Friday, 10 June 2016

ভাঙ্গা-গড়ার সংস্কৃতি

আবার এ বছর ২০১৬ সালে সমস্ত জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নামক দলটি সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে রাজ্যে দ্বিতীয়বারের জন্য সরকার গঠন করেছে। এই বিষয়টা কিছুটা পুরনো হয়ে গেছে। কাকতালীয় বিষয়টা হচ্ছে। ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ আসন সংখ্যার নিরিখে ২১১ তে এসে থামল। একটা সময় নয় অনেকগুলি বছরেরে যোগ-বিয়োগের ফসল ২০১৬ সাল। বিশেষত এই বাংলায়। কী রকম কাকতালিয় ঘটনা দেখুন। ২০১১ সালে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের জমানার অবসান হয়েছে। আবার ২০১৬ সালের ষোড়শ বিধানসভা নির্বাচনে ২১১ টি আসন পেল 'তৃণমূল কংগ্রেস'। 
 নির্বাচন চলাকালীন আমি নিয়মিত ‘নেট’ ব্যবহার করলেও মধ্যে কিছুদিন ‘নেট’ ব্যবহার করিনি। এই সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় চাপানউতর  ভালোই চলেছে বলে মনে হয়।
ওই সময় তীব্র গরম ছিল। প্রখর তাপপ্রবাহ চলছে। আমরা যে বাড়িটায় ভাড়া থাকি, সেটা তিন তলা বাড়ি। আমরা তিন তলায় থাকি ‘আম-জাম’ আদমির মত প্যাঁচ পেঁচে গরম সহ্য করে থাকি। ছাদের কিছুটা অংশ ফাঁকা। মাথায় প্লাস্টিকের ছাউনি। ছাদের রেলিঙে কাক, শালিক, বুলবুলি, টুনটুনি পাখি এসে বসে। ছায়ায় বিশ্রাম নেয়। আবার চলে যায়। আমি ঘরের জানলা দিয়ে ওদের দেখি। মাস খানেক আগের কথা। দুটো শালিক জোড়া পায়ে হাটতে হাটতে জানলার কাছে এসে খুব চেচামেচি করল। জানলার পর্দা তোলা ছিল। আমার স্ত্রীকে বললাম, ‘’গরমে ওরা জল খেতে পারছে না। একটা পাত্রে ওদের জল দিয়ে দ্যাখতো। ওরা সম্ভবত জল চাইছে। সেদিন থেকে একটা প্লাস্টিকের ছোট বাটিতে ওদের পরিষ্কার জল দিচ্ছি। শালিক পাখি দুটি এখন শীস দেয়। জানলার পর্দা তোলা থাকলে জানলার কাছে এসে ঘাড় কাত করে অবুঝ ভাষায় আনন্দ প্রকাশ করে। কখনো কখনো আবার জোড়া পায়ে নাচে। ওরা আমার বন্ধু হয়ে গেছে। কিন্তু একদিন বিড়ম্বনায় পড়তে হল। ‘হুতোম’ সেদিন ছাদের রেলিঙ-এ বসে বলল, ‘’এবার আমাকে ভুলে যাবি নাতো?’’
আমি বললাম, ‘’না ভুলব কেন? ওরা জল চাইছিল। এই গরমে ওদের জল দিলাম।‘’
হুতোম বলল, ‘’এটা ভালো কাজ সবাই জানে। এতে ‘বাহবা’ কুড়োবার মতো কিছু হয়নি। যাই হোক এবার বল ভোটের ফল প্রকাশের পর তুই ইন্টারনেট ব্যবহার করলি না কেন?’’
আমি বললাম, ‘’সেটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়। আমি সবাইকে বলব কেন?’’
হুতোম বলল, ‘’ঠিকই। তোকে বলতে হবে না। কিন্তু তুই ‘ফেসবুকে’ ‘ট্যুইটারে’ অনেক মেসেজ মিস করেছিস। আমার একটা মেসেজ খুব ভালো লেগেছে। কেউ একজন লিখেছিল, ’১২ কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী রেখেছ বাঙালি করে ‘বামপন্থী ভোটার’ করনি।‘’ আমি রবি ঠাকুরের ‘জীবনস্মৃতি’ পড়তে পড়তে হুতোমের কথা শুনছিলাম। বললাম, ‘’আমি এসবের মধ্যে নেই।‘’ মুখ তুলতেই দেখলাম হুতোম চলে গেছে। একটা কাক বাটির জল খেয়ে বাটিটা উলটে দিয়ে চলে গেল।
ভাঙ্গা গড়ার সংস্কৃতি কী একেই বলে? গণতন্ত্রে এটা হয়েই থাকে। ‘মসনদ সংস্কৃতি’র বয়ান আমরা চিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তার উজ্জ্বল উদাহারণ। কিন্তু ভারত নামক একটি গণতান্ত্রিক দেশে ‘মসনদ সংস্কৃতি’ খুব বেশিদিন টেনে নিয়ে যাওয়া কি সম্ভব? ‘দলদাস সংস্কৃতি’ অথবা মধ্যমেধার সংস্কৃতি? ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংস্কৃতি বলে কী কিছু হয়? নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নেত্রী বলেছিলেন, ‘’সাংস্কৃতিকভাবে আগে বাংলাকে এগিয়ে নিতে হবে। সঙ্গে থাকবে ছাত্র যুব।‘’ আর পরে কি বললেন তিনি? মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার পরে তিনি বিধানসভায় বললেন, ‘’যাদের একজন সদস্য আছেন আমি তাদেরও অভিনন্দন জানাচ্ছি। বিধানসভায় আমরা অনেক প্রয়োজনীয় বিষয়ে আলোচনা করব।‘’ মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘’কটূক্তি, কুৎসা করবেন না, যাতে একে অপরের সঙ্গে তিক্ত সম্পর্ক হয়। যা হওয়ার হয়েছে। সুন্দর সীমারেখা রেখে সকলের বোঝাপড়া, ভালোবাসার মধ্য দিয়ে শুভ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে নজির সৃষ্টি করতে হবে। যা পশ্চিমবঙ্গ, ভারতকে পথ দেখাবে।‘’ তিনি এরপরও থামেননি। গত পাঁচ বছরের অভিঞ্জতার মান দন্ডে বিরোধীদের কাছে নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে  চেয়েছেন। দেশ নিয়ে যারা ভাবেন। রাজ্যের উন্নয়নের কথা যারা ভাবেন। সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের কথা মনে রেখে তিনি আস্থার সঙ্গে বলেছেন, ‘’হয়তো বলে যাব। হয়তো হবে না। কিন্তু চেষ্টা করতে ক্ষতি কী?’’ সময়ের পরম্পরায় কূটনীতি বাস্তবকে চিনে নিতে চায়। বাস্তব সব সময় সামগ্রীক স্বার্থের কথা বলে সম্ভবত। ইতিহাস যে তথ্য সযত্নে ভবিষ্যতে আমাদের সামনে চয়ন করে আনে।
২০১৬ হাটি হাটি পায়ে এই বাংলায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বাংলার মানুষ গণতন্ত্রকে কি ফিরিয়ে আনছে? গ্রাম বাংলার আটচালায়, উঠনে, নাগরিক সভ্যতার ‘বহুতল’ বাড়িগুলির গাড়ির শান বাঁধানো ঝা চক চকে চাতালে, দুর্গা মণ্ডপে কি নতুন মহালয়ার সুর বাংলার মানুষ শুনতে পাচ্ছে? এবার এই রাজ্যের বিধানসভার চালচিত্রটা দেখুন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ‘ওরে বিহান হল’ বলে বিধানসভায় বিরোধী আসনে বসল। ১৫ বছর পর। আনুপাতিক হারে ২০১৬ সালের ষোড়শ বিধানসভা নির্বাচনের পরে মুসলিম বিধয়কের সংখ্যা বেড়েছে। ২০১১ সালে মোট মুসলিম বিধায়ক সংখ্যা ছিল ৫৯ জন। ২০১৬ সালে তুলনামুলকভাবে অনেকটা বেড়েছে। এবারের বিধানসভায় তৃণমূল, বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেসের মিলিত মুসলিম বিধায়ক সংখ্যা সর্বমোট ৬১ জন। বামফ্রন্টকে নিয়ে ভারতীয় বামপন্থীদের যে চিন্তা ছিল, সেটার অনেকটা উত্তর মিলেছে। কমরেড সীতারাম ইয়েচুরির নেতৃত্বে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটি দায়িত্ব নিয়েছিল বলেই হয়ত এই ছবি আমারা দেখতে পেলাম। রাজ্যের পোড় খাওয়া নেতা কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং কমরেড সূর্যকান্ত মিশ্রের নেতৃত্বে রাজ্য কমিটি নতুন পরিষদীয় নেতৃত্ব তুলে আনতে পেরেছেন। সময় বলবে এই নেতৃত্ব মানুষের জন্য, এই বাংলার জন্য কতটা দায়িত্ব নিতে পারছেন। পাশাপাশি বিজেপি তাঁদের দলের নতুন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের নেতৃত্বে একের জায়গায় তিনজন বিধায়ক নিয়ে বিধানসভায় হাজির। গণতন্ত্রের সার্বিক বিতর্ক উপভোগ করার অপেক্ষায় বাংলার মানুষ। কিন্তু এরপরও বলতে হয় পঞ্চাশ বছরের পুরনো বামপন্থীদের ভূমিকা এবগ দায়িত্ব আর সকলের থেকে আজ এই রাজ্যে অনেক অনেক বেশী নয়? যেহেতু তাদরে অতীত ছায়া আমরা বয়ে বয়ে বেড়াচ্ছি।           
তথাকথিত একটা তীব্র সাংস্কৃতিক অভিঘাত এই রাজ্যকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কম বেশি প্রায় চল্লিশ বছরের ‘বামপন্থী’ সংস্কৃতি এই রাজ্যে অন্য একটা মনন দিয়েছিল। শুধু এই রাজ্যে নয় সারা দেশে তার প্রভাব বিস্তার করেছিল। গণনাট্যের সময়কালকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু তারপর? কিছুটা তাত্ত্বিক। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত, কখনও আদর্শগত কারণে বাংলার উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক নক্ষত্রদের আমরা অপাংক্তেয় করে দিয়েছিলাম। এবং কিছু বেনোজল এসে প্রথম সারির সাংস্কৃতিক নেতৃত্বকে ‘স্তাবক’ করতে না পেরে বাংলার উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিল। নামগুলি মনে পড়ছে। দেবব্রত বিশ্বাস, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, বিজন ভট্টাচার্য, তৃপ্তি মিত্র, ঋত্বিক ঘটক, শম্ভু মিত্র, সতীনাথ ভাদুড়ী, তারশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র এবং আরও অনেকে। আমি ‘জি নিউজ’ এ চাকরি করার সময় এক সাংবাদিকের কাছে শুনেছিলাম সে সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘জাগরী’ পড়েছে কিন্তু ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস এর’ নাম শোনেনি। আমার কাছে শোনার পরে প্রেস ক্লাবে বসে সে আমাকে বলেছিল, ‘আমি বামপন্থী পরিবারের ছেলে অথচ দাদা দেখ,  আমাকে এই বইটার নাম কোনওদিন বলা হয়নি। তোমার কাছে শুনে বইটা পড়লাম। অসাধারণ উপন্যাস।‘’
জেলে বসে তিনি জাগরী লিখেছেন। পরাধীন ভারতের অন্যতম সৈনিক সতীনাথ। দেশে স্বাধীনতা এল। নতুন সরকার। সতীনাথ ভাদুড়ীর নাম সাংস্কৃতিক জগতে ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে বিপুল জনপ্রিয় তিনি। মন্ত্রিত্বের জন্য তাঁকে প্রস্তাব দেওয়া হল। তিনি সম্মানের সঙ্গে পরিহার করলেন। সতীনাথ বললেন, ‘’আর কী দরকার? দেশ স্বাধীন করার জন্য লড়াই করেছিলাম, দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে, এবার রাজনীতিতে থাকলে ক্ষমতার লোভ আসবে মনে।‘’
আর তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়? যে বিশাল ক্ষেত্র জুড়ে তার কাজ সেখানে একজন ব্যক্তি মানুষের পক্ষে সবটা মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। সত্তরের দশকে আমার থেকে বয়সে আট বছরের বড় এক অধ্যাপক দাদা বলেছিলেন। ‘আরোগ্য নিকেতন’ নোবেল পেতে পারত। ভদ্রলোকের দেশ-বিদেশের ধ্রুপদী সাহিত্য অনেকটা পড়া ছিল। আমার যতদূর মনে পড়ছে ‘আরোগ্য নিকেতন’ জীবন মশাইয়ের প্রস্থানের গল্প। নতুন সময়কে, নতুন কালকে,  বর্তমান সময়ের চিকিৎসা বিঞ্জানকে মেনে নেওয়ার সময়ের কথা তিনি বলেছেন। পাশাপাশি ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসে একই রকমভাবে বা একই ছন্দে তারশঙ্কর ‘করালী’র নেতৃত্বের কথা আমাদের বলে গেছেন। তিনি শিল্পের (ইন্ড্রাস্ট্রী) আহ্বানের কথা বলেছেন। বনোয়ারির ভূমিকার বেলা যে শেষ হয়ে যাচ্ছে সেই কথা আমরা শুনেছি। কালউত্তীর্ণ উপন্যাস।
গোপাল হালদার একটি প্রবন্ধে লিখছেন, ‘’......নরেনবাবু বলেছিলেন তারাশঙ্করের কথা—‘কংগ্রেসের আন্দোলনে (১৯৩১-এ) জেলে গিয়েছিল। আর যাবে না বলেছে। ওর দেশবোধ যাবে কোথায়? ঠিকই, সাহিত্যের কামড়ই শুধু কচ্ছপের কামড় নয়, ওই রাজনীতির কামড়ও কচ্ছপের কামড়—যাকে ধরে তাকে আর ছাড়ে না। ছাড়লেই কি ঘা শুকোয়?’ তারাশঙ্করের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে বুঝেছিলাম—বাইরের ঘা শুকিয়েছে, কিন্তু মনের ঘা শুকোয়নি, না ভেবে পারেন না—দেশের কী হচ্ছে কী হওয়া চাই।‘’ (পশ্চিমবঙ্গ, ১ অগাস্ট, ১৯৯৭)।
রাজ্যের বামপন্থীদের কাছে আমাদের যে প্রত্যাশার কথা আমরা বললাম, সেই অবস্থান থেকে চিনের বিতর্কিত সাংস্কৃতিক বিপ্লব প্রসঙ্গে মাও ৎসে তুং যে দীর্ঘ বক্তব্য রেখেছিলেন (২রা মে, ১৯৪২), ‘সাহিত্য ও শিল্পকলা প্রসঙ্গে’ (ইয়েনানের আলোচনা সভায় প্রদত্ত ভাষণ) নামে পরিচিত। কিছু অংশ উল্লেখ করা যাক। ‘’.........চীনা জণগনের মুক্তির জন্য পরিচালিত আমাদের সংগ্রামে বিভিন্ন ফ্রন্ট আছে; সেগুলির মধ্যে লেখনী ও বন্দুকের ফ্রন্ট, অর্থাৎ সাংস্কৃতিক এবং সামরিক, এই দুটি ফ্রন্টই রয়েছে।...... মনোভাবের সমস্যা। শ্রেণী দৃষ্টি থেকেই যে কোনো বিষয়ের প্রতি আমাদের বিশেষ মনোভাব প্রকাশ পায়। দৃস্টান্তস্বরূপ ধরা যাক, কাউকে প্রশংসা করতে হবে, না তার স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে হবে? এ প্রশ্নটি হচ্ছে মনোভাবের প্রশ্ন। কোন মনোভাবের আমাদের প্রয়োজন? আমি বলি, উভয় মনোভাবেরই প্রয়োজন আছে। কাদের নিয়ে কাজ সেটাই হল প্রশ্ন ।‘’ আধুনিক চিনের রূপকার দেং জিয়াওপিং এর নেতৃত্বে চিনের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৮১ সালে ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’কে ভুল বলে সেই অধ্যায় মুছে ফেলেছে। উন্নয়ন কে হাতিয়ার করেই ‘নতুন চিন’ এর বুনিয়াদ গড়ে তুলতে চাইছেন বর্তমান চিনা নেতৃত্ব।  সমাজ বিঞ্জানীরা বলছেন ‘সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি’। তাই অতীতের যে অংশটা অপ্রয়োজনীয় সেটা ফেলে দেওয়ায় বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু যে ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপাদান আছে সেটাকে কাজে লাগাতেই হবে। বৃহত্তর সমাজের স্বার্থে।
আমেরিকান এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকপ্রাপ্তির যুগ কি বলছে? ‘’অষ্টাদশ শতকে আমেরিকান এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকপ্রাপ্তির প্রধান ঝোঁক ছিল ঐতিহ্যের বদলে যুক্তি, প্রশ্নহীন ধর্মীয় বিশ্বাসের বদলে বৈঞ্জানিক অনুসন্ধান এবং রাজতন্ত্রের বদলে নির্বাচিত সরকারের ওপর। আলোকপ্রাপ্ত চিন্তাবিদ ও লেখকরা ছিলেন ন্যায়, স্বাধীনতা, সমানাধিকার ও মানুষের প্রকৃতিদত্ত অধিকার রক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ।‘’ (মার্কিন সাহিত্যের রূপরেখা, মার্কিন বিদেশ দপ্তর, আন্তর্জাতিক তথ্য কর্মসূচি ব্যুরো)
ভারতেও নববই দশকের পর ‘বাজার অর্থনীতি’র ন্যায্য দাবি আমরা মেনে নিয়েছি। সেই মানদণ্ডে এই রাজ্যেও তার প্রভাব অস্বীকার করা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রয়োজন এক ঝাঁক ঝাঁ চক চকে ছাত্র-যুব। ১৯৮৭ সালে শান্তিনিকেতনে সমাবর্তনে এসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গাঁধি কি   বলেছিলেন। আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় ‘দেশ’ (৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৭) সংখ্যায় লিখছেন, ‘’শান্তিনিকেতনে এসে প্রধানমন্ত্রী তাঁর এই মতামত অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন। আগেও তাঁর এই মত জানা ছিল এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষা নীতিতেও এই মত কিছুটা প্রতিফলিত হয়েছে ঠিকই; কিন্তু শান্তিনিকেতনে এসে তিনি এত তীব্রভাবে কথাগুলো বলেছেন যে, এবার বোধহয় সকলেরই নড়েচড়ে বসার কথা। তিনি নিঃসংকোচে জানিয়েছেন, সমাজবাদের নামে মাঝারিয়ানাকে আর বরদাস্ত করা হবে না। মাঝারি মাপের মানুষ নয় বড় মাপের প্রতিভাবান চাই। রাজীব বলেছেন, তিনি ‘’ইনটেলেকচুয়াল এলিটিজম’’ চান। এ ব্যাপারে কোনও আপসে তাঁর বিশ্বাস নেই।.........রাজীবও বারবার বলছেন, অনুগত, বাধ্য, দীনাতিদীন, ছাত্র চাই না; ছাত্রদের আক্রমণাত্বক, বৈপ্লবিক, সাহসী ও অশান্ত হতে হবে।‘’                         

