Tuesday, 3 January 2017

বিহানবেলার ঘর সংসার

বিহানবেলার ঘর সংসার
একটা দেশ ভারত নামক একটা দেশ এতটা পথ এগিয়ে এসে আবার কি পিছনের দিকে হাটতে চাইছে? আমার এই লেখার মুখবন্ধে প্রথমেই সশ্রদ্ধ আবেদন রাখছি ভারতের সব ধর্মের ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে। বিশেষত ইসলাম ধর্মের সেইসব শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে। বিশ্বের আপামর জনতার আদালতে আমার সীমাবদ্ধ ঞ্জাণের শ্রদ্ধাঞ্জলি। যেসব ঞ্জাণী শিক্ষিত মানুষ ধর্মে বিশ্বাস করেন তাঁদের সিঞ্চিত ধ্যান সাধনার প্রতি সমস্ত শ্রদ্ধা রেখে আমার নিরপেক্ষ নিবেদন। এই লেখায় কোনও ব্যক্তি, কোনও বিশেষ গোষ্ঠী যদি মনে করেন তিনি ভিন্ন মত পোষণ করেন তাহলে আপনি বা আপনারা আমার ব্লগের কমেন্ট বক্সে আপনার এবং আপনাদের মতামত জানাবেন। আপনাদের মতামত আমি পুনরায় সংযোজন করব।  
ইসলাম ধর্মের তিন তালাক বিষয়টা নিয়ে ‘তর্কপ্রিয়’ বাঙালি, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গাঁধির সতর্ক পদচারণার আগে খুব কিছু আলোচনা করার কথা ভাবেনি। আমাদের আলোচনা বাংলার সীমান্ত ভেঙ্গে সর্ব ভারতীয় হয়ে ওঠার দাবি রাখে। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ ‘’তিন তালাক প্রথার বিলোপের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। মুসলিম মহিলাদের একটি সংগঠন সেই মামলা করেছে। তার ভিত্তিতেই সম্প্রতি এ ব্যাপারে আদালত কেন্দ্রের মতামত জানতে চেয়ে নোটিস দেয়। এর পরই জাতীয় আইন কমিশন তিন তালাক এবং বহুগামিতা নিয়ে একটি প্রশ্নমালা তৈরি করে পার্সোনাল ল বোর্ডের কাছে পাঠিয়েছে। কেন্দ্রের এই পদক্ষেপকে মোদী সরকারের স্বৈরাচার আখ্যা দিয়ে আইন কমিশনের প্রশ্নমালা বয়কটের জন্য ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড।‘’
তিন তালাক বিলোপ বিষয়ক মামলায় আরও পরে পর পর দু’টি হাই কোর্টের রায় আবেদনকারীদের পক্ষে গেছে। ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৬ সালে প্রকাশিত খবর ছিল, ‘’ইলাহাবাদ হাইকোর্টের পর কেরল হাইকোর্ট। তিন তালাক ভারতীয় মুসলিম মহিলাদের আইনের চোখে সমতার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে বলে জানাল বিচারপতি এ মুহামদ মুস্তাকের বেঞ্চ। বিবাহবিচ্ছিন্না মুসলিম মহিলাদের তিনটি মামলার রায় দিতে গিয়ে শুক্রবার আদালত বলেছে, এই প্রথা গোটা দেশকে দেখিয়ে দিচ্ছে, মুসলিম মহিলারা সুবিচার পান না। বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের বিধিবদ্ধ করণেই রয়েছে এর সমাধান। আদালত জানিয়েছে, কোরান কোথাও সটান তিন তালাকের সমর্থন করেনি। বরং বিয়ে সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে বোঝাপড়াকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। সৌদি আরব, মিশরের মতো মুসলিম দেশও তিন তালাককে বাতিল করেছে।‘’ (ABP news)      
ইতিহাস আমাদের টেনে নিয়ে যায় আশির দশকে। তখন আমার বয়স কত হবে?
সালটা ১৯৮০-১৯৮১ হবে। আমাদের পাড়ার একটি মধ্যবিত্ত এবং উচ্চশিক্ষিত বর্ণ হিন্দু পরিবার ‘বিবাহবিচ্ছিন্ন’ বা ‘ডিভোর্স’ এই জাতীয় শব্দ সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতেন। কিন্তু নিজেদের পরিবারে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভাবতে পারতেন না। যেমন ভাবতে পারেননি আমার বড়দাদার অভিজাত এবং উচ্চ শিক্ষিত শ্বশুর বাড়ি। আমার বড়দা অল্প শিক্ষিত এবং সরকারি চাকুরে ছিলেন। রামপুরহাট মহকুমার একটি গ্রামের এক প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার সেই ভদ্রলোক তাঁর এক মেয়ের সঙ্গে আমার বড়দার বিয়ে দেন। সালটা ১৯৬৯। সেই ডাক্তারাবুর উচ্চশিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত ছেলেরাও এই অসম বিয়েতে মত দেন। আমার দাদার বিয়ের পর দু’তিন বছরের ব্যবধানে দুই সন্তান হয়। খুব সম্ভবত বছরটা ১৯৭৩ সাল। একদিন বৌদির বাবা ডাক্তারবাবুর বাড়ি থেকে অভিজাত গরুর গাড়ি আসে। সেই গরুর গাড়ি করে আমি আমার মাতৃসম বৌদিকে বাপের বাড়ি ফেরত দিয়ে আসি। সঙ্গে বৌদির ছোট ছেলে। আসা যাওয়া প্রায় ১০-১৫ মাইল রাস্তা হবে। ১৯৭৩ সালের পর বড়দার প্রথম স্ত্রী আমাদের বাড়ি কোনওদিন আসেনি। বড় বৌদি বছর তিনেক আগে মারা গেছেন শুনেছি। তাঁর ছোট ছেলেও কোনদিন বাবাকে দেখতে আসেনি।
১৯৭৪ সালে বড়দা তাঁর পুরনো প্রেমিকাকে বিয়ে করে। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর সঙ্গে আইনি বিবাহ বিচ্ছেদ না নিয়ে ভদ্রলোক দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। বড়দার উচ্চশিক্ষিত ডাক্তার শ্বশুর, ডাক্তার শ্যালক, ইঞ্জিনিয়র আরও দুই শ্যালক এবং উচ্চ শিক্ষিত প্রাক্তন বামপন্থী ছাত্র নেতা, সিউড়ি শহরের একটি নাম করা স্কুলের শিক্ষক ছোট শ্যালকও ‘ডিভোর্স’ নিয়ে উচ্চবাচ্চ করেননিকেন? সে প্রশ্ন কেউ কোনদিন করেন নি। যদিও বর্তমানে আমার বড়দা এবং তাঁর দ্বিতীয় বৌ কেউ বেঁচে নেই। আর্থিক কষ্টের মধ্যেও সামাজিক অবমাননা সঙ্গে বয়ে তাঁরা চার পাঁচটা ছেলেমেয়ে নিয়ে ভরপুর সংসার করেছে। চলুন শুরুর গল্পে ফিরে যাই।
আশির দশক। ১৯৮০-৮১ সাল। নলহাটি, রামপুরহাটে সমাজকর্মী হিসাবে বেশ নাম ডাক হয়েছে আমার। সেই সময় আমাদের পাড়ার সেই বর্ণহিন্দু বাড়ির বড় মেয়েটি বিয়ের এক বছরের মাথায় বাপের বাড়ি ফিরে এলো। উচ্চশিক্ষিত বাবা, দাদা, সরকারি উচ্চপদে চাকুরে তাঁরা। গ্রামে চল্লিশ বিঘে জমি আছে বাবার। তবু পরিবারটি জানে না এর পর কি করতে হবে? ডিভোর্স-এর জন্য আবেদন করা যায় জানলেও সামাজিক তথা লোক লজ্জার ভয়ে তাঁরা আদালতে যেতে পারছিল না। অথচ সেই সময় আমাদের রাজ্যে প্রগতিশীল বামফ্রন্ট সরকার ছিল। পাশে পেলেন আমাদের মত উচ্ছন্নে যাওয়া সমাজকর্মীদের। ওই বছর গুলিতে পরিবারটির সামনে থেকে তাঁদের সাহায্য করতে চেয়েছি। না আমি রবি ঠাকুরের ‘নিষ্কৃতি’ কবিতার কাহিনী নতুন করে বাঁধতে বসিনি। ওই বছরগুলিতে আদালতের নির্দিষ্ট তারিখে মেয়েটি তাঁর দাদা, বাবার সঙ্গে নিয়মিত সিউড়ি যেত। আমাকেও তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যেতে হত। এমনই একদিন সিউড়ি কোর্টের সামনে বসে আছি। হঠাৎ দেখি লিয়াকত আমাকে ডাকছে। লিয়াকত আমার সঙ্গে নলহাটি হরিপ্রসাদ উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে ক্লাশ সিক্স পর্যন্ত পড়েছে। তারপর আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেনি। তখন ও নলহাটি বাজারে রিক্সা চালাত। আমি বললাম, কিছু বলবি?
লিয়াকত বলল, ‘’আমার সঙ্গে খানিক আসবা। আমার কিছু কথা আছে তুমার সঙ্গে।‘’
দূরে একটা চায়ের দোকানে আমরা বসলাম। আদালত চত্বরে কত অসহায় মুখ। মানসিক নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তার জন্য তাঁরা ঘুরছে। লিয়াকত এক কাপ লাল চা নিয়ে বলল, ‘’আমার ছোট বহিনকে বাবা ১৩ বছর বয়সে বিহা দিয়াছিল। এখন দুই ছেলা এক মেয়ার মা। বয়স মাত্র ১৮ বছর। ওর সুয়ামী ‘তিন তালাক’ দিয়াছে। আমার দিদি আর দাদা বুলাছে বোনকে খোরপোষ দিতে হবে। কে কার কথা মানে! জামাই আবার নিকাহ কোরাছে। আমি আমার দিদি মিলে সিউড়ি কোর্টে মামলা কোরাছি। একবছর হুং গেল। তুমি দীপেন সবার লেগি কত উপকার কর। আমাদের পাশে খানিক দাঁড়াও ক্যানে।‘’
লিয়াকতের পুরো কথা শোনার পর আমি থতমত হয়ে গেছিলাম। কারণ সেই সময় শরিয়ত আইন বা মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড বিষয়ে আমার একদমই ধারণা ছিল না। লিয়াকতকে বললাম, আইন আদালতের বিষয়। আমি এই ব্যাপারে কোনও সাহায্য করতে পারব বলে মনে হয় না। তবে পুলিশ এবং সামাজিক বিষয়ে আমি চেষ্টা করব তোদের জন্য কিছু করার।
সেই মত আমি আমার তৎকালীন মান্যগণ্য বন্ধুমহলকে লিয়াকতদের পরিবারের লড়াইয়ের কথা জানাই। তাঁরা সম্ভবত সাহায্যও করেছিল। তারপর কয়েকটা বছর কেটে গেছে। আমি কলকাতায় থাকি। একমাস দু’মাস অন্তর বাড়ি যাই। ১৯৮৪ সালের ডিসেম্বরের কোনও এক বিহান বেলায় লিয়াকত আমাদের বাড়ি এল। ভেতরে ঢুকল না। রিক্সা সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। সেই রিক্সায় করে আমাকে একরকম জোর করে ওদের বাড়ি নিয়ে গেল। ওদের বাড়ির মাটির সীমান্ত প্রাচীরে লিয়াকতের বোন তখন ঘুঁটে দিচ্ছিল। বাইরে তিন চারটে ছেলেমেয়ে নাকের পোঁটা মুছতে মুছতে পিট্টু খেলছে। আমরা যেতেই লিয়াকতের বোন ছুটে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। লিয়াকতের মা আর দিদি সামনে এসে দাঁড়াল। দিদির হাতে বেতের মোড়া। রিক্সার পুরনো টায়ার দিয়ে উপর আর নীচের ঘের সেলাই করা। আমি সেই মোড়ায় বসে ওদের লড়াই শুনেছিলাম। লিয়কতের মা গাজরের হালুয়া, ডিমের হালুয়া আর পড়টা খেতে দিয়েছিলেন। বিহানবেলার ঘর সংসারের কথা সেদিন শুনেছিলাম। সিউড়ি আদালতের রায় লিয়াকতের বোনের পক্ষে গেছিল। কিন্তু জামাই খোরপোষ ছ’মাস দিয়ে বন্ধ করে দেয়। লিয়াকতরা খোরপোষের জন্য আর চেষ্টাও করেনি। পরে বোনকে সেলাই স্কুলে ভর্তি করে সেলাইয়ের কাজ শিখিয়ে নিয়েছে।
