমার সংগ্রহে অনেক অভিঞ্জতা আছে। তার থেকে আমি দুটো বেছে নেব। আমাদের ছোট বেলায় নলহাটীর ‘চার্চপাড়া’ অঞ্চলে একটি দুর্গাপুজো হত। রবার্ট রবীন দাস এবং তাঁদের পরিবার এই পুজোর মূল আয়োজক ছিলেন। রবীনদা একটি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। পুজোর বাজেট বলে সেই সময় তেমন কিছু ছিল না। একটি গঞ্জ এলাকার পুজো। তাই খুব ছোট ছোট মাপে বা নমঃ নমঃ করে  দুর্গাপুজো হত। কিন্তু সেই পুজোকে কেন্দ্র করে আমাদের অবলিল আনন্দ  টেনে নিয়ে যেত এ পাড়া থেকে সে পাড়ায়। সেখানে ‘জাতপাত’, ধর্ম ইত্যাদির কোনও বাধ্যবাধকতা ছিল না। শৈশব কৈশোর থেকেই আমাদের মনটা গড়ে উঠেছে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য......’ এই দর্শনে। এই দর্শনে ব্রাহ্মণ নেই, ক্ষত্রীয় নেই, চাড়াল নেই, শূদ্র নেই, নমঃশূদ্র নেই, ডোম নেই, চামার নেই হাড়ি নেই। হরিজন নেই, বর্তমানের ‘দলিত’ নেই। আমরা সবাই মানুষ। যে কথা রবীন্দ্রনাথও বলছেন।
‘হিন্দু’ কোনও ধর্ম নয়। এই কথার যুক্তি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথাতে কতটা জোড়ালোভাবে এসেছে? কবি বলছেন, ‘’হিন্দু শব্দে এবং মুসলমান শব্দে একই পর্যায়ের পরিচয়কে বুঝায় না। ............হিন্দু ভারতবর্ষের একটি জাতিগত পরিণাম।‘’ (রবীন্দ্র রচনাবলী, ১৩ খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৭৫)        
পরেরটা কর্মজীবনের অভিঞ্জতা। খুব সম্ভবত ২০০৮ সাল। আমি কলকাতা টিভির সাংবাদিক হিসেবে কসবা-হালতু অঞ্চলের একটা দুর্গাপুজো কভার করতে গিয়েছিলাম। ক্যামেরাম্যান মণ্ডপের ছবি তুলতে তুলতেই আমি কাজ শুরু করে দিলাম। খুব খুবই ছোট মণ্ডপ। মানে বলার মতো তেমন কিছু নয়। মণ্ডপে একচালার একটা ঠাকুরের মূর্তি। টিম টিম করে আলো জ্বলছে। পুজোর কর্মকর্তারা সলজ্জ চাহনিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। কেউ সামনে আস্তে চাইছে না। আমি প্রথমটায় ভাবলাম ছোট পুজো সেই কারণে কেউ কিছু বলতে চাইছে না। কিন্তু টিভির সাংবাদিক হিসেবে অতীত অভিঞ্জতা মিলছে না। পুজো যত ছোটই হোক টিভি ক্যামেরা মানে উদ্যোক্তাদের স্বতঃস্ফূর্ত ব্যস্ততা চোখে ধরা পড়ে। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখে আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। অনেক পরে একজন মাঝবয়সী লোককে দেখলাম। তাঁকে ধরলাম। তার পরনে নতুন চেক লুঙ্গি, কোরা গেঞ্জি। দাড়িগোফহীন ভদ্রলোক ভীষণ লজ্জা লজ্জা করে আমাকে বাইট দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের এটা মুসলমান পাড়া। আমরা কয়েকজন মিলে এই পুজো করছি। আপনি খবর করলে করুন। কোনও টিভি আজ পর্যন্ত আসেনি। আপনি প্রথম এলেন। অন্ধকারে হয়ত দেখতে পাচ্ছেন না। মণ্ডপের পাশে দেখুন একটা মাজার আছে।’ এই আমার আপনার বাংলা। এটাই আপনার আমার চিরায়ত সংস্কৃতি। মিলনের সংস্কৃতি।
কয়েকদিন আগে কলকাতার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ থেকে একটা আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। আমার ই-মেলের ঠিকানায়। বয়ানটা তুলে দেওয়া যাক। ‘Indian Museum Kolkata Ministry of Culture, Government of India Homage to the great goddes Durga an Exhibition of photogrphs at Indian Museum, Kolkata by Mireille Josephine Guezennce-Himabindu, French professor of philosophy, a writer and photographer from 12th October to 12th November. 2018, Madame Virginie Corteval Consul General of France in Kolkata has kindly consented to inaguirate the Exhibition.’  
 ১২ অক্টোবর দুপুর তিনটের সময় আমরা জনা পঞ্চাশেক আমন্ত্রিত ব্যক্তি (সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধি সহ) কলকাতার জাদুঘরের প্রদর্শনী কক্ষে একঘণ্টার বাঙালি ঘরানার পুজোর উদ্বোধন দেখলাম। পুজো উদ্বোধন করলেন কলকাতার নতুন ফরাসি কনসাল জেনারেল ভার্জিনিয়া কোর্টেভাল(Virginie Corteval)। দুজন ঢাকি ঢাক বাজালেন। সকলে চটি, জুতো খুলে দুর্গা মূর্তির সামনে করজোরে প্রণাম করলেন। প্রাণচঞ্চল এক উচ্চ শিক্ষিত মহিলা। ফরাসি কনসাল জেনারেল কলকাতায় নতুন। আমার সঙ্গে প্রথম আলাপেই তিনি জানালেন তিনি নতুন। দর্শনের অধ্যাপিকা ক্যামেরা শিল্পী রথের সময় মা দুর্গার কাঠামো বাঁধা থেকে, একমাটি, দো-মাটি, প্রথম রঙের প্রলেপ, দ্বিতীয় রঙের টাচ, চক্ষুদান, দুর্গাপুজার চারটে দিন, বিসর্জন, সিঁদুর খেলা প্রতিটি মুহূর্তকে ক্যামেরার চোখে, বিদেশী ক্যামেরার ভাষায় নিজের শিল্প সুষমায় তুলে এনেছেন। চার মাস সময় নিয়েছেন ফরাসি ক্যামেরা শিল্পী। ১০০টা ছবি প্রদর্শনী কক্ষে প্রদর্শনের জন্য রয়েছে। প্রদর্শনী চলবে একমাস। ১২ অক্টোবর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত। প্রদর্শনীর একটি ছবির সামনের নেমপ্লেটে লেখা রয়েছে, ‘’Presence and significance of the ghat (ritual pot) placed before the goddess, Before the Goddess stands a ghat, a floored Jar made of copper or clay. Containing water and various concentrated substance.’’
