Wednesday, 12 September 2018

সীমান্ত ভাঙা নতুন সীমান্তের স্বপ্ন দেখা শতাব্দী?

 দীপেন্দু চৌধুরী 

অসমের নাগরিকপঞ্জি ৩০ জুলাই প্রকাশের পরে সংবাদ মাধ্যমে বিষয়টা ক্রমশঃ ছোট হয়ে আসলেও আলোচনা, মতবিনিময় সভা, তর্কবিতর্ক কিন্তু চলছে। পিপলস ফিল্ম কালেক্টিভ এবং পিপলস স্টাডি সার্কেল যৌথ উদোগে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করে। ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ যোগেশ মাইম মঞ্চে এই আলোচনা সভা ছিল। উল্লেখিত দু’টি সংস্থা গত দু’বছর যাবৎ রাজ্যের কলকাতা শহর সহ জেলার বিভিন্ন জায়গায় সমাজ সচেতন সিনেমার প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করছে। ছোট ছোট সিনেমা তথা তথ্যচিত্রের মাধ্যমে সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক আলোচনা সভার আয়োজন করে এই আলোচ্য গোষ্ঠীটি। কয়েকজন উচ্চ শিক্ষিত, সমাজ সচেতন তরুণতরুণী সামাজিক দায়িত্বের অবস্থান থেকে বর্তমানে ‘টক অব দ্যা টাউন’ হয়ে উঠছে বলা যায়। এই গোষ্ঠীর উদ্যোগেই আমরা দেখেছি একটি বস্তুনিষ্ঠ তথ্যচিত্র। ভারতের বিভিন্ন শহরে পরিচারিকাদের দৈনন্দিন জীবনের যেসব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় সেই বিষয়ের উপরে ছবি দেখেছি। যে বিষয়টি নিয়ে আমি আমার একটি ব্লগে লিখেছিও। ওই তথ্যচিত্রে যে পরিচারিকা ছবির মুখ্য চরিত্র ছিল তাঁর পরিচয় পত্র ছিল না। সেই প্রসঙ্গে আসে ‘আধার কার্ড’। অত্যন্ত মুনশিয়ানার সঙ্গে ছবিটিতে বক্তব্য হাজির করেছিলেন পরিচালক। সঙ্গে ছিল আলোচনা।
পরে আরও একটি ছবি আমরা দেখি। নকশাল বাড়ি আন্দোলনের প্রথম সারির প্রবাদ প্রতিম নেতা তথা সাংবাদিক, লেখক এবং স্বনামধন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় কবি সরোজ দত্তকে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে ছবিটি। সরোজ দত্তের বিতর্কিত মৃত্যু অথবা নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়াকে বিষয় করে এধরণের ছবি গত চার-পাঁচ দশকে হয়েছে বলে মনে করতে পারছি না। ছবিটির নাম ছিল ‘সরোজ দত্ত অ্যান্ড হিজ টাইমস’, পরিচালনায় কস্তুরী এবং মিতালী। ছোট্ট একটা ওয়েবক্যাম ক্যামেরায় তোলা হয়েছে ছবিটি। অনেক অজানা তথ্য এই ছবিতে আমরা দেখতে পেয়েছি। কস্তুরী এবং মিতালীকে অভিনন্দন। সীমিত আর্থিক সহায়তায় স্বউচ্চারিত শব্দের নস্টালজিয়া, তথ্য, সংলাপ এবং প্রশ্ন তুলে দেওয়ার জন্য। আমরা অভিনন্দন জানাব কলকাতার জার্মান কনস্যুলেট জেনারেলকেও। সম্প্রতি কলকাতার ম্যাক্সম্যুলার ভবন ছবিটি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছিল।      
৯ সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠানের বিষয়ে বলার আগে আমরা একটু প্রাককথন সেরে নিতে চাইছি। চলতি বছরের ৩০ জুলাই অসম নাগরিকপঞ্জি প্রকাশের পরে দেশবাসির উদ্বেগ ছিল। বড় ধরণের কোনও গন্ডগোল হতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকার, অসম রাজ্যসরকার সহ উত্তর পূর্ব রাজ্যের সরকারগুলি সব রকমের নিরাপত্তার আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। সূত্রের খবর সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত সেনা বাহিনীকে যে কোনও পরিস্থিতির জন্য তৈরি থাকতে বলা আছে। অসম এবং প্রতিবেশী রাজ্য গুলিতে ২২০০০ আধাসেনা পাঠানো হয়েছে। প্রকাশিত খসড়া তালিকা থেকে আমরা জানতে পেরেছি মোট ৩ কোটি ২৯ লাখ ৯১ হাজার ৩৮৪ জন এনআরসিতে আবেদন করেছিলেন। নাম বাদ পড়েছে ৪০ লক্ষ ৭ হাজার ৭০৭ জনের। সংবাদ মাধ্যম জানাচ্ছে কাদের নাম বাদ পড়েছে নাগরিকপঞ্জি কতৃপক্ষ জানাবে না। ব্যক্তিগত উদ্যোগে এসএমএসের মাধ্যমে অথবা অনলাইনে বা হেল্পলাইনে ফোন করে জেনে নেওয়া যাবে। কেউ মনে করলে সেবাকেন্দ্র থেকে জেনে নিতে পারবে।
৩০ জুলাই নাগরিকপঞ্জি প্রকাশ করে এনআরসি রেজিস্টার জেনারেল অফ ইন্ডিয়া শৈলেশ বলেছিলেন, ‘’ আজ শুধু অসম নয়, দেশের পক্ষে ঐতিহাসিক দিন। এত বিরাট, জটিল প্রক্রিয়া আজ পর্যন্ত দেশ তো বটেই বিশ্বেও হয়নি। ১৯৫৫ ও ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব আইন ও নির্দেশিকা মেনে স্বচ্ছভাবে প্রক্রিয়া চলেছে। সাড়ে ৬ কোটি নথিপত্রের অনেক তদন্ত, যাচাই ক্রমাগত হয়ে চলেছে। ২০১৩ সাল থেকে শুরু। কেন্দ্র ও রাজ্যের করা পরিশ্রম, হাজেলা এবং তাঁর দল মিলিয়ে ৫০ হাজার কর্মী এই প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন। এটা খসড়া মাত্র। সকলে নিজের নাম ঢোকানো বা সংশোধনের পর্যাপ্ত সুযোগ পাবেন। যারা পাবেন না, তাঁদের সাহায্য করবে দফতর। সম্পূর্ণ ন্যায় বিচার পাবেন প্রত্যেক ভারতীয়।‘’
এদিনের অনুষ্ঠান মঞ্চে ‘আসামের নাগরিক পঞ্জির সাতকাহন’ বইটি ‘পিপলস স্টাডি সার্কেল’ এর তরুণ প্রকাশক দ্বৈপায়ন ব্যানার্জী লেখক দেবর্ষি দাসের হাতে তুলে দিয়ে বইটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশ ঘোষণা করেন। বইটির প্রচ্ছদে লেখা আছে ‘’আসামে নাগরিকপঞ্জি বা ‘এন আর সি’-র খসড়া বেরিয়েছে ৩০ জুলাই। ৪০ লক্ষ মানুষ নাগরিক তালিকাতে জায়গা পান নি। নাগরিকপঞ্জির পিছনের ইতিহাস কী? পূর্ববাংলা থেকে আসা আসামের প্রজন্মের সাথে ‘এন আর সি’-র দাবির কী সম্পর্ক? কোন রাজনীতি নাগরিক পঞ্জির পেছনে রয়েছে? ভবিষ্যতে কী হতে চলেছে? ৪০ লক্ষ দেশহীন মানুষকে নিয়ে কী করা উচিৎ? প্রশ্ন অনেক। প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে পড়ুন এই ছোট বই।‘’
দেবর্ষি বলেন, ‘’আসামের নাগরিকপঞ্জির প্রাক ইতিহাস আছে। নাগরিকপঞ্জিকে কেন্দ্র করে একটা সেন্টিমেন্ট তৈরি হয়েছে। সেই ট্রাজিক দিকটা আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি আমার এই ছোট্ট বইয়ে। আমি বলতে চেয়েছি লড়াইটা অত্যন্ত মানবিক এবং স্পর্শকাতরতার।‘’ দেবর্ষি এর পরে নাগরিকপঞ্জির তৈরির ইতিহাস শোনান আমাদের। ভারতের স্বাধীনতা এবং ভারত ভাগের আগে থেকে অসম জাতি, উচ্চবর্ণ বাঙালি, উচ্চবর্ণ অহমজাতি, জনজাতি, বিহারের ছোট নাগপুর থেকে চা বাগানে কাজ করতে যাওয়া নতুন ‘চা-জাতি’।  এঁদের সম্পর্কে তিনি বলেন। আমি নিজে দেবর্ষির লেখা বইটি এখনও পড়ে উঠতে পারিনি। তাঁর বিষয়গুলি তিনি এদিন আলোচনায় আনলেন। ১৮৯০ সাল থেকে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা ছোটচাষি, ভূমিহীন চাষিদের অসমে আসার কথা উল্লেখ করেন দেবর্ষি। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অসমের জনবিন্যাস বদলে যাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন।
দেবর্ষি মূলত পাঁচটা বিষয়ে আলোকপাত করতে চেয়েছেন তাঁর লেখা বইয়ে। ১) আসামের নাগরিকপঞ্জি মানে কী? ২) বিদেশী তাড়ানো নিয়ে গোলমাল কেন? ৩) আদৌ কি বিদেশী আছে? ৪) নাগরিকপঞ্জির অন্যায়ের বিষয়গুলি কী? ৫) বর্তমান অবস্থায় কী করতে হবে?
‘পিপলস স্টাডি সার্কল’ অসম নাগরিকপঞ্জি বিষয়ে ৬টি বই প্রকাশ করবে। সংস্থার আমন্ত্রণপত্র থেকে আমরা এই বিষয়টা জানতে পারি। আমন্ত্রণ পত্রে লেখা হয়েছে।              
‘’Dear Friends,

