Wednesday, 3 October 2018

ওরা মানবতার ছবি করতে চায় লিঙ্গ বৈষম্যের নয়



দীপেন্দু চৌধুরী
অন্যান্যদের কথা বলতে পারব না। নিজের কথা জানি। কলেজে পড়ার সময় সেটা ১৯৭৬-৭৭ সাল, তখন চা গরম জলে দিয়ে কি করে চা বানাতে হয় শিখেছিলাম। হ্যা ওই একই সময় চায়ের পাতা ব্রাউন প্যাকেটে ভরে ১০০গ্রাম, ২০০ গ্রাম, ২৫০ গ্রাম ৫০০ গ্রামের প্যাকেটে করে বিক্রি করতে শিখেছিলাম। বড় বড় দু’টো চটের ব্যাগে চায়ের প্যাকেট ভরে নিতাম। সাইকেলে ব্যাগ দু’টোকে ঝুলিয়ে নিয়ে খুব সকালে চায়ের পাতা বিক্রি করতে শিখেছিলাম। মাঠের রাখাল বালকদের মত। শিখতে হয় না হলে পিছিয়ে পড়তে হয়। আমাদের নিজেদের কথা বলার জন্য কাউকে আমন্ত্রণ জানানো যায়? আমরা জানতে গিয়েছিলাম। নতুন সভ্যতায়, নতুন ভাষায়, মাত্র দেড় থেকে দু’মনিটে একটা ছোট গল্প কি করে বলা যায়? টাটকা টাটকা পান্ডুলিপি অথবা চিত্রনাট্য থেকে জীবনের টুকরো টুকরো অংশ জুড়ে দিলে ‘পথের পাঁচালী’ লেখা হয়। ছোট ছোট গল্প লেখা হতে পারে। ছবি তৈরি হতে পারে।
১৯৫৯ সালের একটি প্রবন্ধে সত্যজিৎ রায় আক্ষেপ করে লিখেছিলেন ‘চলচ্চিত্র শিল্প কিনা তা নিয়ে এখনও বিতর্ক ওঠে।’ (সত্যজিৎ রায়, ‘চলচ্চিত্র-রচনা’ঃ ‘আঙ্গিক ভাষা ও ভঙ্গি’ [‘বিষয় চলচ্চিত্র’, প্রথম সংস্করণ, আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৭৬, পৃষ্ঠা- ১৮] সত্যজিৎ রায় প্রশ্নটি তুলছেন ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’ (১৯২৫) ছবিটি তৈরি হওয়ার ৩৪ বছর পর। বিশ্ববরেণ্য ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় প্রশ্নটি তোলার আট নয় বছর পরে একটি সমীক্ষা করা হয়েছিল। ১৯৬৭-৬৮ সালে সেই সমীক্ষা করা হয়েছিল নতুন দিল্লির উচ্চ-মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষদের মধ্যে। এই দর্শক সমীক্ষায় প্রতি দশজনের মধ্যে মাত্র তিনজন দর্শক শিল্প হিসেবে চলচ্চিত্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। ফরাসি বিপ্লবের ঢেউ আছড়ে পড়েছে ভারতে। আমাদের দেশের ছাত্র সমাজ উথাল পাথাল ঢেউয়ে দুলছে। আমাদের এই বাংলায় ছবি করছেন সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন সহ আরও অনেকে। হারিয়ে যাওয়া নামের চলচ্চিত্র পরিচালক তাঁরা। গত শতাব্দীতেই সিনেমা ‘শিল্প’-এর মর্যাদা পেয়েছে। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা বিভিন্ন দেশের স্বনামধন্য চলচ্চিত্র পরিচালকদের দল আমাদের সামনে কালজয়ী সব চলচ্চিত্র পরিবেশন করেছেন। চলচ্চিত্রকে শিল্পের উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। এবং হলিউডের দেশ আমেরিকার বিভিন্ন বরেণ্য পরিচালক প্রমাণ করেছেন চলচ্চিত্র শিল্পের ডিটেলিং কোন উচ্চতায় পৌঁছতে পারে। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি যে প্রশ্ন সত্যজিৎ তুলেছিলেন বর্তমান শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে আজকের সভ্যতা অনেক অনেক এগিয়ে। ওয়েবক্যাম বা ছোট ক্যামেরায় তোলা তথ্যচিত্র, কাহিনিচিত্র অথবা ছবি আমরা গত শতাব্দীতেই পেয়েছি। সভ্যতা আরও কয়েকধাপ এগিয়ে এসেছে। ইন্টারনেট, ইউটিউব, স্মার্টফোন হাতের মুঠোয় এসে যাওয়ায়।
গতমাসে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, কলকাতা ছোট ছোট ছবির একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিল। মাত্র দেড় ঘণ্টায় পাঁচটা ছবি। এক ঘন্টা মতবিনিময়। ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুর দু’টো থেকে পাঁচটা পর্যন্ত আমরা দেখলাম ২৪টা ছবি বা সিনেমা। ভাবা যায়? ‘Ending Gender-Based Violence One Story at a Time’ শিরোনামের এদিনের ঠাসবুনোট চলচ্চিত্র উৎসবের যৌথভাবে আয়োজন করেছিল ইউ এস কনস্যুলেট জেনারেল, কলকাতা, ক্যালিফর্নিয়ার  অলাভজনক ছবি তৈরির একটি সংস্থা এবং কলকাতার বাংলানাটক ডট কম নামে একটি সংস্থা। অনুষ্ঠানের যে ব্রসিয়ার আমাদের হাতে এসেছে ‘Gender-Based Violence’ শিরোনামে লেখা হচ্ছে, ‘’Gender-based violence (GBV) is a general term used to capture violence that occurs as a result of the normative role expectations associated with each gender, along with the unequal power relationships between the two genders within the context of a specific society.
Many countries have incorporated women’s rights and gender equality as a matter of policy, but gender-based violence, targeting women and girls in particular, continues unabated. The violence is perpetrated both at home and in public and has its roots in gender stereotyping, unequal norms and imbalanced power dynamics in societies. Addressing the social and structural causes behind this violence is, therefore, the need of the hour.  
ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল প্রসঙ্গে ‘About the Film Festival’ শিরোনামে  লেখা হয়েছে, ‘’Contact base (www.banglanatak.com) is working in collaboration with the American Center in Kolkata to create a youth network that champions the cause of stopping GBV and changing attitudes and behavior. The main objective of the entire initiative is to empower youth leaders across borders to identify and speak up against gender issues. It is also a part of our effort to strengthen the advocacy skills of next-generation leaders in the Indo-Pacific region.
In April 2018, Contact Base, in partnership with the American Center, Kolkata, and Story Centre, USA, organized a workshop on digital storytelling. The workshop was conducted by Amy Lenita Hill from storyCenter, an organization supporting individuals and groups to use storytelling and participatory media for reflection, education, and social change. Storytelling is traditionally the most attractive and popular format of communication that can sensitize people, build awareness, forge solidarity and shape public opinion about various issues concerning the society and the individual. Digital storytelling is the most potent and popular new age tool for communication.
The 24 participants from India (Assam, JharKhand, Nagaland and West Bengal) and Bangladesh developed short films on ending gender-based violence. Each of the films reflected individual experiences. As a follow-up action after the workshop each of the four zonal teams from Bangladesh, Jharkhand, Northeast and West Bengal made two more films.
