Saturday, 2 September 2017

ভারতীয় ভাষা, সভ্যতা সাগরের মতো- বাঙালি সংস্কৃতি গঙ্গার অববাহিকা

ভারতীয় ভাষা সভ্যতা সাগরের মতো
বাঙালি সংস্কৃতি গঙ্গার অববাহিকা: 
সম্প্রতি শিলিগুড়ি থেকে আমার এক আত্মীয় ফোন করেছিল। আমি তাঁর কাছে জানতে চাই পাহাড়ের কি অবস্থা? কবে বনধ উঠবে? স্থায়ী সমাধান কি কিছু দেখা যাচ্ছে? আত্মীয় বন্ধুটি বলল, ‘স্থায়ী সমাধান হলেও হতে পারে। মুখ্যমন্ত্রীর ডাকা সর্বদলীয় বৈঠকের পরে। তবে মনে হচ্ছে পাহাড়ে গোষ্ঠী রাজনীতি নতুন করে শুরু হবে। আমরা সমতলবাসী দ্রুত পাহাড় সমস্যার সমাধান চাই। টানা বন্ধে সমতলের মানুষেরও ব্যাবসায়ী স্বার্থ এবং সামাজিক সম্পর্কের টানাপড়েন বাড়ছে। দার্জিলিংকে কেন্দ্র করে রাজ্যের যে পর্যটন শিল্প সে সবের কি হবে জানি না। হেরিটেজ বাড়ি, বিখ্যাত সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক ক্ষতি হয়ে গেল।’ বন্ধুর আক্ষেপের সঙ্গে বহু শিল্পী, বুদ্ধিজীবীর আক্ষেপ মিলে যাচ্ছে। কলকাতা বা দেশের অনেক খ্যাতনামা ব্যাক্তি আছেন যাঁদের শৈশব কৈশোর দার্জিলিং, কালিম্পং-এর মতো শৈল শহরের মিশনারি স্কুল, হস্টেলে কেটেছে। তারাও আজ উদ্বিগ্ন। যেমন চলচিত্র অভিনেতা তথা পরিচালক অঞ্জন দত্ত। তাঁর ব্যক্তি জীবনের অনেকটাই জুড়ে আছে দার্জিলিং। তাঁদের সঙ্গে আমার বন্ধুটির কথা যেন অনেকটাই মিলে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে পাহাড়ের দলগুলি নিয়ে ২৯ অগস্ট নবান্নে যে বৈঠক হয়েছে সেই বৈঠকে রাজ্য সরকার, গোর্খা জন্মুক্তি মোর্চা এবং পাহাড়ের অন্যান্য দলের আলোচনা আমাদের আশার আলো দেখিয়েছে। পাহাড় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল বাংলা ভাষা চালু করাকে কেন্দ্র করে। সেই আলোচনা পথ বদলে পাহাড় ‘গোর্খাল্যান্ড’-এর দাবিতে রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে। ৮ জুন পাহাড়ে রাজ্য মন্ত্রীসভার বৈঠক চলাকালীন পাহাড়ে গন্ডগোল শুরু হয়। যেটা এই রাজ্যের সুশিক্ষিত সচেতন নাগরিক অতীতেও  চায়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতেও চায় না। ২৭ অগস্ট রবিবার কলকাতার লেক ক্লাবে ‘ক্যালকাটা ডিবেটিং সার্কল’-এর একটি বিতর্কসভা ছিল। সভার মত ছিল, ‘বাংলা ভাষার পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছে’। এই সভায় প্রবীণ কবি শঙ্খ ঘোষ বলেন, ‘’নীচের তলায় বাংলাও গুরুত্বপূর্ণ। শহরের লেখাপড়া শেখা মানুষের দৃষ্টিতে সব কিছু দেখা ঠিক নয়।‘’ এই কথা বলার আগে শঙ্খ ঘোষ একটি গল্প শোনান আমাদের। তিনি বলেন, বিলেতের লেখক উইলিয়ম রাদিচে। এবং অবশ্যই তিনি বাংলাবিদ। বিলেতের ছাত্রেরা আরও ভালো বাংলা শেখার জন্য পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতায় আসতে চেয়ে লেখকের মতামত জানতে চেয়েছিল। রাদিচে সেইসব আগ্রহী ছাত্রদের কলকাতা যেতে নিষেধ করেন। রাদিচে বলেন, ‘ভালো ইংরেজি শিখতে হলে কলকাতায় যেতে পার! ভালো বাংলার জন্য যাবে ঢাকা।’ বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম পথিকৃৎ এবং অভিভাবক কবি শঙ্খ ঘোষ আমাদের হাত ধরে চিনিয়ে দিলেন উচ্চ শিক্ষিত বাংলার নাগরিক আমরা কোথায় আছি।
এই সূত্রে পাহাড়ের ইতিহাসটা আর একবার চর্বিত চর্বণ করে নেওয়া যাক। চাণক্য নীতি সেই কথাই বলে না? ইতিহাস না জানলে একটা অঞ্চলকে আলতো করে দেখা হয়। যে কোনও অঞ্চলের গভীরে জানতে হলে সেই অঞ্চলের ইতিহাস জানাটা অবশ্যই জরুরি।
দার্জিলিং শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ভাষার শব্দ "দুর্জয় লিঙ্গ" থেকে। এর অর্থ " অদম্য ক্ষমতার অধিকারী শিব, যে হিমালয় শাসন করে"।
সিক্কিম, নেপাল, ভূটান ও ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীন ভাবে জড়িত দার্জিলিং এর ইতিহাস । ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্য্যন্ত সিক্কিম রাজ্য দ্বারা দার্জিলিং সংলগ্ন পাহাড়ী অঞ্চল এবং নেপাল রাজ্য দ্বারা শিলিগুড়ি সংলগ্ন তরাই সমতল অঞ্চল শাসিত হত। ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দ থেকে নেপালের গুর্খারা সমগ্র পাহাড়ী অঞ্চল অধিকারের চেষ্টা শুরু করলে সিক্কিম রাজ্যের ছোস-র্গ্যাল তাঁদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িত হয়ে পড়েন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে নেপালীরা তিস্তা নদীর তীর পর্য্যন্ত সিক্কিম সেনাবাহিনীকে হঠিয়ে দিতে সক্ষম হয়। এই সময় সমগ্র উত্তর সীমান্তে নেপালীদের বিজয়যাত্রা রুখতে ব্রিটিশরা তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে সংগঠিত ইঙ্গ-গুর্খা যুদ্ধের ফলে গুর্খারা পরাজিত হয়ে পরের বছর সগৌলি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির ফলে সিক্কিম রাজ্য থেকে অধিকৃত মেচী নদী থেকে তিস্তা নদী পর্যন্ত সমস্ত অঞ্চল নেপালীরা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে সমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে তিতালিয়া চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই অঞ্চল ছোস-র্গ্যালকে ফিরিয়ে দিয়ে সিক্কিম রাজ্যের সার্বভৌমত্ব সুনিশ্চিত করে।
১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে লেপচা ও হিন্দুস্থানী ভাষায় রচিত এই চুক্তির ফলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে দার্জিলিং অঞ্চলের লীজ প্রদান করা হয়।( নেপালি ভাষা নয়)
১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক প্রতিনিধিদল নেপাল-সিক্কিম অঞ্চলের সীমান্তে তাদের যাত্রাকালে দার্জিলিং অঞ্চলে অবস্থান করার সময় এই স্থানে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর স্বাস্থ্য উদ্ধারকেন্দ্র নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেন।
১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানি ছোস-র্গ্যালের নিকট হতে মহানন্দা নদীর পশ্চিমাঞ্চল লীজ নেন।১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে সিক্কিম রাজ্য আর্থার ক্যাম্পবেল নামক কোম্পানির একজন আধিকারিক এবং জোসেফ ডাল্টন হুকার নামক একজন উদ্ভিদবিদ ও অভিযাত্রীকে গ্রেপ্তার করলে কোম্পানি তাঁদের মুক্ত করার জন্য সেনাবাহিনী পাঠায়, যার ফলে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোম্পানি ৬৪০ বর্গমাইল (১,৭০০ কিমি২) এলাকা অধিকার করে নেয়। ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে ভূ্টান ও ব্রিটিশরা সিঞ্চুলা চুক্তি স্বাক্ষর করলে কালিম্পং ও পাহাড়ের গিরিপথগুলির ওপর ব্রিটিশ রাজের অধিকার হয়।
ব্রিটিশ ও সিক্কিমের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিবাদের ফলে ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে তিস্তা নদীর পূর্ব তীরের অঞ্চলগুলি ব্রিটিশদের হস্তগত হয়। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ১,২৩৪ বর্গমাইল (৩,২০০ কিমি২) ক্ষেত্রফল এলাকা নিয়ে দার্জিলিং জেলা গঠিত হয়, যা বর্তমানে একই আকারের রয়ে গেছে। 
১৮৯০ গ্রীষ্মকালে সমতলভূমির প্রচণ্ড দাবদাহ থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ আধিকারিকেরা দার্জিলিংয়ের মনোরম আবহাওয়ায় বসবাস শুরু করলে দার্জিলিং একটি শৈলশহর ও স্বাস্থ্য উদ্ধারকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।
আর্থার ক্যাম্পবেল ও রবার্ট নেপিয়ার এই শৈলশহর গঠনে অগ্রণী ভূমিকা নেন। তাঁদের এই প্রচেষ্টার ফলে ১৮৩৫ থেকে ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পাহাড়ের ঢালে চাষাবাদ ও ব্যবসা বাণিজ্য শুরু হলে দার্জিলিংয়ের জনসংখ্যা শতগুণ বৃদ্ধি পায়।
১৮৩৯ থেকে ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সমতলের সঙ্গে সংযোগকারী প্রথম সড়কপথ নির্মিত হয়।
১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সৈন্যদের জন্য অস্ত্রাগার নির্মিত হয় এবং ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে এই শহরকে পুরসভায় পরিণত করা হয়।১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে বাণিজ্যিক ভাবে চা চাষ শুরু হলে বেশ কিছু ব্রিটিশ চা প্রস্তুতকারক এই স্থানে বসবাস শুরু করেন। ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে দার্জিলিং শহরকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী রূপে আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষনা করা হয়। স্কটিশ ধর্মপ্রচারকরা ব্রিটিশ আধিবাসীদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা শুরু করেন। ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে দার্জিলিং হিমালয়ান রেল চালু হলে শহরের উন্নয়ন আরো দ্রুত হারে বৃদ্ধি পায়।
ব্রিটিশ শাসনকালের শুরুতে দার্জিলিংকে অর্থনৈতিক ভাবে অনুন্নত জেলা হিসেবে গণ্য করা হত, যার ফলে ব্রিটিশ ভারতের অন্যান্য জেলাতে প্রযোজ্য আইন এই অঞ্চলে বলবত হত না। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে এই অঞ্চলকে একটি পিছিয়ে পড়া অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় দার্জিলিং অঞ্চলের চা বাগানগুলিতে অসহযোগ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।[
১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে সশস্ত্র বিপ্লবীরা বাংলার গভর্নর স্যার জন অ্যান্ডারসনকে হত্যার চেষ্টাও করেন।
১৯৪০-এর দশকে এই জেলার চা শ্রমিকদেরকে সংগঠিত করে কমিউনিস্টরা ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু করেন।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের স্বাধীনতার পর দার্জিলিং, কার্শিয়াং, কালিম্পং ও তরাই অঞ্চলের কিয়দংশ নিয়ে নির্মিত দার্জিলিং জেলাকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। পাহাড়ে নেপালীরা প্রধান জনগোষ্ঠী হিসেবে বসবাস করলেও তরাই সমতলে ভারত ভাগের ফলে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত বিশাল সংখ্যক বাঙালি উদ্বাস্তুরা বসবাস শুরু করতে শুরু করে। নেপালীদের দাবীগুলির প্রত্যুত্তরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিস্পৃহ মনোভাবে বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে দার্জিলিংয়ের স্বায়ত্তশাসন ও নেপালী ভাষার স্বীকৃতির দাবী ওঠে।
১৯৭৫খ্রিস্টাব্দে সিক্কিম নামক একটি নতুন রাজ্যের উদ্ভব হলে এবং ভারত সরকার দ্বারা নেপালী ভাষাকে ভারতীয় সংবিধান অনুসারে প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের নিস্পৃহতা লক্ষ্য করে এই অঞ্চলে গোর্খাল্যান্ড নামক একটি নতুন রাজ্য তৈরীর জন্য বিংশ শতাব্দীর আশির দশক জুড়ে ব্যাপক ও হিংসাত্মক আন্দোলন শুরু হয়।
১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট ও সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে দার্জিলিং গোর্খা পার্বত্য পরিষদ নামক একটি নির্বাচিত প্রতিনিধিদলের সৃষ্টি করা হয়, যাদের ওপর এই জেলার প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দেওয়া হয়। 
২০০৮-০৯ সাল নাগাদ ভারত সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার পৃথক রাজ্যের দাবী মেনে নিতে অস্বীকৃত হলে পুনরায় ধর্মঘট আন্দোলন শুরু হয়।
২০১১ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে ভারত সরকার, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার মধ্যে একটি চুক্তির ফলে গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নামক একটি নতুন স্বায়ত্তশাসিত পার্বত্য পরিষদ গঠন করে এই জেলার প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রদান করা হয়। (Courtesy: Mahendra Nath Bala, Facebook)
আন্দোলনের শুরু ‘বাংলা ভাষা’ বাধ্যতামূলক করা হবে কি হবে না এই নিয়ে। আমাদের রাজ্যে বাংলা ভাষা নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছিল রাজ্য শিক্ষা দপ্তর জানিয়ে দেয়, এই বিষয়ে কোনও বিঞ্জপ্তি জারি হয়নি। বিষয়টা আলোচনার স্তরে ছিল। রাজ্যের ভাষা বিতর্ক আজকের নয়। দেশের অন্যান্য রাজ্যের মতই এই বাংলার অভিযোগ ‘হিন্দি ভাষা’ কে রাজ ভাষা করে আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা আগেও ছিল বর্তমানেও আছে। বিশেষত জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতি গড়ে তোলার অন্যতম রাজনৈতিক দল বিজেপির এজেন্ডাতে আছে ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থান’। বিজেপি বিরোধী দলগুলির এই অভিযোগ দীর্ঘদিনের। উল্লেখিত অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিতর্ক দেখা দিলে প্রাক্তন তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রী এবং বর্তমানে দেশের উপ রাষ্ট্রপতি ভেঙ্কাইয়া নায়ডু বলেন,