                            

Thursday, 2 June 2016

সামপ্রতিক এবং নিকট অতীত

  নিকট অতীতঃ  
সময় ছুটতে ছুটতে পেছন ফিরে তাকাতে চায়। ব্যক্ত কথার অভিঘাত অব্যক্ত শব্দের আলিঙ্গন খোঁজে। তাই আমার আবেদন হোক প্রত্যায়িত আমন্ত্রণের অভিঘাত। এখানে জনান্তিকে বলে রাখা ভালো, একথা সে কথার পরই শুরু হয় কথপোকথন। মার্জনা করবেন। আবেদন কেন প্রতিবেদন হবে? নিজেকে নিজের মত করে পাইনি দীঘৎ দীঘৎ সময়কাল। আমেরিকার প্রশ্রয়ে আন্তর্জাতিক উঠোন পেয়েছি। মুক্ত গণতন্ত্রের স্বাদ উপভোগ করছি। সেই প্রশ্রয়ে নিকট অতীত নিয়ে ফিরে বসা। এসবের কোনও প্রয়োজন ছিল না। কয়েকজন বলল কিছুটা যখন প্রকাশ হয়েছে আরও কিছুটা হোক। যথা আঞ্জা বলে শুরু করি।
হয়ত বামপন্থা আমাকে অনেকটা গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। আমার গড়ে ওঠা মননের প্রায় ৯০ শতাংশ ওরা ওদের তথাকথিত কুশলী পরম্পরায় ফিরিয়ে নিতে চাইল। পেরেছে কি? সম্ভবত নয়। কারণ গান্ধি-নেহরুর চিন্তা তথা ভারতীয় জাতীয়তাবাদ আমার প্রাথমিক ভিত গড়ে দিয়েছিল। সেই জাতীয়তাবাদী হারিয়ে যাওয়া মননের ধূসর হয়ে যাওয়া পাতার পৃষ্ঠা থেকে চেনা অক্ষরগুলো ফিরতে চাইছে। ফিরতে চাইছে জাতীয়তাবাদী চেতনার রঙ মশালের আলোয়। 
আমি ১৯৭৫ সালের উচ্চমাধ্যমিকের ব্যাচ। মিলন ঘোষ হাজরা এবং ডাঃ নবদ্বীপ সেনদের সঙ্গে আমি প্রাথমিক স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছি। পারিবারিক এবং আর্থ-সামাজিক সীমাবদ্ধতা আমাকে বারে বারে থমকে দিয়েছে। তাই ওদের থেকে একবছর পিছিয়ে পরলাম। মিলন ঘোষ হাজরা (বাবুন) শৈশবের বন্ধুত্বের মর্যাদা আমাকে দিয়েছে। ১৯৭৯ সালে নলহাটি ‘মিলনী সংঘ’ এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবার পর মিলন (বাবুন) স্মরণিকা প্রকাশের সিধান্ত নেয়। সে বছর ছিল ৪৪ তম প্রতিষ্ঠা দিবস। (১৯৭৯)। এবং ৪৪ বছরে প্রথম স্মরণিকা। মিলন ঘোষ হাজরা আমাকে ‘স্মরণিকা’ সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছিল। প্রকাশকাল ছিল ১৫ আগস্ট, ১৯৭৯। বাবুনকে আমার কৃতঞ্জতা জানাই।

