Sunday, 17 June 2018

ভাষা ভাঙা গহন সমাজেও তিনি আলোর পথিক


দীপেন্দু চৌধুরী  
এই শতাব্দীর বাংলা ভাষার পাঠক এবং দেশ বিদেশের অন্যান্য ভাষার পাঠকের কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কতটা গ্রহণযোগ্য? সোশ্যাল মিডিয়ায় রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে কতটা আলোচনা হয়? হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক সহ সোশ্যাল  মিডিয়ায় এই প্রজন্ম হলিউড, বলিউড, টলিউড নিয়ে যতটা ব্যস্ত থাকেন, সেই তালিকায় রবীন্দ্রনাথ কতক্ষণের জন্য আসেন? আদৌ আসেন কি? প্রশ্নটা আঁতেলদের সভায় উঠলেও এখনও রবীন্দ্রবুদ্ধিজীবীদের কাছে উঠছে না। ২১ এপ্রিল কলকাতা শহরে একটি অভিজাত বুকস্টলে এই বিষয় নিয়ে একটি মনোঞ্জ আলোচনা হয়। ওইদিনের আলোচনার বিষয় ছিল ‘How to read Tagore & why?’
এইদিনের আলোচনায় অধ্যাপক সৌরীন ভট্টাচার্য প্রথমেই উল্লেখ করলেন তাঁর এক শিক্ষকের কথা। তারপর সভার উদ্দেশ্যে সৌরীনবাবু বলেন, ‘’তাকের থেকে বই নামিয়ে রবীন্দ্রনাথ পড়ে ফেলতে হবে।‘’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য নিয়ে অভিযোগ, বর্তমান তরুণ প্রজন্ম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য নিয়ে কতটা আগ্রহী? আমাদের অভিঞ্জতা বলছে সাধারণ কবিরা সময়ের নিয়মে কিছুদিন পর একদিন হারিয়ে যান। স্থান কাল সময়ের উর্ধে যেসব কবি নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেন তাঁরা মহাকবির সম্মান লাভ করেন এবং স্থান হয় সেই দেশের স্কুল কলেজের পাঠ্যপুস্তকে। বিশ্বে এই উচ্চতার কবি সাহিত্যকদের সংখ্যা অত্যন্ত কম? কতজনের নাম আমরা বলতে পারি? সেই সব প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিরা তাঁদের জন্মের একশো দু’শো বছর পরেও বর্তমান কালের সঙ্গে তুল্যমুল্য বিচারে টিকে যায়। তাঁদের লেখার এতটাই সার্বজনীন আবেদন থাকে যে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। সমসাময়িক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের রচনা পড়তেই হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই উচ্চতার আসনে উপবিষ্ট  রয়েছেন। যাকে বাদ দিয়ে বাংলা কাব্যের কোকিল গান গাইবে না। যাকে বাদ দিয়ে গ্রীষ্মের প্রখর সূর্য হাসবে না। তাঁকে আড়ালে রেখে দিলে বর্ষায় ময়ূর ময়ূরী পেখম তুলে নাচবে না। বুলবুলি পাখি শীষ দেবে না। রবীন্দ্রনাথের গান না শুনলে ভোরের আজানের সময় পাখিদের গুঞ্জন আমরা শুনতে পাব না।
পুরো বিংশ শতাব্দী জুড়ে তিনি ছিলেন স্বমহিমায় প্রাক স্বাধীনতার সময়ে আবার উত্তর স্বাধীন রঙিন ভারতের স্বতঃস্ফূর্ত আঙ্গিনায়। রবীন্দ্রনাথ শুধু আমাদের দেশে নয় বিশ্ব সাহিত্যেও এক অনন্য নাম। সাধারণত সারা বছর আমরা রবীন্দ্র গান, নৃত্যনাটক নিয়ে ব্যস্ত থাকি। কিন্তু বাংলা নববর্ষ থেকে ২৫ বৈশাখ পর্যন্ত এপার বাংলা ওপার বাংলায় কবিপক্ষের সময়। তারপরেও আরও এক মাস চলতে থাকে কবিপক্ষের বর্ধিত অনুষ্ঠান। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাঙালির নস্টালজিয়া, আবেগ, সাজ সাজ উৎসব অসীম আকাশে গিয়ে মিশেছে। তবু শেষ নেই পথের। শেষ কোথায় বাঙালি তথা সারা বিশ্ব খুঁজে ফিরছে। ক্ষ্যাপা বাউল যেমন ঘর খোঁজে, আখড়া খোঁজে, দর্শন খোঁজে। আমরা রবীন্দ্রনাথের কাছে আশ্রয় খুঁজি। তিনি কোথায় নেই? সামাজিক আন্দোলন সেখানেও রবীন্দ্রনাথ। সমবায় আন্দোলন করতে ডাক দিয়েছিলেন নিজেদের রাজ্যপাটের প্রজাদের কাছে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভারতীয় ঘরানায় গড়ে তুলতে আশ্রমিক ছায়ায় গড়ে দিয়ে গেছেন ‘বিশ্বভারতী’ নামক এক বিশ্ববিদ্যালয়। শান্তিনিকেতন নামের আশ্রয়ে ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয় স্থাপন করে শিশু কিশোর মনে মূল্যবোধ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
আজ নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করা যায় ভাষা ভাঙা গহন সমাজেও তিনি আলোর পথিক। ২১ এপ্রিল কলকাতা শহরে হাজির ছিলেন প্রবাসের বাঙালি প্রকাশক ‘নিয়োগী বুকস’। রবীন্দ্রনাথকে বিষয় করে এই সংস্থা মোট ছ’টা বই প্রকাশ করে সেদিন। রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে বাঙালি এবং অবাঙালি পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। বিশবকবির লেখা ছ’টা বই ইংরেজি অনুবাদে মাত্র একমাসে পড়ে ফেলার মত ঔদ্ধত্য আমার কোনওদিন ছিল না। কোনওদিন হবেওনা। প্রকাশক সংস্থার সহযোগিতায় আমরা তিনটে বইয়ের বিষয়সূচি একটু নেড়েচেড়ে দেখতে পারি। আমার নিজের অবস্থান এক্ষেত্রে ‘বামন হয়ে চাঁদ ছোঁওয়া’-র মত। বই পড়তে না পারলেও প্রচ্ছদ থেকে যেটা পাচ্ছি। রবীন্দ্রনাথের পত্রাবলিও একটি পৃথক সাহিত্যের দাবি রাখে। এখনও পর্যন্ত যত চিঠি আমাদের সামনে এসেছে সেগুলি থেকে আমরা একটা সমাজের সেই সময়কার সামাজিক পরিস্থিতি, জীবনবোধ, পারিবারিক টানাপড়েন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট জানতে পারি। রবীন্দ্রনাথের চিঠি প্রসঙ্গে যারা গবেষণা করেছেন সেইসব গবেষকদের লেখা থেকে এই পাঠ আমরা খুঁজে নিতে পারি। এই বইটিও অত্যন্ত সময়পোযোগী বই। অত্যন্ত যত্ন এবং মুন্সিয়ানার সঙ্গে বইটি প্রকাশ করা হয়েছে।      
নিয়োগী বুকস প্রকাশিত বই,  ‘Glimpses of Bengal select letters 1885-1895 Rabindranath Tagore, Tagore special: Sadhana, The realization life.’ রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এই বইয়ের প্রচ্ছদে লেখা হয়েছে, ‘’Sobriquet Gurudev, was a Bengali polymath who reshaped Bengali literature and music, as well as Indian art with contextual Modernism in the late 19th and early 20th Centuries. Author of Gitanjali and its ‘’Profoundly sensitive, fresh and beautiful verse.’’ He became the first non-european to win the Nobel Prize in Literature in 1913. He is sometimes refered to as ‘The Bard of Bengal.’’
নিয়োগী বুকস প্রকাশিত পরের বইটি ‘The Post Office: Rabindranath Tagore Translated from the Bengali original by Devabrata mukherjee.’ ভূমিকা লিখেছেন নির্মলকান্তি ভট্টাচার্য।
‘It is the most enigmatic and the most liberating of Tagore’s plays. Post office is the most translated of Tagore’s plays in european languages. A polish teacher in a Nazi concentration camp staged the polish version of the young students, all of whom along with him were to be sent to the execution chamber.
The post office (Dak Ghar) is a 1912 play by Rabindranath Tagore. It concerns Amal, a child confined to his adopted uncle’s home by an incurable disease. It was written four days. Amal stands in Madhav’s courtyard and talks to passers-by, and asks in particular about the places they go. The construction of new post office nearby prompts the imaginative Amal to fantasize about reading a letter from the King promising that his royal physician really does come, with a herald to announce the imminent arrival of the King; Amal however, dies as Sudha comes to bring him flowers. W.B. Yeats was the first person to produce an English play; he also wrote a preface to it. The Bengali original was staged in Calcutta 1917.  
 ডাকঘর গল্পের কথা রবীন্দ্রনাথের পাঠক মাত্রেই জানে। যেটাকে পোস্ট মাস্টার বলেও পাঠকরা জানেন। বিশ্ব বরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় ‘তিন কন্যা’ ছবির একটি গল্প ‘পোস্ট মাস্টার’ থেকে নিয়েছিলেন। এই গল্পের অভিব্যক্তি আমাদের শৈশবকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। যে ভাষায় লেখা হোক দু’টো শব্দ আমাদের জন্য যথেষ্ট। ‘রবীন্দ্রনাথ এবং ডাকঘর’। কতগুলি বিষয় হিসেবে ভেঙে নেওয়া যায়। একটি গল্পের মধ্যে ‘রাজার অসুখ’-র মত উপ গল্পের খোঁজ পায় পাঠক।