‘’Minister Venkaiah Naidu also said that it was necessary for people to learn their mother languages as the "dominance of English medium has shadowed their cultural heritage".
All India | Edited by Divyanshu Dutta Roy | Updated: June 24, 2017

 Union Minister Venkaiah Naidu today called Hindi the "national language" earning him a sharp rebuke from the opposition and a fact check on social media. "Hindi is our national language, our identity and we should be proud of it," Mr Naidu said, adding that "it's very unfortunate that we are obsessed with English" which, according to him, was detrimental to the nation's progress.

Opposition leaders tore through the comments, pointing out that the Indian Constitution does not mark any language as "national". Under its Article 343, Hindi and English are assigned the status of official languages.’’

ইংরেজি সাহিত্যের খ্যাতনামা লেখক এবং কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর ২৪ জুন টুইটারে টুইট করেন,  

‘’Hindi is NOT our national language. It is India's most widely-spoken language & useful to know. But it cannot &should not be imposed on anyone https://twitter.com/JayasreeVijayan/status/878514646231113728 …’’

ন্যাশন্যাল কনফারেন্স নেতা ওমর আব্দুল্লা ওই একই দিনে টুইটারে জানতে চান দেশ কবে জাতীয় ভাষা পাবে?  "When did we get a national language?"

কর্ণাটকে টিউব রেলে বিঞ্জপ্তির কারণেও ‘হিন্দি ভাষা’ নিয়ে আর একদফা বিতর্ক হয়। কয়েকটি আঞ্চলিক দল বিজেপির নেতৃত্বে কেন্দ্রের কোয়ালিশন সরকারের উদ্যোগে ‘হিন্দি ভাষা’ চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করলে তৎকালীন তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রী ভেঙ্কাইয়া নায়ডু আহমেদাবাদে সাংবাদিকদের বলেন, 
"It is unfortunate that everyone is bent upon learning English because it guarantees employment. Hence I want the nation to discuss, promote and learn our mother languages more and at the same time learn Hindi as well," Mr Naidu told reporters at an event in Ahmedabad.( Sources:News agency)  

গত ৭২ দিন পেরিয়ে গেছে। পাহাড়ে টানা বনধ চলছে। সাধারণ মানুষ সমাধানের রাস্তা কি হতে পারে সেই ধন্দে রয়েছে। কেউ কেউ রাজ্য সরকারের সদিচ্ছার উপর ভরসা করে রয়েছে। কেউ কেউ কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ চাইছে। পাহাড়ের প্রতিটি বাঁকে মানুষ আজ ক্লান্ত। যে করেই হোক দুর্গা পুজোর আগে একটা সমাধানের রাস্তা খুঁজে বার করতে হবে। পাহাড়ের পর্যটন না হলে সাধারণ মানুষ কাজ হারাচ্ছে। রাজ্য সরকার এবং ভারত সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। আমি মনে করতে পারছি ২০১০ থেকে ২০১১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত বার দু’ই তিনেক ‘লেপচা’ জনজাতি গোষ্ঠীর নেতৃত্বের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছিল। ওই গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা তখন সন্তর্পণে মহাকরণে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। ২০১০ সালে আমি যে দৈনিকে চাকরি করতাম সেই দৈনিকের জন্য সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম আমার পরিষ্কার মনে আছে। দার্জিলিং-এ লেপচা বোর্ড গঠনের পরে একটার পর একটা বোর্ড গঠন হয়েছে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৎকালীন ইউপিএ সরকার এবং বর্তমান এনডিএ জোট সরকারের নির্দেশিকা মেনেই এই সব বোর্ড গঠন করেছেন পাহাড়ের উন্নয়নকে মাথায় রেখে। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এমনটা হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
দুর্গা পুজোর আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। সেই কথা মাথায় রেখে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২৯ অগস্ট, ২০১৭ রাজ্যের সদর দপ্তর নবান্নে পাহাড়ের দলগুলিকে নিয়ে একটি সর্বদলীয় বৈঠক করেছেন। বৈঠকে রাজ্যের প্রথম সারির বিরোধী দলগুলি অংশগ্রহণ করেনি। এই বিষয়ে একান্ত সাক্ষাৎকারে সিপিএমের পাহাড়ের বর্ষীয়ান নেতা এবং বিধায়ক অশোক ভট্টাচার্য বলেন, ‘’আমাদের মতো বামপন্থী দলকে কি রাজ্য সরকারে কোন প্রয়োজন আছে? পাহাড়ে সমস্যা নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠকে সিপিএম থাকার কি প্রয়োজন? তাই না? এই বিতর্কিত সময়ে সব কথা না বলাটাই সৌজন্য হয়, তাই নয় কি? আমাদের প্রস্তাব রাজ্য সরকার, গোর্খা জনমুক্তি এবং কেন্দ্রের প্রতিনিধি রেখে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হোক। বর্তমানে পাহাড়ের যা অবস্থা একটা দল আড়াআড়ি দু’ভাগ হয়ে যাচ্ছে। ব্রিটিশদের কথা মনে পড়ছে। এরপর পাহাড়ে কি হয় সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকছি।‘’
বিজেপির সর্ব ভারতীয় সম্পাদক রাহুল সিনহা একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘’পাহাড়ের গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা সহ যে সব দল পাহাড় ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত তাঁদের সর্বদলীয় বৈঠকে ডাকা হয়েছিল। এবং এটাই যুক্তি সঙ্গত বলে মনে করি। ওই বৈঠক নিয়ে আমাদের বলার কিছু নেই। কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান হচ্ছে গোরখাল্যান্ড ইস্যুতে যা কিছু করতে হবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলোচনা করেই করতে হবে। রাজ্য সরকারকে এড়িয়ে কিছু করা হবে না।‘’
বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ পাহাড়ে সাম্প্রতিক উত্তেজনা প্রসঙ্গে সংবাদ মাধ্যমে বলেন, ‘’মুখ্যমন্ত্রীর উচিত পাহাড়ের উত্তেজনাকে কমিয়ে আনা। সৌহার্দপূর্ণ আলোচনায় সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে।‘’
রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা আব্দুল মান্নান একান্ত সাক্ষাৎকারে কিছুটা উস্মা প্রকাশ করে বললেন, ‘’আমি যা বলছি সেটাই লিখবে। রাজ্য সরকারের কাছে যে ধরণের গণতান্ত্রিক সৌজন্য পাওয়া উচিত আমরা সেটা পাই না। সেই সৌজনা এবং সম্মান না পেলে আমরা কি করে আমাদের অবস্থান জানাব?’’ কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা এবং সাংসদ প্রদীপ ভট্টাচার্য একান্ত সাক্ষাৎকারে জানান, ‘’রাজ্য সরকারের ডাকা সর্ব দলীয় বৈঠকে আমাদের অবশ্যই যাওয়া উচিত ছিল। কারণ গোরখ্যাল্যান্ড চুক্তি নতুন ভাষায় আমাদের সরকার করেছিল। বর্তমানেও আমরা ঐক্যবদ্ধ ভারতের কথা বলি। গোর্খা, নেপালি সহ অন্যান্য ভাই বোনেদের সঙ্গে নিয়েই অখন্ড ভারতের কথা বলতে হবে। সেটাই আমাদের অবস্থান।‘’
তৃণমূল কংগ্রেসের এক শীর্ষনেতা একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘’আমাদের দিদি তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্য এবং দেশের স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটা পাহাড়ের মানুষের ভালো হবে এই ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী চান পাহাড়ে শান্তি ফিরুক। পাহাড়ে ব্যবসা বাণিজ্য স্বাভাবিকভাবে হোক। জনজীবন স্বাভাবিক হোক। পর্যটন মরশুমে পাহাড়ে শান্তি ফিরুক। পাহাড়ে শান্তির বাতাবরণ ফেরাতে রাজ্য প্রশাসন সব রকম সাহায্য করবে।‘’
উত্তর পূর্ব ভারতের গেটওয়ে হচ্ছে শিলিগুড়ি। পাহাড়তলির মেঘেদের কোলে কোলে আন্তর্জাতিক সীমান্ত। কাছেই ‘চিকেন নেট’। এ বছর ১৫ অগস্ট আমরা ভারতের স্বাধীনতার ৭০বছর আড়ম্বরপূর্ণ মেজাজে উদযাপন করলাম। কিন্তু উত্তর পূর্ব ভারত? উত্তর পূর্ব ভারতের মানুষের শিক্ষা, গণতান্ত্রিক নাগরিক অধিকার, তাঁদের বৈচিত্রময় সংস্কৃতির গ্রহণ বিষয়ে আমরা এই সেদিন পর্যন্ত উদাসিন ছিলাম। উত্তর ভারতের নাগরিকদের আমাদের মতো সুশিক্ষিত নাগরিক কিছুটা নাক উঁচু করে দেখে থাকি। দীর্ঘ দিনের বঞ্চনা ওইসব রাজ্যের নাগরিকদের ভাবেত বাধ্য করছিল ওরা ‘অন্য মানুষ’। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংহ নতুন নীতি আনলেন। সেই নীতি ছিল ‘লুক ইস্ট’ পলিসি। এই নীতির পরে উত্তর পূর্ব ভারতের নাগরিক জীবনে ‘পোষ্ট ট্রুথ’ ভারতের আলো এসে অন্ধকার থেকে মুক্তির রাস্তা বলে দিচ্ছে। ওই সব রাজ্যের মানুষজন ‘নেশন স্টেট’ নিয়ে কি আদৌ চিন্তিত ছিলেন? ওইসব রাজ্যের নাগরিকদের প্রতি ধারবাহিক উদাসীনতা ছিল এক অকথিত অধ্যায়। রাজনীতি আর রাষ্ট্রনীতির অপরিনীত এক অমোঘ দর্শন ছিল কি সেটা? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে এনডিএ সরকার ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ পলিসির মাধ্যমে উত্তর পূর্ব ভারতের উন্নয়নের কথা বলছেন। এই কথা শুধু বললে হবে না। ভারত নামক অখন্ড এক আধুনিক রাষ্ট্রের কথা বলব। অথচ সারা দেশের নাগরিকদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করব সেটা আম নাগরিকের কাছে আজও প্রশ্ন ‘অ্যালবার্ট পিন্টো কো গুসসা কিঁউ আতা হ্যায়’? উত্তর পূর্বের মানুষ ভারতে সামাজিক অধিকার এবং নাগরিক অধিকার কবে পাবে?