১৯৭৬ সালে পেলাম অমিতাভ ধর (মিঠু), অমিত পাল (বাপী), দেবেশ তালুকদার, শান্তিলাল জৈন। আমরা এই চারজন একসঙ্গে স্কুল যেতাম। দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত আমরা ছিলাম পরস্পরের পরিপূরক। শৈশবের বিহানবেলা থেকে সাঁঝবেলার মাধুকরী করতাম ওদের সহায়তায়। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় অমিত আমাদের ছেড়ে সূদূর আকাশে চলে গেল। দীঘায় স্নান করতে গিয়ে ডাঃ মধুসূধন পালের দ্বিতীয় সন্তান বাবা-মায়ের সামনে মারা যায়। আমার একজন প্রিয় বন্ধুকে তখনই হারাই। অমিত ধর (মিঠু) আমাদের ক্লাশে বরাবর ফাস্টবয় ছিল। বাপী সেকেন্ড হত আর চন্দ্রনাথ দত্ত থার্ড হত। ১৯৭৬ সালে মিঠু উচ্চমাধ্যমিক ভালো ফল নিয়ে পাশ করার পর নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে পড়ত। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হল মিঠু। মানসিকভাবে অসুস্থ হল। মিঠুর মাকে আমি কাকিমা বলতাম। কাকিমা আমাকে বললেন, সমস্ত কথা। ওকে সাহায্য করার কথা। যেহেতু শৈশব থেকে ওদের বাড়িতে আমার যাতায়াত ছিল। আড়াল থেকে ও আমাকে সাহায্য করতে চাইত। মিঠু আমার অন্যতম প্রিয় বন্ধু ছিল। 
২০১৫ সালে জানতে পারলাম রাজ্য সচিবালয়ের এক উচ্চ পদস্থ আইএ এস আধিকারিক অমিতাভ ধর (মিঠু)এর সঙ্গে একসঙ্গে নরেন্দ্রপুর মিশনে পড়তেন। উল্লেখিত আই এ এস অফিসার ভদ্রলোক ১৯৮৭ সালে আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন। আমি তখন ‘দৈনিক বসুমতি’ পত্রিকায় মুক্ত সাংবাদিকতা করি। সেই সময় তাঁর বন্ধু সেই সাংবাদিক বন্ধুকে অনুরোধ করেছিল মিঠু। আমাকে আনন্দবাজার পত্রিকায় নেবার জন্য। তিনি যথেষ্ট চেস্টাও করেছিলেন। কিন্তু ১৯৮৭ সালে আনন্দবাজারের চাকরিটা রাজনৈতিক দাদাদের সন্তর্পণ আলতো ছোঁয়ায় আর হল না। একেই কি বলে বিধির বিধান। যা আজও টেনে নিয়ে যাচ্ছি। আমার প্রিয় বন্ধু মিঠুর আত্মার শান্তি কামনা করছি। মিঠু যেখানে আছ সেখানে আমাদেরও যেতে হবে। তাই তোমাকে আর কৃতঞ্জতা জানাতে চাইছি না মিঠু।
       
১৯৭৯ সালেই নলহাটিতে আমাদের পাড়ায় আমি বয়স্কদের জন্য নৈশ বিদ্যালয় শুরু করি। প্রায় পাঁচ বছর স্কুলটা চালিয়েছিলাম। শ্রমিক, মজদুর, রিকশা চালক অনেককেই অত্যন্ত লড়াই করে শিক্ষিত করেছিলাম। এই বিদ্যালয় সম্ভবত বীরভূম জেলায় প্রথম স্কুল ছিল। দুঃস্থ মানুষদের কলকাতায় নিয়ে এসে চিকিৎসা করানোর কথা আগেই বলেছি। ব্যক্তি হিসেবে কি করেছি বা কি পেয়েছি এটা অত্যন্ত গৌন বিষয়। আমি সমাজ থেকে কি আহরণ করতে পারলাম সেটাই ময়ূরপঙ্খী স্মৃতি হয়ে থাক। আবেগের সযত্ন ঘনঘটা আমাকে প্রজন্ম উত্তর মানবতার প্রশ্রয় দিক। মনে পড়ছে সেই শিক্ষক ভদ্রলোকের কথা। ১৯৮৩-১৯৮৬ সাল পর্যন্ত আমি বৌ বাজারের মেসে থেকেছি। 
এক ভদ্রলোককে দেখতাম প্রতি ইংরেজি মাসের দুতিনদিন রাত ৯।৩০ থেকে ১০টার সময় মদ্যপ অবস্থায় একটি বিলেতি মদের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ইংরেজিতে ভাষণ দিচ্ছেন। কিছুক্ষণ পরে ভদ্রলোকের পরিবারের কেউ একজন এসে তাঁকে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন। শুনেছিলাম তিনি থাকতেন শিয়ালদহ অঞ্চলে। অবিভক্ত ২৪ পরগণা জেলার কোনও একটি শহরের উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে প্রধান শিক্ষকের চাকরি করতেন। তাঁর স্ত্রী স্কুলের বেতন নিজে গিয়ে নিয়ে আসতেন। সেই টাকা থেকে কিছু টাকা স্বামীকে দিতেন মদ খাওয়ার জন্য। ওই টাকায় দুতিনদিন বিলেতি মদ খাওয়া যেত।

গল্প এখানেই শেষ নয়। ভদ্রলোক প্রতি সন্ধ্যায় বাড়ির কাছে একটি ফুটপাথে ‘পথশিশুদের’ স্কুল চালাতেন বিনা পারিশ্রমিকে। এটাই সম্ভবত ঠিক। এটাকেই বলে ‘কাজ’ করে যাওয়া। আমাকেও কাজ করতে দিন।

১৯৭৮ সালের বন্যার সময় নলহাটিতে আমি স্থানীয় বামপন্থী নেতাদের ‘দুর্নীতি’ নিয়ে খবর করি। ‘চণ্ডীদাস’ সাপ্তাহিক পত্রিকার সাংবাদিক হিসাবে। কয়েকজন বামপন্থী নেতা আমাকে মারে। এবং থানায় নিয়ে য়ায়। ১৪ ঘণ্টা আমাকে থানায় আটকে রাখা হয়। আমি তখন রামপুরহাট কলেজের ছাত্র। আমাদের বাংলার অধ্যাপক আশিস বন্দ্যপাধ্যায় (তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান বিধায়ক) আমাকে আক্রমনের প্রতিবাদে রামপুরহাট এসডিও অফিসের সামনে কলেজের ছাত্রদের নিয়ে প্রতিবাদ সভা করেন। এবং ‘ডেপুটেশন’ দেয়। ওই আন্দলনে আমিও ছিলাম।
  ১৯৮৫ সাল। নলহাটি ফিরলাম। প্রথমে ৩০০ টাকা বেতনে দু’মাস ইট ভাঁটায় চাকরি নিলাম। সেই টাকায় মায়ের চোখের ছানি অপারেশন করলাম। সেই সময় আমি প্রাথমিক স্কুলে শিখস্কতার চাকরি পেলেও রাজনৈতিক কারণে আমার চাকরি হল না। সিপিএমের গণ সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন এমন দু’একজনের কথা বলছি। যারা আমাদের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন বীরভূম জেলায়। তাঁরা বললেন তুই নলহাটিতে থাকিস না।এই সময়ে আমি নলহাটিতে ‘প্রগতি মঞ্চ’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তুলি। স্থানিয় ক্ষেত্রে ব্যপক সাড়া পড়ে আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। নলহাটিতে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করি। তিনটে ছবি কলকাতা থেকে নিয়ে যাই। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘পথের পাঁচালি’, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত পরিচালিত ‘গৃহযুদ্ধ’ এবং উৎপলেন্দু চক্রবর্তী পরিচালিত ‘চোখ’। নলহাটির ‘শঙ্কর টকীজে’ ছবি তিনটে দেখানো হয়েছিল। 

জীবীকার প্রয়োজনে আবার কলকাতায় ফিরলাম। কলকাতাতে এসেই বসুমতিতে ‘ফ্রি লান্স’ সাংবাদিকতার চাকরি। ছ’মাস কাজ করার পরও বেতন পেলাম না। এই সময় ‘আনন্দ বাজার’ পত্রিকা থেকে চাকরির প্রস্তাব পাই। কোনও এক অঞ্জাত কারণে চাকরিটা হয়নি। সালটা ১৯৮৭। তারও আগে ১৯৮৪ সালে ‘আজকাল’- এ চাকরি পাক্কা হয়েছিল। সাহিত্যিক সন্দীপনদা আমকে তৎকালীন সম্পাদক পূষন গুপ্তের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। এবং সব কথা ঠিক হয়ে যায়। আমি বিনোদনের পাতায় (বীভাগে) সাংবাদিকতা করব। ১৯৮৪ সালে ‘বর্তমান’ ‘পত্রিকাতে’ও সুযোগ পাই। অদৃষ্টের কি পরিহাস কোনও চাকরি আমাকে করতে দেওয়া হয়নি। খুব সম্ভবত আমাদের জেলার দু’ই স্বনামধন্য ব্যক্তি আমাকে এইভাবে আটকে রাখলেন।
 
১৯৮৬ সালে কলকাতা এসেই একটি ছোট বিঞ্জাপণ সংস্থায় ৬০০ টাকার চাকরি। ৪০০ টাকা নিজের জন্য রেখে ২০০টাকা মাকে পাঠাতাম। এক বছর চাকরি করে পরের বছর থেকে আবার ‘ফ্রি লান্স’ লেখা লেখি এবং অন্যান্য কাজ করে জীবীকা চালিয়ে নিচ্ছিলাম। ১৯৮৮ সালের ২৪ নভেম্বর বিয়ের সিদ্ধান্ত। একটি প্রথম সারির বামপন্থী রাজনৈতিক দল প্রস্তাব দিল বিধানসভা ভোটে দাঁড়ানোর। তাঁরা ফ্ল্যাট সহ কলকাতা শহরে সব দেবে। আমি প্রস্তাব সসম্মানে প্রত্যাখ্যান করলাম। আমার স্ত্রী সাহিত্যিক মনোজ বসুর সম্পর্কে নাতনি।  তাঁর নাগরিক মূল্যবোধ কিছুটা আহত হয়। ১৯৭৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার আগে ১৯৭৪ সালে আমার স্ত্রীর বাবা মারা যান। ওর বাবা বিড়লা সংস্থার পদস্থ কর্মী ছিলেন। মা এবং দাদার সঙ্গে থাকলেও দাদার কাছ থেকে সে রকম সাহায্য পায়নি। তাই তাঁকেও নিজের চেস্টায় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়। কলকাতা শহরে ‘জনঅরন্য’ ‘চৌরঙ্গী’ বা ‘সীমাবদ্ধ’ এর নায়কদের মত ছুটতে শুরু করলাম। সাংবাদিক, লেখক হওয়ার সাধ তখন সলিল সমাধি (‘রেখ মা দাসেরে মনে’)। 
        