The People's Study Circle was formed in Kolkata in April 2017, as a group of individuals - alarmed by the rise and rise of fascism in the country - came together feeling the urgent need to create an accessible independent and non-partisan study space where activists and academics could converge to study the society with an interventionist approach but without losing the discipline and rigour that serious and in-depth study demands. 

The Study Circle successfully ran a monthly lecture series on Fascism, Nationalism and Religion for 8 months. After that, we began our Group Study sessions, held every 3 weeks, where we extensively read primary texts concerning communal polarisation, the migration issue, critical texts on the Hindutva iconography in Bengal and even went over some of the Rightwing texts and books.

We are happy to announce a series of six 'Little Books', to be published by the People's Study Circle over the next 3-4 months. The first two titles (on the NRC in Assam, and an appraisal of the myths around Shyamaprasad Mukherjee) are as follows. The Little Books are typically 40 pages long, cost Rs. 15 each, and are written in lucid, jargon-free, attractive styles, which we hope will appeal to one and all!

Please spread the word. Buy our books, place bulk orders, and also donate generously to our 'Little Books' publishing fund. We will fight the rightwing propaganda machine with all mediums at our disposal.’’

 আমাদের যে সময় চলে গেছে সেই সময়ের কথা নতুন করে ভাবেত বলছেন দেবর্ষি। তিনি আরও বলেন, ‘’আসাম জাতীয়তাবাদী একটি এনজিও ২০০৯ সালে একটি জনস্বার্থের মামলা করে। ২০১৪ সালে সেই মামলার রায় বের হয়। ২০১৮ সালে দ্বিতীয় খসড়া প্রকাশ হয়। ২ কোটি ৯০ লক্ষের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে। ৪০ লক্ষের নাম ওঠেনি। যাঁদের নাম ওঠেনি তাঁদের মধ্যে মহিলাদের সংখ্যা সব থেকে বেশি। আমার নিজের বাড়ি কাছাড় অঞ্চলে। আমাকেও বার কয়েক ডেকে পাঠানো হয়েছে। আমি নিজের অঞ্চলে থেকে ক্ষেত্র সমীক্ষা করেছি।‘’

৪ জুলাই, ২০১৮ সালে অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘ফার্স্ট পোস্ট’- সংস্করণে সুশান্ত তালুকদার অসম নাগরিকপঞ্জির বিষয়ে একটি লেখা লেখেন, সেই লেখায় তিনি অসমের নাগরিকপঞ্জি প্রকাশের পরে মহিলাদের সমস্যার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছিলেন। তিনি লেখেন,

‘’Sometimes, it can be the other way round and it turns out in the hearings that the three have ganged up together to deprive the fourth lone person who is the real descendant. As such, during the hearings that were held from February this year onwards, it was found that some persons who had already been included in the part draft were not the true descendants. The state coordinator, however, explained that all those 65,694 excluded due to family tree investigation would be able to appeal for reconsideration of their application or submit new documents for verification during the claims and objection after the publication of the complete draft.
When asked about the exclusion of 48,456 married women from the complete draft, who earlier were included in Part Draft, the NRC State Coordinator explains that at the time of publication of the part draft there was little time left for detail verification as directed by the Supreme Court on 5 December on the panchayat certificates submitted by married women.
Hence, based only on verification of authenticity by issuing authority and field verification results, names of some married women who had submitted such certificates were erroneously included by the field officers. However, the Supreme Court made it clear in the judgment dated 5 December 2017 that the certificates issued by the GP Secretary/Executive Magistrate will be acted upon only to establish a linkage between the holder of such certificate and the person(s) from whom a legacy is being claimed.
The apex court said in the judgement the certificate will be put to such limited use only if the contents of the certificate are found to be established on due and proper enquiry and verification.
Thorough verification of the panchayat certificates submitted by married women could not be taken up before publication of part draft and some such applicants were inadvertently included in the part draft. Exhaustive verification as directed by the Supreme Court was started only in April this year and in respect of these women it has been found that the contents of the certificates submitted to claim that she is the daughter of the person whose legacy data has been used were not established during the verification and therefore their linkages were rejected," Hajela says.
However, after the publication of the complete draft, they would be able to appeal during claim and objection process for re-verification of the certificates or submit additional authentic documents that prove their eligibility.’’ 
দেবর্ষি চিন্তিত শুধুমাত্র অসমের জনবিন্যাস বা উত্তরপূর্ব ভারতের জনসংখ্যা নিয়ে নয়। তিনি তাঁর ক্ষেত্র সমীক্ষা থেকে উঠে আসা যে ছবি তাঁর বইয়ে এঁকেছেন সেখান থেকে আরও বলেন, ‘’আসামে ৬টি বন্দিশিবির রয়েছে। যেগুলিকে ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’ বলা হচ্ছে। তালিকায় নাম নেই এমন কিছু মানুষকে এইসব বন্দিশিবিরে রাখা হয়েছে। আসামের ৬টি জেলকে বন্দিশিবির হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে যাদের নাম ৩১ ডিসেম্বরের পরেও উঠবে না তাঁদের দেশ থেকে চলে যেতে হবে না। ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’- এ রাখা হবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসাবে। এইসব নাগরিকদের ভোটের অধিকার থাকবে না। জমি কিনতে পারবে না। ‘ওয়ার্ক পারমিট’ দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। অনেকটা মেক্সিকো থেকে আসা অবৈধ নাগরিকদের বিষয়ে আমেরিকা সরকার যেটা করে থাকে। ২০১৬ সালে ভারতীয় নাগরিকত্ব আইনে সংযোজনী হিসাবে একটি বিল এনেছে এনডিএ সরকার। এই বিল পাশ হয়ে আইন হিসাবে আসলে আসামের নাগরিকপঞ্জিকে কেন্দ্র করে কী হতে পারে?’’
দেবর্ষি আগামী দিনের ভয়াবহ এক ছবির কথা আমাদের ভাবতে বলছেন। তবে তিনি এটাও বলছেন, ‘’সীমান্ত ভেঙে ফেলা যাবে। অথবা আমাদের প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কোনও সীমান্ত থাকবে না। আমি এখনই আকাশকুসুম এই স্বপ্নবিলাসিতায় থাকতে চাইছি না। সেইদিনের কথা সুদূরপ্রসারি সময়ের অপেক্ষায় তুলে রাখা ভালো। তবে ভোট রাজনীতির জন্য গরিব এবং সাধারণ অশিক্ষিত খেটে খাওয়া মানুষের পাশে আমাদের থাকতেই হবে। সেখানে নির্দিষ্ট জাতি, ধর্ম বলে কিছু হয় না। হতে পারে না‘’
ভারতের বৈধ নাগরিক হিসাবে আমাদের এই কথা বলতে হবে অসমের ২০১৮ সালের নাগরিকপঞ্জি যেন আমাদের দেশে তথাকথিত এক অভিশপ্ত দিন ডেকে না আনে। সাধারণ মানুষ, ভারতের নাগরিক সমাজকে সামনে এগিয়ে আস্তে হবে। মানবিক সমাধান কী হতে পারে এটা ঠিক করতে। এখনও অনেকটা সময় আছে। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে দেশের বিদ্বৎ সমাজ সেমিনার ডাকুক। বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে আলোচনা হোক।  কেন্দ্রীয় সরকার আরও আলোচনায় যাক। লোকসভা, রাজ্যসভায় বিরোধীরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করুক। সমাধান বেরিয়ে আসবেই। ভারতের মতো উন্নত গণতান্ত্রিক একটি দেশ মানবিক সমাধান ঠিক খুঁজে নিতে পারবে বলেই মনে হয়।                      
 