গ্রাম বাংলার এই ধরনের বিহান বেলার গল্পকথা আকছার শোনা যায়। রাজনৈতিক টানাপোড়েন নোট আকালেও সমানে চলছে। পক্ষে বিপক্ষে বিভিন্ন মতামত আমরা সংবাদ মাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি। যে হেতু বিষয়টি আদালতের বিচার্য বিষয় সেই কারণে আমার ব্যক্তিগত কোনও মতামত নেই। পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু কমিশনের চেয়ারম্যান ইন্তাজ আলি শাহয়ের সঙ্গে আলোচনা থেকে জানা যায় ১৯৭৩ সালের সংশোধিত আইনের সি আর পি সি ১২৫ ধারা মোতাবেক জেলা শাসকরা খোরপোষ দেওয়ার বিধান দিতেন। পরে এই আইন সংশোধন হয়। ১৯৭৩ এর পরে ১৯৮৬ সালে পুনরায় সংশোধিত আইন আসে।    
সম্প্রতি ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসের ১৭ তারিখ কলকাতার ইরান সোসাইটি সভাঘরে Justice K. M. Yusuf Memorial Trust & Iran Society-এর যৌথ উদ্যোগে তিন তালাকের বিষয়ে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। আমি সেই সভায় আমন্ত্রিত ছিলাম। আলোচনার বিষয় ছিল, ’Triple Talaq: In the light of Islam and present Scenario’’ সেদিনের আলোচনা সভায় বক্তা ছিলেন যথাক্রমে Kawal Sing Walia, President of the Iran Society, Khwaja iftekhar Yusuf, Trustee, Justice K. M. Yusuf Memorial Trust, Khwaja Jaweed Yusuf, General Secretary, Justice K. M. Yusuf Memorial Trust, Nasir Ahmed, Life Member, Iran Society, Dr. M. Firoze, General Secretary, Iran Society, Kolkata, Intaj Ali Shah, Chairman, West Bengal Minorities’ Commission Government of West Bengal, এবং Ms. Uzma Naheed, An eminent woman social activist from Mumbai and member of the All India Muslim Personal Law Board.
ইন্তাজ আলি শা সাহেব সেদিনের ইরান সোসাইটি সভাঘরে যে বক্তব্য রেখেছিলেন সেই সুরে আলাদাভাবে আমাকে বলেন, ‘’আমি কৃষ্ণনগরে ১৯৮৭ সালে ফার্স্টক্লাস ম্যাজিস্ট্রেট ছিলাম। একজন মহিলা পাঁচজন ছেলে মেয়ে নিয়ে এসেছিল। তাঁর দাবি ছিল স্বামী তালাক দিয়েছেকি খাওয়াব ছেলে মেয়েদের? আমি সেই মামলায় খোরপোষের বিধান দিয়েছিলাম। এর আগে ১৯৮১ সালে আমি প্রথম ম্যাজিস্ট্রেট। তখন আমার কাছে দু’টো তিন তালাকের মামলা আসে। একটা মামলায় অভিযোগ ছিল স্ত্রী ঘর ঝাট দেয়নি। তরকারিতে নুন দেয়নি। সেই জন্য স্বামী তালাক দিয়েছে। আমি ওই মামলাতেও খোরপোষের রায় দিয়েছিলাম।‘’
ইন্তাজ সাহেব আরও বলেন, ‘’আমাদের দেশে ১৯৩৭ সালে শরিয়ত আইন আসে ১৯৩৯ সালে Dissolution of Muslim act আসেআমি বলতে চাইছি জ্বলন্ত ইস্যুর পরিপ্রেক্ষিতে ৮০ শতাংশ মুসলিম পরিবার আইন বিষয়ে অঞ্জ। এইসব পরিবারকে শিক্ষিত এবং সচেতন করা প্রয়োজনতিনটে চান্দ্রমাসে এবং ‘তুহর’ এর সময় এই তিন তালাক দেওয়া হয়। জেলাস্তরে একজন কাজি রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। আধুনিক সময়ের সঙ্গে আমাদের তাল মিলিয়ে চলতে হবে। প্রতিবেশি দেশ পারলে আমরা পারব না কেন?’’
ইন্তাজ সাহেবের বক্তব্যকে মাথায় রেখে আমরা এই রাজ্যের বর্তমান মুসলিমদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটটা একবার দেখে নিতে পারি। বছর দশেক আগে একটি রিপোর্ট আধুনিক বাংলার অহংকার ভেঙ্গে তছনছ করে দিয়েছিল। ২০০৬ সালে প্রকাশিত সাচার কমিটির রিপোর্ট থেকে রাজ্যের মুসলমানদের শোচনীয় অবস্থার কথা রাজ্যবাসী তথা দেশবাসী জানতে পেরেছিল। তারপর আমরা দশ দশটা বছর পেরিয়ে এলাম। উল্লেখযোগ্যভাবে কিছু কি পাল্টেছে? রাজ্যের মুসলিমদের আর্থসামাজিক অবস্থান? পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করেন এমন সংখ্যালঘূদের মধ্যে মুসলিমরা আছেন ২৮ শতাংশ। তাঁদের পরিস্থিতি ২০০৬ সালের পর কি আদৌ বদলেছে? সম্প্রতি প্রকাশিত একটি রিপোর্ট একই কথা বলছে। ৩৮ শতাংশ মুসলমান পরিবার মাসে আড়াই হাজার টাকার কম রোজগার করে। মাত্র ১.৫৪ শতাংশ সরকারি চাকরিতে আছেন। ১.৫৫ শতাংশ  মুসলমান পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী স্কুল শিক্ষক। বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন মাত্র ১ শতাংশ। রাজ্যের মুসলমান বাবা-মা ৪২.৫ শতাংশ ছেলে এবং ৪০.৪ শতাংশ মেয়েকে স্কুলে পাঠাতেই পারেন না। মুসলমান ছেলেমেয়েদের স্কুলছুটের সংখ্যা এইরকম ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে ১৪.৫ শতাংশ মাঝপথে স্কুল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষার হাল আরও শোচনীয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষে ৪৭.১ শতাংশ ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা ছেড়ে দেয়।
তিন তালাক নিয়ে সিপিএম পলিটব্যুরো যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেই সিদ্ধান্ত ১৮ অক্টোবর, ২০১৬ সংবাদ পত্রে প্রকাশ করে ভারতের বৃহত্তম বামপন্থী দলটিআমরা যে প্রেস রিলিজ পাই সেটি উল্লেখ করলাম
The CPI (M) supports the demand of Muslim women against the practice of arbitrary and instant triple talaq. This specific practice is not permitted in most Islamic countries. Acceptance of this demand will bring relief to affected women.
All personal laws including those for the majority community require reform.
In this context the claims being made by Government spoke persons that personal laws for Hindu women have already been reformed shows that their interest is not in securing women’s equality but in targeting the minority Communities, particularly the Muslim minority. Even now laws concerning, adoption, property rights and even the right to choose your own partner discriminate against Hindu women.
With the offensive of the communal forces on the very identity of minority communities, any move to push the agenda of uniform Civil Code as is being done by the Government directly and through its institutions is counterproductive for the rights of woman. Uniformity is not the guarantee for equality.
পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাবিদ মীরাতুন নাহারের সঙ্গে আমার ব্যগতিগত আলাপ রয়েছে। তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম তিন তালাক বিষয়ে তাঁর অবস্থানঅত্যন্ত সুশিক্ষিত মীরাতুনদি ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬ তারিখে আমাকে এসএমএস করে তাঁর বক্তব্য জানান। তিনি বলেন, ‘’আমি মুসলিম মেয়েদের তাৎক্ষণিক তালাকজনিত কষ্ট দূর করার পক্ষে। কেন্দ্রীয় সরকার অথবা মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড সে বিষয়ে সদিচ্ছা পোষণ করে না। এই সত্য স্পষ্ট হয়েছে সাপ্রতিক বিতর্কে। তাঁরা মেয়েদের জীবন নিয়ে খেলা বন্ধ করুক এটাই চাই।‘’
এই লেখায় যিনি মুখ্য ভূমিকা নিয়েছেন মুম্বাইয়ের সমাজকর্মী সেই উজমা নাহিদ কলকাতার ইরান সোসাইটির সভাঘরে যে বক্তব্য রেখেছিলেন সেই বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল নিকাহ। উজমা বলতে চাইছেন আধুনিক ভারতীয় সমাজে মহিলাদের ‘নিকাহ’ করা উচিত সুস্থির এবং গঠনমূলক চিন্তার পর। তাহলে হয়ত তাৎক্ষণিক ‘তিন তালাক’ বিষয়টা এত সহজে আসেনা। এজন্য প্রয়োজন আধুনিক স্ত্রী শিক্ষা। বিশিষ্ট সমাজকর্মী পরে তিনিও তাঁর বক্তব্য আমার অনুরোধমত এসএমএস করে পাঠান ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬ তে। লেখাটি উল্লেখ করলাম।
‘’Nikah is 3letter word in Quran which is a noun, grammatically it means to absorb. Eg. The rain married with the land or sleep married with eyes. So there are multi meanings of this word which brings peace satisfaction in man and woman’s life. They are secure by doing sins.
We must concentrate more to secure Nikah inspite of discussing Talaq. Nikah works like mexicine in human lice it secure from instinctive pressure. Or safe guard from serious diseases. Just think when rain marries with earth it brings Zarkhezi’’ (fruits? Vegetable grains) and when sleep marries with eyes how much peace it provides to human being so if there is no rain the earth is dead and if you don’t have sleep the eyesight is effected. Then, water cannot be separated from earth and sleep cannot be separated from eyes. So we must secure ‘Nikahas’ much as we can. The word Talaq has 14 menings. Like Talaq’ means to open up talaqat’ to be separated atlaq’ to make free. almost the meanings are revoke able like if your stepping ahead you may come back too. If you are flying the came you may open too. This word is so stretchable that you can stretch at as  much as you can but in the end it will come on the same point. So understanding the language of Quran which has eleven meanings of each word. We must work put on mercy’’ which is the purpose of the facility of divorce. If they both don’t like to live together they can use talaq, but Quran says to be just with women and use its given process of three months long period.’’                                                
           