আরও একটি অংশে লেখা রয়েছে, এটি প্রদর্শনীর পরিচয় প্রসঙ্গে লেখা। শিরোনাম
‘Homage to the Great Goddess Durga.’
‘’The ancient scriptures reveal the origins of the Goddess Durga. They relate the circumstances under which ‘The one who is difficult to attain’ was born (Durga-means a fort). For the myth said that only an incredibly beautiful woman, endowed with invincible power, could kill the terrible demon king Mahishasura in a violent battle.’’   
ফরাসি প্রবীণ লেখক এবং দর্শনের অধ্যাপক মিরিল জোসফাইন (Mireille Josephine) ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে বললেন, ‘‘আমি বাঙালির দুর্গাপুজোর বিষয়ে ফ্রান্সে বসেই জানতে পারি। অনন্য এক ব্যতিক্রমী সুন্দরী নারীর প্রতীক তিনি। শক্তির দেবতা তিনি। নারীশক্তির প্রতীক তিনি। তাই আমি এই বিষয়টাকে আমার ক্যামেরায় তুলে আনতে চেয়েছি।‘’ সিঁদুর খেলার ছবির প্রসঙ্গে আলোচনা করার সময় ফরাসি অধ্যাপিকা জানালেন বিষয়টা তিনি জানেন। কিন্তু তাঁর কিছু করার নেই। সভ্যতা এগিয়ে গেলেও ভারতে দুর্গা পুজোর পরে বিশেষ অনুষ্ঠান সিঁদুর খেলা। এই অনুষ্ঠানে সধবা অর্থাৎ বিবাহিতা নারী ছাড়া অন্য মেয়েদের প্রবেশ এখনও অবাধ নয়। সম্প্রতি সাংবাদিক শ্রাবণী বসুর কলম থেকে জানতে পারলাম লন্ডনের বাঙালিরা তথাকথিত ওই সংস্কারের বেড়ি খুলে ফেলতে পেরেছেন। শ্রাবণী লিখছেন, ‘’......একমাত্র রয়্যাল বার্কশায়ারের বাঙালি অ্যাসোসিয়াশনই রীতিমতো প্যান্ডেল খাটিয়ে পুজো করে। এ বার তাদের দশম বছর। পুজো হবে লন্ডন থেকে ২১ মাইল দূরে স্লাও-র বেইলিস হাউসে। এই পুজো ‘ডবল ডট মুভমেন্টের’ সমর্থক। শুধু বিবাহিত মহিলারাই নন, বিজয়া দশমীর দিন মায়ের বরণে এখানে সিঁদুর খেলায় অবাধে অংশগ্রহণ করেন সব মহিলাই। এক উদ্যোক্তা বললেন, ‘বিবাহিত, অবিবাহিত, বিবাহবিচ্ছিন্না কিংবা স্বামীহারা, ১৮ অক্টোবর মায়ের বরণে এবং সিঁদুর খেলায় অংশগ্রহণ করতে আমরা সকলকে স্বাগত জানাই।‘’ 
চলতি বছরের ২০ জুন কলকাতার আমেরিকান সেন্টারে এলজিবিটিদের একটি আন্তর্জাতিক কর্মশালায় রূপান্তরকামী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সমাজকর্মী রঞ্জিতা সিনহা দাবি করেন, ‘’ট্রান্স জেন্ডার আমরা। আমরা বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোয় সিঁদুর খেলতে চাই। যদি আমাদের সুযোগ দেওয়া হয়।‘’                   
গতবছর দুর্গাপুজোর সময় সুদূর আমেরিকা থেকে এসেছিলেন এক তরুণ গবেষক। ক্রিস্টোফার এল ডায়মন্ড তাঁর নাম। ‘কবি বিদ্যাপতি’ বিষয়ক গবেষণার কাজে ১০ মাস কলকাতায় ছিলেন তিনি। ক্রিস্টোফার একটি সাক্ষাৎকারে আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি দুর্গাপুজার কথা জানতাম। তাই পুজোর কিছুদিন আগে এসেছিলাম। হিন্দুস্তান পার্ক থেকে পায়ে হেঁটে আমি ১৫-২০টা ঠাকুর দেখেছি।’ সম্প্রতি কলকাতার নতুন কনসাল জেনারেল প্যট্রিসিয়া হফম্যান আমেরিকান সেন্টারের একটি অনুষ্ঠানে ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ এবং বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গা পুজো নিয়ে তাঁর আগ্রহের কথা বলেছিলেন। ১৩ অক্টোবর চতুর্থীর দিন দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন পুজোমণ্ডপ ঘুরে দেখেন সাতটি বিদেশী রাষ্ট্রের পদস্থ আধিকারিকরা। এই দলে ছিলেন ফ্রান্স, ব্রিটেন, ইটালি, জার্মান, জাপান, বাংলাদেশ এবং আমেরিকার প্রতিনিধিরা। ওইদিন সন্ধ্যেয় বিদেশী রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা কালীঘাটে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের বলেন, ‘’দুর্গাপুজো আমাদের সব চেয়ে বড় উৎসব হলেও আমরা সব ধর্মমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এখানে ইদ, বড়দিন সবই সাড়ম্বরে পালন করা হয়। বড়দিনের শহরও উৎসবের সাজে সেজে ওঠে। এখানে সংখ্যাগুরু, সংখ্যালঘু বলে কোনও ভেদাভেদ আমরা করি না। এটাই আমাদের আদর্শ।‘’
সাতটা দেশ পাহারা দেয় বাংলার মা আমার। সাতটা মহাদেশ পাহারা দেয় ভারত মা আমার। আমরা অনাথ নই  বাংলা আমার মা, আমরা অনাথ নই ভারত আমার মা।
১২ অক্টোবর কলকাতা জাদুঘরে প্রদর্শনী উদ্বোধনের আগে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে ফ্রান্সের কলকাতার নতুন কনসাল জেনারেল ভার্জিনিয়া কোর্টেভাল(Virginie Corteval) বলেন, ‘’আমি একমাস আগে কলকাতায় এসেছি। এসেই বাঙালির সব থেকে বড় উৎসবের কথা জানতে পারি। রাস্তায় ফ্লেক্স, হোর্ডিং দেখলাম। খুব জাগ্রত মায়ের মুখ। আমাকে ভীষণ ভীষণভাবে আকর্ষণ করেছে। আমি কলকাতা এসেই এক নতুনকে খুঁজে পেলাম। আবিষ্কার করলাম এই উৎসবকে। ১১ অক্টোবর কুমারটুলি গিয়েছিলাম। মৃৎ শিল্পের সঙ্গে পরিচিত হলাম। অত্যন্ত সুন্দর। ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। সেই সূত্র আর আজকের প্রদর্শনী আমাদের মিলন মঞ্চে এনে দিল। সবাইকে আমাদের শারদ শুভেচ্ছা।‘’                                         