ছবিগুলি দেখার পরেও উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে কোনও ক্লান্তি আমাদের নজরে পড়েনি। দু’ই থেকে তিন মিনিট সময়ে তৈরি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে পারিবারিক এবং সামাজিক ছবি আমরা টান টান উত্তেজনায় দেখতে থাকি। ডিজিটাল ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলির পরিচালকরা ছবি করার সময় কতটা মনযোগ দিতে চেয়েছেন সেটা বোঝা যায়, ছবি দেখার পরে দর্শকদের সঙ্গে মতবিনিময় সময়ে। প্রত্যেকে উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছেন। ছবিগুলি তৈরি সময় প্রত্যেক পরিচালক আলাদা আলাদা করে পাঁচদিন সময় নিয়েছেন। পাঁচদিনে নিজেদের ছবির চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন তাঁরা। চিত্রনাট্য লিখেছেন ইংরেজি, হিন্দি এবং অসমিয়া ভাষায়। প্রতিটি ছবির সঙ্গে আছে পরিভাষা বা ইংরেজিতে সাব টাইটেল। সারা বিশ্বের দর্শকদের ছবি দেখার সুবিধার জন্য। কোনও কোনও ছবিতে নেপথ্যে ভয়েস ওভার ব্যবহার করে ছবির গল্প দর্শকদের বোঝাতে চেয়েছেন পরিচালক। বাংলাদেশের পাঁচটা ছবির মধ্যে তিনটে ছবির কথা উল্লেখ করতেই হবে। প্রথমটা পরিচালক মারুফ ওয়ালির ‘ইটস নট ওকে’, দ্বিতীয়টা পরিচালক মুনিফ খানের ‘সিঁদুর’ এবং তৃতীয়টা প্রিয়াঙ্কা বোস পরিচালিত ‘আমি সেই মেয়ে’ (Me Too)। বিশেষ নজর কাড়ে প্রিয়াঙ্কার ‘আমি সেই মেয়ে’ ছবিটি। বাংলাদেশের মত আর্থসামাজিক সমাজ কাঠামোয় বর্তমান সময়ে ওই দেশের উচ্চশিক্ষিত মেয়েদের সামজিক জীবনের টানাপড়েনের গল্প বলেছেন প্রিয়াঙ্কা।     ঝাড়খন্ড থেকে চারটে ছবি ছিল। ঝাড়খন্ডের চারটে ছবির মধ্যে পরিচালক শুভজিৎ ঘোষের ছবি ‘দ্য ডে হোয়েন এভরিথিং কেম টু অ্যান এন্ড’। শুভজিৎ দেড়-দু মিনিটে আমাদের ভারতীয় নারীর দু’টো দিক দেখালেন। একদিকে আমরা দেবী দুর্গার কথা বলছি। অন্যদিকে বাড়ির সাধারণ স্ত্রী মেয়েদের উপর অত্যাচার করছি। একটি পরিবারের এক যুবক তাঁর উচ্চ শিক্ষিত কাকার পরিবারের কথা বলছে। স্বচ্ছল পরিবার। যুবকটির কাকা তাঁর স্ত্রীর প্রতি কি ধরণের ব্যবহার করছে সেই চির পরিচিত গল্প আমরা আবার দেখলাম। কাকিমার প্রতি অবিচার সেই যুবকটি মেনে নিতে পারেনি। প্রতিবাদ করেছিল।
ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল (অসম এবং নাগাল্যান্ড) থেকে ছিল চারটে ছবি। রেখা শর্মার ‘অপরাজিতা’ ছবিটি আমাদের মনে দাগ কাটে। ভীষণ কাব্যিক ছবি বলতে হবে। কলকাতা থেকে ছিল ন’টি ছবি। কলকাতা থেকে সংযুক্তা সরকারের পরিচালিত ছবিটি এককভাবে প্রথম পুরষ্কার পায়। এই ছবিটির গল্প বাড়ির মেয়েদের পাতে অর্ধেক ডিম দেওয়া হয়। পুরুষরা খায় গোটা একটা ডিম। একটি মেয়ের মামাবাড়ির প্রেক্ষাপটে সংযুক্তার চিত্রনাট্যে দর্শকরা ‘ডিম’- এর গল্প শোনে। সেরা আঞ্চলিক ছবির পুরষ্কার জিতে নেয় ‘পিঙ্ক অ্যান্ড ব্লু’ (Pink & Blue) । ছবির গল্প এই রকম, আমাদের সমাজে কম বয়সের ছেলেদের বা বলা ভালো বালক শিশুদের হাতে দেওয়া হয় নীল রঙের বেলুন। আর বালিকা শিশুদের হাতে দেওয়া হয় ‘গোলাপী’ বেলুন। এটাও ভারতীয় সমাজের একটা টানাপড়েন। অন্তরা রায় চৌধুরী, মন্দিরা ব্যানার্জি, অলিভিয়া মণ্ডল, পলক চোখানী, রাহুল গোস্বামী এবং শান্তনু ব্যানার্জি এই ছ’জনের যৌথ চিত্রনাট্য এবং পরিচালনায় নির্মাণ হয়েছে ‘পিঙ্ক অ্যান্ড ব্লু’ ছবিটি।
২৯ সেপ্টেম্বরের ছবিগুলির বিষয় ছিল ১) Domestic violence, 2) Sexual harassment, 3) Discrimination in terms of career choice, 4) Gender stereotyping, 5) Unsafe public spaces
জুড়ি প্যানেলে ছিলেন বলিউডের অভিনেতা এবং পরিচালক বিনয় পাঠক, বাংলা ছবির অভিনেত্রী চূর্ণী গাঙ্গুলী এবং বাংলা ছবির পরিচালক অনিন্দিতা অধিকারী। ছবি শেষে বিজয়ী পরিচালকদের হাতে পুরষ্কার তুলে দেন চলচ্চিত্র পরিচালক সুদেষ্ণা রায় এবং আমেরিকান কনস্যুলেট জেনারেল, কলকাতা প্যাট্রেসিয়া হফম্যান। এদিনের অনুষ্ঠানে প্যাট্রিসিয়া হফম্যান বলেন, ‘’আমি কলকাতার সংস্কৃতির ভক্ত। বাংলার শিক্ষার মান, মনন, সঙ্গীত, সাহিত্য বিষয়ে আগ্রহকে আমি সম্মান করি। এই বছর বাংলার দুর্গা পুজো দেখার সুযোগ আমার হবে। বাঙ্গালি জীবনের যে উৎসব সব থেকে বড় উৎসব। আমি সেই উৎসবে অংশ নেব।‘’
মার্কিন কনস্যুলেট জেনারেল আরও বলেন, ‘’This is a meeting point of great minds across the borders. The directors are brave agents of change.’’  ছবিগুলি কি সব বিষয় কে ছাপিয়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাকে আক্রমণের ছবি? ভারতীয় উপ মহাদেশের সামাজিক কাঠামোর কিছুটা উন্নতি হলেও মূল্যবোধ কতটা আধুনিক হয়েছে? উচ্চশিক্ষিত, চাকুরে মহিলাদের দ্বারা ভারতীয় পুরুষরা আক্রান্ত নয়? যে বিষয় নিয়ে কিছুদিন আগে ভারতের সুপ্রীম কোর্টে একটি মামলার শুনানী হয়ে গেছে। দর্শক-শ্রোতারা এই প্রশ্ন তুলেছিলেন। মঞ্চে হাজির ১৩ জন তরুণ পরিচালক বললেন, আমরা পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছবি করতে চাইছিনা। আমরা মানবতার পক্ষে ছবি বানাতে চাইছি।
এই প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ছবির চিত্রনাট্য থেকে কিছুটা অংশ তুলে দিতে চাইছি। মেয়েদের মন নিয়ে সত্যজিৎ ঠিক কি বুঝতেন? তাঁর আবেদন কি ছিল?
অরিন্দমঃ পর পর তিনটি ছবি মার খেলেই কিন্তু আমিও ওজগতে ফিরে যেতে পারি।
অদিতিঃ তা হবে না। নিশ্চয়ই হবে না। আপনি যেখানে আছেন সেখানেই থাকবেন। অনেকদিন। আপনার বাজার ঠিকই থাকবে।
অরিন্দম মৃদু হাসে।
অদিতির ব্যাগ খোলাই ছিল, সে তাঁর ভিতর থেকে একতাড়া কাগজ বার করে।
অদিতিঃ আপনার ইন্টারভিউ ...
অদিতি কাগজগুলো একসঙ্গে কুন্ডলী পাকিয়ে সামনে রাখা জলের গেলাসের ভিতর গুঁজে দেয়।
অরিন্দমঃ ওকি! আপনি কি মন থেকে লিখবেন নাকি?
অদিতিঃ মনে রেখে দেব। চলি।                                                          

Monday, 1 October 2018

অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই





দীপেন্দু চৌধুরী
বিগত ৪১ বছর পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যে কংগ্রেস দলের শাসন নেই। ১৯৭৭ সাল থেকে ২০১১ পর্যন্ত দুর্দান্ত প্রতাপশালী বামফ্রন্টের শাসন চলেছে। ‘বামফ্রন্ট’ একটি শব্দের আশ্রয়ে আসলে ৩৪ বছর সিপিএম নামক একটি দল আমাদের রাজ্য শাসন করেছে। ২০১১ সাল থেকে তৃণমূল কংগ্রেস প্রথমে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট সরকার পরে একক দল হিসেবে রাজ্যের ক্ষমতায় রয়েছে। আমাদের আলোচ্য নিবন্ধ কোনও রাজনৈতিক দল বা রাজ্য সরকার নয়। সমাজের এগিয়ে থাকা সংস্কৃতি জগতের ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কে কয়েকগাছা শব্দচয়ন বা বাক্যচয়ন। নাগরিক সমাজের ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের রাজ্য স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় থেকে সচেতন। অথবা আমরা উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের সময়ের কথাও উল্লেখ করতে পারি। ব্রিটিশ শাসনের সময় কলোনি নামক এক সমাজ ব্যবস্থায় আমরা উপলব্ধি করেছিলাম বুদ্ধিজীবীদের কলম অথবা ভূমিকা সমাজের কতটা পরিবর্তন করতে পারে। নাগরিক সমাজ বলতে বৃহত্তর ক্ষেত্রে বলা হয় ‘সিভিল সোসাইটি’। ভাষা বিশেষঞ্জদের লেখা থেকে জানতে পারছি গ্রিক দার্শনিক আরিস্ততলের (খ্রিস্টপূর্ব ৩৮৪-৩২২) ‘কইননিয়া পলিতিক’-এর লাতিন অনুবাদ ‘সোসায়েতাস সিভিলস’ হয়ে ইংরেজিতে কথাটা এসেছিল। বিশেঞ্জরা বলছেন, এই ধারণা যারা পোষণ করতেন তাঁরা রাজনৈতিক সমাজ এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে অথবা রাষ্ট্র এবং সমাজের মধ্যে কোনওরকম ফারাক করতেন না। সেই সময় ‘নাগরিক সমাজ’- এর মানে ছিল শুধুমাত্র একটি সমাজবদ্ধ গোষ্ঠী।
সপ্তদশ- অষ্টাদশ শতাব্দীতে এসে ‘নাগরিক সমাজ’ গোষ্ঠীটির ধারণায় নতুন চিন্তার কথা বললেন ব্রিটিশ দার্শনিক জন লক (১৬৩২-১৭০৪)। তিনি সমাজের উচ্চ শিক্ষিত লেখক, শিল্পী, নাট্যকার, সাহিত্যিক, চিত্রকর ভাস্কর সহ সমাজের প্রতিষ্ঠিত প্রথম শ্রেণির পেশাজীবী নাগরিকদের একটা মঞ্চে আসার কথা বললেন। পরস্পরের মধ্যে মত বিনিময় তথা নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর মঞ্চকেই নাগরিক সমাজের মূল ভিত্তি হিসেবে দেখার কথা বললেন। পাশাপাশি জন লক সাহেব সমাজের নীতিবোধের চালিকাশক্তি ঈশ্বর বিশ্বাসের কথা বললেন। তিনি বলে গেছেন ‘সুসভ্য’ সমাজে ঈশ্বর বিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির স্বাধীনতা থাকবে। তাঁর ধারণাশ্রয়ী সমাজে নাস্তিকদের অধিকার স্বীকৃত ছিল না। এই সূত্রেই জানা যায় অষ্টাদশ শতাব্দীর স্কটিশ তাত্বিকরা ঈশ্বর নির্ভরতার পরিবর্তে ধর্ম নিরপেক্ষ নাগরিক সমাজের কথা বলে গেছেন। আলোচ্য বিষয় ঈশ্বর বিশ্বাস বা নাস্তিকদের নিয়ে কোনও আলোচনা দাবি করছে না। ২৯ সেপ্টেম্বর বিধান নগরের একটি ব্যাঙ্কয়ট সভাঘরে মতবিনিময় সভা ছিল। উদ্যোক্তাদের ভাষায় দার্শনিক আলাপ আলোচনার সভা বা সম্মেলন (Symposium)। ‘Symposium on ‘’Fake news-Nemesis to Freedom of Expression’. বিষয় ছিল আমরা ভুয়ো খবরের বিরুদ্ধে। মিথ্যে খবরের বিরুদ্ধে। আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল সারা ভারত পেশাজীবী কংগ্রেস(AIPC) কংগ্রেসের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি। এবং সংগঠনটি ইতিমধ্যে অনন্যতা দাবি করে। সংগঠনের পশ্চিমবঙ্গ চ্যাপ্টারের এটি দ্বিতীয় সভা ছিল। কলকাতা জেলা ছাড়াও হাওড়া জেলা, বিধাননগর এবং বারাসত থেকে প্রতিনিধিরা এসেছিলেন। সংগঠনটির দ্বিতীয় মত বিনিময় সভায় ছিল চোখে পড়ার মতো উপস্থিতি।
সভার শুরুতেই এআইপিসির পশ্চিমবঙ্গ চ্যাপ্টারের সভাপতি ঋজু ঘোষাল আলোচনার সুরটা বেঁধে দিলেন। তিনি বললেন ‘’অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে এই সম্মেলন তৈরি করবে আগামীর নেতৃত্ব।‘’ আলোচনাসভায় বক্তা ছিলেন ছ’জন। পবন খেরা আস্তে পারেননি। সঞ্চালক সাহেরা হালিম প্রথমেই উল্লেখ করলেন, মিথ্যে কী ভাবে বলা হচ্ছে। ‘ফেক নিউজ’-কে কেমন করে আমাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কোন দেশে আমরা আছি? ‘ট্রুথ’ বা সত্যি কথা বলা যাবে না। বর্তমান ভারতকে আমরা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে তুলনা করতে পারব? কেন্দ্রীয় সরকারের ভুল ধরিয়ে দিলে লেখক আক্রান্ত হচ্ছেন। সাংবাদিক আক্রান্ত হচ্ছেন। বুদ্ধিজীবিরা আক্রান্ত হচ্ছেন। আমি ঋজু ঘোষালকে জিগ্যেস করব। কেরালার যেমন আলাদা পরিচিতি আছে। আমাদের এই রাজ্য পশ্চিমবঙ্গেরও আলাদা পরিচিতি আছে। সমাজকে, মানুষকে কতদিন উপেক্ষা করা হবে? বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা কী বলতে পারি?  