নিয়োগী বুকসের পরের বইটির প্রচ্ছদ কথা পড়লাম। ‘জীবনস্মৃতি’-র অনুবাদ। আমাদের সময়ে স্কুল কলেজে পাঠ্য বই হিসেবে আমরা পড়েছি। এই বইয়েও রাজা জমিদার বাড়ির ছেলেমেয়েদের একাকিত্ব কতটা একক তথা নিবিড় হতে পারে সেটা আমরা বুঝতে পারি। ‘জীবনস্মৃতি’ গভীর মনযোগ দিয়ে পড়লে পরতে পরতে রবীন্দ্রনাথের শৈশব-কৈশোর উন্মোচন হতে থাকে। ‘’Jibonsmiriti, was translated into English by Tagore’s nephew, Surendranath Tagore, though retouched and slightly changed by Rabindrnath himself. It was serialized in Ramananda Chattopadhyay's. The Modern Review under the little My Reminiscences from January to December 1916. To thwart the attempt by any foreign publisher to publish it, all the issues of the Modern review carried the declaration, ‘All Rights Reserved. Copyrighted in the United States of America’. Interestingly, Rabindranath himself advised Ramananda Chattopadhyay to mail one copy each of the issues of The Modern Review carrying My Reminiscences to W.B. Yeats and Earnest Rhys in April 1917, it was published as a book by MacMillan, New York, with a color portrait by Sasi Kumar Hersh as the frontispiece, apart from 12 paintings by Gagnendranath Tagore.
This book Rabindranath has etched in words many of his primary experiences about his future poetry, plays and novels, A surging for being one with Nature, a sense of imagination filled solitariness even in the midst of a crowed, a consciousness of the concrete and yet non-recognition of its weight— all these aspects of the book inform his later creation. In the sense.
 এই বইটিরও ভূমিকা লিখেছেন নির্মলকান্তি ভট্টাচার্য। জীবনস্মৃতি বইয়ের একটা অংশের কিছুটা পড়ছি, ‘’দুধ খাওয়া আমার আর আর-এক তপস্যা ছিল। আমার পিতা প্রচুর পরিমাণে দুধ খাইতেন। আমি এই পৈত্রিক দুগ্ধপানশক্তির অধিকারী হইতে পারিতাম কি না নিশ্চয় বলা যায় না। কিন্তু পূর্বেই জানাইয়াছি, কী কারণে আমার পানাহারের অভ্যাস সম্পূর্ণ উল্টাদিকে চলিয়াছিল। তাঁহার সঙ্গে বরাবর আমাকে দুধ খাইতে হইত। ভৃত্যদের শরণাপন্ন হইলাম। তাহারা আমার প্রতি দয়া করিয়া নিজের প্রতি মমতাবশত বাটিতে দুধের অপেক্ষা ফেনার পরিমাণ বেশি করিয়া দিত।‘’ ( পৃষ্ঠা- ৬২, জীবনস্মৃতি, প্রকাশক বিশ্বভারতী, ১৯৭৪)
জীবনস্মৃতির একটা টুকরো অংশ পড়লে আমাদের বিশ্বাস আরও গভীর তাৎপর্য পায়। বর্তমান সময়ের মানদণ্ডে দাঁড়িয়ে এই বইটি ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ করে নিয়োগী বুকস একটা বড় দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে বলা যায়।
এই প্রকাশনা সংস্থার শেষ বইটি আমারা বেঁছে নিচ্ছি, বইটির নাম ‘রিরিডিং টেগোর’। লেখক অমিয় দেব। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাস নিয়ে আমার উন্মাদনা আরও অনেকের মত। এই উপন্যাসে মুখ্য চরিত্র ‘গোরা’ যখন তার আসল পরিচয় জানতে পারে তখন তার চর্চিত জ্ঞান, বিশ্বাস, উপলব্ধি সবকিছু খান খান হয়ে যায়। অমিয় দেব ‘গোরা’ প্রসঙ্গে লিখছেন, ‘’ইজ নট জাস্ট আ কোর্স অব ইভেন্টস অ্যান্ড ইটস সাবজেক্ট-অবজেক্ট- এজেন্সি, বাট অলসো ইটস প্লেস, ইজ প্রুভড বাই গোরা টু অ্যাজ বাই মেনি আদার মডার্ন ‘এপিকস’।‘’ এই বইয়ে আরও একটি উপন্যাস নিয়ে অমিয় দেব আলোচনা করেছেন। বইটি ‘যোগাযোগ’। যোগাযোগ উপন্যাস আমি আশির দশকে পড়েছি। একবার পড়েই ভালো লেগে গিয়েছিল। সামাজিক গল্প হিসেবে। কিন্তু গল্পের ঠাস বুনোট আমাদের ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে পুঁজিবাদের দ্বন্দ। দিগন্তস্পর্ধিত স্পর্ধায় এগিয়ে আসছে সেই ধনতন্ত্র। নতুন অর্থনীতি। যেটা আমরা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসে পাই। বা সেই সময় কল্লোল গোষ্ঠীর লেখকদের ‘কয়লা কুঠির’ গল্পে পাই। বইটির ভূমিকায় লেখা হয়েছে, ‘’Re reding Tagore: Amiyo Dev. This is a reader’s book. It looks at Tagore through his texts. It reads his novels Gora and Jogajog indepth, and Char Adhay as a crusible of our times.’’ অমিয় দেব ২১ এপ্রিল নিজের বক্তব্য রাখার সময় বেছে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রযুগের সামাজিক প্রেক্ষাপট। তার বক্তব্য আমাদের রবীন্দ্র সাহিত্যের পরম্পরা বুঝতে সাহায্য করে।
রবীন্দ্রনাথ নিজেকে নিয়ে কোনওদিন খুব কিছু ব্যস্ত হয়ে পড়েননি সম্ভবত। তাই আত্মপ্রচার থেকে দূরত্ব বজায় রাখতেন। কিন্তু স্বদেশের প্রশ্নে সমঝোতা করেননি কোনওদিন। করতে চাননি কোনওদিন। তার স্বদেশপ্রেম থেকে আমরা জানতে পারি নিজের দেশ নিয়ে তার গর্ব, অহংকার ছিল নিজের উচ্চগর্মি আভিজাত্যের মতই। তিনি বিদেশে সুয়েজ খালের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় বর্ণনা করেছেন, ‘’আমাদের সেই রৌদ্রতপ্ত শ্রান্ত দরিদ্র ভারতবর্ষ, আমাদের সেই ধরাপ্রান্তবতি অপরিচিত বিস্মৃত নিভৃত ছায়াস্নিগ্ধ নদীকলধ্বনিসুপ্ত বাংলাদেশ, আমাদের সেই অক্রমণ্য গৃহপ্রিয় বাল্যকাল, আমার ভালোবাসা-লালায়িত কল্পনাক্লিষ্ট যৌবন, আমার নিশ্চেষ্ট নিরুদ্যম চিন্তাশীল অতিব্যথিত জীবনের স্মৃতি এই সূর্যকিরণে এই তপ্তবায়ু-হিল্লোলে সুদূর মরীচিকার মতো আমার স্বপ্নভারনত দৃষ্টির সামনে জেগে উঠছে। আমি প্রাচ্য, আমি আসিয়াবাসী, আমি বাংলার সন্তান, আমার কাছে য়ুরোপীয় সভ্যতা সমস্ত মিথ্যে।‘’
নিজের দেশ, সেই দেশের ভাষা, সংস্কৃতি, লোকাচার, কৃষ্টি নিয়ে কতটা গভীরতা থাকলে নিজের সময়কালকে এইভাবে কজনে বিচার করতে পারে? রবীন্দ্রনাথ এতটাই নির্ভীক ছিলেন। নিয়োগী বুকস যে ছ’টি বই সম্প্রতি প্রকাশ করেছেন। ২১ এপ্রিল আলোচনাসভায় অন্যতম বক্তা ছিলেন অধ্যাপক সোমদত্তা মণ্ডল। সোমদত্তা বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যলয়ের অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ এবং অন্যান্য আধুনিক ইউরোপিয়ান ভাষার প্রধান। তিনি বলেন, ‘’Though not written as a travelogue, the experiences of this trip are nareted by the poet in his book of reminiscences, entitled Jibansmriti, On 20 September 1878, he accompanied his brother Satyendranath and sailed to England for the first time. He was 17 years old then and traveled by train from Itali through Paris to London. We get glimpses of his trip from the letters he wrote home, which were later published under the title ‘Yurop Prabasir Patra (Letter from a Sojourner in Europe). সোমদত্তার বক্তব্য থেকে আমরা মাত্র ১৭ বছর বয়সের রবীন্দ্রনাথের জীবনের গভীরতা সম্পর্কে জানতে পারছি। যে কথা রবীন্দ্রনাথের পত্রসাহিত্য প্রসঙ্গে আমরা উল্লেখ করেছি।
রবীন্দ্রনাথ উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামঝি সময়ে একাধিকবার ইউরোপ আমেরিকা গেছেন। আমেরিকা আজও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পৃথকভাবে গবেষণা করছে। চলতি বছরে ৩মে আমেরিকান সেন্টারে একটি আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়েছিল। অবশ্যই রবীপক্ষ উপলক্ষে। আমন্ত্রণপত্রের ভাষায়, ‘’A brief History of Tagore plays in the U.S. Professor Ananda Lal, academic and theater critic will examine the possible reasons for the paucity of theater productions of Tagore’s plays in the U.S. সেদিনের আলোচনায় উঠে এসেছে আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথের নাটকের প্রভাব। বর্তমান আমেরিকায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সংস্কৃতি চর্চা এবং বিনিময়ের জন্য ভারতের মত ধ্রুপদী সংস্কৃতির দেশকে বেঁছে নিয়েছে মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের সংস্কৃতি সচেতন নাগরিক। কলকাতা আমেরিকান সেন্টার সূত্রের খবর, সেদিনের আলোচক অধ্যাপক আনন্দলাল রবীন্দ্রনাটকের মত বিষয়ে মতবিনিময় করেন অভিজাত লিঙ্কন সভাঘরে। অনেক অজানা তথ্যের সন্ধান পাই আমরা রবীন্দ্রআগ্রহী দর্শক শ্রোতারা।
সম্প্রতি রবীন্দ্র বিষয়ক আরও একটি অনুষ্ঠান আমরা দেখলাম। ১৫ জুন এই অনুষ্ঠান কলকাতা আমেরিকান সেন্টারের লিঙ্কন সভাঘরে আয়োজন করেছিল ‘ইন্দো-আমেরিকা হিস্টোরিকাল সোসাইটি’। ‘জাগো নব রবী কিরণে’ শিরোনামে আয়জিত অনুষ্ঠানটিতে ছিল রবীন্দ্র নৃত্যনাট্য। আমেরিকান সেন্টার আমন্ত্রণপত্রে উল্লেখ করেছিল, ‘Jago Nabo Rabi Kirone: Awake to the New Sun, The U.S. consulate General Kolkata invites you to the dance-drama Jago Naba Rabi Kirone: Awake to the new sun a production based on Tagore’s cultural visit to the U.S.
অত্যন্ত উচ্চ মানের রবীন্দ্রনৃত্যনাট্য পরিবেশন করে এষা গোস্বামী ডান্স ট্রুপ। এবং রবীন্দ্রসঙ্গীতে ছিল সাহিলা পাঁজার সঙ্গীত এবং বাচিক শিল্পী গোষ্ঠী।                                                                            