সংবাদ মাধ্যম সূত্রে জানতে পারছি সুপ্রিম কোর্টের নয়জন বিচারপতি তাঁদের রায়ে ব্যক্তি পরিসরের অধিকারকে মৌলিক অধিকার বলেছেন। ৫৪৭ পৃষ্ঠার রায় তাঁরা শেষ করেছেন ইতি পূর্বে বহুবার উচ্চারিত একটি পঙক্তি উধৃত করে। ‘দি ওল্ড অর্ডার চেঞ্জেথ, য়িল্ডিং প্লেস টু নিউ’। বাংলায় বলা যায় পুরানো ব্যবস্থা বদলায়, নতুনের পরিসর ছেড়ে দিতে। রবীন্দ্রনাথের গানেও আমরা পাই ‘কতবার ভেবেছিনু আপন ভুলিয়া/ তোমার চরণে দেব হৃদয় খুলিয়া.........’’     

প্রতিষ্ঠান ছাড়া গণতন্ত্র হয়না অবহেলিত শৈশব কি আমাদের দলছুট গণতন্ত্র চেনায়?

প্রতিষ্ঠান ছাড়া গণতন্ত্র হয়না অবহেলিত শৈশব কি
আমাদের দলছুট গণতন্ত্র চেনায়?: 
সময়টা আশির দশক। সত্তর দশকের শিক্ষা, সংস্কৃতির মুক্ত হাওয়ার মূল্যবোধ তখনও টাটকা। আমরা যারা অবহেলিত শৈশব কৈশোর চিনে আল টপকে, রেল লাইন টপকে, আঁকাবাঁকা ট্রাম লাইনের পথরেখা চিনে এই কলকাতা শহরের ভাঙাচোরা রাস্তায় নাগরিক চিনছি। তখন সদ্য গড়ে ওঠার নগর সভ্যতার মাঝেও মানবিক কলকাতার আন্তরিক পদচারণা একাধিকবার দেখেছি। বা বলা যায় দেকেচি। এই শহর আধুনিক নাগরিক সভ্যতায় ততটা অভ্যস্ত ছিল না। মেট্রোরেল, ইন্টারনেট সভ্যতার গতি তখনও কলকাতায় মানবতাকে আক্রমণ করতে পারেনি। বিশ্বায়ন নামক দৈত্য, আধুনিক সভ্যতার ‘মল’ নামক ‘ফার্স্ট লাইফ’-এই কলকাতাকে গ্রাস করতে পারেনি। আশির দশকে সামাজিক সংগঠনে কাজ করার সুবাধে দেখেছি ‘বৌ বাজার’-এর মোড়ে, ‘ব্যঙ্ক অফ ইন্ডিয়া’-এর (আমহারট স্ট্রীটে) সংযোগ স্থলে দিনের বেলায় কোলে কাঁখে শিশু সন্তান নিয়ে ‘বারবণিতা’ বাবু বা খদ্দের ধরার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। শিশুর নাক দিয়ে পোটা ঝড়ে পড়ছে। মুখে আঙ্গুল, মা মুখ থেকে আঙ্গুল টেনে বার করে দিচ্ছে। নাকের জল মুছে দিচ্ছে। আমার এক বন্ধু কৌতূহল মেটাতে এক যৌনকর্মীর কাছে জানতে চেয়েছিল। সে যদি ওর ঘরে যায় কত নেবে? টাকার অঙ্ক নিয়ে দরাদরি করার পর বন্ধুটি কোলের বাচ্চাটার কথা জানতে চেয়েছিল। সে যখন ঘরে যাবে বাচ্চাটি কোথায় থাকবে? উত্তরে মধ্যতিরিশের মহিলা বলেছিল, ‘আমার ছেলে আমার ঘরে থাকবে। খেলা করবে। আমাদের চৌকিটা তারে কাপড় চাদর দিয়ে ঘেরা আছে।’ এই হচ্ছে মা। এই সেই মানবতা। রাস্তার ঝুপড়িতে যা আজও পাওয়া যায়। পাওয়া যায় রেল লাইনের ধার বরাবর হাঁটলে। ভারতের মেট্রোপলিটন, নন মেট্রোপলিটন যে শহর সভ্যতায় হাঁটলে। মাতৃত্বের একঘর এক উঠোন সংসারে তুলসিতলার পিদিম জ্বেলে বসে থাকার চিরসত্য খুঁজে পাই আমরা। খুঁজে পাব শহর ছাড়িয়ে যে কোনও গাঁ গঞ্জে গেলে। মায়ের আকুল হয়ে সন্তানের প্রতীক্ষায় বসে থাকা। সব কিছুর মূল্যে মায়ের কাছে তাঁর কোলের শিশু আগে। ঈশ্বর পাটানির সেই অমোঘ শব্দ ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’।       
একটু পরে আসছি। আজ কেন এই প্রসঙ্গ টানলাম সেটা একটু পরেই আমি বলতে চাইব। সমাজে জীবনের গতিময়তা যত বাড়ছে সভ্যতা কি ভুলে যাচ্ছে শিশুর দায়িত্বের কথা? আজকের শিশুইতো আগামী দিনের জাতির ভবিষ্যৎ।    
আশির দশকের ‘বিবেক দংশন’-এর সময়টা আমি কলকাতার বৃহত্তম পাইকারি সবজি বাজার ‘কোলে মার্কেট’ নামক বাড়িটির ‘মেসে’ দু’দফায় প্রায় চার বছর ছিলাম। মাননীয় বাবলু কোলে আপনার সঙ্গে আমার বার দু’তিনেক দেখা হয়েছে। আপনি ভুলে যেতে পারেন। আমার মনে আছে, আমার মতো অনামী এক যুবককে   আপনার প্রয়োজন হয়েছিল কোনও একটা সাহাজ্যের জন্য। এবং আমার সাহায্যে আপনার কাজটাও হয়েছিল। আপনি খুশি হয়ে গণেশ মারফৎ তপনবাবুর ঘরে বড় এক প্যাকেট মিস্টি পাঠিয়েছিলেন। পরে আপনার বাজারে চন্দ্র, গণেশ, তপনবাবু এবং অন্যান্যদের মাধ্যমে অনেক অনেক পচা সব্জির জল বয়ে গেছে। কলকাতা বদলে গেল। কলকাতা বদলে গেছে। আমরা নতুন বৃত্তে এলাম। আমাদের মূল্যবোধ বদলে গেছে। আমরা বদলে গেছি। কেউ ‘চিটিং বাজ’ শব্দে এখন পরিচিত হয়। বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর গল্পগাছা বৈধ অবৈধ অর্থ-সংস্কৃতির সুবাদে আপনাদের কর্ণগোচর হয়ে থাকতে পারে। একা মানুষকে সবাই আক্রমণ করতে চায়। পরিকল্পিতভাবে ‘অন্যায়’ যখন সভ্যতার রাশ ধরে ‘প্রতিবাদীর দল’ সংখ্যায় কমে যায় এবং তাঁকে একা পেয়ে ঠেলতে ঠেলতে মিথ্যার চোরা গলিতে নিয়ে যায়। সংগঠিত প্রচারমাধ্যম সংগঠিতভাবেই প্রচার করে। সভ্যতা ধংসের অভিভাবক হয়ে উঠতে সক্রিয় থাকে। এই প্রক্রিয়া চলার সময় চাঁদ সূর্য পশ্চিম উত্তর দিক ঠিক করে চলে কি? আপনার আমার বা দিকে যেটা দেখি ডান দিকেও একই সভ্যতার আবছা আলোয় সে পৃষ্ঠার হাবিজাবি নজরে পড়ে।  কিন্তু পৃথিবী কখনও কি ধবংসের কাছে আত্মসমর্পণ করে? ন্যায় এবং সত্য সমস্ত অন্ধকার ছাপিয়ে ধ্রুবতারা হয়েই উজ্জ্বল হয়।
যারা আপনাদের বাজার কাম মেস, আমার কথায় ‘কোলেদের বাড়ি’। ওই বাজারে সেই দশকে মাত্র পাঁচ টাকায় দিন এবং রাতের খাবার (মাসে মাত্র দেড়শো টাকা) খেয়েছে তাঁরা আপনাদের জনসেবার কথা কি কোনোদিন ভুলতে পারে? দিনের খাবার পাওয়া যেত মাছভাত আড়াই টাকায়। বিভিন্ন রকমের মাছ পৃথক পৃথক দিনে।  রবিবার মাছ এবং মাংস। রাতে রুটি, ডাল, দু’টো সবজি। পুজোর সময় বিশেষ মেনু। আপনার ওই বাড়ির মেসে রাজ্যের প্রায় প্রতিটি জেলার মেধাবী ছাত্ররা থাকার সুযোগ পেয়েছে। এর কারণ আপনাদের বনেদি পরিবার ছিল জাতীয়তাবাদী এবং অবশ্যই কংগ্রেসি ঘরানার। আপনার ওই বাড়িতে থাকার লড়াই আমাকে সারা জীবনের জন্য কলকাতা শহরে হাঁটতে শিখিয়েছে। এই লেখায় সেই সময়ের এক রাতের অভিঞ্জতা দিয়ে এই লেখা লিখতে চাইছি। তার আগে আমার সেই সময়ের রোজ নামচার খাতা থেকে একটা লেখা তুলে দিচ্ছি।
১-১১-৮৩, ছেলেটাকে পেলাম ঘর খুলতেই। না না ঘরে সে ছিল না। এলো। আগে এই লাইব্রেরিতে ও দশমাস থেকে গেছে। ভালো লাগল। কি অদ্ভুত কথা বলে, রাজনীতি একদম ভাবে না। ‘নোটা’ জাতীয় কিছু একটা নিয়ে ভাবে। রাজনীতিকদের উপর খুব রাগ। আমি ওকে বললাম, ‘এভাবে দু’টো জিনিস হতে পারে না। পরস্পর বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি কারো থাকতে পারে না।’ কিছুটা বুঝল। ছাত্রবেলার স্বতঃস্ফূর্ততা রয়েছে ওর মধ্যে।
ওঁচা সংস্কৃতির মধ্যে যারা আজ আর্ত মানুষ, দুঃস্থ শিশুদের জন্য কিছু কাজ করার কথা ভাবছে তাঁরা আজ আর   পাঁচজনের তুলনায় এগিয়ে। এদিন সুনু নামের ছেলেটিকে ঠিক তাই মনে হল। কথা বলার ভঙ্গিমায় আবৃত্তির ঢঙ। ভালকরে নজর দিলে অনেকের কাছে ধরা পড়ে। পরে সম্ভবত ও প্রকাশও করে। যা আমাকে করল। তবু ভালো লাগল। ঐ বয়সটা আমি ছুটে পেড়তে চেয়েছিলাম। পারিনি। ধাক্কা খেয়েছি। বারে বারে ধাক্কা খেয়েছি। আরও বাস্তবকে চিনেছি।
এই লাইব্রেরি যেমন আমার কাছে এখন বাস্তব। এখানে আসার আগে কল্পনা ছিল এইরকম- (১) দু’টো ঘর, (২) আলো-বাতাস থাকবে, (৩) ঘরের সঙ্গে লাগোয়া পায়খানা, বাথরুম পাব। (৪) এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় সব কিছু পাব। কি হল? সব উলটে গেল। ঘরের সমস্যা যদিও খুব একটা নয়। তবে দিনে সূর্যের আলো থেকে বঞ্চিত হতে হয়। বাড়িওয়ালা দিনে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখে। পায়খানায় লাইন। স্নান করতেও লাইন। আমাদের বাড়িটা পাঁচতলা। লাইব্রেরিটা দুতলায়। নীচে বিরাট পাইকারি সবজি বাজার। অন্যান্য কিছু জিনিষও পাওয়া যায়। সকাল ছ’টা থেকে রাত্রি তিনটে পর্যন্ত খোলা। ব্যবসাদাররা সব সময় ব্যস্ত। নীচ থেকে সম্মিলিত গলার আওয়াজ। বড় বড় ট্রাকে করে সবজি যেমন আসে আবার ছোট ছোট টেম্পু, ঠেলা করে সবজি কলকাতা সহ বিভিন্ন শহরতলীতে চলে যায়। কত রকমের মানুষ এই সময়টায় দেখতে পাওয়া যায়। বাঙালি হিন্দি ভাষায় কথা বলে। অবাঙালি দোখনো ভাশায় কথা বলে। প্রায় অভ্যস্ত হয়ে আসছে। তবে পচা সব্জির গন্ধ সয়ে সয়ে দেহ মন সবজিময় হয়ে থাকে। বাজারের বাইরে কোথাও থাকলে কখনও কখনও মনে হয় সব্জির গন্ধটা গায়ে লেপ্টে আছে।                       