কসবায় আমরা থাকতে শুরু করি। আমাদের কিছুটা স্বচ্ছলতা আসতেই তিনজন ভাইপো, একজন ভাগ্নে সহ মাকে কলকাতায় নিয়ে এলাম। এরপর আমার সঙ্গে সেই বিখ্যাত নেতার দেখা হল। তখন একটি ছোট গল্পের বই প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। সালটা ১৯৯৬-১৯৯৭।

সংযোজন পৃষ্ঠাঃ (৩) 
‘সুবর্ণরেখা’ থেকে বইটি প্রকাশ করার সব ব্যবস্থা হয়ে গেল। তারপর আবার সব এক এক করে হারিয়ে গেল। বইটি আজও প্রকাশ করা গেল না। অভিযোগ শুনলাম। আমি ভাইপোদের ব্যবহার করেছি। আজ কলকাতায় সবাইকে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছি। কলকাতায় সব কিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে নলহাটি ফিরলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম সাংবাদিকতা করব। ‘জি নিউজ’ এর তৎকালীন বাংলা চ্যানেল ‘আলফা’ বাংলা থেকে অফারও পেয়ে গেলাম। কপর্দকশূন্য অবস্থায় নলহাটিতে আমি, আমার স্ত্রী, আমার ভাইপো (আমার ছোড়দার একুশ দিনের ছেলেকে আমরা বড় করেছি। কারণ আমার বৌদি ওকে একুশ দিনের রেখে মারা যায়। পরে আমার ওই দাদা আবার বিয়ে করে এবং তাঁর প্রথম পক্ষের দুই ছেলেকে আমাকেই দেখতে হয়।) এগ রোল, ‘মোগলাই পরটার’ ব্যবসা করলাম। পাশাপাশি আমি ‘লেখালেখি’ বজায় রাখলাম। লিটিল ম্যগাজিন করলাম ‘আর্থ-সামাজিক’ নামে।‘জি নিউজের’ ডাকে কলকাতায় আসতে হল। এক দশক আগে যে আভিজাত্য নিয়ে কলকাতায় ছিলাম সে সব এখন ধূসর। ১৯৯১ সালের কঠিন কঠোর বাস্তব চিনেছি। মানুষ, অথবা তাঁরা মুখোশ ব্যবহার করা তথাকথিত ‘কমরেড’। ‘বিপ্লবে’র নামে শপথ নিয়ে তাঁরা মানুষ ঠকায়। চেনা আবেগ দিয়ে এই সব ‘নাগরিক সভ্যতা’ কে আমরা গ্রামীন সভ্যতার মানুষেরা ভুল ঠাউরে বসি। ওদের অট্টহাসির উৎসব চলে। সৌজন্য আছে এমন মানুষদের এঁরা অনন্য এক ভাষায় অচ্ছ্যুত করে রাখে। ওদেরই পরিকল্পিত ‘চক্রব্যুহে’ টেনে আনে। তারপর সময় মত ব্যবহার করে। মসৃণ এক অভিজাত চিত্রনাট্যের চরিত্র করে গড়তে চায় এঁরা। এইসব লোকেদের ‘অহং’ কে চিহ্নিত করা যায় না। এরপরও যদি থেমে থাকি নিজের কাছে নিজেকে ‘ক্লাউন’ মনে হবে। তাই আরও এক ‘পদাতিক’ এর নেশায় আজও ‘মানবতা’ চিনতে চাইছি। 
        
সাম্প্রতিক
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলির যে অঞ্চলে আমরা থাকি সেটাকে ঠিক শহর বলা যাবে না। শহরের উপকণ্ঠ বলা যেতে পারে। বিশেষত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের জন্য। সাংবাদিকতার সুবাধে গত ১৪-১৫ বছর এই অঞ্চলে আছি। আমি এই শহরে জন্মগ্রহণ করিনি। এখানকার স্কুল কলেজে পড়িনি। স্থানীয় দাদাদের নেতৃত্বে সংগঠিত অপ্রয়োজনীয় প্রচার হয়েছিল। কারণ আমার সত সাংবাদিকতায় অনেকে পদচ্যুত হয়েছেন। অনেকের মুখোশ খুলে গেছে। আরও অনেকের মতো শ্রদ্ধেয় তৃণমূল নেত্রী এবং বর্তমানে রাজ্যে তাঁর দলের দ্বিতীয় বারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০০৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ এ জয়েন করার কথা বলেছিলেন। কেন্দ্রীয় কমিটিতে নিয়ে নেবার কথাও বলেছিলেন। আমি সম্মানের সঙ্গে আমার অনিচ্ছার কথা জানাই। তখন আমি ‘Zee News’ এ চাকরি করি। পরবর্তীতে তাঁর কাছ থেকে অকৃত্রিম সাহায্য পেয়েছি। আমি রাজনীতির লোক নই। বাংলা তথা ভারতীয় সংস্কৃতির ‘সেবাদাস’ হয়ে কাজ করতে পারলেই আনন্দ পাব।
২০০৯ সাল থেকে যে ধারাবাহিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়লাম, এটা অনেকে জানতে চাইছেন। ২০০৯-২০০১১ পর্যন্ত তিন তিন বার ‘২৪ ঘণ্টা’ বাংলা ‘নিউজ চ্যানেলে’ চাকরির সুযোগ হল। তারপর ২০১১ সালে আনন্দবাজার পত্রিকাতে। ২০১২ সালে ‘এই সময়’ দৈনিকে। কিন্তু না নাগরিক কলকাতা আমাকে মানতে পারল না। 
দিন কয়েক আগে একাডেমী যাচ্ছিলাম। রঙরূপের ‘অব্যক্ত’ নাটক দেখতে। অবিশ্রান্ত বৃষ্টি পড়ছে। যেন মুসল পর্ব শেষ হচ্ছে। ধুয়ে দিচ্ছে। শিশির মঞ্চের পেছনের দিকটায় (নন্দনের উল্টোদিকে) একটা বন্ধ দড়জা শেডের তলায় আমরা দাঁড়িয়ে। জনপ্রিয় নাট্য ব্যক্তিত্ব দেবশঙ্কর হালদার আর আমি। দেবশঙ্করদা আমাকে চেনেন বুঝলাম। তিনি ‘বহুরূপী’ এর প্রযোজনায় একটি ঐতিহাসিক নাটকের কথা বলছিলেন। সেই নাটককে কেন্দ্র করে একটি বিতর্কের প্রসঙ্গ এল। আমিও সাংবাদিক, লেখক, শিল্পীদের সীমাবদ্ধতার কথা বললাম। প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের আলাপ চারিতায় পরস্পরে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে, কাজ করতে গিয়ে বাঁধা, বিঘ্ন, সমস্যা, সামাজিক, পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা, জটিলতা, কূটিলতা আসবেই, তবু বৃত্ত পরিপূর্ণ করতে ‘কাজ’ আমাদের করে যেতেই হবে। পারিবারিক বৃত্ত। পারিবারিক দায়বদ্ধতা, অনুভূতি, আবেগ আরও সন্নিকটে চিনলাম। সম্প্রতি ‘নাটক বিষয়ক’ একটি লেখার জন্য নাটক সংক্রান্ত কয়েকটি বই পড়তে হচ্ছে। শ্রদ্ধেয় নাট্য ব্যক্তিত্ব দেবাশিস মজুমদার সম্পাদিত শূদ্রক থেকে প্রকাশিত ‘তৃপ্তি মিত্র’ বইটি পড়লাম। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক বাসু ভট্টাচার্য লিখছেন, ‘’............... শম্ভু মিত্র তার স্বরচিত নাটক ‘চাঁদ বণিক’ এর পালাটি শেষ অবধি মঞ্চস্থ করলেন না-। ওই নাটকটা বেশ কয়েকবার শম্ভুদার মুখেই শুনেছি। ওই নাটকটা তৃপ্তিদি থাকতে থাকতে মঞ্চস্থ হবার প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন ছিল চাঁদ বণিক, সনকা, এবং বেহুলার ভূমিকায় শম্ভু-তৃপ্তি-শাওলীর একত্রিত হওয়ার—এক সাথে। একই মঞ্চে। এঘটনাটা যদি ঘটত তাহলে আমাদের সৌভাগ্য হত এমন একটা নাটক দেখার, যে নাটক আজ অবধি অনেক অনেক না দেখা নাটকের—না জানা নাটকীয়তার—অনেক না বোঝা দৃষ্টিকোণের অনেক ঝাপসা বক্তব্যের সামনে থেকে পরদা তুলে দিত।‘’
এই জীবনবোধের পরে। অথবা এই উপলব্ধির একাগ্রতায় পারিবারিক বৃত্ত কে কোন অহমিকায় বিসর্জন দিতে চায় আহাম্মকের দল? যেখানে গদ্য থেমে যায়। কবিতার মাদকতায় প্রেম চুপি চুপি বলে আমি সাদা ফুলে আছি। আমি লাল ফুলে ছিলাম। আমি ভালবাসায় আছি। আমি সমাজে থাকতে চাই আমাকে সমাজে থাকতে দাও। তোমরা অর্থ নাও। যশ নাও। মান নাও। আমাকে পরিবারে থাকতে দাও।                         
      