Tuesday, 11 September 2018

সামাজিক তর্পণে বর্তমান সময়েও গাঁধীজী চিরন্তন




দীপেন্দু চৌধুরী
সালটা খুব সম্ভবত ১৯৭৬। আমরা স্কুলের গণ্ডি পার হয়ে কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। রাজনৈতিক সচেতনতা মাত্র ১৭-১৮ বছর বয়সে ততটা আসার কথা নয়। তবু কিছুটা ছিল। প্রেক্ষাপট অবশ্যই আমার বাবা, মা, দাদা সহ আমাদের পরিবার। আমাদের আত্মীয়স্বজনদের ‘কংগ্রেস’ পরিবারের সঙ্গে যোগসূত্র। এছাড়া ছিল আমার উপর আমার মায়ের ‘স্বদেশী আন্দোলন’-এর প্রভাব। এই ১৯৭৬ সালে আমার জীবনে তথা আমার সামাজিক জীবনে একটি বড় ঘটনা ঘটে যায়। সে বছর দুর্গাপূজোর সময় একাদশির দিন ‘শ্যামধারী’ নামে একজন ‘দলিত’ (বর্তমানে বিতর্কিত শব্দ) শ্রেণির মানুষ আমাদের বাড়িতে ‘সিঁদে’ নিতে আসে। গাঁধীজীর ভাষায় সেই সময় এই সমাজের  প্রান্তিক মানুষদের ‘হরিজন’ বলা হত।  অথবা তথাকথিত সমাজপ্রভুদের কাছে তপসিলি সম্প্রদায়ভুক্ত যেসব  মানুষরা ‘অচ্ছুৎ’  ছিল। অস্পৃশ্য ছিল। তাঁদের অবস্থানকে ‘হরিজন’ হিসেবে লেখা হত। পরে হরিজন শব্দটির ব্যবহারও উঠে যায়। আমাদের প্রসঙ্গ ‘শ্যামধারী’। সে আমাদের ছোট্ট গঞ্জ শহরের বিভিন্ন পাড়ায় কাঁচা ড্রেন পরিষ্কার করত। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ‘বর্জ’, মল, মূত্র পরিষ্কারের কাজ করতে হত শ্যমধারীকে। যে সব বাড়িতে খাঁটা পায়খানা ছিল সেইসব বাড়িতেও শ্যামধারী মল, মুত্র পরিষ্কারের কাজ করত। শ্যামধারীদের মত ‘মেথর’, ‘ডোম’ এঁরা একাদশী থেকে চতুর্দশী পর্যন্ত বিভিন্ন বাড়ি বাড়ি ঘুরে ‘সিঁদে’ নিতে যেত।
সে বছরও আমাদের বাড়িতে তিনি এলেন। পড়নে ‘মার্কিন কাপড়’-এর নতুন কোরা ধুতি। লুঙ্গির মতো করে পড়েছেন তিনি। খালি গায়ে একটা নতুন সস্তার গামছা। খালি পা। হাতে একটা বাঁশের ঝুড়ি। তাতে ‘বাবু বাড়ি’ থেকে যে যা যা দেবে সে সব শ্যামধারীর ঝুড়িতে ফেলতে হবে। আমার মা-ও দিলেন। সিঁদুর লাগানো সুপারি,  চাল, আলু, নারকেল নাড়ু, খইয়ের নাড়ু, চিড়ের নাড়ু। এবং সিঁদুর লাগানো পাঁচটা টাকা সঙ্গে ধাগা। সুতোর ধাগা সিঁদুর এবং হলুদ জলে চোবানো। শ্যামধারী দূর থেকে মাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন। আমি পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমাকেও প্রণাম করতে এলো। শ্যামধারি আমার থেকে কুড়ি-পঁচিশ বছরের বড়। আমি থামিয়ে দিয়ে প্রথমে নমস্কার পরে ‘কোলাকুলি’ করলাম। এবং আবার নমস্কার করলাম। শ্যামধারীর দু’চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে। টপ টপ করে চোখের জল শিশির বিন্দুর মতো আমার পীঠে পড়ল। শ্যামধারী ওইদিনের পর থেকে আমাদের বাড়িতে আর কোনওদিন ড্রেন পরিষ্কার করতে আসেন নি। ওর ছেলে আসত। পরে আমি ওর সঙ্গে বহুবার কথা বলতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমাকে দেখলেই ছুটে পালিয়ে যেত। প্রচুর দেশীমদ খেত। চুল্লু খেত। সেই কারণে অনেকেই ওকে এড়িয়ে চলত। আমি সমাজকর্মী হিসেবে একবার শ্যামধারীর বাড়ি গিয়েছিলাম। হাসপাতালের মেথর বস্তিতে থাকত। সেই সময়ের এই সব বস্তির যেমন ছবি হয় সেরকমই ছিল। চারিদিকে নোংরা, শুয়োর, মুরগী ঘুরছে। নাকে পোটা ঝরা ছেলে মেয়ের দল উদোম গায়ে খেলা করছে। কম আলোর খড়ের চাল দেওয়া ঘর। শ্যামধারী ছিল না। ওর বড় ছেলে ছিল। এখন নাম মনে নেই। আমাকে ঘরে নিয়ে গেল। ঘরের দেওয়ালে দেখলাম তিনটে ছবি। একটা শিবদুর্গা, একটা কালী আর অন্যটা মহাত্মা গাঁধীর। তিনটে ছবিই ক্যালেন্ডার কেটে বাঁশের সরু বাতা দিয়ে ঘরে বাঁধানো। মহাত্মা গাঁধীর ছবির নীচে বাংলায় লেখা ‘সত্যমেব জয়তু’। যদিও শ্যামধারিরা বিহারের লোক। আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবার। প্রান্তিক সমাজের অ-জলচল সম্প্রদায়ের মানুষ ওরা। নিম্নবর্ণের মানুষ। পেটে চুল্লুর জল যতটা পাওয়া যাবে, তুলনায় পেটে ঘুষি মারলে একটা হিন্দি বা বাংলা শব্দ বেরবে না। তাতে ওদের কীই বা এসে যেত? তাই ক্যালন্ডারের ছবি বাঁশের সরু বাতা দিয়ে বাঁধিয়ে রেখেছে। মহাত্মাজীকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে। এর থেকে আর বেশি কী করতে পারে? আমার সেদিন প্রথম ভারতদর্শন হয়ে যায়। গাঁধীজীর ভারতকে সেদিন প্রথম খুঁজে পাই আমার নিজের শহরে।
সেদিনের পর থেকে দু’টো গানের কয়েকটা কলি আবেগের সঙ্গে মনে মনে আবৃত্তি করি।  একটা ‘ধন ধান্যে পুস্পে ভরা/ আমাদের এই বসুন্ধরা/ তাহার মাঝে আছে যে এক/ সকল দেশের সেরা।’ দ্বিতীয় গানটা ‘ও আমার দেশের মাটি/ তোমার পরে ঠেকাই মাথা’। আজও দুটো গান কোনও শিল্পীর ভরাট গলায় শুনে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারি না। মন খোঁজে গাঁধীজীর গ্রাম। গাঁধীজির আটচালা, তাঁর সাধের চরকার আশ্রম।      
আজকে গাঁধীজীকে নিয়ে আমার সীমাবদ্ধ ঞ্জানে যে লেখাটা লিখতে চাইছি সঙ্গে এই অভিঞ্জতা না দিলে নিজেকে হয়ত ঠাকানো হবে। এই কারণে বিদগ্ধ পাঠকদের কাছে বিনীত অনুরোধ। এই অভিঞ্জতাকে কোনওরূপ আত্মপ্রচার হিসেবে ভাববেন না। গাঁধীজী নিজের আত্মকথায় লিখছেন, ‘’পৃথিবীতে কাহাকেও ঘৃণা করিতে অসমর্থ বলিয়া আমি নিজেকে মনে করি। বহু কালের প্রার্থনাময় ও সংযত জীবন যাপনের ফলে চল্লিশ বৎসরের বেশি হইল কাহাকেও ঘৃণা করা হইতে বিরত আছি। আমি জানি যে এই দাবি খুব বড় রকমের, তথাপি সবিনয়ে আমি এই দাবি করি। কিন্তু যেখানেই পাপ থাকুক আমি তাহা ঘৃণা করিতে পারি এবং করিও। ইংরেজরা ভারতবর্ষে যে- শাসনপ্রণালী চালাইতেছে তাহা আমি ঘৃণা করি। লক্ষ লক্ষ হিন্দু যে-কুৎসিত অস্পৃশ্যতা-রীতির জন্য নিজেদের দায়ী করিয়া রাখিয়াছে আমি অন্তরের অন্তস্থল হইতে তাহা যেমন ঘৃণা করি, ভারতের নির্মম শোষণকেও তেমনি ঘৃণা করি।‘’ ( পৃষ্ঠা- ৪৬, মানুষ আমার ভাই, সাহিত্য অকাদেমী, নিউ দিল্লি, শতবর্ষপূর্তি সংস্করণ, ২ অক্টোবর, ১৯৬৯)
ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এবং গাঁধীজী
