Tuesday, 2 August 2016

আভিজাত্যের পরম্পরা

আভিজাত্যের পরম্পরা
কেউ কেউ বলে কম কথা বললে আভিজাত্যের পরিচয় পাওয়া যায়। কেউ কেউ বলে কথা তো বলার জন্যই। তাই কথা বলতে হয়। আবার অনেকে আছে কথা বলার কৌশলটা রপ্ত না করেই আভিজাত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করে বসে। কিছুটা অতি চালাকির আড়ালে নিজেদের অগ্রগামী ভেবে বসে। এদের বিষয়ে ভাবতে নেই। ভাবলেই ‘কলাভাব’ প্রশ্রয়ে আত্মবিকার করে। একটা সময় এই ধরণের ব্যক্তিদের আড়ালে আবডালে ‘মহারাজ’ বলে ডাকা হত। ‘মহারাজ’ শব্দটির ব্যপ্তি ব্যপক। কোনও পরিবারে পুত্রকে অধিক গুরুত্বের কারণে ‘মহারাজ’ নামকরণ করা হত। আবার কলকাতা শহরে ভিন রাজ্য থেকে আসা পাচকদেরও অনেক সময় সম্মানপূর্বক ‘মহারজ’ বলা হত। গ্রামের তথাকথিত আভিজাত্য আছড়ে পড়ে আবার কখনও শহরের অচেনা আভিজাত্য চাবুক চালায়। এই লেখায় এমন কিছু অভিঞ্জতার চয়ন করতে চাইছি। আমরা তার থেকে ‘মানবতার’ অভিনয় করা কিছু ব্যক্তিক আচরণ খুঁজে পেতে পারি। একটি বাংলা দৈনিকের সম্পাদক। তাঁর কাগজ থেকে কোনও সাংবাদিক, লব্ধ প্রতিষ্ঠিত লেখক, প্রবীণ গায়ক, শিল্পীদের কাছে সাক্ষাৎকার নিতে গেলে তাঁরা বলতেন, ‘’ও... অমুকের কাগজ থেকে এসেছ? না আমি ওই ভদ্রলোকের কাগজে কোনও সাক্ষাৎকার দেব না।‘’ সাংবাদিক জানতে চাইত কেন? দেবেন না কেন? উত্তরে প্রবীণ শিল্পীরা বলতেন, ‘’ওর সঙ্গে কাজ করা অতীত অভিঞ্জতা ভালো নয়। শিল্পীদের সঙ্গে সম্পাদক ভদ্রলোক সংবাদ পত্রের সামাজিক শর্ত  উপেক্ষা করেন। তাই কি প্রয়োজন? অকারণে আমদের মত সংবেদনশীল ব্যক্তিদের অপমান সহ্য করার।‘’    উল্লেখিত পত্রিকার সাংবাদিকের কাছ থেকে এরকমটা শোনা যায়।
দ্বিতীয় ঘটনা কমলের পাড়ার এক দাদার কাছ থেকে শোনা। সালটা ১৯৬৯-৭০। অগ্নিগর্ভ বাংলা। ভদ্রলোকের নাম একটা ঠিক করে নেওয়া যাক। সনাতন ফুলহার। তপসিলি জাতি। সনাতনবাবু তাঁদের অঞ্চলে প্রথম ওই সম্প্রদায় থেকে স্নাতক। সেই সময় ভদ্রলোক তাঁর স্কুলের প্রধান শিক্ষকের খুব কাছের বাধ্য ছাত্র ছিলেন। সেই শিক্ষক মহাশয় উচ্চ শিক্ষিত। অকৃতদার। সংস্কৃতি সম্পন্ন। অত্যন্ত ভালো মানুষ। তিনি একটি চিঠি লিখে তাঁর কলকাতার বাড়িতে সনাতনবাবুকে পাঠিয়েছিলেন। সনাতনবাবুর বাবার সরকারি অফিসের কলকাতায় কিছু কাজ ছিল। তখনকার সময়ের হাড় কাঁপান পৌষ মাসের শীতে কলকাতায় এসেছিলেন সনাতনবাবু। শিশির ভেজা শীতকাল। নিজের প্রধান শিক্ষকের বাড়িতে অত্যন্ত সঙ্কোচ নিয়ে ছিলেন। গ্রাম্য সরলতা এবং তৎকালীন নিম্ন জাতের দ্বিধা নিয়ে কলকাতার এক অভিজাত বাড়িতে কয়েকদিন ছিলেন। খাওয়া নিয়ে তাঁর অভিযোগ ছিল না। কারণ পেট ভর্তি খাবার না পেলেও বাইরে থেকে তিনি