Thursday, 14 June 2018

চতুস্পাঠি নয় ঠান্ডা ঘরে বসে কবি বিদ্যাপতির কথা শোনালেন বিদেশী গবেষক

দীপেন্দু চৌধুরী 

বিশ্বায়ন উত্তর ভারতে আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে তরুণ-তরুণীরা কতটা আগ্রহী? সারা রাজ্য আধুনিক মধ্য শিক্ষিত যুবসম্প্রদায়কে নিয়ে গবেষণা করলে কি দেখা যাবে? বিশ্বায়নের আশীর্বাদ হিসেবে আমরা যে উন্নত ঘরানার তথ্য-প্রযুক্তি পেয়েছি, সেই প্রযুক্তির দৌলতে বর্তমান প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা আমাদের থেকে অনেক বেশি আধুনিক। তারা যেমন পোশাকে নতুন ভাষা এনেছে, নতুন রঙ এনেছে, চেহারায় পালিশ চক চক করছে। খাদ্যাভাসেও আমাদের থেকে লোভ অনেক কম। শারীরিক ভারসাম্য মেনে চলা যায় এমন খাদ্য তারা পছন্দ করে। শারীরিক ভাষায় সব সময় চনমনে, গতিশীল। এরপরেই আসছে কথ্য ভাষা। হিন্দি, বাংলা, ইংরেজিকে ককটেল করে একটা নতুন ত্রিবেণী সংগম। কখনও বলিউড, কখনও টলিউডের সিনেমা থেকে টুকরো শব্দ। অথবা ওইসব ছবির জনপ্রিয় সংলাপের একটা দু’টো শব্দ বাক্যের সংমিশ্রণে আধুনিক ভাষা তাঁদের মুখে।
বর্তমান সভ্যতায় এই ভাষা ‘জলচল’ হয়ে গেছে। আমি সেকেলে বুড়ো হয়ে যাইনি। অথবা সব কিছু চলে গেল বলে হা হুতাশ করছি না। কারণ রক্ষণশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সেদিন বিদেশী গবেষককে প্রথম প্রশ্নটা করেছিলাম এই বিষয়টা জানতে চেয়ে। আমার প্রশ্ন ছিল, ‘হারিয়ে যাওয়া একটা বিষয়। তথা জনপ্রিয় নয় এমন একটা ভারতীয় বিষয় নিয়ে আপনি গবেষণা করছেন? আমাদের দেশে ‘সংস্কৃত ভাষা’ প্রায় মৃতপ্রায়। আমরা জার্মানের দিকে তাকিয়ে রয়েছি। আপনি সেই ভাষার এক কবিকে নিয়ে গবেষণা করছেন?’
বিদেশী ভদ্রলোক আমার প্রশ্নের উত্তরে পরিষ্কার বাংলায় বললেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন। গত কয়েক দশকে ভারতে সংস্কৃত ভাষাচর্চা প্রায় নেই বললেই চলে। আমি আগ্রহী ছিলাম মৈথিলী কবি বিদ্যপতির বিষয়ে। কবি বিদ্যপতিকে নিয়ে গবেষণা করতে গেলে সংস্কৃত ভাষা জানতেই হবে। তাই এই ভাষা শিখে নিলাম।‘’
আমরা আলোচনা করছি আমেরিকা থেকে কলকাতা শহরে আসা ক্রিস্টোফার ডায়ামন্ডকে নিয়ে। ১৩ জুন আমেরিকান সেন্টারে একটা অনুষ্ঠান হয়ে গেল। অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু ছিল পঞ্চদশ শতাব্দীর কবি বিদ্যাপতি এবং তার মৈথিলী ভাষায় লেখা কবিতা। সংস্কৃত ভাষায় অন্যান্য লেখার বিষয়েও। কবি বিদ্যাপতির সাহিত্যের প্রভাব সেই সময় এবং পঞ্চদশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে কতটা পড়েছিল? আমন্ত্রণ পত্রে ছাপা হয়েছিল, ‘Fulbright-Nehru fellow Christopher Diamond for a discussion about the influence of 15th Century poet Vidyapati on Bengali literature and culture.’  আমাদের আলোচ্য গবেষক সম্পর্কে আরও যেটা জানা যায়, Christopher Diamond Ph.D. Candidate-Fulbright-Nehru Fellow with the dept. of Jadavpur University, South Asian Languages and Literature, University of Washington-Seatle, USA    
মৈথিলী কবি বিদ্যপতির নামের তর্জমা করলে পাওয়া যাচ্ছে ‘বিদ্যা’ অর্থে ঞ্জান। ‘পতি’ শব্দের মানে শিক্ষক। বিদ্যপতি একটি সংস্কৃত শব্দ।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারছি ‘বিদ্যাপতি’ (১৩৫২-১৪৪৮) নামেই তিনি শুধুমাত্র পরিচিত ছিলেন না। তাঁকে ডাকনামে আদর করে ডাকা হত মৈথিলী ‘কবি কোকিল’ নামে। তিনি মূলত ছিলেন মৈথিলী কবি এবং সংস্কৃত ভাষার জনপ্রিয় লেখক। বিদ্যপতি জন্মগ্রহণ করেন ভারতের অবিভক্ত বিহার রাজ্যের মধুবনী জেলার মিথিলা অঞ্চলের ‘বিস্ফি’ গ্রামে। তিনি মারা যান সমস্তিপুরে। বিদ্যপতির পিতার নাম ছিল গণপতি ঠাকুর। কবি বিদ্যপতির রচিত কবিতা, পদ্য, পদাবলী পঞ্চদশ শতাব্দীতে ‘হিন্দুস্তানি’, বাংলা, মৈথিলী ভাষার লেখক, কবি সাহিত্যকদের মধ্যে ব্যপক প্রভাব ফেলে। প্রচ্ছন্নভাবে হলেও নেপালী ভাষা এবং পূর্বভারতীয় সাহিত্যের ধারায় এই প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ‘কাঁহা হরব দু’খ মোর’?   
বাংলা সাহিত্যে কবি বিদ্যপতির কাব্যের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। রাধাকৃষ্ণের প্রেমকে বিষয় করে তৎকালে বাংলা কাব্য রচনা করা হত। মধ্যযুগীয় সময়ে বাংলা কাব্যের ধারা শিল্পজাত হয়ে উঠতে থাকে। ষোড়শ শতাব্দীতে আমরা পাই ‘ব্রজবুলি’ ছন্দ বা ঘরানা। মধ্যযুগের মৈথিলী থেকে মূলত ‘ব্রজবুলি’ পৃথক ছন্দ বা ধারা হিসাবে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে। মধ্যযুগের বাঙালি কবি গোবিন্দদাস কবিরাজ, কবি ঞ্জানদাস, কবি বলরাম দাস এবং কবি নরোত্তম দাস তাঁদের কবিতায় বা কাব্যে ‘ব্রজবুলি’ ছন্দ ব্যবহার করেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ (১৮৮৪) লেখেন ‘ব্রজবলী’ ছন্দে। বাংলা ভাষায় কবি বিদ্যাপতির লেখনীর প্রভাব কতটা পড়েছিল সেটা আমরা বুঝতে পারি দিকপাল এইসব কবি সাহিত্যিকদের ছন্দ বা পদাবলীতে ‘ব্রজবুলী’ ঘরানা। উনবিংশ শতাব্দীর বাংলা রেনেসাঁর অন্যতম পথিকৃৎ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘ব্রজবুলী’ ভাষা বা ছন্দ ব্যবহার করেছিলেন। ইউরোপেও এই ছন্দের প্রভাবের কথা শোনা যায়।
এদিনের আলোচনা সভায় আমরা প্রথমে দেবকী বসু পরিচালিত বাংলা বিদ্যপতি সিনেমার ক্লিপিংস দেখি। পাহাড়ি সান্যাল অভিনীত সবাক যুগের ছবিটি দেবকী বসু নির্মাণ করেন ১৯৩৪ সালে। পর্দায় স্লাইড শোয়ের মাধ্যমে আমাদের সামনে বিদ্যাপতি বিষয়ক গবেষণা পত্রের বিষয়গুলি তুলে ধরেন বিদেশী গবেষক ক্রিস্টোফার। Inventing the Vidyapati Tradition: Lyric poetry and Memorialization in Mithila and Bengali Literature.
2.3 Malla in Nepal
Dates: 1360-1450CE?
Brahrun-Smata Courtier to Oinvara Court of Trihut works in 3 Languages.
Nepal as ‘’refuge’’ for politically turbulent Tirhut.
Malla Dynasty [c.1201-1769], especially Three Kingdom period.
বিষটাকে তিনি গুলে খেয়েছেন। ক্রিস্টোফার আরও জানালেন, বিদ্যপতির লেখা ১০০ পাতার খসড়া ১৯৩৬ সালে উদ্ধার করে নেপাল সরকার সংগ্রহশালায় রেখেছে। এক শ্রোতার প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরও বলেন, ‘’আমি বাংলাদেশ যাইনি। এবারের সফরে ঢাকা যাওয়া সম্ভব হল না। তবে কলকাতায় আমার গবেষক বন্ধু এবং শিক্ষকদের কাছে শুনেছি বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য পরিষদের সংগ্রহে বিদ্যাপতি সম্পর্কিত অনেক তথ্য রয়েছে।‘’
ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় সুভদ্র, সুশিক্ষিত ক্রিস্টোফার জানালেন, তিনি ১০ মাস আগে কলকাতায় গবেষণার কাজে এসেছেন। হিন্দুস্থান পার্কে থাকতেন। চলতি সপ্তাহে তিনি আমেরিকা ফিরে যাবেন। গত বছর দুর্গা পুজোর আগে কলকাতায় এসেছিলেন। তাই ১০-১৫টা দুর্গা মণ্ডপ দেখেছেন। বাঙালির সেরা উৎসব দুর্গা পুজোর মণ্ডপগুলি তিনি পায়ে হেঁটে ঘুরে ঘুরে দেখেন। বাংলার উৎকর্ষ, বাঙালি সংস্কৃতি, বাংলার কৃষ্টি, লোকাচারকে তিনি কলকাতা এসেই চিনতে শুরু করেন। তিন বছর আগে এই বিষয় নিয়ে ক্রিস্টোফার কাজ শুরু করেন। এশিয়া তথা ভারতের একটা লুপ্তপ্রায় ভাষার বিষয়ে আগ্রহ কেন হল?
বক্তিগত আলাপ চারিতায় ক্রিস্টোফার বললেন, ‘’আমি আমেরিকান সঙ্গীত ভালোবাসতাম। আমেরিকান লিরিক, সঙ্গীত থেকে ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের খবর পাই। শুনতে থাকি। আমার ভালো লাগে। তারপরেই আমি সংস্কৃত এবং বিদ্যপতি বিষয়ে আগ্রহী হয়ে পড়ি। প্রথমে হিন্দি শিখতে ইংল্যান্ডে যাই। লন্ডনে থেকে হিন্দি শিখি। পরে বাংলা তারপর সংস্কৃত। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৮ মোট ১১ বছরের জার্নি।‘’
তিনি বর্তমানে অনুবাদের কাজ শুরু করেছেন। সংস্কৃত, বাংলা, হিন্দি, মৈথিলী মোট চারটে ভাষায় ‘বিদ্যাপতি-এর পদাবলী অনুবাদ করছেন। পরে এই অনুবাদগুলি থেকে বই প্রকাশ করবেন। অনুবাদের জন্য বিদেশী গবেষক এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সাহায্য নিয়েছেন। ঘুরেছেন বাংলার নবদ্বীপ, বিহারের মিথিলা জেলা সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য। এবং নেপালের কাঠমান্ডু সহ কয়েকটি স্থানে। আমাদের মনে হল ‘বিদ্যাপতি’-কে নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তিনি নিজেও প্রভাবিত হয়ে পড়েছেন। অত্যন্ত সুভদ্র হাসি এবং ব্যবহারে আমরা ১৩ জুন আমেরিকান সেন্টারের লিঙ্কন সভাঘরের ঠাণ্ডা ঘরে তাঁকে পেলাম।              
স্লাইড শোতে দেখতে পেলাম ভারতের মধুবনী, নেপালের গবেষণা বিষয়ক তথ্য। এবং আমাদের বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতিতে ‘রাধাকৃষ্ণ’-এর প্রেম তথা বৈষ্ণব পদাবলী বা চৈতন্য যুগ। সে সম্পর্কে ক্রিস্টোফার বিস্তারিত আমাদের বললেন। তার কাছ থেকে জানতে পারলাম বিহারের মিথিলা অঞ্চলে বিদ্যপতির প্রভাব ব্যপক। স্থানীয় মানুষ তাঁকে ভগবানের মত পুজো করেন। হোরি খেলিছে ব্রজবাসি।                  
     