Saturday, 30 April 2016

বাংলার চতুষ্পাঠী

বাংলার চতুষ্পাঠী

দীপেন্দু চৌধুরী 


আকাশ সেদিনও খোলা আজও চিরঅম্লান আহ্বানে উন্মুক্ত। তবুও এক সুদৃঢ় শৃঙ্খলায় আমাদের জানান দিচ্ছে, বিশৃঙ্খল সাময়িকভাবে বাহুল্যহীন মনে হতে পারে। স্থায়ীভাবে কি সম্ভব? ঠিক তেমনি স্বাধীনতা তথা মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানে বিশৃঙ্খলা নয়। সম্প্রতি ‘সোশাল মিডিয়ায়’ একটি দুটি অপ্রয়োজনীয় পোস্ট নজরে পড়ছে। এই সব লেখা সামাজিক জীবনে ব্যপক দূরত্ব তৈরি করতে সহায়ক হয়। ধরা যাক কোনও এক নাট্য ব্যক্তিত্ব, সাহিত্য ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত এমন অথবা রাজনৈতিক ব্যক্তি। এই সব ব্যক্তিদের পরস্পরের ধারাবাহিকভাবে কয়েক দশকের সুসম্পর্ক আছে। কেউ ‘সোশাল মিডিয়া’ ব্যবহার এবং উপভোগ করেন কেউ কেউ করেন না। তবুও বর্তমান ‘লক্ষ্মী চঞ্চলা’ সময়ে একটা ‘শৃঙ্খলা’ খোলা আকাশের উদার ন্যায় নীতি মেনেই চির বহ্নিমান হয়ে উঠছে। সম্প্রতি ‘ফেসবুকে’ শ্রদ্ধেয় নাট্য ব্যক্তিত্ব শাওলি মিত্রকে নিয়ে একটি অবাঞ্ছনীয় এবং অপ্রয়োজনীয় লেখা আমার নজরে পড়েছে। যদিও আমি লেখাটি শেয়ার করিনি। এবং করতেও চাই না। আমাদের অসময়ে এই সব ব্যক্তিরা আড়াল থেকে কাউকে বুঝতে না দিয়ে ভালো কিছু করার জন্য উৎসাহ দিয়ে থাকেন। তিনি এবং তাঁরা এসএমএস করেন ‘তোমরা ভালো থেক’। ‘তোমার নতুন কাজের শুভ কামনা করি। সাফল্য কামনা করি’। এই সব ব্যক্তিরা ‘নাথবতী অনাথবত’ হয়েই থাকেন। বছর চারেক আগে শাওলীদির সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে জানতে পারি তাঁর সঙ্গে বিগত মন্ত্রীসভার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সরাসরি কোনও যোগাযোগ নেই। তাঁর এক সহকর্মী তথা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তিনি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ২০০৯ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত যোগাযোগ রাখছেন। তাই ব্যক্তি শাওলী মিত্র   তিনি ‘বঙ্গশ্রী’ উপাধীতে ভূষিত হলেন না ‘নাট্যশ্রী’ তে ভূষিত হলেন সেটা তাঁদের মত ব্যক্তিত্বদের কাছে কিছু এসে যায় না। নাট্য ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠা এবং বাংলার নাট্য আন্দোলনে তাঁর কতটা অবদান সেটা আজ ইতিহাস। সম্ভবত তিনি ‘ফেসবুক’ ব্যবহার করেন না। আর যারা আমাদের ‘আঁধার মানিক’ সস্তায় উপহার দিতে চান তাঁদের আলিঙ্গনের আহ্বান জানিয়ে বলছি, সোনার হাঁস চিনতে জানালেন না। ‘পাভলভ’ তত্বের ঘণ্টা কি করে বাজাবেন? হয় নিজেদের সংহত করুন না হলে নাট্য অ্যাকাদেমির শুকনো বাগানের পরিচর্যা করুন। বাগানের রঙ দেখার কি দরকার?  আপনি বা আপনারা কি করবেন সেটা বলা মানে খোলা আকাশের আন্তরিক আহবানকে অবঞ্জা করা হয়! ‘কানা ছেলের নাম পদ্ম লোচন’। গত কুড়ি কুড়ি বছর আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে নাটক ওয়ালাদের ‘বহুরূপী’ মঞ্চের দর্শক আসনে স্থান পাওয়ার যোগ্যতা হয়নি। এবং একই সঙ্গে উচ্চারণ করতে চাই নিজের সত্য-অসত্য ‘সংলাপ’ নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম ‘রুদ্ধ সংগীত’ শোনার রুদ্ধ দ্বার আজও খোলার অবকাশ পাইনি।  কেউ কেন যেন বারে বারে বলে ‘এখনো গেল না আঁধার, এখনো রহিল বাঁধা’। ‘নাট্যজন’ সমাজের বাইরে থেকে চিনেছি অনেক অনেক আলোক বর্ষের তারকাদের। মানবতার কাজ করতে গেলে নির্দিষ্ট কোনও পাত্র বা জলাধারের কি প্রয়োজন? মানবতার কি কোনও পদবী হয়? কোনও পুরষ্কার দিয়ে বলতে হয়, ‘আপুনি মানবতার জন্য কাজ করুন গা’। নাট্য ব্যক্তিত্ব হতে গেলে ‘পানিপার’ ও হতে হয়। বলা শোভা পায় না ‘আমি কি পানি পার’? বাল্কল পড়ে যে সব প্রণাম্য ব্যক্তি বাংলার রঙ্গালয় গড়ে দিয়ে গেছেন। তাঁরা জল বয়ে আনা থেকে ‘বারবণিতাদে’র বাংলার নাট্য মঞ্চে নিয়ে এসে নাট্য সেবক তথা নাট্য সেবায়েত করে গড়ে তুলেছেন। পরে এঁরা সকলেই নাট্য পূজারী হয়েছেন।                             
‘এক পুরুষে করে তিন পুরুষে খায়’ এই প্রবাদটার ব্যবহারিক উপযোগিতা কি সব সময় পাওয়া যায়? এই বাংলার কিছু স্বনামধন্য পরিবার আছে। তাঁরা তিন পুরুষ, চার পুরুষ এবং কয়েক প্রজন্ম ধরে এই বাংলার নীল আকাশের নীচে আমাদের আলো দিচ্ছেন। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায়,      শম্ভু মিত্র, ঋত্বিক ঘটক, অমর্ত্য সেন, নরেন দেব, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রুদ্রপ্রসাদ সেন গুপ্ত, উৎপল দত্ত, উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন, কমল কুমার মজুমদার, প্রফুল্ল সরকার, (পৃষ্ঠপোষক)  ইত্যদি। প্রতি মুহূর্তে  স্মরণযোগ্য এইসব পরিবারকে আমাদের ‘বাংলার চতুস্পাঠিতে’ ব্যকারণ পড়াতে এবং পড়তে লাগবেই। চারদেওয়ালের চারপেয়েতে বসেও বলা যায় ‘আমি যাবই বাণিজ্যেতে যাবই’।
নাটকে রাজনীতি সেদিনও ছিল আজও আছে। উৎপল দত্ত সম্পাদিত ‘এপিক থিয়েটারে’র বিশেষ সংখ্যায় (১৯৮১) ‘রাজনৈতিক থিয়েটার ও আত্ম সমালোচনা’ প্রবন্ধে হীরেন ভট্টাচার্য লিখছেন, ‘’এদিক থেকে দেখতে গেলে রাজনৈতিক থিয়েটার আগেও ছিল এখনো আছে। বাংলা নাটকের উদ্ভবপর্বে রামনারায়ণ-মাইকেল-দীনবন্ধুর নাটকে সামন্ত ব্যবস্থা বিরোধী, প্রগতিশীল, সেক্যুলার সারবস্তু ছিল তা অবশ্যই রাজনৈতিক কেননা তাতে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সার বস্তুরই শিল্পরূপ আমরা পাই। পরবর্তীকালে গিরিশ-অমৃতলালের যুগে নাটকে একই সংগে যে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার প্রগতি এবং ধর্মীয় ও সামাজিক প্রশ্নে নানা পরাগগতির চিহ্ন দেখা দিয়েছিল তাও রাজনৈতিক বিষয়ই। পরাগতির দিকটাও রাজনৈতিক পরাগতি বলেই ধরতে হবে, কেননা তাতে বুর্জোয়া শ্রেনীর বিপ্লবের দিকস্থিতি (অরিয়েন্টেশান) পরিবর্তনের প্রতিফলনই ঘটেছিল। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের নাটকেও উদ্ভবপর্বের রাজনৈতিক চিন্তার ফলগুধারা তাঁর শেষ পর্বের (রথের রশি ইত্যাদি) নাটকে ফলগুতত্বের অবগুণ্ঠন ত্যাগ করে প্রকাশ্যেই প্রবাহিত। এ যুগেই মন্মথ রায়ের ‘কারাগার’ পৌরানিক নাটকের বাতাবরণে সম্পূরণতই রাজনৈতিক নাটক। (হতে পারে তাতে গান্ধিবাদের প্রভাব রয়েছে, কিন্তু গান্ধীবাদও একটি রাজনৈতিক মতবাদ)। তারও পরবর্তীকালে গণনাট্য আন্দোলন তো রাজনৈতিক থিয়েটারকেই তার ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করেছে। আজকের দিনে পশ্চিমবংগে যে অসংখ্য গ্রুপথিয়েটার বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এরা প্রত্যেকেই তাদের রাজনৈতিক ধ্যানধারণাকেই নাট্যরুপে উপস্থিত করছেন! এটা হতে পারে যে রাজনৈতিক চিন্তাধারার ক্ষেত্রে সকলেই ঠিক এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই।‘’ (পৃষ্ঠা- ৫৪)

বাংলার অচল পয়সা নিয়ে খেয়াল তামাশা করার সময় আমরা সম্ভবত পেরিয়ে এসেছি। ধ্রুপদী বাংলার তান গত দু’বছর আগে টান টান ভৈরবী সুরের পল্লবিত লহমায় বাধাঁ শুরু হয়েছে। আপনি বা আপনারা সেই যঞ্জে সম্মিলিত হবেন কি হবেন না সেটা অবশ্যই ‘বৃহন্নলা’ কাহিনীর চিত্রনাট্যে লেখা থাকবে। অবঞ্জা ঞ্জাত সারে হোক অথবা অঞ্জাতসারে। তাম্বুক সেবন করে হোক বা স্বাস্থ্যবিধি সচেতনতায়। অথবা ‘সবার চৈতন্য’ হোক এই গরিমায়। আপনাদের আস্তেই হবে নব ‘বাংলার চতুস্পাঠি’তে।         