Monday, 2 January 2017

আলোক শিশু

আলোক শিশু: 

আজ উৎসবের রাত আলোর শিশুরা গান গাইছে।
হ্যাঁ তোমরা আনন্দ কর.........
পরস্পরে আলিঙ্গন কর।
আজ কিন্তু চেনা-অচেনা শ্মশানে
আলো জ্বলছে না!
কে তুমি? আমাকে ডেকেছ?
এই শ্মশানে ‘আলোকপুরুষ’ ভস্ম
মেখে বসে আছে!
কৃষ্ণগোলাপ দেখেছি বৃষ্টিভেজা সকালে,
সুপ্রভাত, বললাম.........
শিশিরক্লান্ত সন্ধ্যায়!
উৎসবের রাতে নতুন পাঁপড়ি মেলবে
সাদা গোলাপের ভ্রুণ।
অবলোকন করেছ কখনও?
শুনেছ কখনও গোলাপের প্রসব যন্ত্রণা?
জেন, এফুল শরতের শিউলী আগমনী নয়।
অভিজাত কৃষ্ণরাতেও সাদা, হলুদ, নীল, লাল
এবং কৃষ্ণগোলাপের অস্ফুট নিঃশব্দ উচ্চারণ শুনি।
সারি সারি বৃক্ষের শাখায় শাখায়
পাখিদের কলরব-কলতান,
বেহালার ছড়ে ইমন রাগের স্পন্দিত বিচ্ছুরণ—
সূর্যালোকের বর্ণচ্ছটায় ‘আলোকশিশুরা’

আজও গান গায়।   

Friday, 23 December 2016

হেমন্তের অবতরণিকা

হেমন্তের অবতরণিকা:

আমার প্রিয় কবি শঙখ ঘোষ আপনাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। আমি আজ আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। প্রশ্রয়ের সঙ্গে বলতে হয় আমার কি এমন যোগ্যতা আপনাকে নিয়ে শব্দ বাক্য রচনা করি? সত্য সে তার গতি যতই মন্থর উপলব্ধি হোক, বাস্তবের নিয়ম-অনিয়মের দোলাচলে। ন্যায়ের নিয়ম ফিরবেই। ন্যায়দণ্ড আজও ঠাকুর বাড়ি, বিশ্বভারতী, শিলাইদহে আমাদের আমন্ত্রণ জানায়। আমরা নতজানু হয়ে পরস্পর পরস্পরে প্রাচুর্যকে ছুঁয়ে দেখি। আজ শান্তিনিকেতনে ছাতিমতলায় ব্রাহ্ম সঙ্গীত উচ্চারণে বাংলার বর্ণময় মেলার আরাধ্য প্রাচুর্যে আমরা কবিগুরুর চরণের কাছে বসে আছি। এইদিন আরও সমৃদ্ধ হলাম যখন শুনলাম আপনি জ্ঞানপীঠ পুরষ্কার পাচ্ছেন। সময় যত গড়িয়েছে আমরা কাব্য সাহিত্যের তৃষ্ণার্ত আপামর বাঙালি প্রতীক্ষা করেছি আমাদের বাংলার গর্ব, বাংলার বিবেক জানি জগতসভায় আপন আসনে বসবেন। আর তিনি আমাদের বলবেন, ঞ্জান যেখানে মুক্তধারার মত অবগাহন করে আমি এবং আমরা সেই স্বচ্ছতোয়া অববাহিকায় থাকতে চাই।
কবি শঙ্খ ঘোষ এই সেদিন এসেছিলেন। সমর সেন শতবর্ষ অনুষ্ঠানে। ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৬-এর শীত সন্ধ্যায়। এক পত্রিকার সম্পাদক তাঁর মুখবন্ধ বক্তব্যে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিলেন। সম্পাদক বললেন, ‘’সমর সেনের মত মানুষ চলে গেছেন। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় চলে গেছেন। আমাদের সঙ্গে আছেন শঙ্খ ঘোষ।‘’ পরে সভায় কিছু বলার জন্য কবিকে আহবান জানানো হল। তিনি এলেন। মুখে চপট গাম্ভীর্য। অথবা অব্যাক্ত অভিমান। নিশ্চয় নিজের জন্য নয়। বাংলা তথা ভারতের ন্যায়দণ্ডের জন্য। দেশের চেনা বিবকের খোজে। কতদিন কবি কথা বলেননি। স্বল্পবাক কবি কাশফুলের মত সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, শাল জড়িয়ে পোডিয়ামে এলেন। সমস্ত সভাঘর শব্দহীন। নিস্পলক নয়নে আমরা আলোআঁধারি মঞ্চে চেয়ে আছি কান খাড়া করে। তিনি অনেক কথা বলবেন। কোনও নতুন কথা পুরনো শব্দের ভাবগাম্ভীর্যে নতুন ছন্দে।  
শঙ্খ ঘোষ বললেন, ‘’সমর সেনের শতবর্ষে দীপেশ বক্তৃতা করবেন। আমাকে আহ্বান না জানালেও আমি চলে আসতাম। আপনাদের সঙ্গে দর্শক আসনে বসে দীপেশের কথা শুনতাম। সারা দেশে মনুষত্বের যে অবক্ষয় সেখানে সমর সেনের মত একজন মানুষের কথা আলোচনা হবে আমি আসব না? এটা কি হয়? প্রাণ শক্তিটা ফিরে আসুক।‘’
এই প্রজন্মের বাংলার তরুণদের তথা দেশের তরুণদের কবি আহ্বান জানালেন। তাঁর সেইসব দিনের চেনা পথ আমাদের চিনিয়ে দেওয়ার জন্য। সত্তর দশকের মাঝামঝি সময়। রক্তলেখায় বাংলার ইতিহাস, সাহিত্য, কবিতা নতুন ভাষা খুজছে। বাংলার জাগ্রত বিবেক গর্জে উঠেছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে। ভিয়েতনামের মানুষের মুক্তির দাবিতে। ফ্রান্সের ছাত্রদের উপর অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির দাবিতে। মাতৃভাষার গর্বিত অহংকারের পাশে এই বাংলার বিবেক। ওইসময় কবি শঙ্খ ঘোষ তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে বলেছিলেন, ‘’দলবদ্ধ হবার কোনও ইচ্ছে আমার নেইনিজের পখে সাধ্য যতটুকু ততটুকু করব।‘’ সম্ভবত সেই সময় তিনি আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে রবীন্দ্রনাথের ‘মেঘ ও রৌদ্র’ গল্পের কয়েকটি লাইন পড়েছিলেন। ‘’শশিভূষণ.........কহিলেন, ‘জেল ভালো। লোহার বেড়ি মিথ্যা কথা বলে না, কিন্তু জেলের বাহিরে যে স্বাধীনতা আছে সে আমাদিগকে প্রতারণা করিয়া বিপদে ফেলে.........।‘’ (ঋণ- শিলাদিত্য সেন)
ষাটের দশক থেকে যদি আমরা কবি শঙ্খ ঘোষকে দেখি তাহলে জানতে পারব তাঁর ধারাবাহিকতা। যেসব প্রাঞ্জ ব্যক্তিত্ব শঙ্খ ঘোষকে কাছ থেকে দেখেছেন বা দেখছেন তাঁরা আমার থেকে অনেক অনেক ভালো বলতে পারবেন কবির কথা। আমরা শেষ যে অধ্যায় জ্ঞানত দেখলাম সেটা ‘সিঙ্গুর- নন্দীগ্রাম’ পর্যায়। চার দশক পর বাংলা তথা ভারতের এক অবক্ষয়ের ছবি সমস্ত পৃথিবী সেই সময় দেখতে পেয়েছে। রাজনীতির ভাষা এবং কৌশল নিজ নিজ দল ঠিক করে। যেমন নীতিও সেই দল ঠিক করে। আমাদের আলোচনা সেই নীতি বা কৌশল নিয়ে নয়। এটা সেই পরিসরের আলচ্য বিষয় বস্তুও নয়। কিন্তু তখন অবুঝ মানবতার যে পদচারণা আমরা শুনেছি। তাঁর প্রতিবাদ করাটা সমস্ত বিবেকবান মানুষের দায়বদ্ধতা ছিল। শঙ্খ ঘোষ চুপ করে থাকেননি। প্রতিবাদে পথে নেমেছেন। বাংলার ‘পরিবর্তন’-এর এখানেই শেষ নয়। দল, মতাদর্শ সব কিছু কেমন যেন জবুথুবুকখনো কখনো উথাল পাথাল প্লাবনে ‘আমরা-ওরা’ সব মিশে যায়। দিনের আলোয় ‘আমরা-আমরা’, ‘ওরা-ওরা’ আলাদাসন্ধের পর আকাশের তারাদের আর চেনা যায় না। উত্তরের আকাশে যে তারা আজ দেখা যায় পরের দিন দক্ষিণের আকাশেও সেই তারা উজ্জ্বল ভাস্বর। সময়ের বিবর্তনে স্বার্থানেবষি মানুষ নিজেদের মঞ্চ খুঁজে নিয়েছে। সিঙ্গুর আন্দোলনের দশ বছর পর আজ গুটি কয় মানুষ একা। তাঁদের মধ্যে অন্যতম কবি শঙ্খ ঘোষ।

১৯৭৩ সালে মণীন্দ্র গুপ্ত এবং রঞ্জিত সিংহের যুগ্ম সম্পাদনায় ‘এক বছরের শ্রেষ্ঠ কবিতা ১৯৭২’ প্রকাশ হয়। প্রবীণ এবং তরুণ কবিদের কবিতা আছে ওই সংকলনে। শঙ্খ ঘোষের কয়েকটি কবিতা আছে। তারমধ্যে অন্যতম কবিতা ‘মূর্খ, বড়ো, সামাজিক নয়’- ‘’ঘরে ফিরে মনে হয় বড়ো বেশি কথা বলা হলো?/ চতুরতা, ক্লান্ত লাগে খুব?/’’ ..............................কবিতার শেষ স্তবকের তিন লাইন, ‘’যদি তাই লাগে তবে ফিরে এসো। চতুরতা, যাও।/ কী বা আসে যায়--/ লোকে বলবে মূর্খ বড়ো, লোকে বল্বে সামাজিক নয়। ‘’ (পৃষ্ঠা- ৯০ )                                                                     

Monday, 19 December 2016

সম্পাদক এবং রাজনীতি

সম্পাদক এবং রাজনীতি: 