Wednesday, 3 October 2018

ওরা মানবতার ছবি করতে চায় লিঙ্গ বৈষম্যের নয়



দীপেন্দু চৌধুরী
অন্যান্যদের কথা বলতে পারব না। নিজের কথা জানি। কলেজে পড়ার সময় সেটা ১৯৭৬-৭৭ সাল, তখন চা গরম জলে দিয়ে কি করে চা বানাতে হয় শিখেছিলাম। হ্যা ওই একই সময় চায়ের পাতা ব্রাউন প্যাকেটে ভরে ১০০গ্রাম, ২০০ গ্রাম, ২৫০ গ্রাম ৫০০ গ্রামের প্যাকেটে করে বিক্রি করতে শিখেছিলাম। বড় বড় দু’টো চটের ব্যাগে চায়ের প্যাকেট ভরে নিতাম। সাইকেলে ব্যাগ দু’টোকে ঝুলিয়ে নিয়ে খুব সকালে চায়ের পাতা বিক্রি করতে শিখেছিলাম। মাঠের রাখাল বালকদের মত। শিখতে হয় না হলে পিছিয়ে পড়তে হয়। আমাদের নিজেদের কথা বলার জন্য কাউকে আমন্ত্রণ জানানো যায়? আমরা জানতে গিয়েছিলাম। নতুন সভ্যতায়, নতুন ভাষায়, মাত্র দেড় থেকে দু’মনিটে একটা ছোট গল্প কি করে বলা যায়? টাটকা টাটকা পান্ডুলিপি অথবা চিত্রনাট্য থেকে জীবনের টুকরো টুকরো অংশ জুড়ে দিলে ‘পথের পাঁচালী’ লেখা হয়। ছোট ছোট গল্প লেখা হতে পারে। ছবি তৈরি হতে পারে।
১৯৫৯ সালের একটি প্রবন্ধে সত্যজিৎ রায় আক্ষেপ করে লিখেছিলেন ‘চলচ্চিত্র শিল্প কিনা তা নিয়ে এখনও বিতর্ক ওঠে।’ (সত্যজিৎ রায়, ‘চলচ্চিত্র-রচনা’ঃ ‘আঙ্গিক ভাষা ও ভঙ্গি’ [‘বিষয় চলচ্চিত্র’, প্রথম সংস্করণ, আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৭৬, পৃষ্ঠা- ১৮] সত্যজিৎ রায় প্রশ্নটি তুলছেন ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’ (১৯২৫) ছবিটি তৈরি হওয়ার ৩৪ বছর পর। বিশ্ববরেণ্য ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় প্রশ্নটি তোলার আট নয় বছর পরে একটি সমীক্ষা করা হয়েছিল। ১৯৬৭-৬৮ সালে সেই সমীক্ষা করা হয়েছিল নতুন দিল্লির উচ্চ-মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষদের মধ্যে। এই দর্শক সমীক্ষায় প্রতি দশজনের মধ্যে মাত্র তিনজন দর্শক শিল্প হিসেবে চলচ্চিত্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। ফরাসি বিপ্লবের ঢেউ আছড়ে পড়েছে ভারতে। আমাদের দেশের ছাত্র সমাজ উথাল পাথাল ঢেউয়ে দুলছে। আমাদের এই বাংলায় ছবি করছেন সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন সহ আরও অনেকে। হারিয়ে যাওয়া নামের চলচ্চিত্র পরিচালক তাঁরা। গত শতাব্দীতেই সিনেমা ‘শিল্প’-এর মর্যাদা পেয়েছে। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা বিভিন্ন দেশের স্বনামধন্য চলচ্চিত্র পরিচালকদের দল আমাদের সামনে কালজয়ী সব চলচ্চিত্র পরিবেশন করেছেন। চলচ্চিত্রকে শিল্পের উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। এবং হলিউডের দেশ আমেরিকার বিভিন্ন বরেণ্য পরিচালক প্রমাণ করেছেন চলচ্চিত্র শিল্পের ডিটেলিং কোন উচ্চতায় পৌঁছতে পারে। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি যে প্রশ্ন সত্যজিৎ তুলেছিলেন বর্তমান শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে আজকের সভ্যতা অনেক অনেক এগিয়ে। ওয়েবক্যাম বা ছোট ক্যামেরায় তোলা তথ্যচিত্র, কাহিনিচিত্র অথবা ছবি আমরা গত শতাব্দীতেই পেয়েছি। সভ্যতা আরও কয়েকধাপ এগিয়ে এসেছে। ইন্টারনেট, ইউটিউব, স্মার্টফোন হাতের মুঠোয় এসে যাওয়ায়।
গতমাসে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, কলকাতা ছোট ছোট ছবির একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিল। মাত্র দেড় ঘণ্টায় পাঁচটা ছবি। এক ঘন্টা মতবিনিময়। ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুর দু’টো থেকে পাঁচটা পর্যন্ত আমরা দেখলাম ২৪টা ছবি বা সিনেমা। ভাবা যায়? ‘Ending Gender-Based Violence One Story at a Time’ শিরোনামের এদিনের ঠাসবুনোট চলচ্চিত্র উৎসবের যৌথভাবে আয়োজন করেছিল ইউ এস কনস্যুলেট জেনারেল, কলকাতা, ক্যালিফর্নিয়ার  অলাভজনক ছবি তৈরির একটি সংস্থা এবং কলকাতার বাংলানাটক ডট কম নামে একটি সংস্থা। অনুষ্ঠানের যে ব্রসিয়ার আমাদের হাতে এসেছে ‘Gender-Based Violence’ শিরোনামে লেখা হচ্ছে, ‘’Gender-based violence (GBV) is a general term used to capture violence that occurs as a result of the normative role expectations associated with each gender, along with the unequal power relationships between the two genders within the context of a specific society.