Sunday, 10 June 2018

সহিংস নয় একুশ শতাব্দীর কলম হোক অহিংস



দীপেন্দু চোধুরী
কিছুদিন আগে কলকাতা প্রেস ক্লাবে বিঞ্জানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে একটি আলোচনাসভায় ক্লাবের বিদায়ী সভাপতি তথা  বিশিষ্ট সাংবাদিক স্নেহাশিষ সুর তার বক্তব্যে বলেন, ‘’আমরা কলকাতা প্রেসক্লাবকে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তুলতে চাই। এখানে শুধুমাত্র সংবাদ মাধ্যমের কর্মীরা আসবেন এমনটা নয়। সমাজের বিভিন্ন বিষয়ের বিশিষ্টজনেরা আমাদের ক্লাবে আসবেন মত বিনিময় করবেন।‘’
বিদায়ী সভাপতির এই আহ্বান আমরা প্রত্যক্ষ করেছি ২০১৭-২০১৮ সংবাদ-সংগঠনের আর্থিক বছরের অনুষ্ঠানসূচীর মাধ্যমে। গত একবছর আমাদের ক্লাবে যে সব অনুষ্ঠান হয়েছে। সবগুলির মধ্যেই ছিল নতুনত্বের স্বাদ। নতুনের স্পর্শ। নববস্ত্রের আহ্বান। নব ফাল্গুনের গুঞ্জন। নতুন শব্দ-ভাষার আল্পনা। পলাশ সিমুল ফুলের গন্ধহীন আভিজাত্যের আহ্বান জানিয়েছে এই বছরের প্রেসক্লাব পরিচালন সমিতি। এরমধ্যে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য বিষয়, রাজ্য সরকারকে বুঝিয়ে অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের জন্য কিছুটা আর্থিক সুরাহা করা। দুর্দশাগ্রস্ত সাংবাদিকদের জন্য পেনশনের ব্যবস্থা। গত বিদায়ী কমিটির ক্লাবের সম্পাদক কিংশুক প্রামাণিক এবং সভাপতি স্নেহাশিস সুরের নেতৃত্বে এক নতুন চৌকাঠ তৈরি করেছে।          
আমরা মনে করতে পারি ভারতে উনবিংশ শতাব্দীর রেনেসাঁর সময় যেমনটা ছিল। অথবা তারও আগে রাজা রামমোহন রায় ‘ব্রাহ্ম সমাজ’-এর ছাদপেটাই করা খিলান দেওয়া আভিজাত্যের সভাঘরে সকলকে আহ্বান করতেন। সমাজের উন্নয়নের জন্য। নতুন নাগরিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য। সবধর্মের সবশ্রেণীর মানুষ এসে সেই মতবিনিময় সভায় হাজির হতেন। নিজেকে সমৃদ্ধ করতে। অপরকে আপন করে নিজের উপলব্ধ ঞ্জান অন্যের সঙ্গে বিনিময় করার প্রয়াস নিয়ে। আমরা রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাস পড়লে এই সত্য খুঁজে পাই। গোরার মিথ্যে অহংকার, ছদ্ম অহং এক সময় ভেঙে খান খান হয়ে হয়ে যায়। ‘গোরা’ উপন্যাসে স্বদেশপ্রেম তথা ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার যে সামাজিক ছবি সেদিন বিশ্ববরেণ্য লেখক আমাদের সামনে হাজির করেছিলেন সেই চিরসত্যের সন্ধান আমি আজও করি। গোরা একদিন অনুভব করেছিল স্বদেশপ্রেম যখন আমাদের সামনে স্বাভাবিকভাবে দেখা দেবে, তখন ‘সে আমার ধন প্রাণ, আমার অস্থিমজ্জা, রক্ত আমার আকাশ-আলোক, আমার সমস্তই অনায়াসে আকর্ষণ করে নিতে পারবে।’ স্বদেশের ‘সেই সত্যমূর্তি যে কী আশ্চর্য অপরূপ, কী সুনিশিচত সুগোচর, তার আনন্দ তার বেদনা যে কী প্রচণ্ড প্রবল’ হয়ে এসেছিল। আমার অনুভবে আজও ‘গোরা’ আমাদের পথ চিনতে সাহায্য করতে পরে।            
প্রেসক্লাবের এই বছরের নির্বাচন হয়ে গেল। ৯ জুন নির্বাচনের পরে পুনর্বারের জন্য স্নেহাশিষ সুর সভাপতি এবং কিংশুক প্রামাণিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। ৯ জুন শনিবার নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরে যে বাৎসরিক সাধারণ সভা হল সেখানেও বিষয়টা উঠে এল। আমরা সদ্য নির্বাচিত সভাপতির সঙ্গে গলা মিলিয়ে উচ্চচারণ করলাম সংবাদ মাধ্যম হচ্ছে সমাজের অভিভাবক। এই মাধ্যমের একজন সম্পাদক, সাংবাদিক, ডেস্কের কর্মী, এবং মালিক সকলকেই ভাবতে হবে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের উর্ধে উঠার কথা। বলতে হবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা।
আমার নিজস্বতা বলতে তেমন কিছু আছে কি? মধুর খোঁজে গ্রাম সভ্যতার আল ভেঙে। আল পথ ধরে হেঁটে রেল লাইন টপকে, পায়ে হেঁটে পায়ে হেঁটে অপু-দুর্গার দেখানো কাশবনের একফালি পথ চিনে চিনে কালো ধোঁয়ার কলকাতায় এসেছিলাম। ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’-র করালির খেটো ধুতির ছায়া দেখে দেখে। ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের ‘চিতাহ্নিমান’ উপন্যাস পড়েই কলকাতায় এসেছিলাম। অমলেন্দু চক্রবর্তীর ‘গোষ্ঠ গোপাল’-এর খোঁজে। আশাপূর্ণা দেবীর ‘সত্যবতী’-র সঙ্গে যদি দেখা হয়। অথবা ‘কালবেলা’-র অনিমেষকে যদি খুঁজে পাই। আশির দশক সেটা। সাংবাদিকতায় হাতে খড়ি সেই ১৯৭৮ সালে।
আমাদের জেলা বীরভূমে দু’টি প্রথমসারির সাপ্তাহিক সংবাদপত্রে আমার সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি। গরিব ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান আমি। যে কোনও ঠাকুরদালানের সামাজিক অনুষ্ঠানে স্বভাব লাজুক সংস্কৃতির প্রথা মেনে শেষের সারিতে বসে থাকতে অভ্যস্ত আমি। দলিত সমাজের প্রতিনিধি হিসাবে নিজেকে এর জন্য গর্বিত মনে করি। নাগরিক কলকাতায়, নাগরিক সাংবাদিকতায় আজও আমি উদ্বৃত্ত। আমি নিজেকে মনে করি আমি সংবাদ মাধ্যমে ‘দ্বাদশ ব্যক্তি’। উচ্চ শিক্ষিত, অভিজাত এবং মাখন খাওয়া সম্পাদকের দলের কেউ অসুস্থ হলে কয়েকদিনের জন্য আমাদের মত কলমচিদের ডাক পড়ে। অনেকটা বোসে বোসে ‘বাংলা দাঁড়াতে শিখল’ প্রবাদের মত। আমি আজও বসে বসে হামাগুড়ি দিচ্ছি। একটু আলো দেখার জন্য। নিজের কথা আরও বেশি বললে একটা সময় ‘ঠাকুরমার ঝুলি’-র কথা ভুলে যাব। ‘সোনার কেল্লা’-এর কথা ভুলে যাব। হুতোম বলে সামনের ভাঙা আয়নায় পিছন ফিরে মুখ দেখবি। যখন ট্রেন যাবে তখন ভাঙা আয়নাটা কাঁপবে। যেমন উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন অভিনিত বাংলা স্বর্ণ যুগের ছবির পরিচালক আমাদের ‘সপ্তপদী’ ছবিতে দেখিয়েছেন। ফিরে দেখা যে আবেগে অনুভূত কম্পন নেই। আত্মসমালোচনা নেই, সেই আবেগ স্থায়ী হয় না।     
মেঘে মেঘে বেলা হয়েছে। ২৩৭ বছর আমরা পার হয়ে এলাম।  প্রেসক্লাব যথার্থভাবেই প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীকে সংবর্ধনার দিনে একটি তথ্যসম্বলিত (আলোচ্য বিষয়ক) পুস্তিকা প্রকাশ করেছে। বইটির চাহিদা তুঙ্গে। এই বছরের কলকাতা বইমেলার প্রেসক্লাবের স্টলে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পরিলক্ষিত করেছি। পাশাপাশি ২৯ জানুয়ারি এই বিষয়ে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল প্রেসক্লাব। আমরা ই-মেল সহযোগে যে আমন্ত্রণপত্র পাই তার বয়ান ছিল, ‘’Press Club, Kolkata organizes Commemoration of 237th Anniversary of publication of First News Paper in India. Speaker: Prof. Subir Ghosh, Principal, Asutosh College of ‘Communication & Management and formerly of The Statesman & Hindustan Standard. 
ভারতে প্রথম সংবাদপত্র ‘হিকির গেজেট’ প্রকাশের পরের সময়গুলি নিয়ে ওইদিন আলোচনা করেন সুবীরবাবু এবং আরও কয়েকজন বিশিষ্ট প্রবীণ সাংবাদিক। আমন্ত্রণ জানান হয়েছিল কলকাতা বিশবিদযালয়ের সংবাদ বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের। এবং মিজোরামের কয়েকজন সাংবাদিক সম্পাদক ওইদিনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন।      
‘হিকির গেজেট’ প্রকাশের পর এতগুলি বছর আমরা জ্ঞানের আলোয়, ধারালো কলমের খোঁচায়, আধুনিক ‘কি বোর্ডে’-র মসৃণ স্পর্শে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের ভাষায় বদল এনেছি। বদল এনেছি প্রকৌশলে। সংবাদ পরিবেশনের গভীরতায়, আফিসের আঙ্গিকে, ব্যঙ্গচিত্রের পরিভাষায়, ডিজিটাল শব্দ, অক্ষর ছবির গতিশীলতায়। এরপরেও এই একুশ শতাব্দীর চৌকাঠে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছে, বর্তমান আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় সংবাদ মাধ্যম কতটা স্বাধীন? কতটা সহনশীল? সহকর্মীদের প্রতি কতটা স্পর্শকাতর? অথবা কতটা পরশ্রীকাতর?  কতটাই বা প্রতিহিংসাপরায়ণ? আজকের এই নিবন্ধে কারও প্রতি অভিমান থেকে নয়। গত এক দশকের ভারত তথা বাংলার সংবাদ মাধ্যমের কর্মরত সাংবাদিক এবং সংবাদ মাধ্যমের সাধারন কর্মীদের আর্থ–সামজিক ছবিটা পর্যালোচনা করলে আমরা সংবাদ মাধ্যমের দায়িত্ব এবং স্বচ্ছতা বিষয়ে আরও সচেতন হয়ে উঠার দাবি জানাতে পারব।