উত্তরে ঋজু বললেন, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ছত্তিসগড়ের বিষয় নয়। আমাদের গ্রামীণ বাংলায় ইন্টারনেট সংযোগ কতটা পাবেন? কিন্তু স্মার্টফোন দ্বিতীয় হাত, তৃতীয় হাত ঘুরে খেটে খাওয়া তরুণ সমাজের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। তবুও বলব আমাদের দেশ আজও গ্রাম ভিত্তিক দেশ। সংস্কার আছে। মুল্যবোধ আছে তাই ‘ফেক নিউজ’-কে আটকাতে হবে। বাবর যেমন সম্রাট ছিলেন। ভারতের জিডিপি একটা সময় খুব ভালো ছিল। এটা সত্য। এই সত্যকে আমরা কেউ আড়াল করতে পারব না। ‘ফেক নিউজ’, মিথ্যে প্রচার বন্ধ করতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তিকে অবহেলা করলে হবে না।‘’
রবীন্দ্রনাথ নিজে যেমন বিশ্বাস করতেন গ্রামকে বাদ দিয়ে একটা দেশের চরিত্র বোঝা সম্ভব নয়। তিনি জাতি তথা মহাজাতির কথা সেই যুগেও বলে গেছেন। তাঁর রাজা-প্রজা প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, যে দেশে একটি মহাজাতি বাঁধিয়া ওঠে নাই সে দেশে স্বাধীনতা হতেই পারে না। কারণ, স্বাধীনতার স্ব-জিনিসটা কোথায়? উপরন্তু গ্রামভিত্তিক দেশ। গ্রামের স্বয়ংসম্পূর্ণতা ভেঙে দিয়েছিল অথবা স্বয়ম্ভরতা ভেঙে দিয়েছিল ব্রিটিশ শাসকরা। রবীন্দ্রনাথ তার প্রতিবাদ করেছিলেন। এবং স্বদেশী সমাজের কথা বলেছিলেন।        
আইনজীবী ঋজু ঘোষালের বক্তব্য থেকেই আমাদের সামনে এসে যায় ‘গ্রাম সমাজ’-এর কথা। যেটা রবীন্দ্রনাথ সেই সময় বলেছেন। ‘নাগরিক সমাজ’-এর দায়িত্বের কথা বলেছেন তিনি। সমাজ গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে একটি রাষ্ট্রের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য একে একে গড়ে উঠতে থাকল রাজনৈতিক দল বা শক্তি, প্রশাসন, আইন, বিচার ব্যবস্থা সহ একাধিক ব্যাবস্থা। সমাজের প্রয়োজনে লাগবে এমন সব সরকারি বেসরকারি  প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রক্ষমতা নিজেদের হাতে রাখতে রাজনৈতিক দলগুলি কিছু গোষ্ঠী বা বুদ্ধিজীবীদের টাকা দিয়ে বা উপঢৌকন দিয়ে কিনে নিতে চায় বা কিনে নেয়। অভিযোগ বিগত একশো বছরে দেশে বিদেশে এমন উদাহারণ ভুরিভুরি পাওয়া যাবে। সংবাদ মাধ্যমের উত্থানের পরে এই মাধ্যমকে মোটা টাকার অঙ্কে নিজেদের দলের স্বার্থে ব্যবহার করার উদাহারণ হিসেবে আমরা একাধিক অভিঞ্জতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে পারি। বাজার যারা নিয়ন্ত্রণ করেন সেই বাণিজ্যিক সমাজের সঙ্গে প্রতিবাদী এবং ধর্ম নিরপেক্ষ ‘নাগরিক সমাজ’-এর দ্বন্দ চিরায়ত। যে রাষ্ট্রপ্রধান বাণিজ্যিক সমাজের সঙ্গে ‘নাগরিক সমাজ’-এর ভারসাম্য সামলে দেশ শাসন করতে পারেন তিনি ইতিহাসে স্থান করে নিতে পারেন। আমরা যেমন আমাদের দেশে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জওহরলাল নেহরু এবং মনমোহন সিংহের নাম উল্লেখ করতে পারি।
যে সূত্রের উপর নির্ভর করে এই লেখা লিখছি সেই একই সূত্র বলছে, ফরাসি সমাজতাত্বিক ও রাষ্ট্রবিঞ্জানী মঁতেস্কু-র (১৬৮৯-১৭৫৫) মত ছিল, বাণিজ্যিক সমাজের নাগরিকদের মধ্যে একটা স্বাধীন মেলামেশা এবং মুক্ত মনের জায়গা থাকে। এই দর্শন রাষ্ট্রের বাড়াবাড়িকেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। আমাদের দেশে এই শতাব্দীর প্রথম দশকের কথা মনে করতে চাইছি। ঘটনা আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। ২০০৬ সাল থেকে শুরু হওয়া আমাদের রাজ্যে একটি শব্দ হঠাত এসে আছড়ে পড়েছিল। শব্দটি ছিল ‘সুশীল সমাজ’। রিজওয়ানুরের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে একটা আন্দোলন, সিঙ্গুরে টাটাদের ন্যানো গাড়ি কারখানার জন্য জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে একটা আন্দোলন এবং নন্দীগ্রাম। রাজ্য তথা ভারতের ‘নাগরিক সমাজ’ বা ‘সুশীল সমাজ’ একটা রাজ্যের ভাগ্য নির্ণয়ের দায়িত্ব তখন নিয়ে নিয়েছিল। সেই সময়ে রাজ্যের ‘নাগরিক সমাজ’ বা ‘সুশীল সমাজ’ দু’টো শিবিরে ভাগ হয়ে গিয়ে ‘আমরা-ওরা’ নামক আলাদা আলাদা গোষ্ঠীতে চিহ্নিত হয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সম্ভবত এই পরিণতি ডেকে আনে। আমরা নতুন করে এই বিতর্কে যাবনা। ঋজু ঘোষাল অহিংস সমাজের সদর দুর্গে কামান দেগে ন্যায্যতার দাবি জানালেন। সেই দাবি থেকেই সাংবাদিক এবং লেখক প্রাঞ্জয় গুহঠাকুরতা সভার আসনে বসে বললেন,  ‘’আমি কংগ্রেস করি না। তবু এই আলোচনা সভায় আমি এসেছি। ‘ভুয়ো খবর’ আমাদের কতটা ক্ষতি করতে পারে সে বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। উদার সংস্কৃতির প্রসঙ্গে বলার জন্য আমাদের দেশে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ আক্রান্ত হচ্ছেন। আমেরিকায় নোয়াম চামস্কি আক্রান্ত। ‘ফেক নিউজ’ অথবা ভুয়ো খবর, গুজব এসব বেশিদিন ধরে রাখা যায় না। সত্য যদি আপনার সঙ্গে থাকে আপনার কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না। সাংবাদিক মানে স্টেনোগ্রাফার নয়। সাংবাদিক মানে বিঞ্জাপন সংস্থা নয়। সাংবাদিককে নিরপেক্ষভাবে সমালোচকের চোখ দিয়ে দেখতে হবে। মানে ক্রিটিক্যালি দেখতে হবে। এক পেশে এক তরফা হলে চলবে না।‘’
বিশ্বের অন্যতম চিন্তাবিদ তথা দার্শনিক নোয়াম চমস্কী কী বলছেন?    