দীপেন্দু চৌধুরী 
শীতের কলকাতায় ইতি উতি নানা অনুষ্ঠান। কোথাও সাংস্কৃতিক, কোথাও অ-সাংস্কৃতিক, কেউ কেউ সেমিনার করছেন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি। কিন্তু সেদিন ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৬ সন্ধে সাড়ে পাঁচটায় ‘ভারতীয় সংগ্রহালয় কলকাতা এবং ‘অনুষ্টুপ’ ’ এর নিবেদন ছিল ‘সমর সেন শতবর্ষ স্মারক বক্তৃতা ২০১৬’সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার এক অনুষ্ঠান। মানসিকভাবে কিছুটা সয়ে উঠতে পেরেছি বুঝে সেদিনের অনুষ্ঠানে চলে গিয়েছিলাম। অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে অনুষ্টুপ পত্রিকার সম্পাদক অনিল আচার্যকে একটা ফোন করে নিয়েছিলাম পূর্ব পরিচয়ের সুবাদে। সেদিনের অনুষ্ঠানের মূল বক্তা ছিলেন খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ, লেখক ও লরেন্স এ. কিম্পটন ডিসটিংগুইসড সার্ভিস অধ্যাপক, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র-এর দীপেশ চক্রবর্তী। বিশেষ অতিথি ছিলেন শঙ্খ ঘোষ এবং অনুষ্ঠানের সভামুখ্য ছিলেন নির্দেশক, সেন্টার ফর স্টাডিস ইন সোসাল সায়েন্সেস (কলকাতা) এর তপতী গুহঠাকুরতা। এদিনে বক্তব্যের বিষয় ছিল মানবিকতা, অ-মানবিকতা।
অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু সাদা চোখে ‘Humanism-in humanism’ বলেই মনে হয়েছিল আমাদের মত কম লেখা পড়া জানা আনপোড় বঙ্গজদের। অধ্যাপক দীপেশ চক্রবর্তী বলছেন, ‘’ মানবিকতা- যে চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ। আর অমানবিকতার কেন্দ্রেও রয়েছে মানুষ। সুনীল জানার ছবি মানবিক। দুর্ভিক্ষের সময় মৃত মানুষের দেহে মাংস নেই তবু খাচ্ছে একটা কুকুর। কুকুরটার দেহেও মাংস নেই।‘’ দীপেশবাবু আমাদের খুব কম কথায় ‘মানবিকতা এবং অমানবিকতা’ বুঝিয়ে দিলেন।
শুরুতেই ‘ফ্রন্টিয়ার’ পত্রিকার বর্তমান সম্পাদক তিমির বসু আমাদের মনে করিয়ে দিলেন সম্পাদক সমর সেনের হার না মানা লড়াইয়ের কথা। তিনি বললেন, ‘’বিপ্লব যখন নেই তখন ফ্রন্টিয়ার প্রকাশ করে কি হবে? এরকম মতামত আজও আছে। ফ্রন্টিয়ার কোনও ধারাবাহিক নিয়ম মেনে চলেনি। কেউ কেউ পড়ত। বিভিন্ন লেখা থেকে আমরা জানি তিনি কি কষ্টে পত্রিকা চালাতেন।‘’
আমার নিজের অভিঞ্জতাই বলতে পারি আমি দু’তিনবার আশির দশকে ‘ফ্রন্টিয়ার’ অফিস থেকে পত্রিকা নিয়ে এসেছি। দূর থেকে সমর বাবুকে দেখার সুযোগ হয়েছে। নিবিড় কৌতূহল থেকেই দেখতাম। সেই সময় অতি বামপন্থীদের কাছে সমর সেন খুব সম্ভবত কমিউনিস্ট এবং বিপ্লবী ছিলেন না। তাই তৎকালীন আমাদের বামপন্থী অভিভাবকদের নিষেধ ছিল ‘ফ্রন্টিয়ার’ পত্রিকা পড়া। যদিও সেইসব নেতৃত্ব আমাদের আড়ালে সম্পাদক সমর সেন কি লিখলেন সেটা তাঁরা পড়ে নিতেন।
মনে পড়ে ১৯৮৭ সাল। তখন বিভিন্ন গণসংগঠন এবং সাংবাদিকতা করার সুবাদে বামপন্থীদের কাছে আমার গ্রহণযোগ্যতা ছিল। সেই বছর খুব সম্ভবত লোকসভা এবং বিধানসভার নির্বাচন ছিল। আমি আমাদের নলহাটির বাড়িতে ছিলাম। একদিন কমরেড কানু সান্যাল আমাদের বাড়িতে এলেন। সারাদিন ছিলেন। মায়ের হাতের রান্না খেতে তিনি খুব ভালোবাসতেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। আমার পড়ার টেবিলে ফ্রন্টিয়ার দেখে জানতে চাইলেন, তুমি ফ্রন্টিয়ার পড়? আমি খুব ভয়ে ভয়ে বলেছিলাম, নিয়মিত নয়। তা ছাড়া আমি ইংরেজি ভালো বুঝিও না।
কানুদা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে পরে বলেছিলেন, ‘’একজন যোগ্য সম্পাদকের কাগজ ‘ফ্রন্টিয়ার’‘’ এই কথার প্রতিধ্বনি পেলাম অনুষ্টুপ পত্রিকার সমপাদকের বক্তব্যেঅনিল আচার্য বললেন, ‘’সমর সেনের মত একজন মানুষ ছিলেন বলেই আমরা উৎসাহ পেতাম। সমরবাবু বেঁচে থাকাকালীন শেষ পাঁচ সাত বছর ওনার বাড়িতে যেতাম। তখন কিভাবে পত্রিকা চালাতেন সেসব দেখেছি। সমরবাবু বলতেন, ‘আমি ভাবিনি মাছের তেলে মাছ ভাজতে পারব।’ ফ্রন্টিয়ার এতটাই জনপ্রিয় ছিল। অনেকের কাছে প্রশ্ন ছিল তিনি কি কমিউনিস্ট? তার উত্তর ছিল সম্পাদককে মার্ক্সবাদী হতে হয়না। নিজেকে কমিউনিস্ট হিসাবে গড়ে তুলতে হয়।‘’
অনিলদার কথার সূত্রে মনে পড়ছে সম্পাদক সমর সেনের সাংবাদিক এবং সম্পাদক হিসাবে ক্ষমতা   এবং উচ্চতার বিষয় বা তাঁর ঘরানা। কংগ্রেস এআইসিসির একটি বৈঠকে জওহরলাল লাল নেহরুর বক্তব্যের কিছুটা অংশ তিনি সংবাদ হিসাবে প্রকাশ করেছিলেন। সম্প্রতি ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য স্টেটম্যান’ পত্রিকায় ১৩ নভেম্বর তারিখে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয় তার কিছুটা অংশ এখানে উল্লেখ করলাম। সমর সেন কতটা সম্পাদক এবং সাংবাদিক ছিলেন?
‘’The autumn issue of Frontier, of which Samar Sen was the founder-editor, has appropriately been devoted to his centenary as a mark of profound respect for the man. 
The story goes that when Samar Sen was the Night Chief Sub-Editor of  The Statesman some time in the Fifties, the formidable Editor, George Arthur Johnson, had called up to be briefed on the day’s top stories. “I’m too busy,” was the almost astonishingly blunt retort from the gentleman in charge of the desk, marking an abrupt end to the Editor’s “night call”... during peak hour. When Johnson recounted his experience at next morning’s editorial conference, Lindsay Emerson immediately left the high table  and  drove down to Sen’s residence... to congratulate him on how he had cut the Editor off.                      
The autumn issue of Frontier, of which Samar Sen was the founder-editor, has appropriately been devoted to his centenary as a mark of profound respect for the man. Sad to reflect though, it has somehow missed such anecdotes as when he had hacked Jawaharlal Nehru’s address to the AICC session to one paragraph. It was a truly extraordinary career as poet, journalist — with AIR, The Statesman, Hindusthan Standard, and then as editor of  Now — not to forget his career as translator in Moscow and eloquent sympathies  for the Left radicals. The striking feature of his working life being that it was a brief stint wherever he went, including an advertising agency.  A brilliant student, he had distinguished himself as a poet, though it remains a mystery to this day as to why he gave up writing poems.  It is a  mystery that the contributors to the centenary edition — notably Sumanta Banerjee — have not been able to fathom for Sen reserved the right not to answer  the puzzling question — Why? Overall, his career both as a journalist and more importantly as poet is testament to his somewhat restless and non-conformist temperament, preferring to live and work on his terms, abjuring the conventional and the populist. His poems were extraordinary, of a calibre that many writers would be proud of, but few able to claim.  This is the fine print of the commemorative issue — he had distinguished himself and in a remarkably self-effacing manner long before “lit fests” ,  book fairs and book “launches”  became sales-promotion programmes and fashionable diversions for the urbanite.’