গত দু’তিন বছরে আমাদেরকে কয়েকজন সাংবাদিকের শোকসভায় যেতে হয়েছে। প্রেসক্লাব আয়োজিত এই শোকসভায় আমরা ম্লান মুখে শোকাহত হয়ে বসে থেকেছি। যে সহকর্মীরা চলে গেলেন তাঁদের এত তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার কথা কি ছিল? আর্থ সামাজিক পরিস্থিতি তাঁদের কোন পর্যায়ে নিয়ে গেল? ওরা কেউ কি ‘ফেক নিউজ’ করেছিলেন? ওরা কেউ কি সত্যের জন্য সাংবাদিকতা করেছিলেন? তবে কেন ওরা আর চাকরি পাচ্ছিলেন না। সংগঠিত অথবা অসংগঠিত কোনও সংবাদ মাধ্যমের টেবিলে? ওরা কি চিহ্নিত হয়ে গেছিলেন? ‘আমরা-ওরা’ নামক তথাকথিত শব্দবন্ধের রাজনৈতিক ঘুল-ঘুলাইয়ায়? বিগত দু’ই দশকে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকায় সংবাদ মাধ্যমে কালোটাকার অনুপ্রবেশ কিভাবে ঘটেছে সেই ছবি আজ আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। কালোটাকা বিনিয়োগের সব থেকে নিরাপদ আধার হচ্ছে সংবাদ মাধ্যম। ‘আধার কার্ড’-এর থেকেও সংবাদ মাধ্যমের কার্ডের শক্তি অনেক অনেক বেশি। ভারতে সংবাদ মাধ্যমে কালো টাকা অনুপ্রবেশের পরে এপর্যন্ত কতজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন? কতজন সাংবাদিক মারা গেছেন? গত ৩ মে ছিল ‘World Press Freedom Day’ । সেদিন কলকাতায় নজরে পড়ার মত কোনও সংবাদ মাধ্যমের কোনও অনুষ্ঠান নজরে পড়েনি। কিন্তু আমেরিকান কনস্যুলেট জেনারেল কলকাতা আমেরিকান সেন্টারে ৩০ মে ‘World Press Freedom’ উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
৩০ মে আমেরিকান সেন্টারে আমরা একটি দু’ঘণ্টার পূর্ণ দৈর্ঘের ছবি দেখি। যে ছবি আমরা দেখলাম আমাদের দেশে ভারতে এই ছবি আদৌ তৈরি করা সম্ভব কিনা সে প্রশ্ন তোলা যায়। সেদিনের ছবির বিষয় ছিল আমেরিকার ক্যাথলিক চার্চের ভেতরে চলতে থাকা স্বেচ্ছাচারিতা। তথা শিশুদের যৌন হয়রানি। এবং ওই ধরণের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা। ছবির পরতে পরতে উঠে এসেছে একটি ধর্মীয় ব্যবস্থার মধ্যে কতরকমের অসামাজিক মানুষ থাকে। আমেরিকার মত একটি উন্নত গণতন্ত্রের দেশে এই ব্যবস্থা সেলুলয়েডের পর্দায় অভিযোগ হিসেবে উঠে এলে কি ধরণের ঝড় উঠতে পারে আমরা অনুমান করতে পারি। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধি, সম্পাদক একাধিকবার আক্রান্ত হন। তবু শেষ পর্যন্ত সংবাদ মাধ্যম জয়ী হয়। সিনেমার পরে ছিল আলোচনা সভা। আলোচনা সভায় প্রশ্ন ধেয়ে আসতে থাকে। একজন প্রশ্ন করে চার্চের কারও কারও ভূমিকা নিয়ে যখন প্রশ্ন ওঠে তখন আমেরিকান রাজনীতিতে এর প্রভাব কতটা পরে?
উত্তর দিলেন কলকাতা আমেরিকান সেন্টারের ডিরেক্টার জেমি ড্রাগন। তিনি বলেন, ‘’আমেরিকায় দু’টি স্বতন্ত্র ব্যবস্থা আছে। চার্চের পরিচালন ব্যবস্থা আলাদা। এবং রাজনীতি তথা দেশের সরকার নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা আলাদা। আমেরিকার গণতন্ত্র সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে না। যেটা আপনারা এই ছবিতে দেখলেন।‘’ এই একই কথা কিছুদিন আগে ভিন্ন একটি অনুষ্ঠানে আমরা শুনেছিলাম আমেরিকান কনস্যুলেট জেনারেল ক্রেগ হলের কাছ থেকে। তিনি বলেছিলেন, ‘’আমেরিকা আজও সেই দেশ, যে দেশে সাংবাদিক, সংবাদ মাধ্যমের সব রকমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। আমরা মেধাকে একটা উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই।‘’
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হয়ে আসার পরে আমরা জানি সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে তার কিছুদিন সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ট্রাম্প সাহেব প্রশ্ন তুলেছিলেন ‘ফেক নিউজ’ নিয়ে। বর্তমান আমেরিকায় ‘রিপাবলিকান দল’ নিয়ন্ত্রিত শাসনে সংবাদ মাধ্যম স্বমহিমায় নিজেদের ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু ভারতে? সম্প্রতি ‘এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন’ একটি প্রেস বিবৃতি প্রকাশ করেছে। ৩১ মে প্রকাশিত সেই বিবৃতি থেকে আমরা ভারতের ছবিটা বুঝতে পারছি।
‘’ALRC is deeply concerned with the deteriorating climate for the freedom to voice one’s opinion in India, especially when speaking up against the majoritarian, populist narrative or standpoint in the country. Then the 2018 World Press Freedom Index, India dropped two more ranks to be placed at 138 out of 180 countries, a dismal rank for the so-called ‘largest’ democracy in the world. The reasons cited for this were manifold, but mainly the misuse of Section 124A of the Indian Penal Code which defines the offence of sedition, and one that has been severely misused to target journalists speaking out against injustice.'' Courtesy- AHRC
আমাদের দেশে সংবাদ মাধ্যমের উপর আক্রমণের পরে বিরোধী দলের নেতৃত্ব সোচ্চার হয়েছেন। বিশেষত গৌরী লঙ্কেশ খুনের পরে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধি গর্জে উঠেছিলেন। সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি প্রতিবাদ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধযায় প্রতিবাদে সাংবাদিকদের মিছিলে পা মিলিয়েছেন।  আমাদের রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনে সংবাদ মাধ্যমের উপর আক্রমণের পরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যয় প্রশাসনকে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।   
সংবাদ মাধ্যমে কালোটাকা অনুপ্রবেশের ফলে এক সময় পণ্য সাংবাদিক এবং হলুদ সাংবাদিকতার প্রবণতা বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু গঠনমূলক সংবাদ যারা করেন সৎ সাংবাদিকতা যারা করেন তাদেরই জয় হয়েছে। ভারতীয় তথা কলকাতার সংবাদ মাধ্যম বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্ক স্বনির্ভর। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সংবাদপত্রের ভূমিকা আজ থেকে ২০০ বছর আগেও যে দায়িত্ব দাবি করত আজও সেই দাবি করা যায়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন (১৮০১-১৮০৯) বলেছিলেন, ‘’আমার সামনে বেছে নেওয়ার জন্য যদি এমন দু’টি বিষয় দেওয়া হয় যেখানে (১) সংবাদপত্রবিহীন শাসন ব্যবস্থা এবং (২) শাসন ব্যবস্থাবিহীন সংবাদপত্রের মধ্যে একটিকে গ্রহণ করতে হবে সে ক্ষেত্রে আমি নির্দ্বিধায় শেষোক্তটিকে বেছে নেব।‘’
পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, ‘’আমি সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন সংবাদপত্রকেই পছন্দ করি। যদিও জানি যে অবাধ স্বাধীনতার ঝুঁকি অনেক, কারণ প্রতি মুহূর্তে অথবা যে কোনও মুহূর্তে স্বাধীনতা অপব্যবহার হতেই পারে।   এতৎ সত্বেও অবদমিত অথবা নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র আমার একদম পছন্দ নয়।‘’
বিশ্ববরেণ্য এই দু’ই ব্যক্তিকে অনুসরণ করে আমরা কি বলতে পারি না, সহিংস নয়, একুশ শতাব্দীর সাংবাদিকতার কলম হোক অহিংস। সুস্থ প্রতিযোগিতা হোক। ভেঙে পড়া অসহিষ্ণু সংবাদ সমাজমাধ্যমকে গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে আসুন এগিয়ে আসি আমরা। চন্দ্রমল্লিকা হাতে নিয়ে বলি আমাদের কোনও রঙ নেই। আমাদের কোনও জাত নেই। আমাদের কোনও ধর্ম নেই। আমরা সাংবাদিক।
 