তখন রাতের কলকাতা দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। কারণ আমি ওই বাড়িটার যে ঘরটায় থাকতাম সেটা একটা পাঠাগার ছিল। দিনে সূর্যের আলো ঢুকত না। রাতে একটা বাল্ব জবালিয়ে আমি রাত দশটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত পড়তাম। তারপর ঘুমতে যেতাম। সকাল সাড়ে ন’টা থেকে দশটার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে পড়তে হত। কারণ সকাল দশটার পর পুরসভার জল আর পাওয়া যাবে না। তাই বড় বাড়ির কাজ সেরে ফেলা এবং স্নান করে নিতে হবে দশটার মধ্যে। জানি না এই লড়াইয়ের কথা আমার বন্ধুস্বজনদের কতটা মনে আছে। তাঁরা আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। এমন একটা রাতের কথা। এক মায়ের কথা। মধ্যরাতের সন্তানদের কাছে শপথ নেওয়ার ভাষায় আমি দেশের কথা দশের কথা শিশুদের কথা পড়ছি।  রাত সাড়ে দশটা হবে। ভদ্র শিক্ষিত মধবিত্ত কলকাতা তখন বাড়িতে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে। রাতের কলকাতা একটু একটু করে জাগছে। পার্কস্ট্রীট, ফ্রীস্কুল স্ট্রীট, কালীঘাট, বাবুঘাট, হাড়কাঁটা লেন, সোনাগাছি, কোলে মার্কেট, বৈঠকখানা মার্কেট একটু একটু করে জেগে উঠছে। আমি কোলে মার্কেটে বসে বসে সেই তাপ উত্তাপ পেতাম। সিগারেট শেষ হয়ে গেলে নীচে গিয়ে সিগারেট কিনে আনতাম। ক্লান্ত চোখকে জাগিয়ে রাখতে কখনও কখনও চা খেতে নীচে নামতাম। কত বিচিত্র সব ঘটনা। কত বিচিত্র সব নারীপুরুষ দেখেছি। সেই রাতে খুব সন্তর্পণে চন্দ্র আমার ঘরে এল। ঘরে ছিটকেনি, দরজার খিল সবই ছিল কিন্তু সেসব দেওয়ার প্রয়োজন হত না। আমার ঘরের পাশেই কোলেবাবুদের নিরাপত্তা কর্মীদের ব্যারাক। চন্দ্র এসেই বলল, ‘তপনবাবুর এক আত্মীয় খুব বিপদে পড়েছে। তোমার একটু সাহায্য চায়। আমার মনে হয় তুমি এটা করবে।’
বিষয়টা কি জানতে চাইলাম। চন্দ্র বলল, ‘আমি ওনাদের ডেকে দিচ্ছি। তপনবাবুর ঘর তিন তলায়। আমাদেরটা দোতলায়, তাই ঝোলা বারান্দা থেকে ওদের ডেকে নেওয়া হল। যা শুনলাম। তপনবাবুর এক আত্মীয়ের স্ত্রী নীল রতন সরকার হাসপাতালে প্রসূতি বিভাগে ভর্তি আছেন। গত কয়েকদিন আগে থেকে। সন্তান সম্ভবা। কিন্তু পরিস্থিতি জটিল। ডাক্তার নার্স কেউ কোনও সাহায্য করছে না। আমি শুনেই ছুটলাম। হাসপাতালে পৌঁছে দেখলাম অসংখ্য রুগীর সঙ্গে ভদ্রমহিলা বারান্দায় মেঝেতে শুয়ে আছেন। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। আমি আমার কথার জোরে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে নিরাপত্তা কর্মীর সঙ্গে বন্ধুত্ব করলাম। তাঁর সাহায্যে রাতের দায়িত্বে আছেন সেই নার্স ইনচার্জের সঙ্গে কথা বললাম। তিনি বললেন, ‘হ্যা আমরা ওকে লেবার রুমে নিয়ে যাব। এখন হাউস স্টাফদের ডিউটি পরিবর্তনের সময়। হাউস স্টাফ ডাঃ নবদ্বীপ সেন আছেন। উনি আসলেই আমরা কাজ শুরু করব। মহিলার অবস্থা ভালো নয়। আমি সব কথা বলতে পারব না।’
আমি জানতে চাইলাম, ‘আচ্ছা সিস্টার ডাঃ সেনের কি বীরভূমের নলহাটি বাড়ি?’ সিস্টার হ্যা বলতে বলতেই নবদ্বীপ চলে এলো। আমাকে দেখেই নবদ্বীপ বলল, ‘তুমি এখানে?’ আমার উত্তর শুনে ছেলেবেলার বন্ধু আমাকে বলল, ‘তুমি একটা কাজ করো আমাদের হস্টেলে ডাঃ রামচন্দ্র ডোম আছে। ও বীরভূমের ছেলে। আমি পেশেন্ট দেখছি। আমার সিনিয়রকে আমি ডেকে নিচ্ছি আমার নিজের রেফারেন্স দিয়ে। তুমি রামকে গিয়ে আমার পরিচয় দিয়ে সবটা বল।’
রাত তখন সারে বারটা। বহু কষ্টে স্টুডেন্ট হস্টেলের ভেতরে যেতে পারলাম। ডাঃ রামচন্দ্র ডোম আমার কথা শুনেই একটা সাধারণ জামা পড়ে আমাদের সঙ্গে বেড়িয়ে এলেন। ততক্ষণে সময় অনেকটা চলে গেছে। আমরা প্রসূতি ওয়ার্ডের বাইরে অপেক্ষায় বসে থাকলাম। ডাঃ সেন আমাকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে বলল, ‘ভদ্র মহিলার জন্ডিস হয়েছে। ওনার স্বামী এবং তোমার বন্ধুদের আগে বলা হয়েছিল। কেউ কিছু করেনি। এখনই তিন চার বোতল রক্ত লাগবে। আমরা এক দু’বোতল ব্যবস্থা করছি।’
আমরা ছুটলাম সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাঙ্ক। আমার ডাক্তারদের সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদে মাত্র এক বোতল রক্ত নিয়ে ফিরলাম। সময় তখন দু’ঘণ্টা কেটে গেছে। পেশেন্টের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। ভদ্রমহিলার স্বামী, আমি আর একজন কেউ পেশেন্টের কাছে গেলাম। সমস্ত শরীর নীল হয়ে গেছে। দু’চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে। কাতর স্বরে স্বামীর হাত দু’টো টেনে নিয়ে অস্পষ্ট ভাষায় যা বলল, বুঝলাম তাঁর সন্তানটিকে যেন স্বামী দেখে। এরপর ভদ্রমহিলা মারা যান। আমি এই ঘটনা আজও মনে রেখেছি। মৃত্যুমুখী মায়ের অস্পস্ট স্পন্দন আজও আমাকে ভারতীয় নারীর চিরন্তন আবেদনের কথা শুনতে বলে। যতদূর জানি পুত্রসন্তানটিকে একটি অনাথ আশ্রমে রেখে ভদ্রমহিলার স্বামী বড় করেছেন। শৈশবকে হারিয়ে যেতে দিতে নেই। একুশ দিনের শৈশবকে আমার এক বন্ধুর মা এবং সেই বন্ধু পথ, পরিবার, সমাজ, সভ্যতা চিনতে শিখিয়েছে। একুশ দিন বয়সে শিশুটির মা মারা গিয়েছিল। সেই  সন্তানের বয়স আজ ৩৭ বছর। ওই সন্তানের পিতা দ্বিতীয় বিয়ে করে মহাপুরুষের মতো আজও স্বার্থপর পিতৃত্বের আসনে বসে আছে। 
বিংশ শতাব্দীর আশির দশকের এক রাতের গল্পকথা দিয়ে আলো অন্ধকারের ঠাসবুনোট মানব সভ্যতা আমরা দেখলাম। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের এই ২০১৭- এর শুরুটাই হয়েছিল আমাদের রাজ্যে একটার পর একটা শিশু পাচারের মতো হিংস্রতম গল্পগাছার খবর দিয়ে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে দুঃসাহসিক কাজ করেছেন সেটা অবশ্যই সরকারী নথিতে যেমন লেখা থাকবে লেখা থাকবে মানুষের মনে। যে কথা লেখার ইচ্ছে থাকলেও সাহস পাইনি। গত কয়েক বছরের নীরব মানসিক এবং সংগঠিত সামাজিক অত্যাচার আজ আমাকেও বলছে মূক হয়ে থাক। গত কয়েক বছর অকারণে আমাকে এই শহরে হেনস্থা করা হচ্ছে। অপমান করা হচ্ছে। সংগঠিত হেনস্থা।  কিন্তু চেতনার আঘাত থাকলে আঘাত হানলে আমাকে বলতেই হবে, সভ্যতা কি আমাদের মূক হয়ে থাকতে দেবে? মানব সভ্যতা আমাদের বার বারে বলে ‘আমার শিশু তোমার বারান্দায়’। বারান্দায় রোদ্দুর আছে। বারন্দায় চাঁদের আলো আছে। শিশুর কোনও জাত হয় না। ওর কোনও ধর্ম হয় না। ওর কোনও সম্প্রদায় হয় না। তবুও উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, দক্ষিণভারত, (সংবাদ সংস্থা সূত্রে খবর গুরু গুরমিত সিংহ রাম রহিম ইনসানের আশ্রমে ৫-১৫ বছরের ৩৫ জন শিশু কিশোরকে পুলিশ উদ্ধার করেছে।) দেশের সংবাদ মাধ্যম গত কয়েক বছরে আরও দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসছে। এই সময়ের সাংবাদিক বন্ধুরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেক সাহসী খবর করছেন। যেটার প্রয়োজন অনেক আগে থেকেই ছিল। পশ্চিমবঙ্গ সহ একাধিক রাজ্যে আমরা শিশুদেরকে হয় পণ্য করছি না হলে অনাদরে অবহেলায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছি। এর দায় কে নেবে?
কেন ভারত নামক ‘পোস্ট ট্রুথ’ বাস্তবতার একটি দেশ একুশ শতাব্দীতে দাড়িয়েও শিশুদের নিয়ে রাজনীতি করছে? একবার ভাবুন এই রাজ্যের স্কুলের শিশুরা ‘এক ভারত’ দেশ ব্যাগে নিয়ে স্কুলে যায়। কেন? বিতর্ক, মামলা মকদ্দমা চলছে গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক থেকে? পশ্চিমবঙ্গ রাজনৈতিক এবং সংস্কৃতি সচেতন প্রগতি ধারার রাজ্য। সেই রাজ্যে পশ্চিম নিয়ে গর্ব করার লোকের অভাব নেই। কিন্তু তাঁরা পারেননি এই সমস্যা পশ্চিমের উন্নত দেশগুলির মডেলে সমাধান করতে। কোনও রাজনৈতিক দলের গণসংগঠন সামাজিক সচেতনতার আন্দোলন গড়ে তোলার দায়িত্ব হয় নিতে চায়নি না হলে বিতর্ক এবং ভোট ব্যাঙ্কের কথা ভেবে এগিয়ে আসতে পারেনি। বর্তমান রাজ্য সরকার একটা চেষ্টা করছে বলেই মনে হয়। প্রতিষ্ঠান ছাড়া গণতন্ত্র হয় না। অবহেলিত শৈশব কি আমাদের দলছুট গণতন্ত্র চেনাচ্ছে?                                                       