অনুষ্টু স্ম্র সেন সংখ্যায়, ১৯৮৮ তে প্রকাশিত সুম্নত বন্দ্যোপাধ্যায় 'সিমান্ত পেরিয়ে' শিরোনামে লিখছেন, 

''আনন্দবাজা‌রের' পাতায় তখন দৈ‌নিক দেশপ্রে‌মিকতার বাণী বার হ‌চ্ছে; উৎকট স্বা‌দে‌শিকতার আগুন ঝর‌ছে l একদিন সমরবাবু প‌ত্রিকার তৎকালীন মা‌লিক অশোক সরকা‌রের ঘ‌রে গি‌য়ে বই-এর তাক থে‌কে Dictionary of Quotation-এর ক‌পি বার ক‌রে পড়‌ছেন l অশোকবাবু জি‌জ্ঞেস কর‌লেন--"‌কি ব্যাপার সমরবাবু? কি খঁুজ‌ছেন?" নি‌র্বিকার মু‌খে সমরবাবু জবাব দি‌লেন--"‌দেখ‌তে এসে‌ছিলাম Dr. Johnson আস‌লে কি লি‌খে‌ছি‌লেন-- Patriotism is last resort of Scoundrels, না first resort of Scoundrels."
- সুমন্ত ব‌ন্দোপাধ্যায় , 'সীমান্ত পে‌রি‌য়ে' , অনুষ্টুপ , সমর সেন সংখ্যা,১৯৮৮


অধ্যাপক দীপেশ চক্রবর্তী খুব সম্ভবত এই প্রাসঙ্গিকতা মনে রেখেই সেদিন বললেন, ‘’আমি সাহিত্যের মানুষ নই। সমর সেনের সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করি সেই সামর্থ আমার নেই। সমর সেনের কবিতা আমরা বন্ধুরা ন্যাশন্যাল লাইব্রেরি থেকে ফেরার পথে আবৃত্তি করতাম। আজ মনে হচ্ছে ওর বাড়ির সেদিনের আড্ডাগুলিতে যদি আমি থাকতে পারতাম। অথবা ওর বাড়ির আড্ডাটা এই সেমিনারে যদি নিয়ে আসতে পারতাম। যে অবস্থান থেকে লেখার ফলে সরোজ দত্তের সঙ্গে ওর মুখোমুখি আলোচনা হয়েছে‘’ দীপেশ আমাদের মনে করিয়ে দেন বিদেশে থাকার জন্য তাঁকেও ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ হয়ে গেছেন এমনটা শুনতে হয়। কিন্তু তবু অধ্যাপক দীপেশ চক্রবর্তী বলেন ‘’কলকাতা আমার আত্মা। আমি চল্লিশ বছর সাদাদের দেশে আছি। কিন্তু কলকাতায় এলে আমার ঝগড়া হয়। আত্মীয়-ঞ্জাতি ছাড়াতো ঝগড়া হয় নাতাই কলকাতা আমার আত্মা। বাংলা আমার আত্মীয়। তবু শুনতে হয় দীপেশ এখন প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে গেছে। গদ্যের প্রকরণ এবং গদ্যের চরিত্রের জন্যই আপামর স্থানিক একটা ব্যপার থেকে যাবে। যেটা গায়ত্রী স্পীভাকের বইয়ে আমরা পেয়েছি। যারা ভাবেন তাঁরা আত্মজীবনীর বাইরে সমাজের কথা বলতে চান।‘’
তিনি তার অ-অনুকরণীয় ভাষায় বলেন, ‘’সমরদা জানতে চাইলে একটা গল্প বলতাম। বিশ্বায়নের গল্প। বিশ্ব উষ্ণায়নের গল্প। কিয়োটো চুক্তির কথা বলতাম। তখন আমেরিকা রাজি হয়নি। এই উষ্ণায়ণ বিষয়গুলিকে ধনতন্ত্রের সংকট বলেই ধরা হয়। মাত্র কয়েকটি দেশ গ্রীন হাউস গ্যাসের জন্য দায়ি। মানুষের জন্য যে সাহায্য করে তার একটা ধান্দা আছে। এই চিন্তায় ‘ফুকো’ মার্কস সাহায্য করে। ‘New Temple of Modernization’- নেহরু, নাসেররা ভাবতেন। বাঁধ তৈরি। ষাটের দশকে আলোচনা হত এরপর কি হবে? যদি প্রাপ্তি শেষ হয়। ১৯৭৮-৮১ তে ফুকো বলছেন, কান্ট মানুষ এবং পৃথিবীকে পর্যাপ্ত দিয়েছেন ঠিকইকিন্তু এগুলি রাজনীতির বিষয়। ফুকো বলছেন ‘বাইয়ো পলিটিক্স’ ‘’

সেদিন অন্য কাজ থাকাই আমি শেষ পর্যন্ত সভাঘরে থাকতে পারিনি। যে বিষয় নিয়ে দীপেশবাবু বলছিলেন সেই বিষয়ে একটি প্রবন্ধ আমরা আগে পড়েছি। ‘বারোমাস’ পত্রিকার বড়দিন ২০১৪ সংখ্যায় তাঁর তাত্তবিক প্রবন্ধ ‘মানুষের যুগঃ অ্যানথ্রোপোসিন’ সম্ভবত এই বিষয়গুলি ছুঁয়ে যায়।                   