Tuesday, 5 June 2018

প্রাচীন গাছের মতই পুরনো ঐতিহ্যবাহী বাড়ির সংরক্ষণ প্রয়োজন



দীপেন্দু চৌধুরী 
গত কয়েকবছর আগে থেকে আমরা হাহুতাশ করছি। কলকাতা শহরের হারিয়ে যাওয়া পুরনো জরাজীর্ণ বাড়িগুলির স্থাপত্য নিয়ে। কিছুদিন আগে ‘হেরিটেজ ওয়াক’ শিরোনামে একটি পদযাত্রায় প্রাক্তন আইএএস অফিসার এবং বর্তমানে জনপ্রিয় প্রাবন্ধিক জহর সরকার বলছিলেন, ‘’গত কয়েক দশকে কলকাতা শহরের হেরিটেজ বাড়িগুলি নিয়ে বাংলায় কোনও উপন্যাস পড়েছ? বা বড় গল্প? এই প্রজন্মের কোনও লেখক এটাকে বিষয় হিসেবে ভাবল না! আক্ষেপ হয় না?’’ তিনি আরও বললেন একজন লেখক চেষ্টা করেছিলেন। আমি বললাম, বিমল মিত্র? ‘সাহেব বিবি গোলাম’? জহরবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ তবে খুব বিস্তারিত কিছু আমরা পাইনা। আমাদের বাঙালিদের অভ্যেস হচ্ছে আমরা অনেক কিছু নিয়ে ভাবি। কিন্তু নিজেদের সভ্যতা, ঐতিহ্য এগুলিকে আড়ালে রেখে দিতে চাই। তোমার কি মনে হয়?’’
জহর স্যারের কথাটা আমার চিরদিন মনে থাকবে। তিনি অনেক বাঙালির মতই ঠিক বলেছেন। উচ্চশিক্ষিত বাঙালির দল আদিম, পুরনো এবং আধুনিক বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে আমরা গর্ব করি। অতীতচারণায় নিজেদের  সম্পর্কে ‘এগিয়ে বাংলা’ বলতে কেউ দ্বিধা করবে কি? ভাবে যতটা প্রকাশ পায় বাস্তবে সেই প্রয়োগ অজলচল হয়ে থাকে। কে কাকে অভিযোগ করবে। অকৃত্তিম অনুভূতি সর্বেক্ষণ মনন নিয়ে আমরা টেবিলে থাপ্পর মেরে সারা বিশ্বকে কফি হাউসের টেবিলে আনতে পারি। ইতিহাস, বর্তমান ঘটনার ঘটমান সময়, রাজনৈতিক কারণ, সমাজতত্ব, উন্নয়ন, বিশ্বায়ন, সব কিছু ব্যাখ্যা করতে পারি। এবং চূলচেরা বিচার বিশ্লেষণ করে থাকি। কিন্তু নিজেদের স্বত্বা নিয়ে একদম সচেতন নই। নিজেদের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, লোকাচার, লোকসংস্কৃতি, লোকগান,  হেরিটেজ সংরক্ষণ বা পুরাতত্বকে বাঁচিয়ে রাখার আগ্রহ আমাদের কতটাইবা আছে? কে প্রশ্ন তুলবে? কাকে প্রশ্ন করবে? কারণ আমরা কমবেশি প্রত্যেকে গড্ডালিকাপ্রবাহ ভালোবাসি। শুন্য এক চরাচর নিজেদের অজান্তে নিজেরাই রচনা করি। সেই চরাচর ভেঙে সোনালী আলো আনতে আর চেষ্টা করি না।  
সূত্রের খবর, ‘Calcutta Architectural Legacies’ (CAL) নামে একটি সংস্থা কলকাতার পুরনো বাড়িগুলির সংরক্ষণের প্রয়োজনে সচেতনতার কাজ শুরু করে। কলকাতায় হেরিটেজ বিষয়টাতেও গুরুত্ব দিচ্ছে তারা। কলকাতা শহর নিয়ে সম্প্রতি ইংরেজিতে কয়েকটি উপন্যাস গল্প লেখা হয়েছে। এরমধ্যে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য লেখকের নাম অমিত চৌধুরী। লেখক অমিত চৌধুরী ‘CAL’ নামক সংস্থাটির প্রধান হিসেবে এই ধরণের আন্দোলন শুরু করেছেন। চলতি বছরের ২১ মার্চ কলকাতায় ফরাসী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে হেরিটেজ বিষয়ক একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সেই সভায় বক্তারা ছিলেন যথাক্রমে অমিত চৌধুরী, রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের সদস্য, আর্কিটেক্ট পার্থরঞ্জন দাস, গুজরাট রাজ্যের আমেদাবাদ শহরকে বিশ্ব হেরিটেজ তালিকায় তোলার কথা ইউনেস্কো ঘোষণা করেছে। আমেদাবাদ শহরের ইউনেস্কো মনোনীত সম্মানীয় সদস্য রবীন্দ্র বাসাভাদা (Rabindra Vasavada) ওই দিনের আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
২১ মার্চের আলোচনা সভায় অমিত চৌধুরী বলেন, ‘’২০১৫ সাল থেকে আমাদের সংস্থা কলকাতায় হেরিটেজ বিষয়টায় গুরুত্ব দিচ্ছে। এটা ইতিহাস। অবশ্যই ব্যতিক্রমী ইতিহাস। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, রাজকাপুরের ছবিতে আমরা কলকাতা শহরের পুরনো বাড়ির স্থাপত্য এবং সংস্কৃতি পাই। পুরনো ক্যানেল ওয়ারর্থ হোটেলের বিল্ডিং শহরের অন্যতম স্থাপত্যের উদাহারণ। থিয়েটার রোডের বাড়িগুলি পুরনো স্থাপত্যের স্বাক্ষর বহন করছে। হেরিটেজ তালিকাভুক্ত বাড়িগুলি বাদ দিলে এখনও অনেক পুরনো বাড়ি রয়েছে যেগুলিকে ‘হেরিটেজ পর্যায়ে’ আনা যায়।‘’
রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের সদস্য পার্থরঞ্জন দাস বলেন, ‘’আমাদের কলকাতা শহরের জন্য প্রয়োজন ‘টাউন স্ক্যানিং প্ল্যান’, মহারাষ্ট্র এবং গুজরাটে আছে। হেরিটেজবাড়িগুলি যারা দখল করে আছে সেখানে অনেক আইনি সমস্যা আছে। কারণ মালিক একজন নয়। অনেক মালিক আছেন। কেউ কেউ বিদেশে আছেন। আলিপুর জেল, প্রেসিডেন্সী জেলকে সংরক্ষণের তালিকায় নিয়ে আসা হয়েছে। আলিপুর জেলে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, নেতাজী সুভাষ, ঋষি অরবিন্দ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মত ব্যক্তিত্বরা এই জেলে ছিলেন। প্রেসিডেন্সী এবং আলিপুর জেলকে মিউজিয়াম করার প্রস্তাব দিয়েছি। নৈতিকভাবে রাজ্য সরকার রাজি হয়েছে।‘’
ইউনেস্কোর মনোনীত আমেদাবাদ শহরের সম্মানিত সদস্য রবীন্দ্র বাসাভাদা বলেন, ‘’টিডিআর ঘোষণা হয়েছিল বাড়িগুলি তালিকাভুক্ত হওয়ার পরে। আমি আমেদাবাদের কথা বলছি। সরকার টাকা না দিলে কে কাজ করবে? ৬২ হাজার বাড়ি আছে কিন্তু মাত্র ৩ হাজার বাড়ি চিহ্নিত হয়েছে। ৩০% দখল হয়ে গেছে। আমেদাবাদের এই বিষয়গুলি ভীষণ জটিল। আমি মনে করি হেরিটেজ তালিকা তৈরি করার সময় আইনি বিষয়টা আগে দেখা উচিৎ।‘’
কলকাতা সহ সারা রাজ্যের হেরিটেজ ধারাবাহিকতা মাথায় রেখে ১৮ এপ্রিল কলকাতায় একটি মিছিল হয়। মিছিলের আয়োজক সংস্থা ছিল CAL, INTACH, PUBLIC.  বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে কলকাতার পুরনো বাড়ি ও ঐতিহ্য বাঁচাতে ওইদিনের প্রতিবাদ মিছিলে হেঁটেছিলেন, লেখক অমিত চৌধুরী, প্রক্তন আই এ এস এবং বর্তমানে প্রাবন্ধিক জহর সরকার। জহরবাবু বর্তমানে Chairman, Center for Studies in Social Sciences,  চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব অপর্ণা সেন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক সুপ্রিয়া চৌধুরী, শিল্পী চিত্রভানু মজুমদার, লেখক কল্যাণ রায়, প্রদীপ কক্কর (PUBLIC), কুশল চৌধুরী সহ আরও অনেকে। কয়েকটি স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও ওইদিনের মিছিলে হাঁটে। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ দিবসে সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার থেকে মিছিল শুরু হয়ে মিছিল শেষ হয় কলকাতা পুরসভায়। তিনটে সংগঠনের দাবি ছিল, যে সব হেরিটেজ চিহ্নিত বাড়ির তকমা কেড়ে নেওয়া হয়েছে সে সব ফেরৎ দিতে হবে। মুম্বাই, দিল্লি, আমেদাবাদ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শহরকে হেরিটেজ জোন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কলকাতার সমৃদ্ধশালী ইতিহাস আছে। ৩০০ বছরের বেশি পুরনো শহর। অথচ এই শহরের কোনও হেরিটেজ জোন হয়নি।   
মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে অপর্ণা সেন বলেন, ‘’ That like people, an old city also has a face. If this face is struck at continuously, it becomes disfigured, unrecognizable.’’  জহর সরকার বলেন, ‘’CAL Calcutta’s Architectural Legacy, INTACH, PUBLIC & Purono Kolkata got together to raise awareness of citizens to protest because once an old unique architecture — Colonial, Neo-classical, Baroque, Indo-European Hybrid, Art Deco (like Metro, Roxy, Lighthouse, Elite) are destroyed a part of Kolkata’s unique legacy is slaughtered — without any scope for revival. We need to convince house owners that their old beautiful heritage architecture can be preserved and generate income as Heritage Tourism —- so that selling to greedy builders and political Syndicates is not the only option।‘’    
অমিত চৌধুরি বলেন, ‘’This is perhaps the first citizens’ march on heritage in the city. And the letter mention three broad points that needed to be discussed with the CMC.’’ অমিত চৌধুরি, সুপ্রিয়া চৌধুরীদের নেতৃত্বে ওইদিন কলকাতা পুরসভায় একটি স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়। স্মারকলিপির বিষয় ছিল, 1) The delisting of buildings on the CMC’s heritage list should be stopped immediately, 2) Documentation of buildings that require preservation. 3) Authentication of the incomplete heritage list that the city has and putting together a plan that will create heritage precincts, so that Calcutta’s unique neighborhoods do not disappear in the name of development.     
জহর সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে তাল রেখে বলতে হয় একটা শহরের পুরনো সুদৃশ্য বাড়িগুলির ঐতিহ্য আমরা ফিরিয়ে দিতে পারি কিনা সেটা আমাদের ভেবে দেখা উচিৎ। যে কাজটা পুদুচুরি শহরে ফরাসী সরকার করেছে। চন্দননগর শহরকে কেন্দ্র করে একই দাবি উঠেছে। কারণ চন্দননগর নৌবাণিজ্যের শহর হিসেবে পূর্ব পরিচিতি রয়েছে। বাংলার এই প্রাচীন শহরে ফরাসী, ডাচদের প্রাধান্য বেশি ছিল। পরে পুরো শহরটা ফরাসী স্থাপত্যের শহর হয়ে ওঠে। ইউরোপিয় ঘরানার নগরস্থাপত্যের অন্যতম উদাহারণ ছিল এই শহর। ১৬৯৬ সালের হুগলী নদীর তীরে নির্মিত চার্চ আজও ফরাসী স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ১৬৮৮ সালে ফ্রান্স প্রশাসন স্থায়ী ভিত্তিতে চন্দননগরের দায়িত্ব পায়। তারপরে এই চার্চ তৈরি হয়। ১৭৩০ সালে জোসেফ ফ্রাঙ্ককোলিন ডুপ্লেক্স (Joseph Francois Duplex) চন্দননগর শহরের গভর্নর হিসেবে নিয়োগপত্র পান।
তার শাসনকালে প্রায় কয়েক লক্ষ ইঁটের তৈরি ফরাসী স্থাপত্যের বাড়ি তৈরি হয়। এবং চন্দননগর শহর গঙ্গা নদীর উপকূলবর্তী বাণিজ্যনগরী হিসেবে প্রসিদ্ধিলাভ করে। একটা সময় চন্দননগর ইউরোপিয়ান বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্রস্থল হিসেবেও প্রসিদ্ধিলাভ করেছিল।
চন্দননগরের ফরাসী স্থাপত্যের আরও একটি অন্যতম বাড়ি ‘রেজিস্ট্রি বিল্ডিং’ জরাজীর্ণ, পাকুড় গাছের আশ্রয়ে আচ্ছাদিত আছে এই বাড়ি। শহরের রানিঘাট জেটির কাছে অবস্থিত ঐতিহাসিক ফরাসী স্থাপত্যের এবং ফরাসী সরকারের রেজিস্ট্রি অফিস। এই বাড়িটির স্থাপত্য এখনও মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কয়েক বছর আগে চন্দননগর পুরনিগম ঘোষণা করেছিল উনবিংশ শতাব্দীতে তৈরি এই বাড়ি এখন নিরাপদ নয়। তাই এই বাড়ি ভেঙে ফেলতে হবে। স্থানীয় বাসিন্দা, এবং যারা শহরের ফরাসী স্থাপত্যের-ঐতিহ্য ভালোবাসেন তারা এগিয়ে আসেন। সঙ্গ দিলেন কিছু এনজিও। তাঁদের উদ্যোগেই চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে কলকাতায় ফরাসী কনস্যুলেট জেনারেল ড্যামিয়েন সৈয়দকে বিষয়টি জানানো হয়। তার কাছে একটি লিখিত আবেদন করা হয়। আবেদনে চন্দননগরের ‘রেজিস্ট্রি বিল্ডিং’- এর বিষয়ে ফরাসী কনস্যুলেট জেনারেলকে জানানো হয়। সেদিনের আলোচনায় ড্যামিয়েন সৈয়দ শুধুমাত্র ‘রেজিস্ট্রি বিল্ডিং’ নয় উনবিংশ শতাব্দীর ফরাসী এবং ডাচ নৌবাণিজ্য নগরীর অন্যান্য পুরনো বাড়ির সংরক্ষণের বিষয়ে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এবং তিনি আশা প্রকাশ করেন, ফরাসী সরকার চন্দননগর শহরকে তার ঐতিহ্য ফিরিয়ে দেওয়ার কাজে সাহায্য করবে। সেই মোতাবেক চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে কাজ শুরু হয়েছে।
গত ২৯ মে ‘How does heritage work for you’’ শিরোনামে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ কলকাতায় আরও   একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। স্লাইডে আমাদের দেখান হয় ‘How does heritage work for you, Citizen engagements in heritage conversation: a case of Chandannagar.’ Cultural heritage and urban development.  আলিয়সঁ ফ্রঁসেজ-এর ডাইরেক্টর ফ্যাব্রিক প্ল্যাঙ্কন বলেন, ‘’চন্দননগর শুধু ফরাসীদের গর্ব নয়। এই বাংলার গর্ব। এই শহরকে তার পুরনো ঐতিহ্যে ফিরিয়ে দিতে পারলে আমরা চন্দননগরের মানুষের কাছে কৃতঞ্জ থাকব। রাজ্য সরকার আমাদের সাহায্য করছে এই কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।‘’  
ওইদিনের আলোচনা সভায় বক্তা ছিলেন র‍্যাফেল গ্যাস্টেবোইস (Raphaell Gastebois) এবং ঐশ্বর্যা টিপনিস। আলিয়সঁ ফ্রঁসেজ থেকে আমন্ত্রণপত্রে আলোচক দুই ব্যক্তির সম্পর্কিত বিষয় আমরা উল্লেখ করলাম।          
A discussion on the value of heritage to community and the importance of a community effort in its restoration and preservation.
This session will discuss how heritage is helpful to us as citizens and how the latest developments are to take its promotion from the realm of academia to a more citizen driven process.