     "The major media-particularly, the elite media that set the agenda that others generally follow-are corporations “selling” privileged audiences to other businesses. It would hardly come as a surprise if the picture of the world they present were to reflect the perspectives and interests of the sellers, the buyers, and the product. Concentration of ownership of the media is high and increasing. Furthermore, those who occupy managerial positions in the media, or gain status within them as commentators, belong to the same privileged elites, and might be expected to share the perceptions, aspirations, and attitudes of their associates, reflecting their own class interests as well. Journalists entering the system are unlikely to make their way unless they conform to these ideological pressures, generally by internalizing the values; it is not easy to say one thing and believe another, and those who fail to conform will tend to be weeded out by familiar mechanisms."

একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রাণঞ্জয় গুহঠাকুরতা বললেন, ‘’মার্কিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েই ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ফেক নিউজ’-এর নামে সংবাদ মাধ্যমের কন্ঠরোধ করতে চাইলেন। সিএনএন এবং নিউ ইয়র্ক টাইমস সংবাদ সংস্থার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়লেন। কারণ সাংবাদিকরা কঠিন প্রশ্ন করছিলেন। ট্রাম্প যুবক যুবতিদের বলছেন তোমাদের চাকরি মেক্সিকানরা নিয়ে নিচ্ছে। ট্রাম্পের মত আমাদের দেশে মোদী চাকরি দিতে পারছেন না। তিনি জাত, বর্ণ, ধর্ম নিয়ে ব্যাস্ত আছেন। তাঁর কাছে বাদামি বলে কিছু নেই। সব সাদা কালো। আমাদের দেশে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে কিছু বলা যাবে না। কালাধন নিয়ে বলা যাবে না। নোট বাতিল নিয়ে বলা যাবে না। গণপিটুনি নিয়ে কিছু বলা যাবে না। সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হলে কিছু বলা যাবে না তাহলেই আপনি রাষ্ট্রের চোখে ‘শহুরে নকশাল’ অথবা রাষ্ট্রদ্রোহী।‘’
কংগ্রেস দলের ন্যাশন্যাল মিডিয়া প্যানেলিস্ট জয়বীর শেরগিল বলেন, ‘’কলকাতা অনুভূতির জন্য বিখ্যাত। সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত। গত চার বছর ধরে আপনারা পড়ছেন ‘অচ্ছেদিন আ গয়ে’। এর থেকে ‘ফেক নিউজ’ আর কী হতে পারে? আমি কোনও রাজনীতির পরিবার থেকে আসিনি। রাহুল গাঁধির আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাজনীতিতে এসেছি। যদি আপনার ট্যালেন্ট থাকে তাহলে আপনি রাজনীতিতে সাফল্য পাবেন। ভারতীয় সংসদে ১৬৪জন সাংসদের বয়স ৪০ বছরের কম। ‘Fake news is not a current era news.’ এই ধরণের ভুয়ো খবর আগেও ছিল। সত্য সত্যের উপর নির্ভর করে। মিথ্যের উপর নয়।‘’
এআইপিসি(AIPC)-এর পূর্বাঞ্চলীয় কোঅর্ডিনেটর জারিতা লেইটপ্লাঙ্গ (Szarita Laitplang) বলেন, ‘’আমরা কমিউনিটি তৈরি করতে চাইছি। কমিউনিটি তৈরি করতে হবে। আমরা প্রফেশনালদের আহ্বান জানাচ্ছি আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য। বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করতে চাই। তাঁদের আহ্বান জানাচ্ছি। মুক্ত মনে আসুন আমাদের মঞ্চে আসুন। আমরা আলোচনা করব। দেশে সমস্ত মানুষ মিথ্যে খবরের উপর নির্ভর করছে না। মানুষকে বোকা বানানো সহজ নয়। মিথ্যে কথা এবং ভুয়ো খবর বন্ধ করতে হবে। আমরা নতুন মঞ্চ গড়ে তুলতে চাইছি।‘’

কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী বলেন, ‘’উপেক্ষা কোনও বিষয় হতে পারে না। ফোকাস সত্যের উপর হওয়া উচিৎ। আপনার দর্শন কেউ বদলে দিতে পারবে না। আপনি যদি সত্যের উপর নির্ভর করেন। যদি আপনি সত্যের পক্ষে থাকেন। আমি গর্বের সঙ্গে বলছি দেশের প্রগতি হোক। সমাজের সব স্তরের মানুষের উন্নতি হোক। কতজন চা-ওয়ালা দেশে আছেন? একজন চা-ওয়ালা বলছেন আমি দেশের প্রধানমন্ত্রী! যিনি নিজের মাকে কুড়ে ঘরে রেখেছেন। ভুয়ো খবর আর নিজের প্রচার করতে দেশের ভান্ডার থেকে ৪৫, ০০০ কোটি টাকা খরচ করেছেন মোদীজী। দেশের বিকাশ কতটা করেছেন তিনি?’’
সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় আলোচ্য প্রতিবেদকের প্রশ্নের উত্তরে প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী বলেন, ‘’পশ্চিমবঙ্গে কোন দলের সঙ্গে জোট হবে সেটা এখনও ঠিক হয়নি। কংগ্রেস দল এককভাবে নির্বাচন লড়বে না বিরোধী দল সিপিএমের সঙ্গে জোট করবে? অথবা তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে ২০১১ সালের মতো জোটে লড়বে বিষয়টা ঠিক হয়নি। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধির সঙ্গে আজ (২৯ অক্টোবর) দিল্লিতে রাজ্য কংগ্রেস নেতৃত্ব আলোচনা করছেন সেখানে কী সিদ্ধান্ত হয় সেটা আমাদের দেখতে হবে। কংগ্রেস কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব রাজ্য নেতৃত্বের উপর কিছু চাপিয়ে দিতে চায় না। আপনি যৌথ প্রচারের কথা বলছেন। কেন্দ্রীয়ভাবে বিভিন্ন দলের ট্রেডইউনিয়নগুলি একসঙ্গে প্রতিবাদ কর্মসূচী নিচ্ছে। কংগ্রেস রাস্তায় প্রতিবাদে আছে।‘’
ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে ঋজু ঘোষাল আরও বলেন, ‘’দেশের ইতিহাস আপনিও জানেন আমিও জানি। ট্রুথ মানে সত্য। সবার উপরে সত্য তার উপরে কিছু নায়। সারা বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির যে উন্নয়ন হয়েছে সেখানে আমাদের আরও সচেতন হতে হবে। প্রাণঞ্জয় গুহঠাকুরতা বলেছেন। অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে এই সম্মেলন তৈরি করবে আগামীর নেতৃত্ব।‘’                      
         

Thursday, 27 September 2018

রাজনীতির সৌজন্য সৌজন্যের রাজনীতি


দীপেন্দু চৌধুরী
পুজোর বাজার শুরু হয়ে গেছে। বাজার সরগরম। একদিনের দুপুবেলা। গোলপার্কের লাইব্রেরি যাচ্ছি। গড়িয়াহাটের একজন হকার দ্বিতীয় এক হকারকে বলছেন, ‘’এই মহাজাগতিক ঢপ মারিস না।‘’ বিষয়টা কী ছিল বলতে পারব না। তবে ভদ্রলোকের কথাটা আমার ভালো লেগেছে তাই মনেও রেখেছি। ঢপ আমরা সবাই মারি। জাগতিক মহাজাগতিক ঢপ কি হতে পারে অনুসন্ধান না করে বলা সম্ভব নয়। আমার এক বন্ধুর ভায়ের মেয়ে বছর কয়েক আগে একটা অনুষ্ঠান বাড়িতে দুপুরের নেমন্ত্রণ খেতে গেছে। তখন বাচ্চা মেয়েটির বয়স হবে তিন থেকে চার বছর। ওর থেকে কিছুটা বড় কয়েকজন ছেলেমেয়ে সেই বাড়ির খাটের তলায় রেখে দেওয়া ‘চাটনি’-র গামলা টেনে নিয়ে সবাই মিলে হাতা দিয়ে একটু একটু করে খাচ্ছিল। আমার বন্ধুর ভাইয়ের স্ত্রী দেখতে পেয়ে ছুটে গিয়ে ওদের এসব করতে নিষেধ করেন। নিজের মেয়েকে জিগ্যেস করে, ‘’পৃথা তুমি এসব কী করছ? পৃথা উত্তর দিয়েছিল, ‘’মা আমি ঝাড়ি করছি। ঝাড়ি করে খাচ্ছি।‘’ বন্ধুর ভায়ের স্ত্রীয়ের কাছে শোনা। ভদ্রমহিলা আমাকে বলেন, ‘’দাদা আমি ভেতরে ভেতরে হাসছি। কিন্তু ওদের সামনে ছদ্ম গাম্ভীর্য বজায় রেখে উত্তর দিতে হয়েছিল, আচ্ছা ঠিক আছে। এবার সবাই চল খেয়ে নেবে। পরে মেয়েকে বলেছিলাম পৃথা এইসব শব্দ বা কথা বলতে নেই। মেয়ে উত্তরে বলেছিল ‘দিদি’-দের কথা তুমি আমাকে শুনতে বলেছ। এর পরে কী বলব আমি বলুনতো?’’