খেয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু তাঁকে রাত্রে শুতে দেওয়া হত দোতলা বাড়ির রাস্তার দিকের ঝুল বারান্দায়। খস খস দিয়ে বারান্দার খোলা অংশ ঢেকে দেওয়া থাকলেও পৌষের শীতের উথাল পাথাল কনকনে হাওয়া হিস হিস শব্দে চাবুক মারত। কারন বিছানা বলতে একটা শতরঞ্চি। বাড়ি থেকে আনা নিজের খদ্দরের চাদর দিয়ে সেই শীত কি আটকান যায়? তবু তিনি থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন দারিদ্রের কারণে। হোটেলে থাকার সামর্থ ছিল না। কলকাতার কাজ করে অসুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন। প্রগতিশীল পরিবার। তাঁদের মানবতা চিনে বাড়ি ফিরেছিলেন তিনি।
এর পরের অভিঞ্জতা কমলের নিজের। কমলও তপসিলি সম্প্রদায়ের। বামপন্থী আন্দোলনের কর্মী। কম বেশি প্রায় আট বছর জেল খেটেছে। জেল থেকে বেড়িয়ে আশির দশকে রাজনৈতিক মতাদর্শগত গোষ্ঠী কোন্দল দেখে বাড়িতে চুপ করে বসেই ছিল। অত্যন্ত কষ্ট সহিষ্ণু ছেলে। নিজেদের গ্রাম থেকে গঞ্জ শহর আস্তে হত পায়ে হেঁটে। প্রায় ৮ মাইল হেঁটে আসতে হত। সেই কমল কলকাতায় এল দ্বিতীয় দফায় রাজনৈতিক কর্মী হয়ে। এক বিপ্লবী নেতা ওকে কলকাতায় নিয়ে এলেন তাঁর দলের রাজনীতি করার জন্য। ওকে মধ্য কলকাতার যে ঘরে থাকতে দেওয়া হল সেই ঘরে দিনের বেলায় সূর্যের আলো আসত না। সেটাও ঠিক আছে। কমল অত উচ্চ শিক্ষিত নয় যে দিনের বেলায় ‘বাবুশিক্ষা’র প্রয়োজনে খবরের কাগজ পড়তে হবে। তবে রাজনৈতিক খবর জানার জন্য খবরের কাগজ পড়তে হত। কমল নিজেকে ‘ডাকহরকরা’ বলতে ভালবাসে। কারণ নিজের গ্রাম থেকে গঞ্জ শহর আসত প্রায় ৮ মেইল পায়ে হেঁটে। তখন খবরের কাগজটাও পড়ে বাড়ি ফিরতো। মধ্য কলকাতার যে ঘরে ও ছিল আলো না এলে কি হবে? ওর কথায় ‘শিয়ালদা স্টেশনে বসে কাগজ পড়ি লিতাম’। কিন্তু কমলের রাতে শোওয়ার অভিঞ্জতা। ওর ভাষায়। ‘শুন তাহলে কমলবাবু কলকাতায় এলেন। বিপ্লব করতে। জেল খেটি বুঝে লায় এসব বিপ্লব এখন হবার লয়। তা কলকাতায় এলে। গাঁ গঞ্জে হাফশোল হয়ে যাওয়া লাইফ লিয়ে যারা ‘বিপ্লব’ এর কথা ভাবছিল, অরা বুলবে গাঁয়ের ছেলা ‘কমল’ কলকাতায় রাজনীতি করে। মজা পেছিস? পেছিস কিনা বুল? আমি কলকাতায় থাকি যে ঘরে, ওই ঘরে গাঁয়ের জোতদারদের বাড়িঘরে যেমন ছেলা মেয়া লিঙ শুবার খাট থাকে, ওই রকম সাইজের একখান বড় টেবিল ছিল। একবছর কুনো বিছানা ছাড়া ওই টেবিলে শুয়াছি। মাথার বালিশ জেলেও ছিল না। তাই অভ্যেস হুঙ গেলছিল। খবরের কাগজ মাথায় দিঙ শুয়াছি। আমাদের দলের বাবুরা কিন্তু মস্ত পণ্ডিত। গরিব মানুষের জন্যই অরা সবাই ভাবে বুল? কত ঞ্জান উয়াদের। উয়াদের ঞ্জানের ‘গজদন্ত’ আছে। সব্বাই এক্কেবারে দয়ার রাজহাঁস।‘’ আমি শুনতে শুনতে ভাবছিলাম হাসব না কাঁদব?