Tuesday, 13 December 2016

বাংলার মাটি বাংলার মেধা

বাংলার মাটি বাংলার মেধা

দীপেন্দু চৌধুরী 

এই লেখাটি লেখার জন্য প্রাক প্রস্ততি ছিল না। একদম হঠাত লিখতে বসা। কিছুটা নিজের সীমাবদ্ধতা টপকে। কলকাতা প্রেস ক্লাবের বাঞ্ছিত সদস্য না হয়েও বর্তমানে সাংবাদিক সম্মানে মেল পাই আমার বিতর্কিত ই-মেলের ঠিকানায়। আজ (১৩ ডিসেম্বর ১৬) সকালেও এমনি একটি চিঠি বা আমন্ত্রণ লিপি দেখে এই লেখার সূচনা। প্রেস ক্লাবের বর্তমান সম্পাদকের আমন্ত্রণি মেলের ভাষা ছিল ‘’This is to inform you that the U.S. Ambassador to India Mr. Richard Verma will participate at a meet the press programme at the press club, Kolkata, on 14 December 2016, (Wednesday) at 4 P.M.
I would like to request you to kindly attend the program.’’ 
প্রথমেই মনে করা যাক খুব সম্ভবত বছর তিন চার পর আবার কলকাতা আসছেন ভারতে নিযুক্ত কোনও মার্কিন রাষ্ট্রদূত। যদিও ২০১১ সালে তৃণমূল প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন মার্কিন বিদেশ সচিব হিলারি ক্লিন্টন মহাকরণে এসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।  আপনাকে অভিনন্দন মাননীয় রিচার্ড বর্মা সাহেব। আপনি আসছেন নির্দিষ্ট এজেন্ডা এবং পরিকল্পনা নিয়ে। এমন একটা সময়ে আপনি কলকাতায় আসছেন যখন ভারতে ‘এফডিআই’ বিতর্ক শেষে ‘জিএসটি’ বিতর্ক বিদ্যমান। ভারতীয় অর্থনীতির সংস্কারে যেটা আবশ্যিকভাবেই প্রয়োজন। ইউপিএ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংহ-এর পথ নির্দেশিকা মেনে আধুনিক ভারত আজ আরও আধুনিক হওয়ার দাবি নিয়ে বিশ্বের দরজায় কড়া নাড়ছে। যার সূচনা করেছিলেন কংগ্রেস শাসনাধীন আরও এক প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। রাজীব গাঁধির হাত ধরেই আমরা ভারতে আধুনিক ‘টেলিকম প্রযুক্তি’ চিনি।
বর্তমানে কালো অর্থনীতির বোলবোলা বন্ধ করতে নেওয়া হয়েছে নোট বাতিলের মত সাহসী এক পদক্ষেপ। ‘ক্যাশলেস ইন্ডিয়া’ নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক না থাকলেও ‘ক্যাশলেস ভারত’ নিয়ে রয়েছে বিস্তর চাপানউতোর। বিশেষত সময়কাল সঠিকভাবে নির্ধারণ না হওয়া নিয়ে বিতর্ক। এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের হয়রানি নিয়েও সংবাদ মাধ্যমে চলছে আলোচনা। সংসদের চলতি অধিবেশন শুরুই হয়েছে টানটান উত্তেজনা দিয়ে। বিশেষঞ্জদের অভিমত ‘ডিজিটাল ভারত’ হোক। এসব নিয়ে আপত্তি নেই কিন্তু প্রস্তুতি ছাড়া এই রকম সিদ্ধান্ত কিছুটা তাড়াহুড়ো হয়ে গেল না? প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তথা খ্যাতনামা ভারতীয় অর্থনীতিবিদ ডঃ মনমোহন সিংহ বলেছেন, এই সিদ্ধান্তের জন্য আমাদের খেসারত দিতে হবে। এই বিষয়টা যদি জাতীয় হয় আন্তর্জাতিক সময়টা নিয়েও ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। আপনার নিজের দেশে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। নতুন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে শিল্পপতি। তাই আশা করা যায় গত কয়েক দশক আর্থসামাজিকভাবে অবহেলিত পশ্চিমবঙ্গ সহ উত্তর পূর্ব ভারতকে তিনি গুরুত্ব দেবেন। ঠিক বিদায়ী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যে দূরদৃষ্টি নিয়ে ভারতকে দেখেছেন আমরা জানি আমাদের দেশে ইউপিএ সরকার কলকাতাকে কেন্দ্র করে ‘লুকইস্ট পলিসি’ তৈরি করেছিল। সেই নীতির বর্ধিত পলিসি বর্তমান এনডিএ সরকারের ‘অ্যাক্টইস্ট’ পলিসি।
আধুনিক ভারত উত্তর আধুনিক হয়ে উঠছে। সারা বিশ্বের সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনায় আমরা বিশ্বাসের সঙ্গে উচ্চারণ করতে পারি আমাদের তরুণ প্রজন্ম তৈরি নতুন ভারতের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য। যে কথা ১৮ জানুয়ারি ২০১৩ তে আমাদের মনে রাখার কথা বলেছিলেন কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গাঁধি। তিনি বলেছিলেন, ‘’নতুন, পরিবর্তিত ভারতকে চিনতে হবে। যে ভারতে নবীন প্রজন্মের সংখ্যা বাড়ছে। তুলনায় যাঁরা আগের থেকে অনেক বেশি শিক্ষিত। সামাজিক পরিবর্তনের জন্য তাঁদের আকাঙ্খা, অসহিস্নুতা এবং চাহিদাও তাই বেশি।‘’
কংগ্রেস সভানেত্রী সময়টা বেছে নিয়েছিলেন ২০১৩ সালে কংগ্রেসের চিন্তন শিবিরের উদ্বোধন মঞ্চএই চিন্তন শিবির থেকেই ভারতীয় তরুণ প্রজন্মের কাছে রাহুল গান্ধিকে তুলে ধরা হচ্ছে। রাহুল গান্ধিকে সহ-সভাপতি করে আনুষ্ঠানিক সিলমোহর দেওয়া হয় ওই মঞ্চে।
এশিয়া মহাদেশে ভারতের গুরুত্ব অপরিসিম। বিশেষত চিন নামক একটি দেশের আধুনিক বাজার অর্থনীতির সঙ্গে তুলনায়। মার্কিন বিদেশ নীতির তাত্ত্বিক খাতায় ইতিপূর্বে বিষয়টি নিশ্চয়ই গুরুত্ব সহকারে আলোচনা হয়েছে। ২০১৫ সালের ১৯ এপ্রিল ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে পুনঃ প্রকাশিত New York  Times, News Service এর Jonathan Weisman এর লেখা খবরে ছিল, ‘’Experts say that is giving rise to a more chaotic global shift, especially toward China, which even Obama administration officially worry is extending its economic influence in Asia and elsewhere without following the higher standards for environmental protection, worker rights and business transparency that have become the norms among western institutions.
…………………President Obama told ‘’The fastest-growing markets, the most populous markets, are going to be in Asia, and if we do not help to shape the rules so that our business and our workers can compete in those markets, then China will set up the rule that advantage Chinese workers and Chinese businesses.’’
ভারতের গুজরাট নামক একটি অঙ্গরাজ্য উদার অর্থনীতির সুযোগকে ধারাবাহিকভাবে কাজে লাগিয়ে ২০১৫ সালে ‘ভাইব্রান্ট গুজরাট’ বা ‘চনমনে গুজরাট’ শিরোনামে একটি মহা সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে প্রস্তুতির পরে গুজরাট নামক রাজ্যটি দেশের অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে তুলনায় শিল্পায়নে এগিয়ে থাকলেও সমাজ উন্নয়নে সমানতালে এগতে পারেনি এমনটাই দাবি বিরোধী দল, সংবাদ মাধ্যম এবং সমাজ কর্মীদের।  
সংবাদ সংস্থা সূত্রে খবর ২০১৫ সালের সম্মেলনে ১২টি সহযোগী দেশের রাষ্ট্রনেতা ও ১০০টি দেশের শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। এই সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী গুজরাটের ভূমিপুত্র নরেন্দ্র মোদী বিশ্ব ব্যাঙ্কের প্রধান জিম ইয়ং কিমকে মনে করিয়ে দিয়ে  বলেছিলেন, ‘’শেষ বার নয়াদিল্লি সফরে এসে আপনি জানিয়েছিলেন এ দেশে লগ্নির প্রক্রিয়া সরল করতে হবে। সরলীকরণের ক্ষেত্রে ভারত এখন ১৫০ –এর ও নীচে। তার উন্নতি দরকার।‘’ পরে প্রধানমন্ত্রী যোগ করেন, ‘’আমি কথা দিচ্ছি , পুরনো জমানা শেষ। এ বার আপনারা এক কদম এগোলে আমরা দু’কদম এগিয়ে আসব। আসুন এদেশে বিনিয়োগ করুন।‘’
গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, কর্ণাটক, কেরল রাজ্যের সঙ্গে পশিমবঙ্গের তুলনা  চলে না। কারণ সেই পুরনো কাসুন্দি। অবহেলিত পূর্ব ভারতের প্রধান রাজ্য আমাদের বাংলা। এই বাংলার মাটিতে সবুজ শস্য ফলে। বাংলার নরমমাটি, বাংলার জলবায়ু সৃষ্ট প্রকৃতি অতিথি বাৎসল্য। ফুলে ফলে আমরা উন্নতি করলেও ‘শিল্পায়ন’ নামক শব্দটি আমাদের কাছে অপরিচিত ছিল। ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের জমানার পর থেকে। বামফ্রন্ট সরকার তাঁদের শাসনকালের শেষ পাঁচ বছর ‘শিল্পায়ন’-এর জন্য উদ্যোগ নিলেও বিভিন্ন বিতর্কে সেই প্রচেষ্টা আটকে যায়। বর্তমান তৃণমূল সরকার মাত্র তিন বছর ‘শিল্প সম্মেলন’ করছে। রাজ্য সরকার সূত্রে খবর গত দু’বছরে রাজ্যে প্রস্তাবিত বিনিয়োগ আনুমানিক ৫ লক্ষ হাজার কোটি টাকা মাত্র। এমন একটা সময়ে আমাদের রাজ্যে ভারতে নিযুক্ত আমেরিকার বর্তমান রাষ্ট্রদূত রিচার্ড বর্মা আসছেন। আপনাকে নতুন করে মনে করিয়ে দেব আমাদের এই বাংলা শিল্পে পিছিয়ে থাকলেও রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র,রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায়, রামকিঙ্কর, অমর্ত্য সেন এবং মাদার টেরেজার বাংলায় মেধার অভাব নেইবরেণ্য ব্যক্তিত্ব জগদীশ চন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, মেঘনাথ সাহা যে বাংলার ভিত গড়ে দিয়ে গেছেন আমরা আজও সেই ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আছি। এই বাংলার মাটি এই বাংলার মেধা আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
আমরা জানি প্রতিরক্ষা, বিমান, ওষুধ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ সহ খুচরো ব্যবসার ক্ষেত্রে বিদেশি লগ্নির দরজা কার্যত খুলে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় শর্তও তুলে দেওয়া হয়েছে। এইসব কারণে ‘অ্যাপল’ সহ একাধিক সংস্থা নিজস্ব বিপণি খুলতে পারবে। এছাড়া ভারতে তাঁদের পণ্য তৈরি করতে পারবে। আধুনিক ভারতের এই মানচিত্রে বর্মা সাহেব পশ্চিমবঙ্গ থাকবে আশা করি। কারণ ১ জুলাই, ২০১৬, সালের প্রভাতি সংবাদ মাধ্যমে খবর ছিল, ‘’কলকাতা শহরের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক বহু দিনের। ভৌগলিক অবস্থানের বিচারে এ রাজ্যের গুরুত্ব তাঁদের কাছে অনেক। এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর আতিথেয়তায় তাঁরা মুগ্ধ। সুতরাং এ রাজ্য এবং রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে ধারাবাহিক ভাবে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলার বার্তা দিয়ে গেলেন মার্কিন বিদেশ দফতরের রাজনীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি থমাস এ শ্যানন।‘’
সেদিনের সকালের দৈনিক খবরের কাগজে আরও ছিল। নবান্নে এক ঘণ্টার বৈঠক শেষে শ্যানন বলেন,  ‘’ভারত মার্কিন সম্পর্ক এখন শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে। কলকাতা নিয়েও মার্কিন প্রশাসনের দারুণ আগ্রহ রয়েছে। ১৭৯২ সালে এই শহরে প্রথম মার্কিন দূতাবাস তৈরি হয়েছিল।‘’
ঔপনিবেশিক ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সময় থেকে আমেরিকার সঙ্গে আমাদের এই বাংলার নিবিড় আর্থ-সামাজিক সম্পর্ক আছেউচ্চশিক্ষিত বাঘা বাঘা সব বাঙালি আমেরিকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে আছেন। তাঁদের সান্নিধ্যে আমাদের এই বাংলার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ক্ষেত্র সহ নারী এবং শিশুদের কল্যাণে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়ার জন্য বাংলার আপামর মানুষ আপনাদের পথ চেয়ে বসে আছে। আপনারা স্মার্ট সিটি গড়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিন। পাশাপাশি উত্তর আধুনিক বাংলা গড়ে তুলতে আধুনিক শিক্ষার মাধ্যমে আপনাদের একান্ত প্রতিবেশি রাজ্যটির মনন গড়তে সাহায্য করুন ভারতে নিযুক্ত বর্তমান মাননীয় মার্কিন রাষ্ট্রদূত রিচার্ড বর্মা মহাশয়, এই দায়িত্ব নেওয়ার জন্য আপনাকে এবং নতুন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প মহাশয়কে অনুরোধ জানাচ্ছি।                                                                              