বিষয়গুলি কতটা সামাজিক হলে আমাদের শুনতে হয়। অথবা কতটা অসামাজিক হলে আমাদের দূরত্ব রাখতে হয়। সম্প্রতি আমদের শহরের একটি পাড়ার চায়ের দোকানের মালিক, বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর। দোকানে উপস্থিত বিভিন্ন বয়সের খদ্দেরদের বলছে, ‘না ওই ছেলেগুলো আর আসে না। আমি ওদের বলেছি যতক্ষণ বাজে আড্ডা মারবি সেই সময়টা বাড়িতে বাবা-মায়ের পা টিপে দিবি। বলুন কিছু খারাপ বলেছি?‘’
আমাদের বিষয়টিও উল্লেখিত তিনটে বিষয়ের খুব কিছু উর্ধে নয়। আমাদের দেশে গত দু’তিন দশক রাজনীতি নামক কঠিন এবং বিষম এক বিষয়ে ‘সৌজন্য’ কতটা আছে? বিরোধী দলের সঙ্গে সরকার পক্ষের ‘সৌজন্য’ অথবা উল্টোদিকে সরকার পক্ষের লোকেরা নিজেদের কতটা সামনে এগিয়ে আনতে পারেন বিরোধী দলের সঙ্গে ‘সৌজন্য’ মূলক আলাপচারিতায়? সম্প্রতি আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে দু’জন (উত্তর বঙ্গের রায়গঞ্জে) ছাত্রের পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর প্রতিবাদে একটি ১২ ঘণ্টার বাংলা বনধ হয়ে গেল। বনধ ডেকেছিল কোন দল? বিজেপি। বাংলা বন্ধের মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। উত্তরবঙ্গের বনধের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের বন্ধের দিন (২৬ সেপ্টেম্বর)-এর প্রভাবের ফারাক কিছুটা নজরে পড়েছে। কিন্তু আমাদের এই বিষয়ের সঙ্গে একদিনের ‘বনধ’ খাপ খায় কী? হ্যা সাযুজ্য আছে। কারণ এটাও সৌজন্যের রাজনীতি এবং রাজনীতির সৌজন্যের মধ্যে পরে। গত সাত বছরে বামপন্থীদের অবস্থা সারা ভারতে উল্লেখ করার মতো তেমন কিছু নেই। বিষয়টা আমরা কলাম লিখিয়ে এবং নিরপেক্ষ, নির্ভীক সাংবাদিকের দল বলছি। তথাকথিত বামপন্থীদের কয়েকজন নেতার যদিও আমাদের মতামতের কোন মূল্য নেই। তাঁদের নাক এতটাই উঁচু। যে কেউ সমালোচনা করলে ‘উগ্র হিন্দু’ বলে দেগে দিতে তাঁদের সময় লাগে না। অথবা ‘পাগলা বাবা’ এবং ক্যামেরাম্যান। সময়ের মানদণ্ডে বর্তমান সময়ে প্রতিটি সাংবাদিক, লেখককে ক্যামেরাম্যন হতে হয়। যে সামাজিক কর্পোরেট ব্যবস্থা দু’দশক আগে থেকে শুরু হয়েছে। তিনি বা তাঁরা এসব খবর রাখতেন না।
ভারত তথা বাংলার বামপন্থীদের দায়িত্বের কথা আমাদের মত অখ্যাত কলমচির দল বলছি এমনটা নয়। প্রখ্যাত নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ তথা সমাজবিঞ্জানী অমর্ত্য সেন সম্প্রতি একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে আবার বলেছেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন বামপন্থীদের ঐতিহাসিকভাবেই গতিশীল সমাজের দায়িত্ব নিতে হবে।  
গত সাত বছর আমাদের বাংলায় পরিস্থিতি সব থেকে জটিল। কংগ্রেসের রাজনৈতিক মূল্যবোধ এবং ৩৪ বছরের শাসক সিপিএম তথা বামফ্রন্টের ঘরানায় রাজনীতি শেখা দল তৃণমূলকংগ্রেস বর্তমানে রাজ্যের শাসকদল। রাজ্যের উন্নয়নের স্বার্থে এবং শিল্পপতিদের আস্থা যোগাতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বনধ রাজনীতির বিরোধী। যে কারণে তিনি ইতালির মিলান শহর থেকে বাংলা বনধের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘’বনধের বন্ধ্যা রাজনীতি বাংলার মানুষ বন্ধ করে দিয়েছেন। আমি তাঁদের কাছে কৃতঞ্জ।‘’ বামফ্রন্টের আমলে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যে কোনও বনধের বিরোধিতা করেছেন। বাংলার উন্নয়নের প্রশ্নে। বিজেপি নিজেদের দলের কর্মীসমর্থকদের চাগাতে লোকসভা ভোটের আগে দু’জন ছাত্রের মৃত্যুকে বিষয় করে ‘বাংলা বনধ’ ডেকে বাংলার মানুষের অবস্থান জেনে নিতে চেয়েছিল। রাজনীতির পরিভাষায় তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া দেখা মানে গাঁধিজী বা লেনিনের কথায় মানুষের কাছে যাও। তাঁদের রায় নাও এবং তত্বে প্রয়োগ কর। বিজেপি বাংলার মানুষের রায় বুঝে নিতে চাইল। সামনে লোকসভা ভোট। বিজেপির টার্গেট ২২ জন সাংসদকে নির্বাচিত করে দিল্লি পাঠানো। পরে আসছে ২০২১ বিধানসভা ভোট। তত্বের প্রস্তুতির মঞ্চে বিজেপি কাদের সাহায্য নিয়ে থাকে? তাঁদের দলের মেরুদন্ড ‘আরএসএস’ নামক একটি শক্তিশালী সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। যাঁদের সাহায্য ছাড়া ‘বিজেপি’ দলটি মুখ থুবড়ে পড়বে।
২৬ সেপ্টেম্বর বিজেপির ডাকা বাংলা বনধ সফল বলা যাবে না। তবে শাসক তৃণমূল দলকে তথা প্রশাসনকে  একটা ধাক্কা দিতে পেরেছে বলেই বিশেষঞ্জদের মত। বিজেপি বনধের দিনটা বেছে নিয়েছিল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলকংগ্রেসের অন্যতম মেরুদন্ড মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপস্থিতির দিন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১২ দিনের বিদেশ সফরে। ১৬ সেপ্টেম্বর তিনি জার্মানী গেছেন পরে ইতালি। ঠিক এই সময়ে রাজনীতির সৌজন্যে বিজেপি এই সময়টাকে বেছে নিয়েছে। বিজেপির ডাকা বনধের দিন বামপন্থী দলগুলি রাস্তায় ছিল বনধকে সমর্থন না করেও। দু’জন ছাত্রের মৃত্যুর প্রতিবাদে সৌজন্যের রাজনীতিকে গুরুত্ব দিতে। তারমানে আমাদের ধরে নিতে হবে সিপিএম, প্রদেশ কংগ্রেস এবং বিজেপি তৃণমূল কংগ্রেসকে নয়। আসলে আমি কি ডরাই সখি রাখবে? আমি এবং আমরা ডরাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। নেত্রী এবং প্রশাসক হিসেবে। কারণ মমতার প্রত্যুৎপন্ন রাজনীতি তথা সৌজন্যের রাজনীতির অন্যতম উদাহারণ। চলতি বছরের ১৬ জুলাই মেদিনীপুর শহরের কলেজ কলেজিয়েট মাঠে নরেন্দ্র মোদীর জনসভায় ছাউনি ভেঙে একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনায় কয়েকজন বিজেপি সমর্থক আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর দলের আহতদের দেখতে যাবেন এটাই রাজনীতির সৌজন্য। সমাজবিঞ্জান এই দাবি করে। কিন্তু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে ওইদিনের দুর্ঘটনায় আহতদের হাসপাতালে দেখতে গেলেন। পাশাপাশি আহতদের নিজের ত্রাণ তহবিল থেকে আর্থিক সাহায্যও করলেন। এটাকে কি বলা যায়? রাজনীতির সৌজন্য না সৌজন্যের রাজনীতি?   