Many countries have incorporated women’s rights and gender equality as a matter of policy, but gender-based violence, targeting women and girls in particular, continues unabated. The violence is perpetrated both at home and in public and has its roots in gender stereotyping, unequal norms and imbalanced power dynamics in societies. Addressing the social and structural causes behind this violence is, therefore, the need of the hour.  
ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল প্রসঙ্গে ‘About the Film Festival’ শিরোনামে  লেখা হয়েছে, ‘’Contact base (www.banglanatak.com) is working in collaboration with the American Center in Kolkata to create a youth network that champions the cause of stopping GBV and changing attitudes and behavior. The main objective of the entire initiative is to empower youth leaders across borders to identify and speak up against gender issues. It is also a part of our effort to strengthen the advocacy skills of next-generation leaders in the Indo-Pacific region.
In April 2018, Contact Base, in partnership with the American Center, Kolkata, and Story Centre, USA, organized a workshop on digital storytelling. The workshop was conducted by Amy Lenita Hill from storyCenter, an organization supporting individuals and groups to use storytelling and participatory media for reflection, education, and social change. Storytelling is traditionally the most attractive and popular format of communication that can sensitize people, build awareness, forge solidarity and shape public opinion about various issues concerning the society and the individual. Digital storytelling is the most potent and popular new age tool for communication.
The 24 participants from India (Assam, JharKhand, Nagaland and West Bengal) and Bangladesh developed short films on ending gender-based violence. Each of the films reflected individual experiences. As a follow-up action after the workshop each of the four zonal teams from Bangladesh, Jharkhand, Northeast and West Bengal made two more films.
ছবিগুলি দেখার পরেও উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে কোনও ক্লান্তি আমাদের নজরে পড়েনি। দু’ই থেকে তিন মিনিট সময়ে তৈরি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে পারিবারিক এবং সামাজিক ছবি আমরা টান টান উত্তেজনায় দেখতে থাকি। ডিজিটাল ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলির পরিচালকরা ছবি করার সময় কতটা মনযোগ দিতে চেয়েছেন সেটা বোঝা যায়, ছবি দেখার পরে দর্শকদের সঙ্গে মতবিনিময় সময়ে। প্রত্যেকে উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছেন। ছবিগুলি তৈরি সময় প্রত্যেক পরিচালক আলাদা আলাদা করে পাঁচদিন সময় নিয়েছেন। পাঁচদিনে নিজেদের ছবির চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন তাঁরা। চিত্রনাট্য লিখেছেন ইংরেজি, হিন্দি এবং অসমিয়া ভাষায়। প্রতিটি ছবির সঙ্গে আছে পরিভাষা বা ইংরেজিতে সাব টাইটেল। সারা বিশ্বের দর্শকদের ছবি দেখার সুবিধার জন্য। কোনও কোনও ছবিতে নেপথ্যে ভয়েস ওভার ব্যবহার করে ছবির গল্প দর্শকদের বোঝাতে চেয়েছেন পরিচালক। বাংলাদেশের পাঁচটা ছবির মধ্যে তিনটে ছবির কথা উল্লেখ করতেই হবে। প্রথমটা পরিচালক মারুফ ওয়ালির ‘ইটস নট ওকে’, দ্বিতীয়টা পরিচালক মুনিফ খানের ‘সিঁদুর’ এবং তৃতীয়টা প্রিয়াঙ্কা বোস পরিচালিত ‘আমি সেই মেয়ে’ (Me Too)। বিশেষ নজর কাড়ে প্রিয়াঙ্কার ‘আমি সেই মেয়ে’ ছবিটি। বাংলাদেশের মত আর্থসামাজিক সমাজ কাঠামোয় বর্তমান সময়ে ওই দেশের উচ্চশিক্ষিত মেয়েদের সামজিক জীবনের টানাপড়েনের গল্প বলেছেন প্রিয়াঙ্কা।     