    

Friday, 9 December 2016

এপথ কাঙাল নয়

এপথ কাঙাল নয়
এপথ কাঙাল নয়। মুক্তি আছে বলেও থেমে থমকে গেছি সেদিন। মাছেরা বড় আদরণীয়। মাছেদের সংখ্যা গুনতে আছে নাকি? পিঁপড়ের লম্বা লাইন আজ হেথা থাকে। অন্যথা হলেই অন্য কোথাও চলে যেতে চায়। ক্লান্তিহীন ওই লম্বা ‘লঙমার্চ’ এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে চায় এমন বাপের সাহসী পুত্তুর কজন খুঁজে পাওয়া যাবে? আজকের উত্তর বিশ্বায়ন ঝা চক চকে আধুনিক সভ্যতায়? বানরের গলায় মুক্তোর মালা দেখে অমন ‘মছলিবাবার’ মত করে চেয়ে আছ কেন? ভোগের জৌলুস চিনতে চাইবে না। তথাকথিত ত্যাগের কাহন শোনাতে চাইবে! তুমি ঘর কা না ঘাটকা হে নটবর? টিকিহীন সভ্যতার গল্পকথা স্বগর্বে চার ছয় হাঁকানোর মত করে আর কতদিন চটকাবে? এটা কি ‘তেঁতুলতলা যাবার ৩৩ নম্বর বাস? না ‘চেতলা যাওয়ার ডবল ডেকার’? কতদিন কলেজস্ট্রীটের শরবত খাওনি? কতদিন কফি হাউসে হুলো বেড়াল হয়ে বসতে পারছ না? ওই পাড়ার লিটলম্যাগ পড়তে চাইছ কেন? মাগগি গন্ডার ঞ্জান বাজারে তুমি কে হে? তর্পণ করার বই চেন না অর্থশাস্ত্রের ব্যকরণ খুঁজছ? ভালো জামার জন্য এখন গড়িয়া যাও না গড়িয়াহাট? মনে করতে পারবে নাটাটা করে ‘বাটা’ ভুললে কবে? যেদিন থেকে আট আঁটকুড়ে হলে? তোমার জামায় ঝোলানর জন্য ন্যাজ আছে? মানে টাই আছে? ধর্মতলার নিউ মার্কেটের সুখ্যাত এবং বিখ্যাত ‘নিউইয়র্ক’ দোকানটি আজ আর নেই। থাকলেই বা কি? তোমার কাছে সামাজিক কার্ড আছে? মোদীজীর মত চওড়া কাঁধ আছে? মমতাদির মত ভিন ভাষার রাজ্যে রাজ্যে ছুটে বেড়ানোর ‘হাওয়াই চপ্পল’ আছে? ‘সংসদে মুখ খুললে আমি ভূমিকম্প’ করে দেব।’ এটা আমার কথা নয় রাহুলজীর কথা। কি ভাবছ? রাহুলজী ছেলে মানুষ? এখনও এইসব ভাবার মত চওড়া বুক আর চওড়া মাথা তোমাদের আছে? কাজু খেতে চাইছ কেন? দিল্লিতে কাজু পাওয়া যায় না। দূষণ একটা কারণ হতে পারে। কিন্তু আমি জানি ‘কেজরিবাল’জি একাই দিল্লির ‘কাজুকিসমিস’। এপাশে সীতারাম ওপাশে ডেরেক বাম। দুঃখিত। বাম মানে ব্যাথা বা যন্ত্রণা উপশম করার কথা কেউ বলছে না। যে মানুষটা বুদ্ধি উপচে সাধারণ ঞ্জানের ডালি সাজিয়ে কত সভাঘর ঘুরেছেন, সেই ব্যক্তিটি কম বয়সে কালো চুল সাদা করে ব্যাটিং করবেন না বোলিং করবেন ঠাউর করতে পারছেন নানা বস ঘাবড়ালে হবে না। সামিয়ানা ভাব্বেন সেটা নোট আকালেও থাকবে জোট আকালেও থাকবে। ছোট আমের জন্য পেতে পারেন আবার বড় বড় কমলালেবু, আপেল, ন্যাসপাতির জন্যও এক আনা দু আনা চিনে চিনে ঢুকে পড়লে কে আর আটকায় বস? ফকিরের কথায় দুঃখ কষ্ট পেলে মলিন হ্রদয় সাবলীল করতে সত্যি সত্যি তিন সত্যি প্লাস মাইনাস বাম লাগিয়ে নেবেন। কেমন জানেন? আমার অভিভাবক হুতোম বলে ‘সাদা গোলাপে কেউ রক্ত লাগালেই কি রক্ত লেগে যাবে? গোলাপ কাঁটা জড়িয়েই নিজেকে আলিঙ্গন করে।’ পাগলা হাওয়া কে দমকা খ্যাপাটে আগুন্তুক মনে হয় আমাদের। 

সারস্বত সাধনায় সাগরের ঢেউ মন্থর গতি থেকে সময়ে সময়ে একটা উচ্চতায় যায়। ধংস প্রলয় লয় সৃষ্টি। যেমন আমাদের সংসদ আছে। সংসদীয় আদব কায়দা মেনে বা চিনে সব সাংসদ চলতে চায়। কেউ ভোলেনি চলতি কা নাম গাড়ি। সেই গাড়ি চালাতে ডেবিট কার্ড লাগে না। ক্রেডিট কার্ড কি লাগে?                                                                  

Wednesday, 7 December 2016

হাটকথা

হাটকথা
কি করে নোট আকালে হাটবি তুই?
কি করে জোট আকালে
খুঁজবি পথ?
জয়তু ‘রুপিয়া কার্ড’।
বাজার দেখে বাজার চিনে
হাটছে দেখ ওই ভিখারি,
পৌষ-পাবণের পালায় পালায়—
ছাদনাতলার মালায় মালায়—
কি করে নোট আকালে
হাটবি তুই?
কি করে জোট আকালে
খুঁজবি পথ?
‘কাক তাড়ুয়া’ দাঁড়িয়ে থাকে—
একলা মানুষ?
এই শহরে আর খুঁজব কত রঙ্গিন ফানুস?
ভাঙ্গছে বোধ! মূল্য কত?
‘বাবুঘাটে’ ঘুরছে দেখ পণ্য ফুল।
আর হেসনা, আর কেঁদনা—
পাবে পাবে অন্য পথে
আর ভেবনা ঘনঘোর এই সন্ধ্যায়,
কার্ড এসেছে বৌ বাজার বাবু বাজারে
যাত্রা গানের কাব্য গাঁথায়!
তবুও বলছি আমি, বলতে হয়
এই শহরে আর খুঁজব কত
রঙিন ফানুস?
কি করে নোট আকালে
হাটবি তুই?