আবার এটাও মানতে হবে গত সাত বছরে তৃণমূল প্রশাসনের মন্ত্রীরা অনেক পরিণত। তুলনামূলকভাবে অনেক শান্ত, ধীরস্থীর। অনেক কৌশলী। এটার অন্যতম উদাহারণ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপস্থিতে তাঁর গড়ে দেওয়া ‘মন্ত্রিগোষ্ঠী’-র মাঝেরহাট সেতু ভেঙে পড়া এবং বাংলা বনধের মতো দু’টি বড় ঘটনাকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা। কয়েকজন নেতা মন্ত্রীর প্রথম দিকের নতুন ক্ষমতা পাওয়ার ছদ্ম অহংকার এবং তথাকথিত ‘আবেগ’ কেটেছে। কাটছে। এটাই দক্ষতার লক্ষণ। তাঁদের কর্মীসমর্থদের মধ্যে একটা তথাকথিত ঔদ্ধত্য এসেছে। সেই কারণে সমাজে একটা রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিসর তৈরি হচ্ছে। অত্যন্ত জনপ্রিয় গণমাধ্যম ‘সোশ্যাল মিডিয়ায়’ সুযোগ পেলেই বয়সে বড় মানুষকে হেয় করা। অপমান করা। অকারণে ‘তুই’- ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করা। তৃণমূল সরকারের প্রথম পাঁচ বছরে তথাকথিত এক ছাত্রনেতা (আদৌ তৃণমূলের লোক কি সে?), একজন কাঠের মাথা তথকথিত কবি, (সে এখনও আছে। দলে থাকলেও সেও কি তৃণমূল করে?) এই গোষ্ঠীর উদ্যোগে সৎ, নিরপেক্ষ সাংবাদিক, লেখকদের ‘ভাম’ বলে দেগে দেওয়া হত। মহাকরণ, নবান্ন, প্রেসক্লাব, তৃণমূল ভবনে সুযোগ পেলেই অপমান করা হত। ‘তুই’ বলে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়েছে।  ২০১৬ সালে বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশের কয়েকদিন পরে ‘বাংলা অ্যাকাদেমী’তে আমাকে নোংরা অপমান করার চেষ্টা হয়েছিল। সম্ভব হয়নি অ্যাকাদেমির আধিকারিকদের সৌজন্যে। আমাকে অপমান করার পেছনে ছিল ওই কাঠের মাথা কবি। যে বালখিল্যসুলভ আচরণ ছাড়া আর কিছু বোঝে না। আমি সেদিন বাংলা অ্যাকাদেমির সভাপতি শাওলী মিত্রের একটি সাক্ষাৎকার আনতে গিয়েছিলাম। যে সাক্ষাৎকারটি পরে বাংলা নাটকে পাঁচজন নারীর অবদান নিয়ে আমার একটি লেখায় প্রকাশ হয়। লেখাটি রাজ্য সরকারের ‘পশ্চিমবঙ্গ’ পত্রিকার ‘সিঙ্গুর’ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।
পঞ্চায়েত, পুরসভা এলাকায় মানুষ বামপন্থীদের অনুপস্থিতিতে নতুন পরিসর খুঁজছে। তৃণমূল কংগ্রেস দলে এবং সরকারে এত বেশি ‘পপুলিস্ট রাজনীতি’-র চর্চা হচ্ছে অনেকে বামফ্রন্টের শেষ দশকের সঙ্গে তুলনা করছে। গত ১৫ অগস্ট কলকাতা প্রেস ক্লাবের মধ্যহ্নভোজের অনুষ্ঠানে কয়েকজন উচ্চশিক্ষিত প্রবীণ সাংবাদিক বিষয়টা নিয়ে চর্চা করছিল। তাঁরা প্রত্যেকে ব্যক্তিগতভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রশাসক হিসাবে নম্বর দিলেও তাঁর দলের ‘পপুলিস্ট রাজনীতি’-র বিষয়ে সন্দিহান। আমি সেদিন যুক্তি দিয়েছিলাম কিছু নেতা মন্ত্রী ‘পপুলিস্ট রাজনীতি’ থেকে বেরিয়ে আস্তে চাইছে। আমার বলা কথার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায় পরিবহনমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শিশুসুলভ রাজনীতির পর্ব পার হয়ে আসা। উত্তর নন্দীগ্রাম এবং জঙ্গলমহল আন্দোলনের সময় যে আবেগ তাড়িত রাজনীতির চর্চা তিনি করেছেন তাঁর খেসারত তাঁকে জাতীয় এবং স্থানীয় ক্ষেত্রে দিতে হয়েছে। বনধের দিন ২৬ সেপ্টেম্বর ইসলামপুর শহরে জনসভা করলেও মৃত দু’ই ছাত্রের বাড়িতে যাননি। আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এটাকেও রাজনীতির সৌজন্যের মধ্যেই দেখতে হবে। ২৬ সেপ্টেম্বরের সভা থেকে তৃণমূলের যুবনেতা বলেন, ‘’নিহত রাজেশ সরকার ও তাপস বর্মণের পরিবার যে ধরণের ক্ষতিপূরণ বা সাহায্য চাইবেন, তাই নিয়েই তাঁদের পাশে দাঁড়াব। দাড়িভিটের ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে। হত্যাকারীদের শাস্তি হোক।‘’ পরিবহণমন্ত্রী আরও বলেন, ‘’কয়েক দিনের মধ্যেই রাজেশ এবং তাপসের বাড়িতে যাব। তাঁদের দাবি দাওয়া নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করব।‘’ সংবাদ মাধ্যম সূত্রে খবর রাজ্য সরকার দু’ই ছাত্রের মৃত্যুর তদন্তভার সিআইডির হাতে তুলে দিল।
‘’দাড়িভিট তদন্তের দায়িত্ব নিল রাজ্য সিআইডি। বৃহস্পতিবারই রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিবের নির্দেশে, ছাত্র মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত জেলা পুলিশের কাছ থেকে সিআইডিকে দেওয়া হয়।
জেলা পুলিশ উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরে দাড়িভিট উচ্চবিদ্যালয়ে দুই ছাত্রের গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। পুলিশের সঙ্গে ছাত্র এবং গ্রামবাসীদের সংঘর্ষের পৃথক মামলায় জেলা পুলিশ কয়েক জনকে গ্রেফতার করলেও এখনও কোনও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি’’ (সূত্রঃআনন্দবাজার ডিজিটাল)।
আলিঙ্গনের রাজনীতি এবং সৌজন্য
আমাদের দেশে লোকসভার বর্ষাকালীন অধিবেশন চলাকালীন কংগ্রেস সভাপতি তথা সাংসদ রাহুল গাঁধি অনাস্থা প্রস্তাবের উপর একটি আগুন ঝরানো বক্তব্য রাখেন। এর পরের ঘটনাটির জন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। বক্তৃতার পরে রাহুল গাঁধি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রমোদীর সঙ্গে আলিঙ্গন করেন। যে ব্যবহারের জন্য পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ এবং প্রশাসক নরেন্দ্র মোদী প্রস্তুত ছিলেন না। ২০ জুলাই সংসদে বক্তৃতার শেষে রাহুল বলেন, ‘’আপনাদের অন্তরে আমার প্রতি ঘৃণা থাকতে পারে। আপনারা আমাকে পাপ্পু বলে হাস্যস্পদ করতে পারেন, গালি দিতে পারেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমার অন্তরে আপনাদের প্রতি একটুও রাগ বা ঘৃণা নেই! প্রধানন্ত্রীর বিরুদ্ধেও কোনও বিদ্বেষ নেই। আমি এক এক করে আপনাদের অন্তর থেকেও ভালবাসা বার করে আনব।‘’ রাহুল গাঁধির এই আচরণ নিয়ে তর্ক বিতর্ক যতই হোক বা থাক এটা ইতিহাসে চলে যাবে। কারণ আমরা ভারতীয়রা নমস্কার বিনিময়, আলিঙ্গন করা এইসব সংস্কৃতিকে রাজনীতির ময়দানে দেখতে অভ্যস্ত নই। এটা ভারতীয় সংস্কৃতির সৌজন্যমূলক আচরণের মধ্যে পড়ে। যেমন পূর্ব ভারতের দুর্গা পূজোর পর বিজয়া উপলক্ষে নমস্কার করা এবং কোলাকুলি করে আলিঙ্গন করা। ঈদের পরেও এই সংস্কৃতি আমরা দেখেছি। জাতি, বর্ণ, সম্প্রদায়, ধনী, নির্ধন কোনও ভেদাভেদ না রেখে ‘কোলাকুলি’ সংস্কৃতি আমাদের সামাজিক সনাতন সম্পর্ককে আরও অটুট রাখে।  যদিও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সংসদে দাঁড়িয়ে রাহুলের প্রতুৎপন্ন সামাজিক সংস্কৃতিকে শ্লেষ করতে ছাড়েননি। ২০ জুলাই সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, ‘’কুর্সিতে বসার এত তাড়া, প্রধানমন্ত্রীর কাছে এসে উঠে বলেন, উঠে দাঁড়াও! উনি জানেন না, এই কুর্সিতে বসতে যোগ্যতা লাগে। দেড়শো কোটি ভারতবাসীর আশীর্বাদ লাগে।‘’
বিষয়টা এখানেই থামল না। রাহুল গাঁধির নেতৃত্বে কংগ্রেস আর্থিক প্রতারণায় অভিযুক্ত শিল্পপতিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে ধারাবাহিক আক্রমণ করে যাচ্ছে। ২৯ জুলাই লখনউ বিনিয়োগ কারীদের একটি সম্মেলনকে বেছে নিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেন, ‘’দেশের উন্নতিতে অংশ নেওয়া শিল্পপতিদের পাশে দাঁড়াতে আমি ভয় পাই না। কারণ আমার অভিপ্রায় সৎ।‘’ প্রধানমন্ত্রী সেদিন আরও বলেন, গাঁধিজীর উদ্দেশ্য স্পষ্ট ছিল। তাই তিনি বিড়লাদের বাড়িতে থাকতেও দ্বিধা করেননি। যদি তোমার উদ্দেশ্য ভাল ও সৎ হয়, তা হলে যে কারও সঙ্গে ছবি তুলতেই পার। এতে চরিত্রে কোনও দাগ পরে না।‘’
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উত্তরের প্রতিক্রিয়া পেলাম দু’জন ইতিহাসবিদের কাছ থেকে। আমরা সংবাদ মাধ্যম মারফৎ তাঁদের প্রতিক্রিয়া জানতে পারলাম। সাংসদ-ইতিহসবিদ সুগত বসু বলেন, ‘’আশা করি উনি নিজেকে মহাত্মা গাঁধি ভাবতে শুরু করেননি। উনি নিদেনপক্ষে দীনদয়াল উপাধ্যায়ও নন। বিড়লা সম্বন্ধে সমালোচনা থাকতে পারে। কিন্তু তিনি দেশ ছেড়ে পালাননি।‘’
ইতিহাসবিদ দীপেশ চক্রবর্তী বলেন, ‘’বিড়লা গাঁধিকে টাকা দিতেন। গাঁধি বছরশেষে পাইপয়সার হিসেব দিতেন। মোদী শিল্পপতিদের থেকে কত টাকা নেন, সেই হিসেব যদি তিনি জানান, তা হলে অসুবিধা ছিল না।‘’ প্রসঙ্গটি উল্লেখ করলাম বর্তমানে ভারতীয় রাজনীতিতে ফরাসি যুদ্ধবিমান ‘রাফেল’ নিয়ে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধি রাজনৈতিক সৌজন্য বজায় রেখেই একটার পর একটা আক্রমণ করে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে। আজ সিপিএম পলিটব্যুরো এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাঁদের দাবি ফরাসি সংস্থা ‘দাসো অ্যাভিয়েশন’-এর রাফাল বিমান সংক্রান্ত যে চুক্তি হয়েছে সেই বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য যৌথ সংসদীয় কমিটি (জেপিসি) গঠন করতে হবে। রাফাল নিয়ে বিতর্ক এমন একটা উচ্চতায় পৌঁছেছে বাধ্য হয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকরঁ বিবৃতি দিয়েছেন। কংগ্রেস সভাপতি সেই বিবৃতিকে লুফে নিয়ে নতুন ভাষায় নতুন করে আক্রমণ শুরু করেছেন। এই বিষয়টাকে কি বলা যায়? রাজনৈতিক অথবা কূটনৈতিক সৌজন্যের বাধ্যবাধকতা?