আমাদের সঙ্গে আছেন জর্জদা। জর্জ দেবব্রত বিশ্বাস। ২০১১ সালে ২২শে অগস্ট তাঁর জন্ম শতবর্ষ হয়ে গেছে। ১৯৭৮ সালে তাঁর নিজের লেখা আত্মজীবনী ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত’ বই প্রকাশ হয়। মুখবন্ধে জর্জ বিশ্বাস লিখেছেন, ‘’আমার মনে আছে আমি জন্মেছিলাম ম্লেচ্ছ হয়ে— শেষজীবনে রবীন্দ্রসঙ্গীত জগতে হয়ে গেলাম ‘হরিজন’’। ১৪ বছর পিছনে হেঁটে যাই। সালটা ১৯৭৪ এর ১৪ এপ্রিল। আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘স-ক-ঘ’ (সন্তোষ কুমার ঘোষ) একটি প্রতিবেদন লিখলেন। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘কার গান? কার সুর?’ বিষয় অবশ্যই দেবব্রত বিশ্বাস। সন্তোষবাবু প্রশ্ন তুলেছিলেন দেবব্রতের গায়কি নিয়ে। প্রতিবেদন প্রকাশের পরে পরেই গায়কের অনুরাগী মহল গর্জে উঠলেন। প্রিয় সঙ্গীত শিল্পীর সমর্থনে পত্রিকার দপ্তরে আছড়ে পড়ল প্রতিবাদের ঢেউ। এই ঘটনার পর যুগান্তর পত্রিকায় ২৫শে মার্চ, ১৯৭৫ সালে ‘বিশ্বভারতীর খামখেয়ালিপনা’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ হল। প্রতিবেদনে বিশ্বভারতীর কতৃপক্ষের সিদ্ধান্তকে সমালোচনা করা হয়। এবং কতৃপক্ষ যে দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করছে তার বিরুদ্ধেও প্রতিবেদক সোচ্চার হন। এর পরের ইতিহাস আমরা জানি।             

‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত’ গ্রন্থে দেবব্রত বিশ্বাস মর্মস্পর্শী ভাষায় লিখলেন, ‘’আমি ১৯৭০-৭১ সনের পরে আর কোনো রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করিনি এবং আমার মনে হয় ভবিষ্যতে আর হয়তো রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করবার সুযোগ আমার হবে না। মনে খুব আশা নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম, হয়তো বিশ্বভারতী সঙ্গীত সমিতি আমার প্রতি একটু সহানুভূতিশীল হয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ মৈত্রকেই আমার রেকর্ড অনুমোদন করার দায়িত্ব দেবেন। কিন্তু হঠাত একটি মর্মান্তিক দুঃসংবাদ পেলাম যে, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ আমাদের বটুক, ২৫ অক্টোবর, ১৯৭৭ তারিখে আমাদের সবাইকে ছেড়ে পরলোকে চলে গেল। বটুক চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে আমাকেও পথে বসিয়ে দিয়ে গেল। রবীন্দ্রসঙ্গীত জগতে আমি হয়ে গিয়েছিলাম ‘হরিজন,’ সেই হরিজন হয়েই আমার জীবনের শেষ কয়টি দিন কাটাতে হবে।‘’