ঝাড়খন্ড থেকে চারটে ছবি ছিল। ঝাড়খন্ডের চারটে ছবির মধ্যে পরিচালক শুভজিৎ ঘোষের ছবি ‘দ্য ডে হোয়েন এভরিথিং কেম টু অ্যান এন্ড’। শুভজিৎ দেড়-দু মিনিটে আমাদের ভারতীয় নারীর দু’টো দিক দেখালেন। একদিকে আমরা দেবী দুর্গার কথা বলছি। অন্যদিকে বাড়ির সাধারণ স্ত্রী মেয়েদের উপর অত্যাচার করছি। একটি পরিবারের এক যুবক তাঁর উচ্চ শিক্ষিত কাকার পরিবারের কথা বলছে। স্বচ্ছল পরিবার। যুবকটির কাকা তাঁর স্ত্রীর প্রতি কি ধরণের ব্যবহার করছে সেই চির পরিচিত গল্প আমরা আবার দেখলাম। কাকিমার প্রতি অবিচার সেই যুবকটি মেনে নিতে পারেনি। প্রতিবাদ করেছিল।
ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল (অসম এবং নাগাল্যান্ড) থেকে ছিল চারটে ছবি। রেখা শর্মার ‘অপরাজিতা’ ছবিটি আমাদের মনে দাগ কাটে। ভীষণ কাব্যিক ছবি বলতে হবে। কলকাতা থেকে ছিল ন’টি ছবি। কলকাতা থেকে সংযুক্তা সরকারের পরিচালিত ছবিটি এককভাবে প্রথম পুরষ্কার পায়। এই ছবিটির গল্প বাড়ির মেয়েদের পাতে অর্ধেক ডিম দেওয়া হয়। পুরুষরা খায় গোটা একটা ডিম। একটি মেয়ের মামাবাড়ির প্রেক্ষাপটে সংযুক্তার চিত্রনাট্যে দর্শকরা ‘ডিম’- এর গল্প শোনে। সেরা আঞ্চলিক ছবির পুরষ্কার জিতে নেয় ‘পিঙ্ক অ্যান্ড ব্লু’ (Pink & Blue) । ছবির গল্প এই রকম, আমাদের সমাজে কম বয়সের ছেলেদের বা বলা ভালো বালক শিশুদের হাতে দেওয়া হয় নীল রঙের বেলুন। আর বালিকা শিশুদের হাতে দেওয়া হয় ‘গোলাপী’ বেলুন। এটাও ভারতীয় সমাজের একটা টানাপড়েন। অন্তরা রায় চৌধুরী, মন্দিরা ব্যানার্জি, অলিভিয়া মণ্ডল, পলক চোখানী, রাহুল গোস্বামী এবং শান্তনু ব্যানার্জি এই ছ’জনের যৌথ চিত্রনাট্য এবং পরিচালনায় নির্মাণ হয়েছে ‘পিঙ্ক অ্যান্ড ব্লু’ ছবিটি।
২৯ সেপ্টেম্বরের ছবিগুলির বিষয় ছিল ১) Domestic violence, 2) Sexual harassment, 3) Discrimination in terms of career choice, 4) Gender stereotyping, 5) Unsafe public spaces
জুড়ি প্যানেলে ছিলেন বলিউডের অভিনেতা এবং পরিচালক বিনয় পাঠক, বাংলা ছবির অভিনেত্রী চূর্ণী গাঙ্গুলী এবং বাংলা ছবির পরিচালক অনিন্দিতা অধিকারী। ছবি শেষে বিজয়ী পরিচালকদের হাতে পুরষ্কার তুলে দেন চলচ্চিত্র পরিচালক সুদেষ্ণা রায় এবং আমেরিকান কনস্যুলেট জেনারেল, কলকাতা প্যাট্রেসিয়া হফম্যান। এদিনের অনুষ্ঠানে প্যাট্রিসিয়া হফম্যান বলেন, ‘’আমি কলকাতার সংস্কৃতির ভক্ত। বাংলার শিক্ষার মান, মনন, সঙ্গীত, সাহিত্য বিষয়ে আগ্রহকে আমি সম্মান করি। এই বছর বাংলার দুর্গা পুজো দেখার সুযোগ আমার হবে। বাঙ্গালি জীবনের যে উৎসব সব থেকে বড় উৎসব। আমি সেই উৎসবে অংশ নেব।‘’
মার্কিন কনস্যুলেট জেনারেল আরও বলেন, ‘’This is a meeting point of great minds across the borders. The directors are brave agents of change.’’  ছবিগুলি কি সব বিষয় কে ছাপিয়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাকে আক্রমণের ছবি? ভারতীয় উপ মহাদেশের সামাজিক কাঠামোর কিছুটা উন্নতি হলেও মূল্যবোধ কতটা আধুনিক হয়েছে? উচ্চশিক্ষিত, চাকুরে মহিলাদের দ্বারা ভারতীয় পুরুষরা আক্রান্ত নয়? যে বিষয় নিয়ে কিছুদিন আগে ভারতের সুপ্রীম কোর্টে একটি মামলার শুনানী হয়ে গেছে। দর্শক-শ্রোতারা এই প্রশ্ন তুলেছিলেন। মঞ্চে হাজির ১৩ জন তরুণ পরিচালক বললেন, আমরা পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছবি করতে চাইছিনা। আমরা মানবতার পক্ষে ছবি বানাতে চাইছি।
এই প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ছবির চিত্রনাট্য থেকে কিছুটা অংশ তুলে দিতে চাইছি। মেয়েদের মন নিয়ে সত্যজিৎ ঠিক কি বুঝতেন? তাঁর আবেদন কি ছিল?
অরিন্দমঃ পর পর তিনটি ছবি মার খেলেই কিন্তু আমিও ওজগতে ফিরে যেতে পারি।
অদিতিঃ তা হবে না। নিশ্চয়ই হবে না। আপনি যেখানে আছেন সেখানেই থাকবেন। অনেকদিন। আপনার বাজার ঠিকই থাকবে।
অরিন্দম মৃদু হাসে।
অদিতির ব্যাগ খোলাই ছিল, সে তাঁর ভিতর থেকে একতাড়া কাগজ বার করে।
অদিতিঃ আপনার ইন্টারভিউ ...
অদিতি কাগজগুলো একসঙ্গে কুন্ডলী পাকিয়ে সামনে রাখা জলের গেলাসের ভিতর গুঁজে দেয়।
অরিন্দমঃ ওকি! আপনি কি মন থেকে লিখবেন নাকি?