Wednesday, 23 August 2017

মানবতার পক্ষে আছি অধর্মে নেই জিরাফেও নেই

মানবতার পক্ষে আছি অধর্মে নেই জিরাফেও নেই: 

প্রকৃতি তোমার চিরনন্দিত অপরূপ শোভা তুমি কেন লুকিয়ে রাখতে পার না? অতি সাধারণ জীবনের যেটুকু অভিঞ্জতা হয়েছে, যৌবনের বিহান বেলায় প্রথম চোখের ভাষায় বিহার, ঝাড়খন্ড, অসম, ওড়িশা, মেঘালয় এই কয়েকটি পাহাড়তলীর রাজ্য একসময় দেখেছি। উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, লঝমন ঝোলা, হরিদ্বার দেখেছি। আহা কি সে অপরূপ সৌন্দর্য। অকৃপণ সবুজের মায়াময়তায়, মেঘতলির সদাহাস্য কুঠুরি খুলে বসে আছে অচেনা এক নিষ্পাপ কুমারী নারী। অতি সন্তর্পণে ছুঁয়ে বলে আমি তোমার সেই মেয়ে। এসো আমাকে আলিঙ্গন করো। পাশে ঝোরা আছে। নদী আছে, গঙ্গা আছে। ছুঁয়ে যাও আমাকে, সব কলঙ্ক পাপ ধুয়ে যাবে। আমি আজ তোমার প্রেমিকা হব। ভালোবাসার পাহারি জংলা রঙের ভেলা নিয়ে বসে আছি। কত রঙের প্রজাপতি উড়ছে দ্যাখ আকাশে বাতাসে। রঙিন প্রজাপতি গাছের পাতায় পাতায় ঘুরছে নব যৌবনের বাতায়ন খুলে। গাছের ডাল, পাতা, ফুলের রেণু নিঙরে প্রাগে পরাগে সম্মেলনের কবিতার চরণ লেখে। পয়ার ছন্দে। প্রেম এসে ফিরে যায় একাকি গহন বনে। এসো তুমি জলে জঙ্গলে। বলো, হে বন্য নারী আজ আমি তোমার প্রেমে তৃপ্ত। পাত্র উজাড় করে ভরিয়ে দাও আমায়। আহ্বান করে অচেনা বন্য সুন্দরী তনয়া যেন বলছে, তুমি পুরুষ, তোমার ক্লান্ত শ্রান্ত ঘর্মাক্ত শরীর দেখলে আমার নারীত্ব আমাকে আরও শান্ত করে রাখে। আমার ঘৌমটা খুলে অদেখা সুন্দরকে উজ্জ্বল করো। প্রজ্বলিত করো। অদেখা অচেনা সুন্দরের কাছে আজ তোমাকে আত্মসমর্পণ করতেই হবে। আমি তোমার সেই বন্য নারী।        
সপ্ততরীর ঢেউ ভাঙা অকৃত্রিম মেঘমল্লারের নৃত্যে ‘তাতা থৈ থৈ, তাতা থৈ থৈ’ ছন্দে রাজপ্রাসাদের রাজকীয়তা নিয়ে ডেকে পাঠাও সকলকে। সবুজ বৃক্ষরাশি কখনও বৈশাখী ঝঞ্ঝায়, কাল বৈশাখীর উথাল পাথাল আন্দোলনে প্রলয়ের বড় গল্প শোনায়। অবিরাম বৃষ্টি শেষে ‘টুপ টুপ, টুপ টুপ’ পাহাড়ি ঝোরার চেনা অচেনা খিল খিল হাসি। কে একজন প্রশ্ন করে ‘এ বাবু হেথাকে কখন এলি?’ শরতের এলোমেলো মেঘ সাদা সাদা বকেদের ডানায় ডানায় আবার সে ফিরে ফিরে আসে, ছোট নাগপুরের আদিবাসী গ্রামের ‘আরণ্যক’ উপাখ্যানের বহু বর্ণনায়। হে আমার অচেনা প্রকৃতি তোমার প্রলয় রুদ্র মুরতি সৃষ্টির বন্ধন ভেঙ্গে আগুনে পোড়া মানবতা ছুঁয়ে যায়।
যে আকাশে বাদলের গান শুনি সেই আকাশে সাদা কালো, লাল নীল, হাজারো রঙের পাখ পাখালির কলরব। চেনা অচেনা আকাশেও দবন্দ থাকে, অসীম আদিগন্ত কালো মেঘেদের অন্তরালে অবিরাম আকাশ দখলের সচেষ্ট অভিলাষ থাকে। ওরা পক্ষীরাজের দেশের ভাষায় কথা বলে। এতবড় আকাশ, প্রকৃতি সেও তোমার স্বপ্ন দেখানো ঘুম ভাঙা ভোরের দিগন্ত বলয়। এই বলয়ে পাখিদের দবান্দিক অবলোকন আহ্বান করে দেশ বিদেশের পরিযায়ী পাখিদের। সাগরের চরাচরে, নদীর বালুকা বেলায়, হ্রদের শীতল উষ্ণতায় পরিযায়ী পাখি অক্লান্ত যাত্রা পথে অধর্মকে শাসন করে মানবতার চড়ুইভাতির আনন্দে। পটুয়া শিল্পীর গ্রাম্যপটে ছবি হয়ে উড়ে বেড়ায় তাঁরা। বলে আমরা আকাশেও আছি, মাটিতেও আছি, তোমার আঙিনায় থাকব। এই জগৎসভায় পরিক্রমা করতে করতে বারে বারে বলি জিরাফের পীঠে বসতে চাইনা। হাঁটব জিরাফের পথরেখায়। গ্রাম্য পটুয়ার আঁকা আলভাঙা সড়কের পল্লবিত পক্ষীবালিকার নূপুরের তালে তালে। বলব অধর্মে নেই মানবতায় আছি।
সেদিন অনেকদিন পর এপাড়া ওপাড়া ঘুরে বইপাড়ায় গিয়েছিলাম। পরিযায়ী পাখিদের মত ঘুরতে ঘুরতে যাযাবর জীবনটা চিনতে কলকাতার প্রাচীন বৃক্ষরাশির ছায়াতলে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। অতীতের কথকতা, স্মৃতি, ভাঙা ভাঙা ছন্দে হাঁটি হাঁটি এসে আলিঙ্গন করছে। আমি উদাস চাউনিতে হেরিতেছি ক্লান্ত, পথভ্রস্ট আহত কবুতরের মতো। কলেজস্কয়ারের পূর্বদিকের গেটের সামনে তখন কিছু লোক গোল হয়ে দাঁড়িয়ে। সামনে কিছু একটা দেখছে। ভিড় দেখলেই যেমন আম বাঙালি ভিরে যায়। দেহাতী বাঙালিদের মতো আমিও গলা ঢুকিয়ে দিলাম। ভিড়ের গলতা দিয়ে দেখলাম আমাদের সমবয়সি একজন লোক হাতে একটা আড়াই ফুট লম্বা পুতুল নিয়ে কি সব দেখাচ্ছে। পুতুলটা পুরনো নতুন কাপড়ের ছোট ছোট টুকরো সেলাই করে তৈরি করা হয়েছে। পুতুলের পোশাকে বোঝা গেল পুতুলটি পুরুষ চরিত্র। জিনসের প্যান্ট। দুটো পকেট দেওয়া জলপাই রঙের জামা। জামার একটা পকেটে ভারতের ‘জাতীয় পতাকা’-এর স্টীকার আলাদভাবে সেলাই করা আছে। কোমরে চওড়া চকলেট রঙের বেল্ট। পুতুলের মুখটায় সার্কাসের ‘জোকার’-এর মতো করে রাঙানো। যে লোকটা পুতুলটা ধরে আছে তাঁর বাবরি চুল। পেল্লাই বড় এক দাড়ি। পোশাক পড়ে আছে সেও এক বিচিত্র। গায়ে পুরনো দিনের বাঙলা সার্ট। গায়ক হেমন্তবাবুরা যেমন সার্ট ব্যবহার করতেন। ঢোলা পায়জামা। পায়ে কাঠের খড়ম। লোকটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা লাঠিতে বাঁধা একটা প্ল্যাকার্ড ধরে আছে। প্ল্যাকার্ডে লেখা, ‘মানবতায় আছি, অধর্মে নেই জিরাফেও নেই’। নীচে ছোট করে লেখা ‘তিরপিতা’। বুঝলাম ‘তিরপিতা’ মানে গোষ্ঠীর নাম।     