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন তথা কংগ্রেস নামক দলের ইতিহাসে সবচেয় গুরুত্ব দিতে হয় তিনজন প্রথম সারির ব্যক্তিকে। তিনজন ব্যক্তি ছিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গাঁধী, জওহরলাল নেহরু এবং সুভাষচন্দ্র বসু। মা ডাকতেন- মনিয়া। বাবা বলতেন মনি। সেই মনি বা মনিয়া হয়ে উঠলেন মহাত্মা, বন্দিত হলেন দেশের পিতা হিসেবে। বর্তমান একুশ শতাব্দীতেও তিনি সমান প্রাসঙ্গিক। নিঃসন্দেহে হিংসার প্রশ্নে তাঁর চিন্তাধারা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। নিম্নবর্ণের মানুষ আক্রান্ত হলেই জেনে হোক অথবা না জেনে তাঁর চিন্তাধারায় আশ্রয় খোঁজে। ওই অর্ধনগ্ন দেহের একজন মানুষের কাছে ছুটে ছুটে যায়। আমার এক স্কুলের শিক্ষক আমাকে বলেছিলেন, ‘ভেবে দেখেছিস কখনো? গাঁধীজী একজন ব্যারিস্টার মানুষ। যেমন তেমন ব্যারিস্টার নন। বিলেত থেকে পাশ করে আসা ব্যারিস্টার। সেই মানুষ, হেটো ধুতি পড়ে হাতে একটা লম্বা লাঠি নিয়ে দেশের এপ্রান্ত থেকে সে প্রান্ত ছুঁটে চলেছেন। কি করে সম্ভব? ভেবে দেখ।’ আমি সত্য সত্য আজও ভাবি। ভারতের আত্মা চিনে ছিলেন তিনি। আউল, বাউল, ফকির, সুফি, সাধুসন্ন্যাসীদের দেশ ভারতবর্ষ। তৎকালে দেশের নিম্নবর্ণের মানুষ বছরে একবার অথবা দু’বার জামা পড়তেন। বাড়িতে কোনও উৎসবে অথবা সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে। এই সংস্কৃতি তিনি আত্মস্থ করেছিলেন। শুধুমাত্র এই একটা কারণই নয়। নিজের লব্ধ ঞ্জানের উপলব্ধি ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিলো বলেই মনে হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকার সময় তিনি অনুভব করেছিলেন খেটে খাওয়া মানুষের হ্রদয়ে পৌঁছতে গেলে তাঁদের নিজেদের লোক হতে হবে। তাঁদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে হবে। গাঁধীজীর রাজনীতিতে আবির্ভাব হয়েছিল গত শতব্দীর দ্বিতীয় দশকে। দক্ষিণ আফ্রিকার সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সযত্ন লালিত আপন চর্চা তাঁকে গণদেবতার আসনে বসিয়ে ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেক্ষাপটটা কী ছিল? সেই দেশের নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেস মূলত সেখানকার ব্যাবসায়ীরা নিজেদের দাবি সমূহ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের কাছে পেশ করত। নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেসের মাধ্যমে। এই ব্যাসায়ীরা অবশ্যই ছিলেন ভারতীয় এবং বিত্তবান। খেটে খাওয়া শ্রমিকশ্রেণীর এই সংগঠনের সদস্য হবার অধিকার ছিল না। সেই বিষয়টা গাঁধীজীকে ভাবিয়ে থাকতে পারে। তিনি ভারতে ফিরলেন এমন একটা সময়ে যখন কংগ্রেসের হাল ধরার মতো কেউ নেই। যে ব্যক্তি ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে দর কষাকষি করতে পারবে আবার দেশের স্বাধীনতার দাবি নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবেন। এইরকম এক সন্ধিক্ষণে তিনি ভারতে এলেন। আট বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় আন্দোলন করে ১৯১৬ সালে তিনি ভারতে এলেন। ভারতে একদিকে খিলাপৎপন্থীরা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলছে। পাশাপাশি কংগ্রেসের নেতৃত্বে স্বাধীনতার আওয়াজ উঠছে। দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট, ব্রিটিশপ্রভুর অত্যাচারে জর্জরিত ভারতীয়রা স্বাধীনতার দাবিতে উদ্বেল হয়ে উঠছে। ভারতের এই গণআন্দোলন গাঁধিজীর জন্য প্রেক্ষাপট তৈরি করেই রেখেছিল।
দক্ষিণ আফ্রিকার সীমিত এবং নিয়ন্ত্রিত গণআন্দোলনের অভিঞ্জতা ভারতের আন্দোলনে কাজে লাগাতে তিনি সচেস্ট হলেন। অভিঞ্জতা থাকলেই গণআন্দোলনের রাশ ধরা যায় না। প্রয়োজন হয়ে থাকে আরও কয়কটি বিষয়। এর মধ্যে অন্যতম উল্লেখিত নেতৃত্বের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির। যেটা গাঁধীজী সযত্নে গড়ে তুলেছিলেন। ফলে তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে দ্রুত জায়গা করে নিলেন। পরিসর আগে থেকে তৈরিই ছিল। সঙ্গে তিনি যুক্ত করতে পারলেন নিজের সাধারণ অর্ধউলঙ্গ পোশাক, পায়ে খড়ম, আকর্ষনীয় সরল সাধারণ জীবনযাত্রা। এবং ভারতীয় প্রথম সারির ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির মিশ্রণ ঘটাতে সহায়ক হয়ে উঠলেন তিনি। ধর্ম এবং রাজনীতির এই সমন্বয় তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজেই গ্রহণ যোগ্য করে তুলল। ভারতের প্রান্তিক মানুষ, নিম্নবর্ণের মানুষ যাদের অচ্ছুৎ করে রেখেছিল সমাজের উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় শ্রেণী। গাঁধীজী তাঁদের কাছে ‘মিথ’ হয়ে গেলেন। ভারতের নিরন্ন, খেটে খাওয়া মানুষ মোহাবিষ্টের মতো তাঁর গড়ে তোলা আদর্শ, মঞ্চ, আন্দোলন, চরকা, আশ্রমে ভিড় জমাতে থাকলেন।
বিহারের চম্পারন এবং গুজরাটের খেদায় দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা কৃষক আন্দোলনের পাশে থেকে আন্দোলনের সাফল্য আনতে সাহায্য করলেন। এই দু’টি ঘটনা তাঁকে দেবত্বে উত্তীর্ণ করতে সফল হল। পরাধীন ভারত পেল তাঁর নেতা। এরপর আমরা পেলাম তাঁর সেই বিখ্যাত অসহযোগ আন্দোলন। ১৯২০-২১ এবং ১৯৩০-৩১ এর আইন অমান্য তথা অসহযোগ আন্দোলন কাল বৈশাখী ঝড়ের মতো উথাল পাথাল রূপ নিয়েছিল। ঐতিহাসিকরা বলছেন ‘স্বরাজ’ নামক বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের জন্য দেশ প্রস্তুত ছিল না। ভারতীয় বুর্জোয়াদের স্বার্থ দেখা এবং দেশের ধর্ম-বর্ণ সহ একাধিক সম্প্রদায়ের স্বার্থ দেখাটা প্রকৃত নেতার কাজ ছিল। সেই কারণে তিনি অনেক সময় দ্বিধায় ছিলেন। আন্দোলনের রাশ যাতে লাগাম ছাড়া না হয়ে যায় এই বিষয়টা সম্ভবত ব্যক্তি এবং ব্যরিস্টার মোহনদাসকে ভাবতে হয়েছিল। এই কারণেই কী তিনি ব্রিটিশ শাসনের মধ্যে থেকে ভারতীয়দের হাতে কিছু ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে ছিলেন? ১৯২১ সালের কংগ্রেস অধিবেশন, ১৯২৭ সালের মাদ্রাজে কংগ্রেসের অধিবেশন এবং ১৯২৮ সালের কলকাতা অধিবেশনেও তিনি পূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন না। কিন্তু এক বছর পরে তিনি উপলব্ধি করছেন ভারতের গণজাগরণকে আর উপেক্ষা করা যাবে না। ১৯২৯ সালের লাহোর অধিবেশনে নিজেই পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব উত্থাপন করছেন। ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ ভারত ছাড়ো আন্দলনের ডাক দেশের একমাত্র এবং অদ্বিতীয় নেতা মহাত্মা গাঁধী নিজেই দিচ্ছেন। অনাহার অনশন মানুষের বলে সভ্যতা জেনেছিল। তিনি সেটাকেই হাতিয়ার করে এগিয়ে আস্তে থাকলেন। অহিংসার সেই মহামন্ত্র বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর বিশ্বের মানুষের আন্দোলনের প্রধান অস্ত্র। সম্প্রতি আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন তাঁর আদর্শ হচ্ছেন তিনজন, মহাত্মা গাঁন্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলা এবং মার্টিন লুথার কিং (জুনিয়ার)। মহাত্মা গাঁধীকে নিয়ে সারা বিশ্বে নতুন করে বিশ্লেষণ হচ্ছে। আলোচনা হচ্ছে। অবশ্যই নতুন করে মূল্যায়ণ প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে ভারতে গাঁধীজীর মতো গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তির আবারও প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সেই কারণে কী কংগ্রেস সভাপতি  রাহুল গাঁধী মানসরোবর থেকে ফিরে রাজঘাট গেলেন? কৈলাসে তীর্থ করতে গিয়ে নিয়ে আসা মানসরোবর হ্রদের জল রাজঘাটে গাঁধীজীর সমাধিতে অর্পণ করেন রাহুল। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন কৈলাস যাত্রার পাথর। সেই পাথরও তিনি গাঁধীজীর সমাধিতে অর্পণ করেন। ভারতীয়দের বিশ্বাস কৈলাস যাত্রার পাথর কাউকে দেওয়া হলে তাঁরও কৈলাস সফরের সমান পুণ্যলাভ হয়।
বিজেপিও কী অনুভব করছে? কারণ সামনের বছর গাঁধীজীর সার্ধশতবর্ষ পালনের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ইতিমধ্যে দু’টি সভা হয়ে গেছে। এটাও চরম সত্য যে ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট ভারতের স্বাধীনতার দিনে গাঁধীজীর অনশন আর গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে দিন শুরু করেছিলেন। মনুবাহেন গাঁধী জানতে চেয়েছিলেন, এমন দিনে তিনি উপবাস কেন করছেন? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন পুণ্যদিনেই মানুষ উপবাস করে। কারণ তাতে শরীর সুস্থ থাকে। কেউ কেউ উল্লেখ করেন, না সেটা একমাত্র কারণ নয়। খুব সম্ভবত তিনি নীরবে প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলেন। তিনি দেশ ভাগ মেনে নিতে পারেননি। মহাত্মা গাঁধীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী নৃবিঞ্জানী নির্মলকুমার বসু খুব কাছ থেকে মহাত্মাকে দেখেছেন। গাঁন্ধী দর্শনকে উপলব্ধি করেছিলেন। একটি প্রবন্ধে তিনি লিখছেন, ‘’.........১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে ঘটনা। তখন গান্ধীজী বেলিয়াঘাটায় রহিয়াছেন এবং স্থানীয় যুবকদের সঙ্গে বহু বিষয়ে দীর্ঘ তর্কবিতর্কের পর এই আশ্বাস লাভ করিয়াছেন যে, তাহারা স্থানীয় একটি বস্তি হইতে মুসলমানদের উৎখাত করিয়া দেওয়া সত্বেও এবার তাহাদের মধ্যে যাহারা পরিশ্রম করিয়া খায় (............) তাহাদিগকে ফিরাইয়া আনিবেন ও স্বাধীন ভারতের নাগরিক হিসাবে তাহাদের সহিত সুব্যবহার করিবেন। যাহারা গত এক বৎসর ধরিয়া সর্বতোভাবে পাকিস্তান কায়েম করিবার চেষ্টা করিয়াছিল, তাহাদিগকে সদব্যবহারের দ্বারা আনুগত্যশীল ভারতের নাগরিকে রূপান্তরিত করিবার চেষ্টা করিবেন।
এই প্রতিঞ্জা গান্ধীজী যুবকগণের নিকট ১৫ই অগাস্ট নাগাদ লাভ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে অগাস্টের শেষে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে কলিকাতায় আবার এক দাঙ্গার সূচনা হয় এবং গান্ধীজীর সম্মুখেই বোমার আঘাতে দুইজন পলায়মান মুসলমান প্রাণ হারায়। গান্ধীজী অত্যন্ত চিন্তিত হইয়া উঠিলেন। পাঞ্জাবে তখন বিপুল দাঙ্গা চলিতেছে। আবার কলিকাতার দাঙ্গা যদি পূর্বাঞ্চলে ছড়াইয়া পড়ে তবে বিপদের অবধি থাকিবে না। সূচনাতেই এই আগুন কি ভাবে নিবানো যায় সে-বিষয়ে চিন্তা করিতে লাগিলেন।‘’
নির্মলকুমার সেই সময়ের ঘটমান ঘটনার এই বিষয়টি উল্লেখ করে থেমে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি থামেননি। তিনি ওই একই প্রবন্ধে আরও লিখছেন, ‘’ইতিমধ্যে বেলিয়াঘাটার যুবকের দল তাঁহার নিকটে এক নিবেদন করিলেন। অবশিষ্ট মুসলমানদিগকে তাঁহারা স্থানান্তরিত করিতে দিবেন না। তাঁহাদের মধ্যে দুই তিনজন গান্ধীজীর যুক্তির প্রতি অনাস্থাবশতঃ পলায়মান মুসলমানদের উপরে বোমা নিক্ষেপ করিয়াছিলেন, কিন্তু অধিকাংশই তাঁহার যুক্তি মানিয়া লইয়াছিলেন। তাঁহারা অবশিষ্ট বস্তিবাসীদের রক্ষার ভার লইবার সংকল্প করিয়াছেন। কিন্তু এই কাজ অস্ত্রের দ্বারা সাধন করিবেন। অহিংসা তাঁহারা জানেন না, বোঝেন না। অতএব তাঁহাদের প্রার্থনা, পুরানো মিলিটারি বন্দুক সমেত যদি পুলিশ তাহাদিগকে রাত্রে গ্রেপ্তার করে তবে গাধীজী যেন পুলিশকে বলিয়া তাঁহাদের ছাড়িয়া দেন।
এই বিচিত্র প্রার্থনা যখন গাধীজীর নিকটে পৌঁছাইল, তিনি মুহূর্তমাত্র বিলম্ব না করিয়া বলিলেন— ‘এঁদের বলিয়া দাও যে আমি সঙ্গে আছি।’ (উনকো কহ দো কি ম্যায় উনকে সাথ হুঁ)। আশ্চর্য হইয়া পরে যখন তাঁহাকে জিঞ্জাসা করিলাম, হিংসা বা অহিংসার তাহা হইলে সম্পর্ক কি? তিনি যাহা বলিলেন, তাহার মর্ম আপনাদের নিকট জানাইয়া আমার এই বক্তব্যের সমাপ্তি ঘটাইতেছি।
গাধীজী বলিলেন— ‘গভর্ণমেন্ট আজ প্রত্যেক নাগরিকের জীবন রক্ষা করিতে অসমর্থ হইয়াছেন। এরূপ অবস্থায় যুবকেরা যে সৎ উদ্দেশ্য লইয়া হিংসার ব্যবহার করিতেছেন, আমি নৈতিক বিচারে সেই উদ্দেশ্যকে সমর্থন করি। তাঁহারা অহিংসার কৌশল জানেন না। এ ক্ষেত্রে আমার দায়িত্ব হইল অহিংসার দ্বারা কি ভাবে রক্ষা সম্পাদন করা যায় তাহাই কার্যতর দেখাইতে হইবে, যতক্ষণ তাহা না পারিব ততক্ষণ যুবকদিগকে অপেক্ষা করিতে বলিতে পারি না, তাঁহারা স্বীয় ধর্ম অনুসারে আচরণ করিতে পারেন।’