Thursday, 28 April 2016

গণতন্ত্রের পরিভাষা

সবিনয় নিবেদন,
আপনাদের সমীপে অবান্তর আলাপ করার ঔদ্ধত্য দেখাতে সাহস করে উঠলাম ‘সামাজিক সাংবাদিকতা’ (Social Media) এর খোলা বাতাসের প্রশ্রয়ে। নিজের বাড়বাড়ন্ত দেখানোর অনধিকার চর্চা না করে শুধু এই কথাটা রাখব। রাখব অযত্নলালিত ‘শিল্পসংস্কৃতির’ এক উঠোন আড়ম্বর প্রশ্রয়ে।
আকাশের সঙ্গে অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু যোগ্যতা নেই। আবেগ কখন ঘুমিয়ে পড়ল। তবুও বড় কথার মানুষ নেই পাশে। বাতাসের সঙ্গে বেড়াতে ইচ্ছে করে। কিন্তু গাছেরা বড় শান্ত। প্রশ্রয় দেবার আকাশে তারা নেইত। আজ নেই। সেও না হয় মেনে নেবার অবকাশ খুঁজে নেওয়া যাবে। মাকড়সার আঠা মাখানো শিল্পীর তুলিতে আঁকা বহুকথিত সমাজ আছে। আপনারা কি একমুঠো প্রশ্রয় দেবেন? আপনাদের তিলত্তমা প্রশ্রয়ে যদি নিজের অবস্থান হয়, জানি অচল পয়সার মত নিজেকে আড়াল করতে করতে শুনতে হবে। কেটে পড়ুন মশায়। সটান এবং সপাটে বলতে চাই, বুদ্ধবাবু হেলে নয় ‘কেউটে’ ধরেছেন। বুদ্ধুবাবু হেলেও ধরতে পারেন। কেউটেও ধরতে পারেন। যার কথা ধার করে লিখলাম তিনি হয়ত ব্যক্তিগতভাবে বমাপন্থী দলে নেই। কিন্তু চাষার ব্যাটা রেজ্জাক মোল্লা, সিপিএমের উত্তর অনিল বিশ্বাস যুগে ‘দ্বন্দমূলক বস্তুবাদ’ বোঝার অন্যতম কারিগর। আমি জানিনা, আমার মত জনপদের সাংবাদিককে রেজ্জাকদার মনে আছে কিনা। আমার মত ‘হারমাদদের সর্দারকে’ রেজ্জাকদা কতটা মনে করতে পারবেন। সেই রেজ্জাকদার কথা উল্লেখ করেই বলছি, বুদ্ধুবাবু কেউটে ধরেছেন।
কংগ্রেসের সহ-সভাপতি রাহুল গাঁধির শৈশব, কৈশোর আক্রান্ত। তিনি এক বাঁও, দো বাঁও গুনতে গুনতে এগিয়ে আসছেন দেশের যোগ্য নেতা হওয়ার দাবিতে। বুদ্ধবাবুকে এদিন যতটা আবেগপ্রবণ দেখাচ্ছিল বহু বছর এই আবেগ দেখা যায়নি। যে কথা তিনি তাঁর তাত্ত্বিক বক্তব্যের ভাঁজে ভাঁজে বুঝিয়ে দিতে চেস্টা করেছেন।     
কিছুদিন আগে ‘মানুষের জোট’ গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন তুলেছিলাম হাজরা পার্কে ‘কংগ্রেসের সভা মঞ্চে’ দীপা দাশমুন্সির পাশে একসঙ্গে কি বুদ্ধবাবুকে দেখা যাবে? আমার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে আরও বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে। ২৭ এপ্রিল, ২০১৬ কলকাতার ‘পার্ক সার্কাস’ ময়দানে কংগ্রেস এবং সিপিএমের যৌথ নির্বাচনী প্রচারসভা ছিল। মঞ্চে হাজির কংগ্রেসের সহ-সভাপতি রাহুল গাঁধি সহ এক ঝাঁক প্রদেশ কংগ্রেসের নেতা নেত্রী এবং অবশ্যই দীপা দাশমুন্সি। সিপিএমের কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সহ কয়েকজন সিপিএমের যুব নেতা।
সিপিএমের রাজ্য কমিটি এবং রাজ্য সম্পাদক মণ্ডলীকে ধন্যবাদ। শেষ পর্যন্ত এই বাংলার বৃহত্তর স্বার্থে ‘কংগ্রেসের সভামঞ্চে’ বামপন্থীদের মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নেতাকে পাঠানোর জন্য। প্রদেশ কংগ্রেস কমিটিকেও ধন্যবাদ। যদিও এর আগে কংগ্রেস সভাপতি সনিয়া গাঁধির দুটি জনসভায় সিপিএম প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। সংবাদ মাধ্যম সূত্রে আমরা জানতে পারছি, বুদ্ধবাবুকে কংগ্রেসের সভায় পাঠানোর জন্য সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির একটি অংশ ক্ষুব্ধ। এই বিষয়ের সাংবাদিকদের  প্রশ্নের মুখে সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি এদিন বলেছেন, ‘’পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাই এখন বাস্তব প্রয়োজন। মানুষ যা চাইছে, উপর তলায় তারই প্রতিফলন ঘটছে। তা ছাড়া বুদ্ধদেব এখন পলিটব্যুরো বা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নন।‘’
  ক্ষোভের কারণ যাই থাক। যে দলের ‘লৌহ কপাট’ ভাঙ্গছে সেই দলের ‘ক্ষোভ’ বাইরে আসা মানে বৃহত্তর গণতন্ত্রের পরিভাষা তৈরি হওয়া। কারণ পরিভাষায় গণতন্ত্রকে বলা হয় ‘বৃহত্তর সাধারণ মণ্ডল’ ইংরেজিতে ‘The greater common good’। কিন্তু এর পরে কি? আর মাত্র কয়েকটা দিন। তারপরে বাংলার ‘জনতার আদালত’ রায় দেবে। সম্প্রতি একটি সূত্রে জানতে পারলাম রাজ্য সিপিএমের প্রথম সারির নেতৃত্ব এই মুহূর্তে সরকারে যেতে আগ্রহী নয়। দলের কয়েক জন প্রথম সারির শীর্ষ নেতা দলটাকে নতুন করে গড়ে তুলতে আগ্রহী। যতটা সম্ভব ‘বেনো জল’ বের করে দলটার খোল নলচে বদলে দিতে চান এইসব নেতৃত্ব। সেই কারণে আগামী দুবছর বামপন্থিরা ‘বিরোধী’ আসনে বসে ‘দায়িত্বশীল বিরোধী’ দলের ভূমিকায় নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। বাংলার ‘শিল্পায়ন’ ‘গণতন্ত্র’ এবং বাঙ্গালির মূল্যবধকে তার স্ব মহিমায় ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী এই গোষ্ঠীটি। সম্ভবত খুব সঠিক সিধান্ত। কারণ দলের পুরনো কিছু ‘বেনোজল’ আবার মাথা তুলতে চাইছে। দাঁত নখ বের করে তাঁরা নিরীহ মানুষের উপর খবরদারি করতে চাইছে। রাহুল গাঁধির নেতৃত্বে একদল ‘কংগ্রেসের মূল্যবোধে’ বিশ্বাস করে এমন নতুন যুবক-যুবতি এই বাংলার উন্নয়ন দেখতে চাইছে। সময় বলব কোন গাছের ছায়া শীতল হবে।      
যদিও আমারা জানিনা ১৯ মে কি হবে। ‘সোসাল মিডিয়া’ মারফৎ  বামপন্থীদের একটি সান্ধ্য দৈনিকে দেখালাম ‘জোট’কে দেওয়া হয়েছে ১৬৭ টি আসন। আর তৃণমূলকে দেওয়া হয়েছে ১২৭টি আসন। এই হিসাব ধরলে বিজেপি সহ অন্য দল গুলি শূন্য। যদি ধরে নেওয়া যায় কাগজটি তার পাঠককে টার্গেট করে এই খবর করেছে তা হলে ঠিক আছে। কিন্তু এই হিসাব ধরে কোনও আহাম্মক ‘উত্তর সম্পাদকীয়’ লিখবে না। মূল্যবোধ আছে এমন উচ্চ শিক্ষিত কিছু নির্বাচিত ‘তৃণমূল’ বিধায়ক নতুন ঘরানায় না থেকে অন্য কিছু ভাবতে পারেন। বিগত পাঁচ বছরের মূল্যায়ন করে এই সব নব নির্বাচিত তরুণ বিধায়করা পূর্বাশ্রমের মঞ্চে ফিরে আসলেও অবাক হওয়ার মত কিছু থাকবে না। সর্বপরি তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি নিজের দায়িত্বে ভোট চাইছেন। তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তিনি আবার নিজে পরখ করে দেখতে চাইছেন। এবারের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ‘বিজেপি’ তাদের আসন সংখ্যা বাড়ানোর সব রকম প্রচেষ্টা করছে। বেশ কয়েকটি আসনে তুল্য মূল্য বিচারের লড়াই আমরা দেখব। পাশাপাশি থাকবে এসইউসি, নকশালপন্থীর মত দল। 
গত প্রায় চার দশকের পশ্চিমবঙ্গে সব থেকে জটিল অবস্থা সম্ভবত মানুষের মূল্যবোধের। ১৯৭৭ সালে বাম্পন্থীরা যখন ক্ষমতায় এসেছিল তখন দীর্ঘকালীন লড়াইয়ের কারণে সামাজিক মূল্যবোধের কারণটা ছিল অনেক অনেক গভীরে। উদবাস্তু জীবনের স্বজন এবং দেশ হারানোর একটা নিবিড় যন্ত্রণাও ‘বাংলার সংস্কৃতি’ গড়ে ওঠার কারণ ছিল। পশ্চিমের হাওয়ার ঝাপ্টাকেও মনে রাখতে হবে। ফরাসী ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব এই দেশে তথা এই বাংলায় ব্যপকভাব দেখা যায়। তার কিছুদিন আগেই ‘তে ভাগা আন্দোলন’ ছুঁয়ে এসেছে এই বাংলা। কৃষক আন্দোলনের নেতারা এই সেদিন পর্যন্ত কমরেড লেনিনকে উধৃত করে লিখেছেন, We are told: ‘’If the peasants seize the land now, it is the richer peasants who will get it those who have animals, implements etc.; would this, therefore, not be dangerous from the point of view of the poor peasants.’’ Comsade, I must dwell on the argument, because our party, in all our divisions, programs and appear to the people, dulaares: ‘We are the party of wage-workers and poor plasants’,  it is their inbereals we are to protect; it is through them, and through them alone, through those clause, than mankind can excape the horrors (First Congress of peasant deputies-Vol, 24, page 402)। বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
সত্তরের দশকেও রবীন্দ্র উত্তর যুগে ‘বামপন্থী সংস্কৃতির’ সঙ্গে ‘জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতির’ সংঘাত থাকলেও বাংলা তথা বাঙ্গালির ‘মূল্যবোধ’ ভেঙ্গে পড়েনি। বিশ্বায়ন সংস্কৃতির যতই দাপট থাক পারিবারিক, সামাজিক মূল্যবোধ ভেঙ্গে বেড়িয়ে আসব কেন? এই প্রশ্ন তুলে আমরা চণ্ডী মণ্ডপে, পাড়ার রকে, চায়ের দোকানে, অশ্বত্থ গাছের ছায়া শীতল বৈঠকি আড্ডায় মশগুল ছিলাম। পারিবারিক, সামজিক আভিজাত্যের অহংকারে।
কিছুদিন আগে উচ্চ শিক্ষিত এক প্রবীণ মানুষের সঙ্গে আলাপ হল। একটি পাক্ষিক পত্রিকার অফিসে। তার সঙ্গে আলাপচারিতায় বললাম, আগে পরস্পরকে চিনি। সামাজিক সম্পর্কটা আগে হোক। তারপরে রাজনৈতিক বিষয়টা আলোচনা করা যাবে। তিনি অট্টহাসিতে আমাকে আলিঙ্গন করে বললেন, ‘’অসম্ভব ভালো কথা বলেছেন। আজ আমাদের প্রয়োজন পরস্পর পরস্পরকে সম্মান করা। সামাজিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনা। সুনন্দ সান্যালের মত অধ্যপককে যদি অসম্মান করা হয় সেটা আপনারা মেনে নিতে পারেন আমরা মেনে নিতে পারব না।‘’

পশ্চিমবঙ্গে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সব স্তরের নাগরিকের। কোনও একটি দলের কয়েকজন নেতার দায়িত্ব নয়। কংগ্রেস, বামপন্থীরা যেমন করে ভাবছে, তৃণমূল দলের কিছু নেতা সম্ভবত নিজেদের মত করে ভাবতে চাইছেন কিভাবে দলটির পুনঃনবীকরণ করা যায়। প্রায় গত দু’দশকের ঘনঘটা ভুলে ‘পশ্চিমবঙ্গকে’ নতুন করে তোলার শপথ নিতে হবে নির্বাচিত সরকার এবং বিরোধী বেঞ্চের বিধায়কদের। এই ক্ষেত্রে মারটিন লুথার কিংকে আমরা মনে করতে পারি। তিনি বলেছিলেন, ‘যে কোনও জায়গায় অন্যায় ঘটলে সেটা সব জায়গায় ন্যায়ের পক্ষে বিপজ্জনক’’                               

Monday, 18 April 2016

একটু পা চালিয়ে ভাই

পশ্চিম বঙ্গে মুসলপর্ব কি পেরিয়ে এলাম?
‘নিহিত পাতালছায়া’ কাব্যগ্রন্থে ‘বিপুলা পৃথিবী’ কবিতায় কবি শঙ্খ ঘোষ বলছেন, ‘’একদিন সে এসে পড়েছিল এই ভুল মানুষের অরণে্য।/ হাতে তাদের গাঁ ছুঁতে গিয়ে কর্কশ বল্কল লাগে বারে বারে।
আজ মনে হয় কেন সে গিয়েছিল। সে কি ভেবেছিল তার চিকন মোহ উদ্ভিন্ন করে দেবে অন্ধকারের শরীর? সে কি যেন মেঘলা জল কালো বনের মাথায়? প্রতিটি পাতা তার নন্দন বরণ করে নেবে সবুজ কৃতঞ্জতায়? আঙুরের আভার মতো দৃষ্টি-ধুয়ে-দেওয়া প্রান্ত বেলা?
আজ মনে হয় কেন সে ভেবছিল। সেই অরণ্যের মধ্যে সেও এক তামসী বৃক্ষ যে নয়, এই কি তার জীবন?’’