লোকটা বলছে, ‘এই দ্যাখেন দাদা, দিদিরা এই পুতুলটো এখনও অর দ্যাশের ভাষায় দশের ভাষায় কথা বুলে। ইটো পুতুল নাচের ইতিকথা লয়। আমি মানিকবাবুর ভাষায় কথা বলতে পারিয়ে না। আমার পুতুল কি বুলছে আপনারা শুনেন।’
লোকটা জানতে চাইল, ‘গোবরা তুমাহার বাড়ি কুথায়?’
‘ওই তিরপিতা গাঁয়ে। কাঠ ব্যবসায়ী হর্ষবাবুদের পাড়ায়।’ পুতুল উত্তর দিল।
লোকটা জানতে চাইল, ‘গোবরা তুমহার লিখা পড়া কতদূর?’
‘আঞ্জে বিপিএল কার্ড নাইখো। পঞ্চায়েতে বাবুরা বুললে বিপিএল কার্ড না থাকলে স্কুলে পড়া চলবে না। আমি বুললাম আমার বাপের বিদ্যাসাগর ছিল না আমাহার ‘বিপিএল কার্ড’ লায় বাবু। আর স্কুলে লিলে না।’
‘আচ্ছা গোবরা তুমি এখন কি কাজ কর?’
‘কাজ কুন্ঠি পাব? আমি বামুন-কায়েত, সদগোপ চাষির ছেলা যে আমাকে কাজ দিবে? আবার দ্যখেন আহমি সিডিউল কাস্ট লই। দলিতও লই। বাপের পদবী ছিল ‘মাল’। তবে আমার বাপ একদম মাল চিনতে শিখেনি। ওই লেগি আমার এই হাল হুলো কাকা। একশো দিনের মাটি কাটার কাজেও কেউ লিছে না। আমাকে কাজ দিলে আমি নাকি ‘পুকুর চুরি’-এর কথা সবাইকে রসিয়ে রসিয়ে বুলি দিব?’ এই কথা কি ঠিক? আপনি বুলেনতো কাকা? আমি কি পঞ্জজনের ঢুলি? ধান্দা আমিও বুঝি। মাগ্যিগণ্ডার দ্যাশে পাঁচ দশ টাকা কমিশন সব্বাই খেছে।   
‘আমাকে আজ কাকা বলছ ক্যানে? ঠিক আছে, ঠিক আছে, তুমি কাজ না করলে সারাদিনের খাওয়া খরচ, বাড়ি ঘর মেরামতির টাকা, চিকিৎসার খরচ এইসব কুথা থেকি পেছ?’
‘ এই যে আপনার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছি। পাঁচটো কথা বুলছি। সাপের পাঁচ পা দেখার কথা লয়। ওই আপনার মতো বাবুদের কথা। সেই কথা শুনি গাঁ গঞ্জের দাদা দিদিরা আনন্দ পেছে। তারপর অরা যা দিছে তার ভাগ আমাকে কিছু দিছেন আপনি মামা। তবে কিনা ফাউল করছেন আপুনি।’
‘তুমি গোবরা একবার ‘কাকা’ বুলছ, একবার ‘মামা’ বুলছ ক্যানে? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আর ফাউল কি করলাম?’
‘আপনি বুলাছিলেন আপনার একশো টাকা আয় হলে তিরিশ টাকা আমাকে দিবেন। একশো তিরিশ টাকা আয় হলেও তিরিশ টাকা আহমাকে দিবেন। আপনি কি করছেন? আমাকে তিরিশ টাকা দিছেন আপনি? ১২ টাকা দিছেন। তবে ব্যাঙ্কের এটিএম থেকে ১২ টাকা পেছি। ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট করি দিয়াছেন। আর ১৮ টাকা ভাউচার লিখে ছিঁড়ে দিছেন, ভাউচার ছিঁড়ে দিছেন। ১৮ টাকা আপনি পকেটে পুরছেন। ইটো ফাউল লয় জামাইবাবু? পিএফ দিছেন না, ইএসাই করি দেননি। তবু আহমার এক চোখ লিং আপনার সাথে কাজ করছি। এই গুলান ফাউল লয় জামাইবাবু?’
‘সে না বুঝলাম, তা এতসব মেনে লিং আমার সঙ্গে কাজ করছ ক্যানে শালো?’
‘এইবার ঠিক বুল্লেন, কলকাতার যে খানে যেছি সবখানে আপনাদের লোক। আমার বা দিকে দ্যাখেন যে লোকগুলান বসি আছে ওইখানে আপনার মতো জামাইবাবু অনেক পাবেন। আবার ডান দিকে দ্যাখেন ওইখানে মামা,কাকাদের দল পাবেন জামাইবাবু।’  
এতক্ষণ যে সব কোতুহলী মানুষ ‘পুতুলের কথা’ শুনছিল তাঁরা অনেকেই বিছিয়ে দেওয়া চাদরে পাঁচ টাকা, দশ টাকার নোট, একটাকা দুটাকা, পাঁচ টাকার কয়েন ফেলছিল। এদের মধ্যে থেকে একজন বলে ফেলল ‘এই যে পুতুলের মালিক তুমিও বাংলার বাইরের ব্যবসা শিখে গেছ বস?’
ভিড় পাতলা হতে থাকে। মালিক ধমক দিয়ে পুতুলকে বলে, ‘কি সব বুলছ তুমি আজ গোবর? এবার কি করবে? ভিড় যে পাতলা হুং গেল?’
‘আঞ্জে কি আর করব? হর্ষবাবু বুলাছিল কলকাতার সব রাস্তা থিকা চেতলা যাওয়ার ৩৩ নম্বর দোতলা বাস পাওয়া যায়। আমি ইবার ওই বাস ধরি ‘নবান্ন’ দেখতি যাব। পুলিশবাবুরা ভিতরে ঢুকতে দিলে পঞ্চুকাকুকে বুলব আহমাকে তিনটা কার্ড দেন। একটো ‘সিডিউল কাস্ট’ কার্ড, একটো কাজ পাওয়ার জব কার্ড আর একটো ‘হেলথ কার্ড’। আমার চোখে ‘ন্যাবা’ হলছে।’    
পুতুলের মালিক এরপর আর কথা না বাড়িয়ে গোবরকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে তখনও দাঁড়িয়ে থাকা কিছু মানুষের উদ্দেশ্যে বলল, ‘গোবরের শরীরটা ভালো নেই। আজ ওকে একটু বিশ্রাম দিন। আবার একদিন আমরা ওর কথা শুনব।’                      

’                

Tuesday, 22 August 2017

গ্রহণ

গ্রহণ: 
একটা সময় ছিল পৃথিবীটা
ভালো করে চিনতাম না!
এ কি এমন কথা?
আটপৌরে মানুষ মানুষের মত বাঁচে।
একটা সময় ছিল ঘর্মাক্ত শরীরটা
যৌন গন্ধের পরশ পশমে—
বর্ধিষ্ণু বাড়ির হুলো বিড়াল হতে চাইত!
পুরনো দর্শনের ভাষান্তর করে নাও—
আনন্দ পেয়েছ, আনন্দ পেয়েছি
বলেই সেদিন বৃন্ত ছেঁড়া
ফুলের পাঁপড়ি, বইয়ের ভাঁজে......
না না ছোট্ট টিলার খাঁজে রেখে এসেছিলাম!
ফুল ফুটেছে, ফুল ফুটেছিল
আবার কি সেদিনের মত
রাত জাগা শিশিরে ভিজে গোলাপ ফুটবে?
একটা সময় গোলাপের জন্ম বৃত্তান্ত জানতাম না।
একি এমন কথা?
ঘরপোড়া মানুষ মানুষের মত
বাঁচতে চায়।
সূর্যের আগুনে আজ তাপ উত্তাপ নেই,
চুলার নিষ্পাপ আগুনে সেদিনও
হাত ভিজিয়ে নিতে পারতাম—
দাঁড়িয়ে থেকনা, রোদ্দুর চিনলে
গ্রহণে কার কি এসে যায়?    