নির্মলকুমার বসুর লেখা থেকে খুব পরিষ্কার হচ্ছে গাধীজী ‘স্বদেশ’ বলতে বুঝতেন আর্থসামাজিকভাবে উন্নত একটি রাষ্ট্রে সব ধর্ম, সব বর্ণ, সব জাতি এক সঙ্গে থাকবেন। সেটাকেই আধুনিক উন্নত গণতন্ত্র বলে। এই শিক্ষা, সংস্কৃতি তিনি যেমন সনাতন ভারতের গ্রাম সমাজ থেকে পেয়েছেন। পাশাপাশি শিল্প বিপ্লবের পরে ইউরোপের যে আলো ভারতে এসে আছড়ে পড়েছিল। যেটাকে আমরা উনবিংশ শতাব্দীর রেঁনেশা বলি। এই সময়ের একটু আগে পরে রাজা রামমোহন রায়, কালীপ্রসন্ন সিংহ, হেনরি লুই ডিরোজিও, পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একঝাঁক বাঙালি তথা ভারতীয় দেশ গঠনের জন্য কাজ করে গেছেন। গুজরাটের ছোট্ট মনিয়াও (গাঁধীজীর মা ডাকতেন) একদিন ওইসব মনীষীদের পথ অনুসরণ করে মহাত্মা হয়ে উঠলেন।
বি কে ভার্মা তাঁর Modern Indian political system: problems and prospects বইয়ে লিখছেন ‘’.......On the other hand, as differentiated from modern western political thought, recent western political thought begins with Hegel and Marx. Roughly the period, is parallel to the period indicated by modern political thought in India. Rammohan Roy was the contemporary of Hegel; Dayananda was the contemporary of Marx. In the history of modern Indian political thought a well-defined, clearcut and precise distinction between recent and modern is not possible. There is a line of distinction, however, between the exponents of the renaissance in India and the builders of the theory of nationalism. Roughly we can say that Rammohan Roy is the key figure in modern Indian political thought. Mahatma Gandhi has been the greatest personality in the contemporary history of India. From Gandhi, we can trace the rise of recent political thought. The recent theorists of Hindu and Muslim communalism may be taken, in some senses, to belong, intelectually, to the early period of the religious reformation of India.’’        
মুনিয়াকে আমরা মহাত্মা বলে সম্বোধন করতে পারি। কিন্তু এটাও সত্যি তিনিও মানুষ ছিলেন। গাঁধীর মতে অথবা তাঁর দর্শনে ব্যক্তির ভূমিকা সংগঠনের চেয়েও বড়। গাঁধি কোনও অবস্থাতেই একজন ব্যক্তিকে তাঁর ভূমিকা থেকে রেহাই দিতে চাননি। একজন ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে পৌঁছতে চেয়েছেন তিনি। একজন ব্যক্তির বিকাশ সম্ভব হলে তবেই সমষ্টির বিকাশ সম্ভব। আধুনিক গণতন্ত্রও সম্ভবত সেই আধার খোঁজে। আধুনিক ভারতের আধুনিক সংস্কৃতি, তথ্যপ্রযুক্তি, সামাজিক ভারসাম্যকে মান্যতা দিতে মুনিয়া বা মহাত্মা গাঁধীকে ভারতের খুব প্রয়োজন। আমরা অপেক্ষায় আছি বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের নেতৃত্বে তাঁর সার্ধশতবর্ষে গাঁধীজীর আধুনিক মননশীল বিশ্লেষণাত্বক লেখা দেখা এবং পড়ার জন্য। চলতি বছরের ২মে মোহনদাস গাঁধীর সার্ধ শতবার্ষিক উদযাপনের প্রস্তুতি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বৈঠকটি হয় রাষ্ট্রপতি ভবনে। প্রস্তুতি কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবে প্রধানমন্ত্রী সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকেই বৈঠকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। অ-বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীদের অনেকে উপস্থিত না হলেও এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন। কংগ্রেসের তরফে বৈঠকে গিয়েছিলেন গুলাম নবি আজাদ। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘’গাঁধীর আদর্শকে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া নিয়ে অনেকে আজ মতামত জানিয়েছেন। আমরা একটি আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছি। পাশাপাশি জানিয়েছি, বছরটিকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বছর হিসাবে পালন করা হোক। রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ নিজেও বলেছেন, গাঁধীজীর আদর্শ বজায় রাখতে সচেষ্ট হতে হবে। গাঁধীর আদর্শ প্রচার করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীও।‘’
কংগ্রেস সূত্রে খবর সরকারি উদ্যোগে যেটা করছে করুক। তবে গাঁধীজী কোনও দলের বা একজন ব্যক্তির নয়। গাঁধীজী জাতির জনক। কংগ্রেস আলাদাভাবে গাঁধী সার্ধশতবর্ষ উদযাপনের কর্মসূচী নিচ্ছে। সম্প্রতি গাঁধী রচনাবলির প্রথম খন্ড পড়ছিলাম। আধুনিক ভারতের রূপকার পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর একটি লেখা পড়লাম। ইতিহাস বলছে পণ্ডিত নেহরু ছিলেন গাঁধীজীর সব থেকে কাছের মানুষ। তাই দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, দেশ গঠন প্রভৃতি বিষয়ে তাঁদের মধ্যে যেমন মতের মিল হয়েছে, সভ্যতার নিয়ম মেনে মতের অমিলও হয়েছে। তবু গাঁধীজী কংগ্রেস সভাপতি হিসাবে মতিলাল নেহরুর সামনে ছেলে জওহরলালের নাম প্রস্তাব করেছেন কংগ্রেস অধিবেশনে। ভারত সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক থেকে প্রকাশিত মহাত্মা গাঁধীর আত্মজীবনীর প্রথম খন্ডে পণ্ডিত নেহরু লিখছেন, ‘’We shall not think of him as an old man, but rather as one who represented with the vitality of spring the birth of a new India. To a younger generation who did not come in personal contact with him, he is a tradition, and numerous stories are woven round his name and activities. He was great in his life he is greater since he passed away.’’
‘’……….I write this in Darjeeling with the mighty Kinchinjunga looking down upon us. This morning I had a glimpse of Everest. It seemed to me that there was about Gandhiji something of the calm strength and the timelessness of Everest and Kinchinjunga.’’         
পরিশেষে বলা যায়, ইতিহাসবিদ, গাঁধী বিশেষঞ্জরা আগামীদিনে ব্যক্তি গাঁধী, পারিবারিক গাঁধী, সামাজিক গাঁধীর বিভিন্ন দিক উন্মোচন করবেন। সেইসব লেখায় ব্যক্তি গাঁধী এবং মহাত্মা গাঁধীর দ্বান্দিক বিকাশ, ব্যক্তি জীবনের সঙ্গে পারিবারিক জীবনের টানাপড়েন আরও বিস্তারিত সামনে আসবে। কয়েক দশকের তাঁর ব্যপক কর্মকান্ডের কতটা আর আমরা জানি?                                    
 