এখানেই বা থামব কেন? বাংলার রেনেসাঁ যুগের এক মহীয়সী নারীকে আমরা জানি। তিনি বাংলা নাট্যমঞ্চকে আলোকিত করেছিলেন নিজের ব্যক্তিত্বগুণে। তিনি নটী বিনোদনী তথা বিনোদিনী দাসী।   কিন্তু স্বীকৃতি? বিনোদিনী সামাজিক স্বীকৃতি কতটা পেয়েছিলেন? তুলনামূলকভাবে বিচার করলে দেখা যায় ভিন্ন মাত্রার ছবি পাচ্ছি আমরা। আভিজাত্যের ক্যানভাসে। ভিন্ন প্রেক্ষাপটের আঙ্গিকে নাগরিক সভ্যতার স্বীকৃত মহানায়িকা বলেই কি তাঁদের ত্যাগের এত মর্যাদা? সে ভারতে হোক বা আমেরিকায়। যদিও তাঁরা দু’জনের কেউ নাটক থেকে আসেননি। দু’জন মহান শিল্পীই আমার এবং আমাদের কাছে ব্যক্তিত্ব, অভিনয়গুণে চিরস্থায়ী হয়ে আছেন এবং থাকবেন। বাংলা এবং হিন্দি সিনেমার মহানায়িকা সুচিত্রা সেন অভিনয় জীবনের যে উচ্চতায় নিজেকে পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন, সেই উচ্চতা, মর্যাদা আজ পর্যন্ত কোনও বাঙালি বা ভারতীয় অভিনেত্রী পেয়েছেন বলে জানা নেই। অভিনয় জীবনের জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও এক লহমায় ফ্লাশ বাল্বের আলোকে ভ্রুকুটি দেখিয়ে হেলায় সব কিছু ছেড়ে দিয়ে অন্তপুরবাসিনী হয়ে রইলেন। আর সেটাই সুচিত্রা সেনকে আরও মহান করে রেখেছে। অভিজাত বাঙালির চায়ের আড্ডায়, দুপুরের ভাত খাওয়ার টেবিলে। ভারতীয় সিনেমার সমালোচকরা সুচিত্রা সেনকে হলিউডের গ্রেটা গার্বোর সঙ্গে তুলনা করেন। নাগরিক সভ্যতায় নাগরিক সংস্কৃতি বারে বারে একাধিক বার ওদের দু’জনের জন্মদিনে আলোচনা করে। সংবাদ মাধ্যম তাঁদের ‘লালিপপ’ পাতায় আভিজাত্যের রঙ্গিন আঁচড়ে রঙ্গিন পাতায় প্যাকেজ তৈরি করে আমাদের মনে করিয়ে দেয় অভিজাত দু’ই নারীর আত্মত্যাগ। কিন্তু পাঠক একবার ফিরে চলুন উনবিংশ শতাব্দীর রঙ্গালয়ে। গিরীশ ঘোষের আভিজাত্যে যে নারী আজও চুপি চুপি জানান দিচ্ছে যে তিনিও ত্যাগ করেছিলেন ভারতীয় তথা বাংলার রঙ্গমঞ্চের জন্য। তাঁকে বার দুয়ারের নারী বলে নাগরিক সভ্যতা উদাসীন থাকলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। সেই মহীয়সী মহিলা একটা দু’টো বছর নয়। দশ বিশ বছর নয়। ৫৫ বছর বিনোদিনী নাটক দেখেছেন দর্শক আসন থেকে। কিন্তু ব্যথাভরা অভিমান থেকে আর বাংলা রঙ্গমঞ্চে ফিরে আসেননি। তিনি বিনোদিনী দাসী। মাত্র ১২ বছর নাটক করে বিনোদিনী জনপ্রিয়তার পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছিলেন। তাঁর