রাজনীতির সৌজন্য এবং সৌজন্যের রাজনীতিকে প্রসঙ্গ করে কয়েকশো পাতার একটা বই লেখা যায়। ইতিহাস থেকে সংগ্রহ করে এই বই গবেষকরা লিখতে পারেন। উন্নত গণতন্ত্রের দেশ আমেরিকা, গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া সহ ইউরোপের অতীত এবং বর্তমান রাষ্ট্রনায়কদের নাম এবং তাঁদের কাজের তথ্যসাবুদের ঘটনা উল্লেখ করে এই বই লেখা যায়। আমাদের দেশেও মহাত্মা গাঁধি, পণ্ডিত নেহরু, নেতাজী সুভাষ বোস, জ্যোতির্ময় বসু, ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, অটলবিহারী বাজপেয়ী, মনমোহন সিংহ, সনিয়া গাঁধি সহ একাধিক প্রথমসারির রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আলোচ্য বিষয়ে একটি প্রামাণ্য দলিল লিখে ফেলা যায়। তরুণ প্রজন্মের নেতাদের কাছে আমরা সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌজন্যের রাজনীতি এবং সংস্কৃতি আশা করলে কি খুব ভুল কিছু প্রত্যাশা করা হবে? শ্যামধারীদের বাড়িতে বাঁশের সরু বাতা দিয়ে বাঁধানো ক্যালেন্ডারে ‘সত্যমেব জয়তু’ লেখা এক সভ্যতায় আমার দেশ দেখা হয়েছিল। শ্যামধারীকেও আমি ‘আপনি’ সম্বোধন করে আলিঙ্গন করেছিলাম। কোলাকুলি করেছিলাম। ওদের বাড়িতে আমার গাঁধির দেশ দেখা হয়েছিল। আজ বলি আমি এবং আমরা ‘সত্যমেব জয়তে’-র দেশে সাংবিধানিক সৌজন্য সকলের থেকে আশা করি।          

Wednesday, 19 September 2018

আপনারা ঘুমতে যান, আমরা শুল্কযুদ্ধে...... পরমাণু বোমার আর ভয় নেই


দীপেন্দু চৌধুরী  
প্রায় চারমাস আগের কথা। একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, সঙ্গীত, সাহিত্য, খেলা, বাণিজ্য, শুল্কবাণিজ্য, প্রতিরক্ষা এবং কূটনীতির এক নতুন বাতায়নের ভাষা আমরা পেয়েছি। সম্মিলিত ঐকতানের আশায় ‘প্রাচ্য-পাশ্চাত্য’-র অতিথিপরায়ণ মানুষ দুই দেশের আঙিনায় বিনিময়ের নতুন ঘরানায় অবগাহন করতে চাইছি। কূটনীতির এই নতুন ঘরানাকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বিশ্ববাণিজ্য ও বিশ্ব রাজনীতির আঙিনায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছে। অভিঞ্জ পাঠক, নাগরিক সমাজ সচেতন মানুষ আশা করি বুঝতে পারছেন আমরা কোন দেশের কথা বলছি। এবং কাদের কথা বলছি।
দীর্ঘ টানাপড়েনের পরে সিঙ্গাপুরে অভিজাত সভাঘরে বিশ্বের পরমাণু শক্তিধর দুই নেতার প্রস্তাবিত বৈঠকটি ১২ জুন, ২০১৮ তে হয়। বৈঠকের কুশীলব ছিলেন বিশ্বের তাবড় সংবাদ মাধ্যমে বহু আলোচিত শব্দবন্ধ ‘বেঁটে রকেটম্যান’ আর ‘খ্যাপাটে বুড়ো’। ‘খ্যাপাটে বুড়ো’ মানে বিশ্বের সব চেয়ে শক্তিধর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর ‘বেঁটে রকেটম্যান’ কে নিশ্চয় বলে দিতে হবে না। তবু নামটা উল্লেখ করি। উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং উন। ক্যাপিলা হোটেলে বৈঠকের আগে বা পরে বিশ্বের কাছে পরিচিত ‘স্মল রেড ডেট’ নামে পরিচিত সিঙ্গাপুরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে কেউ ‘কালো পতাকা’ দেখায়নি। এই লক্ষণের অন্যতম কারণ সিঙ্গাপুর সহ সমস্ত বিশ্বের শান্তিপ্রিয় নাগরিক কেউ ‘পরমাণু যুদ্ধ’ চায় না। ২০১৮ সালের সংবাদ মাধ্যমের সোজন্যে প্রথম সারির এবং চিরকালের বড় খবর হয়ে থাকবে ‘মোটা আর খ্যাপাটে’ বুড়োর এই ঐতিহাসিক বৈঠক। একুশ শতাব্দীর এক নয়া অধ্যায়। প্রায় সাত দশক পরে জুন মাসের হাই প্রোফাইল ওই বৈঠকের সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ দাবি তুলেছিলেন ১২ জুন সিঙ্গাপুর সরকার ছুটি ঘোষণা করুক। বিশ্ব শান্তি প্রয়াস দিবস উপলক্ষে। বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমের প্রায় ১২০০ প্রতিনিধির সামনে এবং আড়ালে এই বৈঠক হয়েছে। সব থেকে বেশি আলোচিত চলতি বছরের ১১ জুন দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের দু’ই রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য ব্যবস্থাও ছিল ঢালাও। সূত্রের খবর সিঙ্গাপুর সরকার কিম এবং তাঁর পারিষদদের হোটেল খরচ সহ আরও বিভিন্ন খাতে প্রায় দুকোটি টাকা খরচ করেছে। সেসময় সিঙ্গাপুরের সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্ন উঠেছিল এই খরচ করে সিঙ্গাপুর কী পাবে?মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিঙ্গাপুর গিয়েছিলেন জি-৭ বৈঠকের টাটকা উত্তেজনা সঙ্গে নিয়ে। হাত মেলাতে গিয়ে বয়সে ছোট ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকরঁ-এর হাতে প্রায় কালশিটে ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। বিশ্বের সবথেকে শক্তিধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। কিন্তু এসব কিছুর উত্তেজনা সেদিন উবে গিয়েছিল। কিমের পরশ ট্রাম্পকে নতুন উত্তেজনা দিয়েছিল। ‘বেঁটে  রকেটম্যান’-ও নিজের আবেগ চেপে রাখতে পারেননি। বৈঠক শুরুর আগেই ‘মোটা আর খ্যাপাটে’ বুড়োর হাতে হাত রেখে উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং উন বলেছিলেন, ‘’গোটা দুনিয়ার কাছে এই মুহূর্ত নির্ঘাত কল্পবিঞ্জানের মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু এটাই বাস্তব।‘’
কলকাতা থেকে প্রকাশিত প্রথম শ্রেণীর দৈনিক ১৩ জুন লিখল
·         পারস্পরিক শান্তি ও সমৃদ্ধি, নতুন সম্পর্ক স্থাপনের অঙ্গিকার
·         কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি রক্ষায় একজোটে কাজের প্রতিশ্রুতি
·         পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়ার প্রতিশ্রুতি উত্তর কোরিয়ার। বিনিময়ে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করবে আমেরিকা।
·         উত্তর কোরিয়ায় নিহত মার্কিন যোদ্ধাদের দেহাবশেষ আমেরিকায় ফেরানো হবে।
বয়সে প্রায় দ্বিগুণ ট্রাম্প সাহেবকে সম্মান জানাতে ১২ জুন ৩৪ বছরের কিম বৈঠক শুরুর মিনিট সাতেক আগে ক্যাপিলায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। কূটনৈতিক ভদ্রতা বলুন অথবা একটা আধুনিক সমাজতান্ত্রিক দেশের উন্নত শিক্ষা সংস্কৃতি। সকাল ৯টা। বৈঠকে কী হতে পারে তাঁর একটা আগাম বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলে পরমাণু শক্তিধর দু’ই রাষ্ট্রনেতা। সমস্ত বিশ্ব একটা ‘ট্রেলার’ দেখে। ১২ সেকেন্ডের করমর্দন। কয়েকটি কথা। এরপর হাসিমুখে লাইব্রেরি লাগোয়া প্রাইভেট চেম্বারের দিকে হাঁটতে দেখা যায় দু’জনকে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের মেজাজে বলেছিলেন ‘’এক মিনিটে বুঝে যাব কিম কী চান।‘’ কিন্তু সময়ের বিচারে বৈঠক হল ৫ ঘণ্টা ৮ মিনিট। দু’ই রাষ্ট্রপ্রধানের একান্ত বৈঠক ৩৮ মিনিটের। দু’ই দেশের সরকারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে চুক্তি বৈঠক আরও সাড়ে ৪ ঘণ্টা। এবং পরমাণু অস্ত্র সহ একাধিক বিষয়ে চুক্তিও হয়ে গেল দু’ই দেশের। যৌথ বিবৃতিতে সই করলেন ট্রাম্প এবং কিম। সইয়ের পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বললেন, ‘’সারা জীবন তো চুক্তি করেই এসেছি। তাই জানি, কে কখন কী চুক্তি চায়।‘’
কিম বলেছিলেন, ‘’চ্যালেঞ্জ আসবে সেটা বুঝছি। তবু আশা রাখছি, বৈঠক নিয়ে যাদের সন্দেহ আছে, অচিরেই তা মিটে যাবে।‘’
নিউ ইয়র্ক টাইমস ১২ জুন অনলাইন সংস্করণে প্রতিবেদক Mark Landler লিখলেন,
‘’He also repeated his determination to keep imposing sanctions on the North until it abandons nuclear weapons. But he confirmed that China, the North’s largest trading partner, had eased a clampdown on cross-border trade in recent weeks — a reversal he attributed partly to the trade tensions between China and the United States.
Still, the president said he did not plan to return to bellicose threats like “fire and fury,” which fueled tensions last year and helped drive South Korea to seek a diplomatic overture to the North.
Appearing to accept the views of his predecessors, as well as most of his own military commanders, Mr. Trump said he could not imagine a war in a country where the largest city, Seoul, is only 35 miles from the border where the conflict would likely erupt.