Monday, 3 September 2018

ছোট্ট ছোট্ট পায়ে ছোট্ট ছোট্ট ছবি


দীপেন্দু চৌধুরী
ছোট ছোট ঘটনার, ছোট ছোট কথার বিনিসুতোর মালা গেঁথে গড়ে ওঠে ‘ছোট গল্প’-এর খন্ড চিত্র। একটা সফল ছোট গল্প পড়তে পড়তে মনে হয় যা শেষ হয়েও হয় না শেষ। আমি একজন লেখকের কথা জানি ১২ টা ছোট গল্প নিয়ে ২১ বছর অপেক্ষা করছেন। ছোট গল্পের সংকলন প্রকাশ করার জন্য। আবার বলতে পারি ‘যা শেষ হয়েও হয় না শেষ’। সেই স্বঘোষিত লেখক ২০১৪ সালে আবার একটা বিনিসুতো টেনে নিয়ে মালা গাঁথতে শুরু করেছিল। না শেষ হয়নি। ছোট ছোট কথা ছোট ছোট খন্ড চিত্র বড় হয়ে থেমে গেল। থেমে রয়েছে। যা শেষ হয়েও হয়নি। এটাও একটা ছোট গল্প হতে পারে। ‘সাত সাগর আর তের নদীর উপাখ্যান’-র কথা সম্প্রতি একটি চিঠিতে লিখেছি। আজ আবার বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, ২১ টা রঙিন সুতো আর ১২ টা সাগরের ঢেউ গোনার চিত্র মালার উপাখ্যান। কিন্তু সময় কোথায়? সামাজিক অবসর কোথায়? সামাজিক ছাড়পত্র, সামাজিক স্বীকৃতি, আর্থিক সহায়তা, সক্ষমতা এতগুলির এবং ছোট গল্পের লেখকের জনপ্রিয়তা থাকলে তবে না এগতে পারা সম্ভব! আপনি বা আপনারা কি বলেন?
আমরা ছোট গল্প, বড় গল্প, উপন্যাস এসবের ইতিহাস বা কাহিনি শোনাতে চাইছি না। সাহসও নেই, দায় আছে।  দায়িত্বের কথা সমাজ ভাবতে শেখাবে। আজ আমরা পাঁচটা খন্ড খন্ড হ্রদয়ের থুড়ি পাঁচজন চলচ্চিত্র শিল্পীর কথা বলতে এসেছি। পাঁচটা ছোট ছবি দেখার বিষয় আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে আমার এই গৌরচন্দ্রিকা। সম্প্রতি কলকাতার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ থেকে ই-মেলে একটি আমন্ত্রণপত্র পাই। ২৯ অগস্ট সন্ধ্যে ৬টায় পাঁচটি ছোট ছবি বা ‘সর্ট ফিল্ম’ দেখার সঙ্গে তিন্নি ভট্টাচার্যের আলাপন। আমার ধারণা ছিল তিন্নি ভট্টাচার্যের নিজের তৈরি পাঁচটা ছোট ছোট ছবির ঠাসবুনোট মালার বহু বর্ণের গ্রন্থন দেখতে পাব। কিন্তু ই-মেলের বিষয় থেকেই জানতে পারি পাঁচজন ভিন্ন ভিন্ন পরিচালকের পৃথক পৃথক ছবি। আমরা জানি ‘চুরি বিদ্যা মহা বিদ্যা’ যদি না পড়ি ধরা। আসুন আমরা সৌজন্য বজায় রেখে কিছুটা ফাঁকিবাজির রাস্তায় হাঁটি। একটু চুরি, না চুরির কাছাকাছি ছোট ছোট শব্দ, বাক্য আড়াল থেকে সামনে নিয়ে আসি। আমি আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, কলকাতার পাঠানোর ই-মেলের বয়ানটা এখানে ছেপে দিতে চাইছি। আপনাদের রাগ হবে নাতো? অবঞ্জা করবেন? কি আর করা যায় বলুন ওই যে চুরি বিদ্যা মহা বিদ্যা। ফাঁকিবাজ শুনতে হবে। কত কথা শুনতে হয়। শুনতে হয়েছে। ছোট্ট ছোট্ট পায়ে এগিয়ে আসা। ছোট্ট চোট্ট চোট্ট শব্দের চাপানউতোর, টানাপড়েন শুনতে শুনতে বড় হওয়া। নাগরিক কলকাতায় জলনুপূরের তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ দেখতে দেখতে সামনে আসা। তাই অপেক্ষা না করে ছেপে দি। আপনারা কী বলেন?
                     

Join us for the screening of a series of short films followed by an interesting seminar with film director Tinni Bhattacharya.

The topic of discussion is Technology vs. Concepts in the film. 

'Film as an Art' cannot survive without technology. To create film 'ideation' does not suffice; it is backed up by various technical tools- camera, editing,
etc.
 While watching any film are we moved by the technical inputs or the conceptualization? Or both? In this new era of technology, it may seem like the idea is lost, and that it is the technical gimmick which is taking over..

Programme:

1) Aissa by Clément Tréhin-Lalanne (2014, 8 min)
2) Le Banquet de la Concubine (2012, 13 min)
3) Blindspot by Simon Rouby (2014, 3 min, Animation)
4) Le Bucheron des mots (2009, 11 min, Animation)
5) Les chiens isolés by Rémi Bastie (2011, 6 min. Animation)
6) Brises by Enrique Ramirez (2008, 13 min)
7) La Chair et les volcans (2014, 20 min)
 
 About Tinni Bhattacharya

"I have been exposed to Worldwide Advertising from a very tender age. As a film scholar, I have contributed articles in some of the leading newspapers of the country.  In 2013 I made a short film named ‘Indispensables’, which was shown at the Kolkata International Film Festival, and Delhi International Film Festival.
Now I am working on my next script and teaching Film and Advertising as a freelance lecturer in various institutes. Along with this, I am engaged in conducting workshops in different cities across the world such as Bangalore, Kolkata, and Paris."