খ্যাতি যখন মধ্য গগনে তখনই নাগরিক সভ্যতাকে কঠোরভাবে বার্তা দিয়েছিলেন, আমি সেই নারী। তোমাদের পিতৃতান্ত্রিক তথা পুরুষতান্ত্রিক নিয়ম কানুনকে মানি না। আমার অভিনেত্রীর মর্যাদা চাই। নারীর মর্যাদা চাই। এই অভিমান থেকেই কি বিনোদিনী নিজেকে সন্তর্পণে সরিয়ে নিয়েছিলেন? না তিনি সুচিত্রা সেন বা গ্রেটা গার্বোর মত স্থায়ীভাবে সরে যাননি। সুদীর্ঘ ৫৫ বছর বাংলা রঙ্গমঞ্চের সামনে বসে দর্শকের ভূমিকায় সহ-শিল্পীদের মনে করিয়ে দিয়েছেন আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। তোমাদের সংগ্রামে আছি। তোমাদের দুঃখে থাকব। কিন্তু আর নাট্যমঞ্চে নয়। বিনোদিনী আর নাটক বা পালা করলেন না।
কথাতো বলার জন্যই। শালীনতা রেখে। সামাজিক ভারসাম্য চিনে এবং সম্পাদকের অনুমোদন নিয়ে সব ধরণের লেখাই লেখা যায়। আগন্তুক শব্দের মিছিল ভেঙ্গে প্রান্তিক বাক্য গঠন কি সহজ? আশির দশকের প্রথম প্রহর। দ্বিতীয় প্রহর। তৃতীয় প্রহরে চেনা, জানা এবং বন্ধুত্ব। এক ‘হোর্ডিং পেন্টার’ এর সঙ্গে। আমরা মধ্য কলকাতার একটি মেসে এক সঙ্গে থাকতাম। সেই সময়ের কলকাতা। ঝুঁকিপূর্ণ হোর্ডিং। পুরনো দিনের বাড়ির তিনতলা চারতলার কার্নিশে বাঁশ বেঁধে সেইসব বোর্ডে কাজ করতে হত তখনকার পেন্টারদের। আমার সেই আবেগ প্রবণ বন্ধুটিও নিদারুণ কষ্ট করে কাজ করত। বার মাসে তের দাগের অসুখ নিয়ে সে কাজ করত। প্রখর রোদ, অবিশ্রান্ত বর্ষা সব ঋতুতে মালিকের হুকুম মেনে কাজ করতে যেত। সন্ধ্যের পর ক্লান্ত শরীরটা টেনে নিয়ে যেত  সরকারি আর্ট কলেজের বারান্দায়। নাইট কলেজ। অক্লান্ত শ্রম তাঁর আবেগকে চাগিয়ে দিত।  
এখন আর সেই সব দিনের হোর্ডিং কোথায়? ঝুঁকির কাজও আজ আর নেই। পেন্টেড ফ্লেক্স, পেন্টেড ফেস, পেন্টেড গ্লাস। আশি নব্বই দশকের সেই হোর্ডিং পেন্টারকে ‘দেশ’ পত্রিকা চিনিয়েছিলাম। রাম কিঙ্কর বেজ সহ একাধিক শিল্পীর নাম মন্ত্রের মত উচ্চারণ করতে বলতাম। শিল্পী পরিতোষ সেনের ‘জিন্দাবাহার’ সহ একাধিক বই পড়তে দিয়েছিলাম। সেই বন্ধুর ক্যানভাসে আঁকা ছবি নিয়ে প্রথম প্রদর্শনী(‘এক্সিবিশন’) আমাকেই সব ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। তারও আগে ফরাসী কনসাল জেনারেলে গিয়ে ছবি বিক্রি। সেও আমাকে  করতে হয়েছিল। প্রথম সারির একটি ইংরেজি দৈনিকে ‘পেস্টআপ’ বিভাগে চাকরি। সেটাও পাকা ব্যবস্থা করার জন্য আড়াল থেকে আমাকেই এগিয়ে আসতে হয়। তখনকার সেই হোর্ডিং পেন্টারকে আভিজাত্য চেনাতে হয়েছিল। আভিজাত্যের উঠনে নিয়ে গিয়েছিলাম। তারপর? আভিজাত্যের জঙ্গলে হাবুডুবু খাচ্ছে কি সে? সুযোগ পেলে জানা যাবে। জানানো যাবে ১/৮ ডিমাই সাইজের দু’একটি অধ্যায়ের বয়ান। রঙ তুলি হাতে।