For Mr. Trump, averting such massive bloodshed justified the risk of meeting with Mr. Kim. He bridled at critics who said he had elevated a brutal dictator by agreeing to meet, and had extracted little in return.
“If I have to say I’m sitting on a stage with Chairman Kim and that gets us to save 30 million lives — it could be more than that — I’m willing to sit on the stage,” Mr. Trump said. “I’m willing to travel to Singapore.”
Still, as ever, the president hedged his bets.
“I think, honestly, I think he’s going to do these things,” Mr. Trump said. “I may be wrong. I mean, I may stand before you in six months and say ‘Hey, I was wrong.’ I don’t know that I’ll ever admit that, but I’ll find some kind of excuse.”
David E. Sanger contributed reporting from Singapore, and Choe Sang-Hun from Seoul, South Korea.’’ 
এই চুক্তির পরেও চারমাস অতিক্রান্ত। কিন্তু উত্তর কোরিয়া এবং মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তির পরের অধ্যায় কী হচ্ছে বা কী হতে যাচ্ছে সে বিষয়ে বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষ আমরা আজও অন্ধকারে। রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উডরো উইলসন এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ নিজেদের কূটনৈতিক দ্বন্দ মেটাতে শান্তি আলোচনায় বসেন। কিন্তু সেই আলোচনা ব্যর্থ হয়। শুরু হয় নতুন বিশ্বের ভারসাম্য। তথা দ্বিতীয় বিশ্বের মঞ্চ। সোভিয়েত ইউনিয়নের দুর্দান্ড প্রতাপ শাসক জোসেফ স্তালিন এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান নিজেদের দ্বন্দকে একটি ঠান্ডাযুদ্ধের ‘কূটনীতি’ হিসাবে দেখতেন। তারই ফলস্বরূপ আমাদের সামনে এল পরমাণুযুদ্ধের ভয়াবহ ছবি। দু’ই শক্তিশালী দেশের পরবর্তী দু’ই রাষ্ট্রনায়ক নিকিতা ক্রুশ্চেভ এবং জন এফ কেনেডি বিশ্বকে পরমাণু যুদ্ধের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। যাকে বলা হয় ব্রিঙ্ক অফ নিউক্লিয়ার ওয়ার। Brink of nuclear war. যুদ্ধ। পরমাণু যুদ্ধ। জাপানের হিরোশিমার অভিঞ্জতা বিশ্বের প্রথম সারির আর্থিক এবং পরমাণু  প্রযুক্তিতে বলিয়ান শক্তিধর রাষ্ট্রের মানুষ আজও ভোলেনি। রাষ্ট্রপ্রধানরা আরও বেশি ইতিহাস সচেতন তাই তাদেরও ভোলার কথা নয়।
এই প্রসঙ্গে আমরা উল্লেখ করতে পারি ভারত এবং মার্কিন পরমাণু চুক্তির কথা। ভারতের সঙ্গে ২০০৫ সালে  পরমাণু চুক্তি হওয়ার পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ বলেন, ‘’২০০৫-এর যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে মার্কিন দেশ এই প্রথম প্রচ্ছন্নভাবে হলেও ভারতের নিউক্লিয়ার বোমার প্রকল্পটিকে মান্যতা দিয়েছে। এ ছাড়াও মার্কিন দেশের জনমত এই প্রথম মেনে নিল যে নিউক্লিয়ার গবেষণা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ভারত একটি অগ্রগণ্য দেশ, এবং সে দেশ দায়িত্ব নিয়ে এগুলির সুরক্ষা দিচ্ছে; তাই পৃথিবীর অন্যান্য নিউক্লিয়ার শক্তিধর দেশ যেসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, ভারতেরও সেই সব সুযোগসুবিধা পাওয়া উচিত।...... এই ১২৩ চুক্তি করার সময় আমরা আমাদের দেশের বর্তমান ও সুদূর ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার বিষয়টি সর্বদা মাথায় রেখেছি— এটাও খেয়াল রেখেছি যে এটা যেন আমাদের ‘নিউক্লিয়ার ডকট্রিন’-এর সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ হয়।...’’
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ প্রবাদ প্রতিম দেশ। আধুনিক শিল্প এবং প্রযুক্তির প্রতীক বলা চলে। এই দেশেও একটা সময় আদৌ শিল্প সম্ভব কিনা সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। উন্নত গণতন্ত্রের দেশ আমেরিকা। সেই দেশ উচ্চশিক্ষা, ধ্রুপদী সংস্কৃতির এক মহান তীর্থ ক্ষেত্র।     
পরমাণু যুদ্ধের আতঙ্ক কী এবং কতটা হতে পারে ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে অনেকটা বোঝা যায়। তাই আমরা সচেতন ভাবেই এই প্রশ্ন তুলতে চাইছি।  প্রমাণ অতীতের পরমাণু যুদ্ধের যে আতঙ্ক আমাদের সামনে রয়েছে। জাপানের মানুষের সঙ্গে সহমর্মিতা ভাগ করে নিয়েই বলতে চাই বর্তমানে আমরা আরও বেশি আতঙ্কিত ‘শুল্ক যুদ্ধে’-এর ঠান্ডা লড়াই নিয়ে। একমেরু পৃথিবী এক সময় দু’টো মেরুর বুদ্ধির যুদ্ধ অথবা ঠান্ডাযুদ্ধ দেখেছে। বর্তমান বিশ্ব দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বহুমুখী পৃথিবীর দিকে। আমরা অতীত পার হয়ে এসে পড়েছি পুঁজিবাদ বনাম সমাজতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ বনাম সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ উত্তর বিশ্বে। বিশ্বায়ন উত্তর নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায়। সীমান্ত বাণিজ্য বনাম ‘শুল্ক যুদ্ধ’। জাতীয় স্বাধীনতা অবশ্য সব কিছুর উর্ধে কথা বলতে এগিয়ে আসে। যে কোনও দেশের মুক্তচিন্তা এবং স্বাধীনতার স্বাদ আমাদের স্বাধীন হতে শিখিয়েছে।      
এই নিবন্ধ লেখার খুব কিছু প্রয়োজন বা গুরুত্ব দাবি করে কী? হ্যাঁ করে। কারণ চলতি বছরের ১২ জুন ‘মোটা এবং খ্যাপাটে বুড়ো’-র সঙ্গে ‘বেঁটে রকেটম্যানের চুক্তির পরে আরও একটা নতুন যুদ্ধ শুরু হয়েছে। সেই যুদ্ধ হচ্ছে ‘শুল্ক যুদ্ধ’। পরিবর্তনশীল সমাজে তথা আধুনিক বিশ্ব ব্যবস্থায় ধনতন্ত্র বনাম সমাজতন্ত্র শিবিরের একটা যুদ্ধ ছিল। কিন্তু ক্ষয়িষ্ণু সমাজতন্ত্র শিবির পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অত্যন্ত সন্তর্পণে সমাজতন্ত্রের পতাকা হাতে নিজেদের দেশের আর্থসামাজিক মান একটা উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছে। যদিও এই দেশটির সামজতন্ত্র নিয়ে বিভিন্ন মত উঠে আসছে। কারণ বামপন্থী মতাদর্শের চিরন্তন সত্য মানব কল্যাণ। মার্ক্সের সমাজ বিঞ্জান সেই দাবি করে। মার্ক্সের প্রঞ্জাও উল্লেখিত সত্যের জন্য মানব কল্যাণের ব্রতের কথা শোনায়। বর্তমান ধনী সমাজতান্ত্রিক দেশ, যেমন চিন। নিজের দেশকে ‘কূটির শিল্প’-এর উন্নত দেশ হিসাবে বিশ্বের স্বীকৃতি আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রের চোখে চোখ রাখতে শুরু করেছে। চিনের শ্রমিকের ঘামের বিনিময়ে তৈরি সস্তার পণ্য সারা বিশ্বের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছিল। স্বল্প পারিশ্রমিকে চিনা শ্রমিকের ঘামের বিনিময়ে তৈরি দৈনন্দিন জীবনের সমস্ত সামগ্রী সারা বিশ্বের বাজারে ছেয়ে গেছে। চিনের শ্রমিকের ঘামে সস্তার সামগ্রী চিনের অর্থনীতিকে আজ স্বাবলম্বী করেছে।  আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া মহাদেশে চিনের বর্তমান সরকার নিজেদের দেশের পণ্য ছড়িয়ে দিতে আরও এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়েছে। ‘ওবর প্রকল্প’ বলি অথবা ‘ওয়ান রোড ওয়ান বেল্ট’। যদিও চিনের বামপন্থী মতাদর্শের পাশাপাশি আরও একটি অসংগঠিত আধুনিক বামপন্থী চিন্তার কথা শোনা যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই নতুন কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। নতুন জীবনবোধ গড়ে তোলার জন্য নতুন বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে লড়াই করার মতো মতাদর্শ আজ বড় বেশি প্রয়োজন। বিষয়টা মার্ক্সবাদের আধুনিক পণ্ডিত বিদ্দজ্জনেরা ভাববেন।
আমরা নতুন বিশ্বের আলোচ্য শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ‘শুল্কযুদ্ধ’ নামক একটি বিষয়ে বেশি চিন্তিত। কারণ সমস্ত বিশ্বে বেকারি বাড়ছে, নিরক্ষ মানুষের সংখ্যা আমরা কতটা কমাতে পেরেছি? শিশু শ্রমিক ব্যবস্থা এখনও রয়ে গেল। মানব পাচারের মতো সভ্যতার এক অভিশাপ আমাদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। নতুন করে ‘শুল্ক যুদ্ধ’ নামক একটি অস্ত্র আমাদের ভাবতে বলছে। এই বিষয়ে আলাদা একটা নিবন্ধ দাবি করছে। আমরা চেষ্টা করব নভেম্বরে আমেরিকার অন্তর্বর্তী নির্বাচনের আগে এই বিষয়ে একটি নিবন্ধ আলোচ্য স্তম্ভে পরিবেশন করার।