অনুষ্ঠানের শুরুতেই দক্ষ এবং অভিঞ্জ পরিচালক তিন্নির বক্তব্য থেকেই আমরা বুঝে যাই হেমন্তের কলকাতার সন্ধ্যেয় গঙ্গাবক্ষের পশ্চিমের হাওয়ার মেদুর আদর আমরা পেয়ে যাব। সাহিত্য, চলচ্চিত্র, সামাজিক আন্দোলন, সামাজিক বিক্ষা ইত্যাদি। চিত্রভাসের ক্যানভাস বনাম আধুনিক কারিগরি। হ্যাঁ শুরতেই তিন্নি আমাদের বললেন, ‘’আমরা কেন সর্ট ফিল্ম করি? বাজেট একটা বিষয়। ২লাখ ৩ লাখ টাকায় ডিজিটাল ছবি হয়ে যায়। watch Film and get social values. ও হেনরি যেমন উপন্যাস লেখেন। আবার ছোট গল্পও লেখেন। সিনেমা বিষয়টা তেমন নয়। How people are getting film?  আমার প্রশ্ন। সামাজিক মূল্যবোধের গল্প আছে এমন ছবি আমাদের দেখতে ভালো লাগার কথা।‘’  
এর পরে আমরা একটা করে ছবি দেখি আর তিন্নি আমাদের সামনে আসেন। না তিনি তাঁর লব্ধ প্রতিষ্ঠিত ঞ্জানের কথা বলতে আসেননি। তিনি আমাদেরমতো দর্শকদের সঙ্গে সংলাপ করলেন। আমাদের কথা শুনলেন। তারপর নিজে ব্যখ্যা দিলেন প্রতিটি ছোট ছোট ছবির গল্প, ডিটেলিং, চরিত্র, অভিনয়, সামাজিক প্রেক্ষাপট, আধুনিক কারগরি, প্রতিটি বিষয়ে বললেন। তিনি আমাদের অভিঞ্জ শিক্ষক বন্ধুর মতো করে বুঝিয়ে দিলেন। আমরা দর্শকরা আন্তরিকভাবে ‘মত বিনিময়’ সভায় অংশ নেওয়ার সাহস পেলাম।
আমরা দুটো ছবি বেছে নিচ্ছি আলোচনার জন্য। Aissa শিরোনামে প্রথম ছবি। পরিচালক Clément Tréhin-Lalanne ,ফরাসী সংস্কৃতির ধ্রুপদী ভাষায় চলচ্চিত্রের বুনোটে ছবিটির বক্তব্য আমাদের সামনে তুলে দিয়েছেন পরিচালক। ছবি শুরু হচ্ছে একজন কালো যুবতি মেয়েকে সামনে রেখে। নাম আইসা। কোনও ‘পরিচয়পত্র’ মেয়েটির কাছে নেই। সে বিউটিশিয়ান। মেয়েটি একটি ল্যাবে শারীরিক পরীক্ষা করতে এসেছে। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর ওজন নেওয়া হয়, মেয়েটি নিজে জানায় তাঁর বয়স সতেরো বছর। সেইমতো তাঁর শারীরিক বিভিন্ন পরীক্ষা শুরু হয়। ক্যামেরা এবং ক্যামেরা পরিচালকের জাদুর সামনে কালো চামড়ার মেয়েটি একটি সুডৌল স্তন পরীক্ষার জন্য দেখায়। শিল্পের দাবি মেনে সে একটা একটা করে পোশাক খুলতে থাকে। ছোট ছবির ছোট ছোট কথার মতো। ছোট ছোট শব্দের মতো, ছোট ছোট দেশী-বিদেশী বহু বর্ণের মতো করে সে পোশাক খুলতে থাকে।  গম্ভীর গভীর নদীর শান্ত ঢেউয়ের মত সদ্য যুবতী মেয়েটি তাঁর পোশাক খুলতে থাকে। না ক্যামেরা কোনরকম বেয়াড়াপনা করেনি। শিল্পের দাবি মেনে ক্যামেরা চালিয়েছেন পরিচালক।
মেয়েটির হাড়, পেশির পরীক্ষা করার পর জানা যায় মেয়েটির বয়স ২০ বছর। এবং এর পরে মেয়েটি আবার টুকরো টুকরো শব্দের মতো, টুকরো টুকরো সেলুলয়েডের ফিল্মের মতো, ছোট ছোট ফ্রেমের মতো নিজের পোশাক পড়ে নেয়। প্যাথলজিক্যাল কেন্দ্র থেকে সে যখন চলে যায়, নিজের ‘ব্রা’ বা ‘বক্ষআবরণী’ না পরে হাতে নিয়ে চলে যায়। আমরা জানতে পারি সে এসেছিল বা বা রাষ্ট্র তাঁকে আসতে বাধ্য করেছিল দেশের অভিবাসন দপ্তরে। ইমিগ্রেসন ডিপার্টমেন্টে। তারপর?
২০১৪ সালে তৈরি মাত্র ৮ মিনিটের ছবি। মাত্র ৮ মিনিটে এত কথা বলা যায়? এই ছবি না দেখলে আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়ে উঠত না। কতটা দক্ষতা, দেখার অন্তর্দৃষ্টি থাকলে তবেই বোধহয় সম্ভব হয় এমন একটা ছবি নির্মাণের। পরিচালক নতুন ভাষা উদ্যান থেকে আমাদের বিশ্বের এক চেনা, এক অচেনা ছোট গল্পের সন্ধান দিলেন।
দ্বিতীয় ছবিটি চিনের একটি রূপকথার গল্পকে অবলম্বন করে তৈরি। Le Banquet de la Concubine    শিরোনামের ছবিটির সুর বাঁধা ছিল ‘অপেরা মিউজিক’-এর তাল লয় ছন্দে। সম্রাটের পরিবার এবং তাঁর জীবন যাবনকে কেন্দ্র করে এক সামাজিক টানাপড়েন। একজন নারীর অবসাদ। অসাধারণ গ্রাফিক্স বর্ণনা উঠে এসেছে পরিচালকের সূক্ষ অনুভবী ভাষায়। পরের ছবি তিনটিও বর্তমান সমাজের সমস্যা কেন্দ্রিক, তাঁর মধ্যে অন্যতম ‘সমকাম’, ড্রাগস এবং চাকরি না পাওয়া বর্তমান প্রজন্মের গোপন দৈনন্দিন জীবনের ছন্দের গল্প। পরিচালক ত্রয়ী  আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। এইসব আধুনিক জ্বলন্ত বিষয়ের সঙ্গে। এছাড়াও ছিল আরও অন্যান্য সামাজিক প্রেক্ষাপট।
দু’টি ছবি দেখার পরে আমাকে বলতে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আমি সেদিনের আমার দেখা কলকাতার দু’টো অভিঞ্জতার কথা বলেছিলাম।
২৯ অগস্ট গোধূলি সন্ধ্যে। ঘড়িতে সাড়ে পাঁচটা বাজে। একটু আগে ফরাসী কবিতার শব্দে মধ্য কলকাতায় শরতের বৃষ্টি হয়ে গেছে। একটু আগে বৃষ্টি হয়েছে। শরতের নীলাভ আকাশের আড়াল থেকে বৃষ্টি এসেছিল।  জীবনানন্দের কাব্যের গোধূলি সন্ধ্যে ছিল সেদিন। শম্ভু মিত্রের কন্ঠের আনুনাসিক শব্দের মতো আমরা বৃষ্টির শব্দ পেয়েছিলাম। আমি মেট্রো রেলে এসে পার্কস্ট্রীট স্টেশনে নামলাম। আমার সামনে একজন মধ্য চল্লিশ বয়সের মহিলা। মধ্যবিত্ত বলি অথবা নিম্নমধ্যবিত্ত। ভদ্রমহিলা ট্রেনের টোকেনটা এক্সিট ভেন্ডার যন্ত্রে কি ভাবে দিতে হয় জানতেন না। আমি বলে দিলাম। তিনি বাইরে গেলেন। পাশের ভেন্ডিং যন্ত্রে লাল রঙ দিয়ে ক্রস (X) চিহ্ন দেওয়া রয়েছে। সেই গেট দিয়ে বাইরে যাওয়া যাবে না। ভদ্রলোক জানতেন না। বাইরে বসে থাকা নিরাপত্তা কর্মীরা আমরা যে গেট দিয়ে বাইরে এলাম ভদ্রলোকটিকে সেই গেট দেখিয়ে দিলেন। স্বামী-স্ত্রী বাইরে এলেন। মহিলা বললেন, ‘’পয়সাটা কোন ঠায় দিবার লাগে জানতাম না।‘’ স্বামী উত্তর দিলেন, ছয়মাস পর আইলামতো সব ভুইলা গেসি গিয়া।‘’ জানি না ওই দম্পতি উত্তরপূর্ব ভারতের কোনও রাজ্য থেকে এসেছেন না বাংলাদেশ থেকে? অভিবাসন সমস্যা? না নাগরিক পঞ্জি?
স্টেশনের বাইরে এলাম। কলকাতা পুলিশ ক্লাব। ফুটপাথ। বড় রাস্তা। আবার পরের ফুটপাথ। ফুটপাথে হাঁটুজল নেই। ফুট পাথে একটা পরিবার। রাস্তায় কিছুটা কালো কাদা জল। কাদা জল থৈ থৈ করছে। ফুটপাথের ওই পরিবার থেকে একটি সাত-আট বছরের বাচ্চা মেয়ে বেরিয়ে এসে জল নিয়ে খেলা করছিল। ওর কাছে জলনুপূরের খেলা। আমাদের মতো তথাকথিত ভদ্রলোক দেখলেই পায়ে করে জল ছিটিয়ে দিচ্ছে। রাস্তার কালো তেল মোবিল ধুলো মিশ্রিত নোংরা জল ছিটিয়ে ও আনন্দ পাচ্ছিল। আবার ফোঁকলা দাতে হাসছে আমাদের দিকে তাকিয়ে। আমি মুচকে হেসে মাথা দুলিয়ে নোংরা জল ছিটিয়ে না দিতে নিষেধ করলাম। দূর থেকে নিষেধ করলাম। আমার কথা শুনল না। হাসতে হাসতে যেন ‘ঘৃণা ঘৃণা’ মজার খেলা করছিল। এই খেলা জলনুপূরের মজা ওর কাছে! আর আমাদের কাছে? অভিবাসন?
তিন্নি সেদিনের ছোট ছবির মতবিনিময় সভায় আরও বলেন, ‘বলিউড-হলিউড’-এর নায়করা একমাত্র নায়ক কী? ‘মিড নাইট’, ‘কাউ বয়’, ‘বাই সাইকেল থিভস’-এর মতো ছবি আমাদের সামনে আছে। তথাকথিত বাণিজ্যিক ছবি এবং আর্ট ফিল্ম বা তৃতীয় ধারার ছবির সঙ্গে তুলনায় বর্তমান সময়ে কী ধরণের ছবি হতে পারে?’’
প্রশ্ন তুললেন পরিচালক, গবেষক এবং ছোট ছবির নির্মাতা তিন্নি ভট্টাচার্য। আমরা উত্তর খুঁজি। বাংলাদেশের চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ বলেছেন, ‘’আমরা যত মিশ্র, তত সমৃদ্ধ। এটা মানলেই সমস্যা থাকত না।‘’