Wednesday, 9 August 2017

হুজুরে হাজির নয় ভাঙা গণতন্ত্র হাঁটছে

হুজুর হাজির নয় ভাঙা গণতন্ত্র হাঁটছে: 

ভারতে সম্প্রতি সদ্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়ে গেল। সেই নির্বাচন নিয়ে যে প্রেক্ষাপট ভারতের উচ্চ শিক্ষিত, মধ্য শিক্ষিত, কম শিক্ষিত এবং লেখা পড়া না জানা ভারতীয় নাগরিক দেখল সেটা আলোচনার বিষয় কেন হবেনা? চলুন বর্তমানকে একবার ফিরে দেখি। বিজেপি নামক দলটির ভারতে উত্থান নেহরুর বহু আলোচিত মিশ্র অর্থনীতির হাত ধরে। নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্রাক্তন জনসংঘ নেতা এবং বিজেপি নামক দলটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী। এই অটলবিহারী বাজপেয়ীর প্রদর্শিত পথেই হাঁটছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। উদার অর্থনীতি তথা বিশ্বায়নের উত্তর প্রজন্মের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ভারতীয় গণতন্ত্রে কংগ্রেসের নেতৃত্বেই আমরা পেয়েছি উদার গণতন্ত্র, উদার অর্থনীতি এবং উদার সংস্কৃতি। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংহের নেতৃত্বে ভারতীয় অর্থনীতি বিশ্বে নিজের মর্যাদা অর্জন করতে পেরেছে। ‘হুজুরে হাজির’ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক বাতায়ন টপকে আজ ভারত নামক দেশটি স্বতন্ত্র একটি দেশ। একথা আমারমতো অরবাচিনের কলমে আসলেও ভারতের সব দলের, বিভিন্ন মতাদর্শের পণ্ডিতজনেরা স্বীকার করছেন।
মাননীয় বর্তমান রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের নাম বিজেপি তথা এনডিএ শিবির থেকে ঘোষণা হওয়ার পর কংগ্রেসের নেতৃত্বে দলিত নেত্রী, ইউপিএ জমানার দ্বিতীয় দফার অধ্যক্ষ মীরা কুমারকে প্রার্থী করে সতেরোটি দলের বিরোধী জোট। নির্বাচনে জয়পরাজয় থাকেই কিন্তু এবছর ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভারতীয় গণতন্ত্র অনেকটা পথ হেঁটে এসে আধুনিক হয়ে উঠতে পারছে। দেশীয় রাজনীতির বর্তমান সময় আমাদের সেই আবৃত্তি করতে আহ্বান করছে বলেই মনে হয় । নিরপেক্ষ কলমচির টেবিল থেকে এমন উপলব্ধি আমার হয়েছে। পূর্বের পরিস্থিতি যদি খুঁজে দেখি তাহলে ইতিহাস বলছে অটলবিহারী বাজপেয়ীর সময় রাষ্ট্রপতি-পদে এ পি জে আব্দুল কালামকে সমর্থন করা নিয়ে বামেদের সঙ্গে কংগ্রেসের মতপার্থক্য দেখা দেয়। কলকাতা থেকে প্রকাশিত সেই সময়ের একটি বহুল প্রচারিত বাংলা দৈনিক লিখেছিল, ‘’অবশেষে কংগ্রেসও রাষ্ট্রপতি-পদে এ পি জে আব্দুল কালামকে সমর্থন ঘোষণা করল।‘’
একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের দ্বিতীয় বছরে কিরকম রাজনৈতিক অভিঞ্জতা ভারতবাসীর হয়েছিল? অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল দেশের মেট্রোপলিটন শহরগুলি। যেমন দিল্লি, কলকাতা এবং চেন্নাই। বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার কিছু উল্লেখযোগ্য উন্নয়নের কাজ করলেও চতুর্দশ লোকসভা নির্বাচনে সাফল্য পায়নি। তার কারণ দেশের ধর্মীয় ভারসাম্য রক্ষা করতে বাজপেয়ী সরকার ব্যর্থ হয়। দেশের যে চিরাচরিত বিশ্বাস, বিভিন্ন জাতি, সম্প্রদায় পাশাপাশি বাস করেও বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের আঙিনায় আলপনা আঁকা ভারতের মানচিত্রের সীমানা ভেঙ্গে পড়েছিল। সামাজিক ঐক্যের সুর কেটে গিয়েছিল। সনাতন গ্রাম ভারতের যেটা ছিল একান্ত নিজস্বতা। সামাজিক ঐক্যের দায়িত্ব কেন্দ্র অথবা রাজ্য সব সরকারকে নিতে হয়। ভারতীয় প্রাচীন সভ্যতার বহুবর্ণের সেই সহিষ্ণুতা আজকের ভারতেও প্রশ্নের মুখে এসে দাড়িয়েছে। 
দ্বিতীয় দশকের শেষ প্রান্তে ভিন্ন ধরণের অভিঞ্জতার মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি। এখানেই খুব সম্ভবত ভারত নামক দেশটির গণতন্ত্র নিজ স্বকীয়তায় পড়শি দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই আধুনিক গণতন্ত্রের উদাহারণ হয়ে উঠতে চাইছে। আজ ৯ অগস্ট প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্যোগে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ৭৫তম বর্ষপূর্তি উদযাপন করছে এন ডি এ সরকার। সংবাদ মাধ্যম সুত্রের খবর ২০১৭ সালের ৯ অগস্ট সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শপথ নেবেন দুর্নীতি, সন্ত্রাসবাদ, আবর্জনা, দারিদ্র, জাতিভেদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে ভারত ছাড়া করার। প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ নিয়ে শুরু হয়েছে চাপানউতোর। ১৯৪২ সালে গাঁধিজি যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন সে আন্দোলনের ফলে ব্রিটিশ শাসকদের ভিত কেঁপে গিয়েছিল। ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন শুরু হয়, গাঁন্ধিজি চেয়েছিলেন সেই আন্দোলন হবে একটি প্রকাশ্য আন্দোলন বা বিদ্রোহ’। পাশাপাশি তাঁর পরিকল্পনা ছিল ‘যতটা সম্ভব সংক্ষিপ্ত ও ক্ষিপ্র’। ৮ অগস্ট কংগ্রেস অধিবেশনে গাঁধিজি এই আন্দোলনের লক্ষ্য ঘোষণা করেছিলেন। লক্ষ্য ছিল পূর্ণ স্বাধীনতা ছাড়া কোন কিছুই নয়। সেই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পরাধীন ভারতের জনতার কাছে তাঁর আহ্বান ছিল— ‘হয় স্বাধীনতা না হয় মৃত্যু’।
 তাঁর আরও অভিমত ছিল আন্দোলন পরিচালনার জন্য তিনি নিজে থাকবেন একজন সাহায্যকারীর ভূমিকায়। ইতিহাস বলছে ওইদিন অর্থাৎ ৮ অগস্ট বক্তৃতায় আপসহীন সংগ্রামের আহ্বান জানানোর পরে পরেই গাঁধিজি বড়লাটের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাবও দিয়ে রাখেন। কিন্তু তিনি ভাবতেও পারেননি যে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারে। আগের দিনের বক্তৃতার পর ৯ অগস্ট ভোর চারটার সময় তিনি ঘুম থেকে ওঠেন নিয়ম মতো প্রার্থনা করার জন্য। ওই কাক ভোরেই তিনি তাঁর একান্ত সচিব মহাদেব দেশাইকে বলেন, ‘গতকাল রাতের বক্তৃতার পর তাঁরা আমাকে গ্রেপ্তার করবে না।’ ঘটনা ঘটল একদম উল্টো। ওইদিন সকালেই পুলিশ আসে গাঁধিকে গ্রেপ্তার করতে। গাঁধিরমতো দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিও ভাবেত চাননি তাঁকে ব্রিটিশের বড়লাট গ্রেপ্তার করতে পারে। অগস্ট আন্দোলনের শক্তি কতটা ছিল এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়।
এই ঘটনার আগে ১৯৪২ সালের ১০ই মে গাঁধিজি বলেছিলেন, ‘’The withdrawal of British rule from India was a supreme act to the realization of which I must devote my whole energy.’’   গাঁধিজি ১৯৪২ সালের ১৪ জুলাই ওয়ার্ধায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন শুরু করার জন্য নিজের সঙ্কল্পের কথা বলেন। ওইদিন তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এই প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেওয়া অথবা শাসকদের আরও একবার সুযোগ দেওয়ার কোনও সম্ভবনা নেই। আমি বলছি চূড়ান্তভাবেই এটা শাসকের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ। গাঁধিজির ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে কাতারে কাতারে মানুষ আন্দোলনে নামে। ৯ অগস্ট বোম্বাই শহরের ‘গোয়ালিয়া ট্যাঙ্ক ময়দানে’ এবং শিবাজী পার্কে সভা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ পুলিশ নিরস্ত্র মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ব্যপক লাঠিচার্জ করে এবং কাঁদানো গ্যাস ব্যবহার করে। অনেকেই গ্রেপ্তার হন। পুলিশের গুলিতে ৫ জন কংগ্রেস কর্মী নিহত হন। আহত হন ২০-২৫ জন কংগ্রেস কর্মী। বোম্বাই শহরেই এক সপ্তাহে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয় ৩৫ জন সত্যাগ্রহী কংগ্রেস কর্মীর। আহতের সংখ্যা ছিল ৫০০ এরও বেশি। কলকাতায় রিপন কলেজ, বঙ্গবাসী কলেজ, তৎকালীন যাদবপুর কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিক্ষোভ আন্দোলনে ব্যাপকভাবে সামিল হয়।
দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় ভারতের কোন দলের কি ভূমিকা ছিলো সেই নিয়েই নতুন করে শুরু হয়েছে বিতর্ক। কংগ্রেস দল খুব স্বাভাবিকভাবেই উত্তর প্রজন্মের কাছে দায়বদ্ধ। এই প্রজন্মের ছাত্র যুবদের কংগ্রেসকে বলতেই হবে, ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন ছিল গাঁধিজির নেতৃত্বে কংগ্রেস ঘরানার আন্দোলন। সেইমতো কংগ্রেস গত কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যপক প্রচার করে। ‘ক্যুইট হেট মুভমেন্ট’ নামে একটি আন্দোলের সূচনাও একবিংশ শতাব্দীর ভারতে শুরু হয়েছে। আমরা যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত সংবাদের সঙ্গে থাকি তাঁরা ৮ অগস্ট কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকের ভিডিও ফুটেজ পেয়েছি। সেই সূত্রে খবর, বম্বে অধিবেশন থেকে গাঁধিজি ঐতিহাসিক ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। সেই দিনটিতেই কংগ্রেস কর্মসমিতির বৈঠক করে। দলের সভানেত্রী সনিয়া গাঁধি ওই দিনের সভায় বলেন, ‘’দেশে সংখ্যালঘু দলিত, মহিলা এবং আদিবাসীরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। প্রতিদিন মানুষের স্বাধীনতায় হাত পড়ছে। যে সব সমাজবিরোধীরা তা করছে, তাদেরই হাত শক্ত করছে বহুত্ববাদ-বিরোধী মোদী সরকার।‘’      
৯ অগস্ট, ১০১৭ এই দিনের সকালের একটি বাংলা দৈনিকে পড়লাম প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্যোগে শুরু হওয়া প্রচার নিয়ে কিছু বক্তব্য। দৈনিকটি লিখছে, ‘’যেন মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধিকে পুরোপুরিই কংগ্রেসের থেকে ছিনিয়ে নিতে চাইছেন তিনি। ‘অন্তত ভারত ছাড়ো’ নিয়ে তাঁর উৎসাহ ও আয়োজনের বহর দেখে এমনটাই মনে করছেন  জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিঞ্জানের শিক্ষক সৌম্যজিৎ রায়। ..................সৌম্যজিৎবাবুর বিশ্লেষণ, ‘এটা শুধু জাতীয়তাবাদ বা স্রেফ রাজনৈতিক চাল নয়, নির্বাচনী কৌশলও। এখনকার কংগ্রেস বস্তুত ইন্দিরা গাঁধির তৈরি। মোদী গাঁধিজির কংগ্রেস থেকে আজকের কংগ্রেসের নেতাদের বিচ্ছিন্ন করে দিতে চান। কিন্তু গাঁধিজিই কংগ্রেসের প্রধান আইকন তাঁকে নিয়ে নিলে কংগ্রেস একেবারে দেউলিয়া হয়ে পড়বে।’
সময়ের কেমন সমপতন ভাবুন, ৮ অগস্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা জয়রাম রমেশের সাক্ষাৎকার দেখি। সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জয়রাম বলেন, ‘’সাম্রাজ্য গিয়েছে, কিন্তু এখনও অনেকে সুলতানের মতো ব্যাবহার করেন। অস্তিত্বের সঙ্কট চলছে কংগ্রেসে।‘’ উচ্চশিক্ষিত এবং প্রাক্তণমন্ত্রী জয়রাম আরও বলেন, ‘’নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহের ভাবনাকে মোকাবিলা করতে না পারলে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে দল। পুরনো শ্লোগান, মন্ত্র, সমীকরণে আর কাজ দেবে না। দেশ বদলেছে, কংগ্রেসেরও বদল দরকার।‘’
কংগ্রেস দলে কোনও শীর্ষ নেতা বাস্তব নিয়ে ভাবলেও বিতর্ক তুলতে সাহস পাচ্ছিলেন না। কংগ্রেস সহ সভাপতি রাহুল গাঁধি এই কথাটা অনেকদিন থেকে বলতে চাইছেন সম্ভবত। দলের পুরনো ভাবনা চিন্তার খোল নলচে বদলে দেওয়ার সময় এসেছে। মাত্র ৩৭  বছরের পুরনো দল বিজেপি সমস্ত সীমাবদ্ধতা নিয়েও আধুনিক ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্য দল হয়ে উঠতে চাইছে। দেশের প্রধান বামপন্থী দল ৫৩ বছরের পুরনো সিপিএম নিজেদের দলে আরও গণতন্ত্রের খোঁজে বারে বারে পরীক্ষা নিরীক্ষায় যাচ্ছে। সিপিএম দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নিজেদের ভুল শুধরে নিয়ে গত পাঁচ ছ’ বছরে ভারতীয় ঘরানায় দলকে গড়ে তোলার কর্মসূচী নিচ্ছে।  
‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের উত্তরাধিকার যে সময় নরেন্দ্র মোদী ছিনতাই করতে চাইছেন সেই সময়কে  মাহেন্দ্রক্ষণ বেছে নিয়ে জয়রাম সঠিক কথাটা বলে দিয়েছেন। দলে স্বাভাবিকভাবেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। কংগ্রেসের তাত্বিক নেতা মণিশঙ্কর আয়ার জয়রামকে সমর্থন করে প্রকাশ্যে বলেন, ‘’জয়রাম যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তাতে স্পষ্ট তিনি কট্টর কংগ্রেসি। বিভিন্ন মত না শুনলে আবার এগোনোও যাবে না।‘’
সমপতনের আরও একটি ঘটনা দেখুন গুজরাট থেকে রাজ্যসভার ভোটকে কেন্দ্র করে। সেটাও ৮ অগস্টের ঘটনা। কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গাঁধির রাজনৈতিক সচিব আহমেদ প্যটেল। দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকা আমরা খুব কিছু প্রকাশ্যে দেখতে পাই না। কিন্তু তিনি যে কত দক্ষ নেতা সেটা আবার প্রমাণ হয়ে গেল। সব রকমের জল্পনা কল্পনাকে মিথ্যে প্রমাণ করে, বিজেপি সভাপতি অমিত সাহের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ‘বাপুজি’-এর রাজ্য গুজরাট থেকেই রাজ্যসভার ভোটে জিতে গেলেন আহমেদ প্যাটেল। ৯ অগস্ট সকালের খবরে দেশবাসী জানতে পারল গুজরাট রাজ্য সভার ভোটের খবর। টানটান উত্তেজনা শেষে কংগ্রেস নতুন করে শক্তি পেল।
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস দলটিও পিছিয়ে থাকতে রাজি নয়। ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে ঘোষণা করেছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বিজেপি ভারত ছাড়ো’। ৯ অগস্ট পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে সেই কর্মসূচি শুরু করলেন তৃণমূল নেত্রী। ওইদিনের সভায় মমতা বিজেপির নাম না করে বলেন, ‘’ক্ষমতায় এসে কেউ কেউ মনে করছে ৯ অগস্টের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন তারাই করেছে। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় অনেকের অন্যরকম ভূমিকা ছিল। আমি মানুষে মানুষে ভাগাভাগি করি না।‘’    
ভারতবর্ষ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। যে কোনও বহুদলীয় গণতান্ত্রিক দেশের প্রেক্ষাগৃহে বুর্জোয়া, কৃষক, জোতদার, শ্রমিক, মুটে, ক্ষেত মজুর একই নাটক বা সিনেমা দেখে। অনেক সময় শহরে গ্রামাঞ্চলে সাংসকৃতিক অনুষ্ঠানও দেখে। নিজেদের অত্যন্ত স্পর্শকাতর অনুভূতি রুচি ও মূল্যবোধের তারতম্যে হাততালি দেয়, নয়তো শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। এই মুহূর্তকে কি বলা যায়? শ্রেণী নিরপেক্ষ মানবিক ইন্দ্রিয়ানুভূতি, শ্রেণী বিভক্ত সমাজে খণ্ডিত এবং সীমিত অনুভূতি? এসবের প্রকাশ আমরা দেখি শুধু কয়েকটি মৌল মানবিক বোধেই সীমাবদ্ধ থাকে। রাজনীতিতে এমনটা হবার নয়। রাজনীতি সম্ভাবনার শিল্প। প্রতি মুহূর্তে গড়ে নিতে হয়। নতুন করে ভাঙ্গতে হয়। নব প্রভাতের সঙ্গীতে গড়ে নেওয়ার অবকাশ খুঁজে নিতে হয়। সেটা করতে না পারলে মেঠো রাজনীতির কচকচানি বাড়তেই থাকে। সতর্ক থাকতে হয় কে বন্ধু কে শত্রু চেনার সময়। রাজনীতি বড় স্পর্শকাতর বিষয়।
প্রখ্যাত উর্দু লেখক সাদাত হাসান মান্টোর লেখা যারা পড়েছেন তারা মান্টোর বহুবার ব্যবহার করা একটি শব্দবন্ধ সম্পর্কে পরিচিত। শব্দবন্ধটি হল ‘দুশমন দোস্ত’। এর অর্থ হল বন্ধুর ছদ্মবেশে আড়াল থেকে শত্রুর কাজ করা। রাজনীতি সামাজিক মানদণ্ডে বিচার করলে আমাদের ‘দুশমন দোস্ত’ সম্পর্কে বারে বারে ভাবতে হবে। না হলে বন্ধুর ছদ্মবেশে ঘরের শত্রু বিভিষণ চিনতে আমাদের অসুবিধায় পড়তে হতে পারে। গত কয়েক দশকে কংগ্রেসে পরিবারে ‘দুশমন দোস্ত’ –এর সংখ্যা কিন্তু অনেক। ‘হুজুর হাজির’ বলার সময় এবং দিন শেষ হয়ে আসছে ভারতে। সামন্ত নেতাদের সামনে সমস্ত দলন পীড়নের অত্যাচার সহ্য করে ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ –এর যুগে দলিত মানুষ মুখ খুলছে। স্বাধীনতা চাইছে। কথা বলার, গণতন্ত্রের। বই পড়ার, তথ্য জানার প্রয়োজনে। যে ব্যবস্থা ভারতবাসী কংগ্রেস ঘরানার রাজনীতিতেই পেয়েছে। তাই কংগ্রেস নামক দলটি নিজের ভাষায় ভারতে আধুনিক গণতন্ত্রের মঞ্চ হয়েই ব্যবহার হবে এমন আশা করা খুব কিছু অন্যায় হবে বলে মনে করি না।