অদিতিঃ মনে রেখে দেব। চলি।                                                          

Monday, 1 October 2018

অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই





দীপেন্দু চৌধুরী
বিগত ৪১ বছর পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যে কংগ্রেস দলের শাসন নেই। ১৯৭৭ সাল থেকে ২০১১ পর্যন্ত দুর্দান্ত প্রতাপশালী বামফ্রন্টের শাসন চলেছে। ‘বামফ্রন্ট’ একটি শব্দের আশ্রয়ে আসলে ৩৪ বছর সিপিএম নামক একটি দল আমাদের রাজ্য শাসন করেছে। ২০১১ সাল থেকে তৃণমূল কংগ্রেস প্রথমে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট সরকার পরে একক দল হিসেবে রাজ্যের ক্ষমতায় রয়েছে। আমাদের আলোচ্য নিবন্ধ কোনও রাজনৈতিক দল বা রাজ্য সরকার নয়। সমাজের এগিয়ে থাকা সংস্কৃতি জগতের ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কে কয়েকগাছা শব্দচয়ন বা বাক্যচয়ন। নাগরিক সমাজের ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের রাজ্য স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় থেকে সচেতন। অথবা আমরা উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের সময়ের কথাও উল্লেখ করতে পারি। ব্রিটিশ শাসনের সময় কলোনি নামক এক সমাজ ব্যবস্থায় আমরা উপলব্ধি করেছিলাম বুদ্ধিজীবীদের কলম অথবা ভূমিকা সমাজের কতটা পরিবর্তন করতে পারে। নাগরিক সমাজ বলতে বৃহত্তর ক্ষেত্রে বলা হয় ‘সিভিল সোসাইটি’। ভাষা বিশেষঞ্জদের লেখা থেকে জানতে পারছি গ্রিক দার্শনিক আরিস্ততলের (খ্রিস্টপূর্ব ৩৮৪-৩২২) ‘কইননিয়া পলিতিক’-এর লাতিন অনুবাদ ‘সোসায়েতাস সিভিলস’ হয়ে ইংরেজিতে কথাটা এসেছিল। বিশেঞ্জরা বলছেন, এই ধারণা যারা পোষণ করতেন তাঁরা রাজনৈতিক সমাজ এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে অথবা রাষ্ট্র এবং সমাজের মধ্যে কোনওরকম ফারাক করতেন না। সেই সময় ‘নাগরিক সমাজ’- এর মানে ছিল শুধুমাত্র একটি সমাজবদ্ধ গোষ্ঠী।
সপ্তদশ- অষ্টাদশ শতাব্দীতে এসে ‘নাগরিক সমাজ’ গোষ্ঠীটির ধারণায় নতুন চিন্তার কথা বললেন ব্রিটিশ দার্শনিক জন লক (১৬৩২-১৭০৪)। তিনি সমাজের উচ্চ শিক্ষিত লেখক, শিল্পী, নাট্যকার, সাহিত্যিক, চিত্রকর ভাস্কর সহ সমাজের প্রতিষ্ঠিত প্রথম শ্রেণির পেশাজীবী নাগরিকদের একটা মঞ্চে আসার কথা বললেন। পরস্পরের মধ্যে মত বিনিময় তথা নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর মঞ্চকেই নাগরিক সমাজের মূল ভিত্তি হিসেবে দেখার কথা বললেন। পাশাপাশি জন লক সাহেব সমাজের নীতিবোধের চালিকাশক্তি ঈশ্বর বিশ্বাসের কথা বললেন। তিনি বলে গেছেন ‘সুসভ্য’ সমাজে ঈশ্বর বিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির স্বাধীনতা থাকবে। তাঁর ধারণাশ্রয়ী সমাজে নাস্তিকদের অধিকার স্বীকৃত ছিল না। এই সূত্রেই জানা যায় অষ্টাদশ শতাব্দীর স্কটিশ তাত্বিকরা ঈশ্বর নির্ভরতার পরিবর্তে ধর্ম নিরপেক্ষ নাগরিক সমাজের কথা বলে গেছেন। আলোচ্য বিষয় ঈশ্বর বিশ্বাস বা নাস্তিকদের নিয়ে কোনও আলোচনা দাবি করছে না। ২৯ সেপ্টেম্বর বিধান নগরের একটি ব্যাঙ্কয়ট সভাঘরে মতবিনিময় সভা ছিল। উদ্যোক্তাদের ভাষায় দার্শনিক আলাপ আলোচনার সভা বা সম্মেলন (Symposium)। ‘Symposium on ‘’Fake news-Nemesis to Freedom of Expression’. বিষয় ছিল আমরা ভুয়ো খবরের বিরুদ্ধে। মিথ্যে খবরের বিরুদ্ধে। আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল সারা ভারত পেশাজীবী কংগ্রেস(AIPC) কংগ্রেসের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি। এবং সংগঠনটি ইতিমধ্যে অনন্যতা দাবি করে। সংগঠনের পশ্চিমবঙ্গ চ্যাপ্টারের এটি দ্বিতীয় সভা ছিল। কলকাতা জেলা ছাড়াও হাওড়া জেলা, বিধাননগর এবং বারাসত থেকে প্রতিনিধিরা এসেছিলেন। সংগঠনটির দ্বিতীয় মত বিনিময় সভায় ছিল চোখে পড়ার মতো উপস্থিতি।
সভার শুরুতেই এআইপিসির পশ্চিমবঙ্গ চ্যাপ্টারের সভাপতি ঋজু ঘোষাল আলোচনার সুরটা বেঁধে দিলেন। তিনি বললেন ‘’অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে এই সম্মেলন তৈরি করবে আগামীর নেতৃত্ব।‘’ আলোচনাসভায় বক্তা ছিলেন ছ’জন। পবন খেরা আস্তে পারেননি। সঞ্চালক সাহেরা হালিম প্রথমেই উল্লেখ করলেন, মিথ্যে কী ভাবে বলা হচ্ছে। ‘ফেক নিউজ’-কে কেমন করে আমাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কোন দেশে আমরা আছি? ‘ট্রুথ’ বা সত্যি কথা বলা যাবে না। বর্তমান ভারতকে আমরা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে তুলনা করতে পারব? কেন্দ্রীয় সরকারের ভুল ধরিয়ে দিলে লেখক আক্রান্ত হচ্ছেন। সাংবাদিক আক্রান্ত হচ্ছেন। বুদ্ধিজীবিরা আক্রান্ত হচ্ছেন। আমি ঋজু ঘোষালকে জিগ্যেস করব। কেরালার যেমন আলাদা পরিচিতি আছে। আমাদের এই রাজ্য পশ্চিমবঙ্গেরও আলাদা পরিচিতি আছে। সমাজকে, মানুষকে কতদিন উপেক্ষা করা হবে? বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা কী বলতে পারি?  