About the panellists:

Raphaël Gastebois is an expert in urban development. In 2016, he joined the Ministry of Europe and Foreign Affairs as part of the Smart City program.
He is trained in the conservation and restoration of heritage.

Aishwarya Tipnis is an award winning architect and urban conservationist.
Tipnis is currently directing the project 'House of the Moon' in Chandernagore,
with the aim to restore centuries-old heritage buildings in the former French colony. In recognition of her commitment to the preservation of French heritage in India, she has been conferred the Chevalier des Arts et des Lettres by the Ambassador of France to India in January 2018.


কলকাতায় র‍্যাফেল তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘’আমি গত দু’ বছর ধরে এই কাজ করছি। বিভিন্ন জায়গায় আমি কাজ করছি। ১০০টি শহরকে ভারতে বেঁছে নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় সংরক্ষণ গাইডলাইন মেনে এই বাছাইপর্ব হয়েছে। পৃথক পৃথক শহরের আলাদা আলাদা ভাবনা চিন্তা রয়েছে। ফ্রান্সের ‘প্যারিস শহর’-এর মত করে আমি ভাবছি। একটা শহরের তার ঐতিহ্য ফিরিয়ে দেওয়া মানে শুধু পুরনো বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া নয়। সেই শহরকে আধুনিক মানদণ্ডে গড়ে তুলতে হবে। শহরের পরিকাঠামো, পরিশুদ্ধ পানীয় জল, স্নানের জলের ব্যবস্থা করতে হবে। জ্যামজট মুক্ত, জঞ্জাল মুক্ত শহর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আমরা পুদুচুরি শহরকে এইভাবে সাজিয়েছি। পুরনো ফরাসী স্থাপত্যে এমনই ভাবনা এবং নকশা ছিল। রাজনীতি অনেক কিছু পরিবর্তন করতে পারে স্থানীয় মানুষের দাবি মেনে। ৬৩টা প্রকল্প আমাদের হাতে আছে।‘’ 
ঐশ্বর্যা টিপনিস বলেন, ‘’আমরা চন্দননগরে কাজ করছি ৮ বছর হল। চন্দননগর-চুচুড়াকে কেন্দ্র করে পর্যটনের সুযোগ আছে। ৬০টার কিছু বেশি বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে। চন্দননগর শহরের হেরিটেজ সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তার প্রয়োজন রয়েছে। আমরা চন্দননগরের হেরিটেজ বিষয়ক একটি প্রদর্শনী করি। সেই প্রদর্শনীতে হুগলী জেলার জেলা শাসকের নেতৃত্বে জেলার সমস্ত শীর্ষ আধিকারিকরা এসেছিলেন। চন্দননগরকে ফরাসী স্থাপত্য ফিরিয়ে দেওয়া যায় না?’’
কলকাতার ফরাসী কনস্যুলেট জেনারেল ড্যামিয়েন সৈয়দ ২১ মার্চের আলোচনায় উল্লেখ করেছিলেন ‘’ ৯৯টি ফরাসী স্থাপত্যের বাড়ি আছে। ইন্দো-ফ্রেঞ্চ হেরিটেজ। কিছু স্থাপত্য ধ্বংস হয়ে গেছে। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলেই আমাদের কাজ করতে হবে।‘’ এদিন তিনি বলেন, ‘’আমরা পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করেছি। ফরাসী স্থাপত্যের বাড়িগুলি সংরক্ষণের জন্য কি ব্যবস্থা নেওয়া যায় সেটা আমরা ভাবছি। এই বাড়িগুলি ঐতিহাসিক স্মারক। চন্দননগরের স্থাপত্যগুলিকে কেন্দ্র করে ‘হেরিটেজ অব সিটি’-এর জন্য আমরা পরিকল্পনা করছি। পর্যটক আকর্ষণের বিষয়টাও আমাদের মাথায় আছে। ‘’       

     
 কলকাতার আমেরিকান কনস্যুলেট জেনারেল ক্রেগ হল ১৮ এপ্রিল ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ডে’ উপলক্ষে উত্তরবঙ্গে ছিলেন। আমেরিকান সেন্টার সূত্রে খবর ওইদিন উত্তরবঙ্গে ক্রেগ হল হেরিটেজ বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে রাজ্যের ‘হেরিটেজ বাড়ি’ এবং সংস্কৃতি সংরক্ষণের কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘’শহরের উন্নয়ন প্রয়োজন। পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজন। কিন্তু সেইসঙ্গে দেখতে হবে, একটি শহরের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি আমরা কতটা ধরে রাখতে পারছি।‘’