চতুর্দশ বিধানসভার শেষ অধিবেশনে আমি একটি প্রথম সারির দৈনিক সংবাদ পত্রের সাংবাদিক হিসাবে বিধান সভায় হাজির ছিলাম। ২০১১ সালের ২৫ মার্চ ছিল বামফ্রন্ট সরকারের শেষ বিধানসভার অধিবেশন। এই অধিবেশনে প্রাক্তন স্পিকার হাসিম আব্দুল হালিম এক ঘণ্টা ১৬ মিনিট বক্তব্য রেখেছিলেন। নিজের আসনে বসে। কি বলেছিলেন তিনি? আমি যতটা নোট নিতে পেরেছিলাম, ‘’১৯৭৭ সালের মে মাসে প্রথম নির্বাচিত হই। জ্যোতি বসুর ক্যাবিনেটে আইনমন্ত্রী ছিলাম। ‘পরিবর্তন’ এর কথা খুব প্রচলিত হয়েছে। ‘পরিবর্তন’ কোনদিন কখন কোথায় হবে? ১৯৯৭৭ সাল থেকে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। গ্রামের কি অবস্থা ছিল? গ্রামজীবনে সামাজিক পরিবর্তন হয়েছে। সব করেও আবার পরিবর্তন থাকবে। কী পরিবর্তন? ব্যক্তি না নীতির পরিবর্তন? মানুষের স্বার্থে কোন পরিবর্তন দরকার? যত কাজ হবে তত ঘাটতি থাকবে। যারা নবনির্বাচিত হয়ে আসবেন তাঁদেরও শিক্ষা, শিল্প সব বিষয়ে দেখতে হবে। আশা করব আমার জায়গায় যোগ্য লোক আসুন। আমি গর্বিত এতদিন এই পদে থাকতে পেরে। আমরা নতুন নতুন জিনিস আনতে পেরেছি। সরকার কিভাবে কাজ করবে তার নিরদেশ দেওয়াই আমাদের ভূমিকা। নতুন প্রজন্ম আসবে তাদের হাতে ক্ষমতা দেওয়া হোক। ১৫৮টা আইন করতে হয়েছে আমাদের। ১৮ বছরের ভোট দেওয়ার অধিকার এই রাজ্যে প্রথম। পশ্চিমবঙ্গ যে মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে আরও সভ্যতা আনা দরকার। সমাজ পরিবর্তন সংসদীয় গণতন্ত্রে হবে কিনা জানি না। আংশিকভাবে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাছে আমি কৃতঞ্জ। তিনি যেভাবে সাহায্য করেছেন। বিরোধী দল নেই। তবুও বলব পার্থবাবু সব সময় সাহায্য করতে পারেননি। আবু হেনা এবং কংগ্রেসের দু’একজন শীর্ষস্থানীয় বিধায়ক সাহায্য করেছেন। সংসদে মানুষের স্বার্থে কাজ করতে হবে। ভাঙচুর, অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করা ঠিক নয়। 
আমি আশা করব কেউ চিরস্থায়ি নয়। দেশ মানুষের থেকে বড়। এই বিধানসভা আমার থেকে বড়। কিন্তু এখনকার রীতিনীতিকে মর্যাদা দিতে হবে। বিরধীদলের কোন স্বীকৃতি ছিল না। তখন ওদের ৪৮ জন সদস্য ছিল না। বিরোধী দলের নেতার কোনও স্ট্যাটাস ছিল না। জ্যোতিবাবুকে বলে ৩০ জনের দলকে বিরোধী দলের স্বীকৃতি দেওয়া হল। আমি আশা করব আগামীদিনে সভা আরও উচ্চতায় যাবে। আমি আশা করব বিধানসভা আরও দায়িত্বশীল হবে। শান্তির পরিবেশ ফিরিয়ে দিন। আমার আবেদন আপনাদের সকলের কাছে।‘’   
২০০১১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ এর কোনও অধিবেশনে উপস্থিত থাকার মতো সৌভাগ্য আমার হয়নি। এবছর আবার এই রাজ্যে বিধানসভার ভোট। গত দু’বছর আগের একটি শ্লোগান সিপিএম তথা বামফ্রন্ট ফিরিয়ে এনে সোশাল মিডিয়ায় ব্যবহার করছে। ‘পরিবর্তন’ তো অনেক হল এবার প্রত্যাবর্তন এর পালা’। এই শ্লোগানটির সঙ্গে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ছবি। এবারের বিধানসভার ভোট তরুণ প্রজন্মের কাছে এক নতুন অভিঞ্জতা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ন্যায়ের লড়াই। সার্বিকভাবে দীর্ঘায়ত এক অচেনা অশুভ শক্তির সঙ্গে শুভ শক্তির যুযুধান লড়াই। এই লড়াইয়ে দু’টি ভিন্ন মেরুর রাজনৈতিক দল জোট করেছে। কংগ্রেস-সিপিএমের জোট গঠন নিয়ে যতই চাপানউতোর হোক। বামপন্থীদের সঙ্গে কংগ্রেসের জোট নতুন কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ১৯৩৬ সালে ভারতের কমিউনিস্টরা সাময়িকভাবে কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কমিউনিস্টরা মূলত তিনটে থেকে চারটে দলে ভাগ হয়ে দেশের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ১৯৭৭ থেকে ২০০১১ যে সভ্যতায় আমার বড় হলাম। গ্রাম-বাংলার মুখে ভাষা এল। নিম্ন বর্ণের মানুষ স্বাধীনতা পেল। বর্গাদার আন্দোলন স্বীকৃতি পেল। গ্রাম পঞ্চায়েত ব্যবস্থা নতুন এক সভ্যতা চিনতে এগিয়ে এল। এই দীর্ঘ সময়ে কেন্দ্রে বেশিরভাগ সময়টাই কংগ্রেস ছিল। গ্রাম পঞ্চায়েতের মাধ্যমে শাসন নিম্ন বর্গের মানুষের হাতে তুলে দেওয়ার পথ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু বাতলে দিয়েছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এবং পরে ১২৯ বছরের পুরনো দলটি বিভিন্ন পরম্পরা বজায় রেখে আপন গরিমায় ভাস্বর থাকতে চেয়েছে। স্বাধীনতা উত্তর ভারতে কংগ্রেস যে উল্লেখযোগ্য কাজগুলি করেছে। পরপর সাজিয়ে দিলে আসে (১) দেশের ‘গণতন্ত্রকে’ নাগরিক জীবনে আরও উন্নত মানে নিয়ে যেতে সাহায্য করা। (২) জমিদারি প্রথার অবসান। (৩) বৃহৎ শিল্পের পরিকাঠামো এবং পরিবেশ তৈরি করা। (৪) শিল্পনগরী গড়ে তোলা। (৫) ব্যাঙ্ক জাতীয় করণ। (৬) প্রথম শ্রেণীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আই আই টি, আই আই এম প্রতিষ্ঠা। (৭) দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।(৮) দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্রকে স্বগরিমায় লালিত্য এবং লাবণ্যে ধরে রাখা। এবং অর্থনৈতিক সংস্কার। এই পর্যায়ে দু’টি ইউপিএ সরকার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের নেতৃত্বে আর্থিক সংস্কার যেমন করেছে। অবশ্যই উল্লেখযোগ্য কাজ সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যপক সংস্কার। তারমধ্যে অন্যতম খাদ্য নিরাপত্তা আইন বা ১০০ দিনের কাজ। তথ্য জানার অধিকার আইন, শিক্ষার অধিকার আইন। শিশুশ্রমিক প্রথা বিলোপ বিলের প্রস্তাব এবং মহিলাদের সামাজিক নিরাপত্তা বিলের প্রস্তাব। ভারতীয় গণতন্ত্রের বিকাশের এই পর্যায়ে আমাদের দেশ তথা কংগ্রেস পেল এক অত্যন্ত সম্মানজনক নেত্রীকে। আড়াল থেকে নয়। একদম সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গাঁন্ধি।
বাম জামানার দীর্ঘ ৩৪ বছরের শাসনে আমরা স্ববিরোধ পরিলক্ষিত করেছি। সিপিএম তথা বাম্ফ্রন্টের মধ্যে এই আদর্শের সংঘাত বাংলার কলমজীবীরা অনেক আগেই চিনতে পেরেছিল। সিপিএমের মধ্যে যে আদর্শের সংঘাত বাংলার মানুষ উপলব্ধি করছিল তারই ফসল কি ২০০১১ সালের তথাকথিত হোক অথবা কথিত হোক ‘পরিবর্তন’? এই প্রেক্ষাপটে কি বলা যায় ৩৪ বছরের এবং পরবর্তী পাঁচ বছরে ভারতের বিভিন্ন পিছিয়ে থাকা রাজ্য এগিয়ে গেল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানব উন্নয়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে। বিহার, ঝাড়খণ্ডের মত রাজ্য পশ্চিমবঙ্গকে পেছনে ফেলে সামনের সাড়িতে এসে কড়া নাড়ছে।
তৃণমূল আমলে একদম কোনও উন্নয়নের কাজ হয়নি এটা বলা খুব সম্ভবত নিরপেক্ষ প্রতিবেদকের কাজ নয়। প্রচারের ঢক্কানিনাদ এর অংশটা বাদ দিলে নিজেদের সূত্রে জানা যাচ্ছে রাজ্য সরকারের ‘কণ্যাশ্রী’ প্রকল্প খুব উল্লেখযোগ্য কাজ। ‘খাদ্যসাথী’ও প্রশংসার দাবি রাখে। বিছিন্নভাবে হলেও প্রয়াত ডাঃ সুব্রত মৈত্রের নেতৃত্বে স্বাস্থ ক্ষেত্রে কিছুটা সংস্কার হয়েছে। ডাঃ শশী পাঁজা দায়িত্ব নেওয়ার পর নারী ও সমাজ কল্যাণ দপ্তরের কাজও প্রশংসা দাবি করে। শিল্প এবং বিদ্যুতের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হলেও কাজ যে হয়েছে সেটা নজড়ে আসে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেগঘন আবেদনের সঙ্গে একমত না হয়েও বলতে হবে প্রথম একবছর কাজ শিখতেই নতুন মন্ত্রীসভার সময় চলে গেছে। পাশাপাশি বিরোধী দলের অভিযোগ কৃষি ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকের আত্মহত্যা বেড়েছে। ১০০ দিনের কাজ নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। সংবাদ মাধ্যম সূত্রে জানতে পারছি রাজ্যের চা বাগানগুলিতে খাদ্যের অভাব এবং অপুষ্টিজনিত কারণে ৩৮৩ জন শ্রমিক ইতিমধ্যেই মারা গেছেন। রাজ্যের অস্থীর পরিস্থিতির সুযোগে নারী নির্যাতনের হার বেড়েছে এমনটাই দাবি সিপিএম, কংগ্রেস এবং বিজেপি দলের নেতৃত্বের। রাজ্যে নারী এবং কিশোরী পাচারের হার কিছুটা নিম্নমুখী হলেও উল্লেখযোগ্য কিছু নয়।