উত্তরে ঋজু বললেন, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ছত্তিসগড়ের বিষয় নয়। আমাদের গ্রামীণ বাংলায় ইন্টারনেট সংযোগ কতটা পাবেন? কিন্তু স্মার্টফোন দ্বিতীয় হাত, তৃতীয় হাত ঘুরে খেটে খাওয়া তরুণ সমাজের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। তবুও বলব আমাদের দেশ আজও গ্রাম ভিত্তিক দেশ। সংস্কার আছে। মুল্যবোধ আছে তাই ‘ফেক নিউজ’-কে আটকাতে হবে। বাবর যেমন সম্রাট ছিলেন। ভারতের জিডিপি একটা সময় খুব ভালো ছিল। এটা সত্য। এই সত্যকে আমরা কেউ আড়াল করতে পারব না। ‘ফেক নিউজ’, মিথ্যে প্রচার বন্ধ করতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তিকে অবহেলা করলে হবে না।‘’
রবীন্দ্রনাথ নিজে যেমন বিশ্বাস করতেন গ্রামকে বাদ দিয়ে একটা দেশের চরিত্র বোঝা সম্ভব নয়। তিনি জাতি তথা মহাজাতির কথা সেই যুগেও বলে গেছেন। তাঁর রাজা-প্রজা প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, যে দেশে একটি মহাজাতি বাঁধিয়া ওঠে নাই সে দেশে স্বাধীনতা হতেই পারে না। কারণ, স্বাধীনতার স্ব-জিনিসটা কোথায়? উপরন্তু গ্রামভিত্তিক দেশ। গ্রামের স্বয়ংসম্পূর্ণতা ভেঙে দিয়েছিল অথবা স্বয়ম্ভরতা ভেঙে দিয়েছিল ব্রিটিশ শাসকরা। রবীন্দ্রনাথ তার প্রতিবাদ করেছিলেন। এবং স্বদেশী সমাজের কথা বলেছিলেন।        
আইনজীবী ঋজু ঘোষালের বক্তব্য থেকেই আমাদের সামনে এসে যায় ‘গ্রাম সমাজ’-এর কথা। যেটা রবীন্দ্রনাথ সেই সময় বলেছেন। ‘নাগরিক সমাজ’-এর দায়িত্বের কথা বলেছেন তিনি। সমাজ গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে একটি রাষ্ট্রের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য একে একে গড়ে উঠতে থাকল রাজনৈতিক দল বা শক্তি, প্রশাসন, আইন, বিচার ব্যবস্থা সহ একাধিক ব্যাবস্থা। সমাজের প্রয়োজনে লাগবে এমন সব সরকারি বেসরকারি  প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রক্ষমতা নিজেদের হাতে রাখতে রাজনৈতিক দলগুলি কিছু গোষ্ঠী বা বুদ্ধিজীবীদের টাকা দিয়ে বা উপঢৌকন দিয়ে কিনে নিতে চায় বা কিনে নেয়। অভিযোগ বিগত একশো বছরে দেশে বিদেশে এমন উদাহারণ ভুরিভুরি পাওয়া যাবে। সংবাদ মাধ্যমের উত্থানের পরে এই মাধ্যমকে মোটা টাকার অঙ্কে নিজেদের দলের স্বার্থে ব্যবহার করার উদাহারণ হিসেবে আমরা একাধিক অভিঞ্জতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে পারি। বাজার যারা নিয়ন্ত্রণ করেন সেই বাণিজ্যিক সমাজের সঙ্গে প্রতিবাদী এবং ধর্ম নিরপেক্ষ ‘নাগরিক সমাজ’-এর দ্বন্দ চিরায়ত। যে রাষ্ট্রপ্রধান বাণিজ্যিক সমাজের সঙ্গে ‘নাগরিক সমাজ’-এর ভারসাম্য সামলে দেশ শাসন করতে পারেন তিনি ইতিহাসে স্থান করে নিতে পারেন। আমরা যেমন আমাদের দেশে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জওহরলাল নেহরু এবং মনমোহন সিংহের নাম উল্লেখ করতে পারি।
যে সূত্রের উপর নির্ভর করে এই লেখা লিখছি সেই একই সূত্র বলছে, ফরাসি সমাজতাত্বিক ও রাষ্ট্রবিঞ্জানী মঁতেস্কু-র (১৬৮৯-১৭৫৫) মত ছিল, বাণিজ্যিক সমাজের নাগরিকদের মধ্যে একটা স্বাধীন মেলামেশা এবং মুক্ত মনের জায়গা থাকে। এই দর্শন রাষ্ট্রের বাড়াবাড়িকেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। আমাদের দেশে এই শতাব্দীর প্রথম দশকের কথা মনে করতে চাইছি। ঘটনা আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। ২০০৬ সাল থেকে শুরু হওয়া আমাদের রাজ্যে একটি শব্দ হঠাত এসে আছড়ে পড়েছিল। শব্দটি ছিল ‘সুশীল সমাজ’। রিজওয়ানুরের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে একটা আন্দোলন, সিঙ্গুরে টাটাদের ন্যানো গাড়ি কারখানার জন্য জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে একটা আন্দোলন এবং নন্দীগ্রাম। রাজ্য তথা ভারতের ‘নাগরিক সমাজ’ বা ‘সুশীল সমাজ’ একটা রাজ্যের ভাগ্য নির্ণয়ের দায়িত্ব তখন নিয়ে নিয়েছিল। সেই সময়ে রাজ্যের ‘নাগরিক সমাজ’ বা ‘সুশীল সমাজ’ দু’টো শিবিরে ভাগ হয়ে গিয়ে ‘আমরা-ওরা’ নামক আলাদা আলাদা গোষ্ঠীতে চিহ্নিত হয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সম্ভবত এই পরিণতি ডেকে আনে। আমরা নতুন করে এই বিতর্কে যাবনা। ঋজু ঘোষাল অহিংস সমাজের সদর দুর্গে কামান দেগে ন্যায্যতার দাবি জানালেন। সেই দাবি থেকেই সাংবাদিক এবং লেখক প্রাঞ্জয় গুহঠাকুরতা সভার আসনে বসে বললেন,  ‘’আমি কংগ্রেস করি না। তবু এই আলোচনা সভায় আমি এসেছি। ‘ভুয়ো খবর’ আমাদের কতটা ক্ষতি করতে পারে সে বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। উদার সংস্কৃতির প্রসঙ্গে বলার জন্য আমাদের দেশে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ আক্রান্ত হচ্ছেন। আমেরিকায় নোয়াম চামস্কি আক্রান্ত। ‘ফেক নিউজ’ অথবা ভুয়ো খবর, গুজব এসব বেশিদিন ধরে রাখা যায় না। সত্য যদি আপনার সঙ্গে থাকে আপনার কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না। সাংবাদিক মানে স্টেনোগ্রাফার নয়। সাংবাদিক মানে বিঞ্জাপন সংস্থা নয়। সাংবাদিককে নিরপেক্ষভাবে সমালোচকের চোখ দিয়ে দেখতে হবে। মানে ক্রিটিক্যালি দেখতে হবে। এক পেশে এক তরফা হলে চলবে না।‘’
বিশ্বের অন্যতম চিন্তাবিদ তথা দার্শনিক নোয়াম চমস্কী কী বলছেন?    
     "The major media-particularly, the elite media that set the agenda that others generally follow-are corporations “selling” privileged audiences to other businesses. It would hardly come as a surprise if the picture of the world they present were to reflect the perspectives and interests of the sellers, the buyers, and the product. Concentration of ownership of the media is high and increasing. Furthermore, those who occupy managerial positions in the media, or gain status within them as commentators, belong to the same privileged elites, and might be expected to share the perceptions, aspirations, and attitudes of their associates, reflecting their own class interests as well. Journalists entering the system are unlikely to make their way unless they conform to these ideological pressures, generally by internalizing the values; it is not easy to say one thing and believe another, and those who fail to conform will tend to be weeded out by familiar mechanisms."

একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রাণঞ্জয় গুহঠাকুরতা বললেন, ‘’মার্কিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েই ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ফেক নিউজ’-এর নামে সংবাদ মাধ্যমের কন্ঠরোধ করতে চাইলেন। সিএনএন এবং নিউ ইয়র্ক টাইমস সংবাদ সংস্থার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়লেন। কারণ সাংবাদিকরা কঠিন প্রশ্ন করছিলেন। ট্রাম্প যুবক যুবতিদের বলছেন তোমাদের চাকরি মেক্সিকানরা নিয়ে নিচ্ছে। ট্রাম্পের মত আমাদের দেশে মোদী চাকরি দিতে পারছেন না। তিনি জাত, বর্ণ, ধর্ম নিয়ে ব্যাস্ত আছেন। তাঁর কাছে বাদামি বলে কিছু নেই। সব সাদা কালো। আমাদের দেশে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে কিছু বলা যাবে না। কালাধন নিয়ে বলা যাবে না। নোট বাতিল নিয়ে বলা যাবে না। গণপিটুনি নিয়ে কিছু বলা যাবে না। সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হলে কিছু বলা যাবে না তাহলেই আপনি রাষ্ট্রের চোখে ‘শহুরে নকশাল’ অথবা রাষ্ট্রদ্রোহী।‘’
কংগ্রেস দলের ন্যাশন্যাল মিডিয়া প্যানেলিস্ট জয়বীর শেরগিল বলেন, ‘’কলকাতা অনুভূতির জন্য বিখ্যাত। সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত। গত চার বছর ধরে আপনারা পড়ছেন ‘অচ্ছেদিন আ গয়ে’। এর থেকে ‘ফেক নিউজ’ আর কী হতে পারে? আমি কোনও রাজনীতির পরিবার থেকে আসিনি। রাহুল গাঁধির আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাজনীতিতে এসেছি। যদি আপনার ট্যালেন্ট থাকে তাহলে আপনি রাজনীতিতে সাফল্য পাবেন। ভারতীয় সংসদে ১৬৪জন সাংসদের বয়স ৪০ বছরের কম। ‘Fake news is not a current era news.’ এই ধরণের ভুয়ো খবর আগেও ছিল। সত্য সত্যের উপর নির্ভর করে। মিথ্যের উপর নয়।‘’
এআইপিসি(AIPC)-এর পূর্বাঞ্চলীয় কোঅর্ডিনেটর জারিতা লেইটপ্লাঙ্গ (Szarita Laitplang) বলেন, ‘’আমরা কমিউনিটি তৈরি করতে চাইছি। কমিউনিটি তৈরি করতে হবে। আমরা প্রফেশনালদের আহ্বান জানাচ্ছি আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য। বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করতে চাই। তাঁদের আহ্বান জানাচ্ছি। মুক্ত মনে আসুন আমাদের মঞ্চে আসুন। আমরা আলোচনা করব। দেশে সমস্ত মানুষ মিথ্যে খবরের উপর নির্ভর করছে না। মানুষকে বোকা বানানো সহজ নয়। মিথ্যে কথা এবং ভুয়ো খবর বন্ধ করতে হবে। আমরা নতুন মঞ্চ গড়ে তুলতে চাইছি।‘’

কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী বলেন, ‘’উপেক্ষা কোনও বিষয় হতে পারে না। ফোকাস সত্যের উপর হওয়া উচিৎ। আপনার দর্শন কেউ বদলে দিতে পারবে না। আপনি যদি সত্যের উপর নির্ভর করেন। যদি আপনি সত্যের পক্ষে থাকেন। আমি গর্বের সঙ্গে বলছি দেশের প্রগতি হোক। সমাজের সব স্তরের মানুষের উন্নতি হোক। কতজন চা-ওয়ালা দেশে আছেন? একজন চা-ওয়ালা বলছেন আমি দেশের প্রধানমন্ত্রী! যিনি নিজের মাকে কুড়ে ঘরে রেখেছেন। ভুয়ো খবর আর নিজের প্রচার করতে দেশের ভান্ডার থেকে ৪৫, ০০০ কোটি টাকা খরচ করেছেন মোদীজী। দেশের বিকাশ কতটা করেছেন তিনি?’’
সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় আলোচ্য প্রতিবেদকের প্রশ্নের উত্তরে প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী বলেন, ‘’পশ্চিমবঙ্গে কোন দলের সঙ্গে জোট হবে সেটা এখনও ঠিক হয়নি। কংগ্রেস দল এককভাবে নির্বাচন লড়বে না বিরোধী দল সিপিএমের সঙ্গে জোট করবে? অথবা তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে ২০১১ সালের মতো জোটে লড়বে বিষয়টা ঠিক হয়নি। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধির সঙ্গে আজ (২৯ অক্টোবর) দিল্লিতে রাজ্য কংগ্রেস নেতৃত্ব আলোচনা করছেন সেখানে কী সিদ্ধান্ত হয় সেটা আমাদের দেখতে হবে। কংগ্রেস কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব রাজ্য নেতৃত্বের উপর কিছু চাপিয়ে দিতে চায় না। আপনি যৌথ প্রচারের কথা বলছেন। কেন্দ্রীয়ভাবে বিভিন্ন দলের ট্রেডইউনিয়নগুলি একসঙ্গে প্রতিবাদ কর্মসূচী নিচ্ছে। কংগ্রেস রাস্তায় প্রতিবাদে আছে।‘’
ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে ঋজু ঘোষাল আরও বলেন, ‘’দেশের ইতিহাস আপনিও জানেন আমিও জানি। ট্রুথ মানে সত্য। সবার উপরে সত্য তার উপরে কিছু নায়। সারা বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির যে উন্নয়ন হয়েছে সেখানে আমাদের আরও সচেতন হতে হবে। প্রাণঞ্জয় গুহঠাকুরতা বলেছেন। অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে এই সম্মেলন তৈরি করবে আগামীর নেতৃত্ব।‘’