দু’টি জামানার সময়কাল এবং কার্যকাল পাশাপাশি রেখে আলোচনা করলে কি আংশিকভাবে ‘সভ্যতার সংঘাত’ পরিলক্ষিত হচ্ছে? আলোচনার সূত্র ধরে যদি পিছিয়ে যাই তাহলে ১৮ বছর আগে এই রাজ্যে এক অচেনা সভ্যতা রাজ্যের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার দখল নেয়। ২০১৩ পর্যন্ত এই রাজ্য তথাকথিত সেই সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে যুঝতে থাকে। মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বুদ্ধবাবু মনে হয় এসব মেনে নিতে পারেননি। মানতে পারেননি সিপিএম দলের তৎকালীন রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাসও। পার্টি চিঠিতে দলের কর্মীদের তথাকথিত ওইসব বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন তিনি। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় বুদ্ধবাবু বৃহৎ শিল্পের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। হয়ত ভেবেছিলেন শিপ্লায়ন হলে রাজ্যের তথাকথিত সমান্তরাল চালু আর্থিক ব্যবস্থাকে ভাঙ্গতে সক্ষম হবেন তিনি। কিন্তু সেই ব্যবস্থা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে রাজ্যের ‘শিপ্লায়ন’কে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে আটকে দিতে পেরেছিল। এটাকে একধরণের ‘Clash of civilization’ বা ‘সভ্যতার সংঘাত’ই বাল যায় কি? এই প্রসঙ্গে স্যামুয়েল পি হান্টিংটনের ‘Clash of civilization’ বা ‘সভ্যতার সংঘাত’ লেখাটির থেকে কিছুটা উল্লেখ করছি। যদিও বিশিষ্ট সমাজ বিঞ্জানী হান্টিংটন বিশ্ব সমাজ ব্যাবস্থার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তাঁর বক্তব্য বা থিসিস লিখেছিলেন।
‘’ The Clash of Civilizations (COC) is a hypothesis that people's cultural and religious identities will be the primary source of conflict in the post-Cold War world. It was proposed by political scientist Samuel P. Huntington in a 1992 lecture[1] at the American Enterprise Institute, which was then developed in a 1993 Foreign Affairs article titled "The Clash of Civilizations?",[2] in response to his former student Francis Fukuyama's 1992 book, The End of History and the Last Man. Huntington later expanded his thesis in a 1996 bookThe Clash of Civilizations and the Remaking of World Order.
The phrase itself was earlier used by Albert Camus in 1946,[3] and by Bernard Lewis in an article in the September 1990 issue of The Atlantic Monthly titled "The Roots of Muslim Rage".[4] Even earlier, the phrase appears in a 1926 book regarding the Middle East by Basil Mathews: Young Islam on Trek: A Study in the Clash of Civilizations (p. 196).
This expression derives from clash of cultures, already used during the colonial period and the Belle Époque.[5] 

Overview[edit]
Huntington began his thinking by surveying the diverse theories about the nature of global politics in the post-Cold War period. Some theorists and writers argued that human rights, liberal democracy, and capitalist free market economy had become the only remaining ideological alternative for nations in the post-Cold War world. Specifically, Francis Fukuyama argued that the world had reached the 'end of history' in a Hegelian sense.
Huntington believed that while the age of ideology had ended, the world had only reverted to a normal state of affairs characterized by cultural conflict. In his thesis, he argued that the primary axis of conflict in the future will be along cultural and religious lines.[6]
As an extension, he posits that the concept of different civilizations, as the highest rank of cultural identity, will become increasingly useful in analyzing the potential for conflict.
In the 1993 Foreign Affairs article, Huntington writes:
It is my hypothesis that the fundamental source of conflict in this new world will not be primarily ideological or primarily economic. The great divisions among humankind and the dominating source of conflict will be cultural. Nation states will remain the most powerful actors in world affairs, but the principal conflicts of global politics will occur between nations and groups of different civilizations. The clash of civilizations will dominate global politics. The fault lines between civilizations will be the battle lines of the future.[2]
In the end of the article, he writes:
This is not to advocate the desirability of conflicts between civilizations. It is to set forth descriptive hypothesis as to what the future may be like.[2]
In addition, the clash of civilizations, for Huntington, represents a development of history. In the old time, the history of international system was mainly about the struggles between monarchs, nations and ideologies. Those conflicts were primarily seen within Western civilization. But after the end of the cold war, world politics had been moved into a new aspect in which non- Western civilizations were no more the exploited recipients of Western civilization but become another important actor joining the West to shape and move the world history.[7]   ‘’ (Wikipedia)

২০১১ সালের ২৫ মার্চ ছিল বামফ্রন্ট সরকারের শেষ বিধানসভার অধিবেশন। সেই অধিবেশনে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আনুমানিক এক ঘণ্টা কুড়ি মিনিট বক্তব্য রেখেছিলেন। কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি। চতুর্দশ বিধাসভার আজ শেষদিন। পাঁচ বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা, বিল, বাজেট সরকারি-বেসরকারি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বহুমুখী আলোচনা হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্র যাতে আরও প্রসারিত হয় আমরা চেস্টা করেছি। কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করতে চাইছি। বিতর্ক হবেই। বিতর্ক মানে বিরোধী দলের বিকল্প ব্যবস্থা তুলে ধরা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক কিছু ঘটনা ঘটেছে। অধ্যক্ষকে অপমানিত হতে হয়েছে। এইসব দুরভাগ্যজনক ঘটনার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে আমাদের। সেসবের মধ্যে দিয়ে গিয়েও আমাদের অধ্যক্ষ চেয়ারে বসে ঝঞ্জা-বিধস্ত সমুদ্রে সভা চালিয়েছেন। এই ঝঞ্জার মধ্যে স্পিকার সাহেব জাহাজ চালিয়েছেন। ওই জাহাজ চালাতে গিয়ে আপনি দুর্যোগের মধ্যে পড়েছেন। সেই দুর্যোগ থেকে আপনি যাত্রীদের বাচিয়েছেন। আপনাকে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ জানাচ্ছি অনুপস্থিত বিরোধীদেরও। সাংবাদিক বন্ধুদেরও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আগামী দিনে আরও শক্তিশালী গণতন্ত্র চালাতে পারি এই দিশা রেখে আমার বক্তব্য শেষ করছি।‘’
এত দীর্ঘ বারান্দায় হেঁটে এসে কয়েকটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে উঠছে। বামফ্রন্ট কি এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে? যদি সরকার গঠন করতে পারে তা হলে আগের বামফ্রন্ট   সরকারের করা ভুলগুলি ইতিমধ্যে সিপিএম নিজের দলে এবং বামফ্রন্টগতভাবে চিহ্নিত করেছে। সেই ভুলগুলি কি সংশোধন করা সম্ভব হবে? নীচুতলার কিছু অতি উৎসাহী ‘কমরেড’ ইতি পূর্বে যেসব অতিবাম ঝোঁক দেখিয়েছেন সেগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে তো? আবার যদি কংগ্রেসের সঙ্গে জোট সরকার করতে হয় সে ক্ষেত্রে ‘প্রত্যাবর্তন’ কিভাবে সম্ভব? যদিও কমরেড সূর্যকান্ত মিশ্রের নেতৃত্বে রাজ্য কমিটির নতুন টিম ‘বাম-গণতান্ত্রিক’ মনোভাবাপন্ন শিক্ষিত, কম শিক্ষিত মানুষের মনে আশার আলো জাগাতে পেরেছেন। ১৯ মে আমারা জানতে পারব নতুন সরকার কারা গঠন করছেন। এবং কারা রাজ্যের শিল্পায়নের স্বার্থে, সার্বিক     উন্নয়নের  দাবিতে, সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্য প্রকল্পে উৎসাহ দিতে বিরোধী আসনে বসছেন? কারা বাংলার হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী হবেন? যদি এবার ত্রিশঙ্কু বিধানসভা হয় সে ক্ষেত্রে কংগ্রেস এবং বামফ্রন্ট কিভাবে দায়িত্ব পালন করবে সেই অপেক্ষায় আমরা থাকব। পশ্চিমের উন্নত গণতন্ত্রের মানদণ্ডে সরকার এবং  বিরধী দলের যৌথ প্রচেষ্টায় বাংলায় নতুন ভোর আসুক। নীল আকাশে লাল সূর্যের উদয় আমরা দেখতে অভ্যস্ত। প্রাক্তন অধ্যক্ষ হাসিম আব্দুল হালিমের আহবান মনে রেখে এই বাংলার দায়িত্ব এবং কর্তব্য নতুন নির্বাচিত বিধায়করা নেবেনতো? কংগ্রেসের সহ-সভাপতি রাহুল গাঁধি আমাদের ‘ডিগনিটির’ কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। ১৮ এপ্রিল, ২০১৬ সালে কান্দি জনসভায় রাহুল গাঁধি বলেন, ‘’এক সময় বাংলা ভারতকে পথ দেখাত। আজ সেই বাংলা পিছিয়ে পড়ছে।‘’ 
আসুন একবার ফিরে দেখি পদাতিক কবি কি বলেছিলেন। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় একটু পা চালিয়ে, ভাই কবিতায় বলছেন, ‘’লাল-নিশান নিয়ে একদল মজুরের এক বিশাল মিছিল আসছে।/ আমার মনে হল, লেনিন যেন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বললেন,/ শতাব্দী শেষ হয়ে আসছে-/ একটু পা চালিয়ে, ভাই, একটু পা চালিয়ে।।‘’