আমার সেই হারিয়ে যাওয়া বন্ধুটি পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘আমাদের তুমুল হৈ হল্লা’ নামে একটি কবিতার বই আমাকে উপহার দিয়েছিল। ১৯৮৫ সালের ২ জুলাই। ওই কাব্যগ্রন্থে একটি কবিতা আছে, কবিতার নাম ‘দীপেন বললেই’। কয়েকটি লাইন, ‘’দীপেন বললেই আমার চোখে ভেসে ওঠে/ একটা প্রকান্ড গাছ/ ঝড়কে যার থোড়াই কেয়ার।/ দীপেন বললেই দেখতে পাই এক চওড়া বাঁধ। যার কাছে নতজানু/ সমস্ত প্লাবনের জল।‘’ আমার সেই সময়ের আবেগ প্রবণ বন্ধুটির মনে হয়েছিল কবিতাটি আমাকে নিয়ে লেখা। আমি সঙ্গে সঙ্গেই ভুল ভাঙ্গিয়ে দিয়ে বলেছিলাম না আমাকে নিয়ে নয়। কবি পূর্ণেন্দু পত্রী কবিতাটি তাঁর প্রিয় বন্ধু এবং বাংলা সাহিত্যের অন্যতম লেখক দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে মনে রেখে লিখেছেন।
কতটা প্রাসঙ্গিক হবে জানি না। তবুও লিখতে চাইছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাতাশা মুনকুর এর কথা এখন আমরা প্রায় সবাই জানি। এই শতাব্দীর প্রথম দশকের শুরুতেই ‘টু ইন টাওয়ার’ নামক এক আভিজাত্য তাসের ঘরের মত লুটিয়ে পড়ে। সে দিনটা ‘৯/১১’ নামে পরিচিত। এরপর অ-শ্বেতাঙ্গ নাতাশা এক ভয়াবহ লাঞ্ছনার মধ্যে দিন অতিবাহিত করে। তবুও হার না মেনে লড়াই করতে থাকে। মুক্তির পথ খুঁজে পায় ‘বর্ণ-বিদ্বেষের’ বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা মহম্মদ আলির জীবন দর্শনে। সংখ্যাগুরু অভিজাতদের স্বরূপ চিনতে দেরি হয়। তবে চিনব মনে করলে চেনা যায়। এইসব গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ঐতিহ্য এতটাই দীর্ঘ যে এইসব গোষ্ঠীর মানবতার নামে ‘মুখ ও মুখোশ’-এর পরিচয় নির্ণয় করতে পারি না। লাঞ্ছিত মানুষদেরও সময় লাগে। উদাহারণ প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক চার্লি চ্যাপলীন। তাঁর ব্যক্তি যন্ত্রণার ক্যানভাস। বহুলখ্যাত ছবি ‘সিটি লাইট’। ওই ছবিতে আমরা মদ্যপ অভিজাতদের করুণা চিনেছি। নাতাশার কাছ থেকে শিখলাম জীবনের সমস্ত অপমান, লাঞ্ছনাকে সহ্য করেও তিনি মানবতার পক্ষে কাজ করছেন। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিশুদের লেখাপড়া শেখানোর কাজে নিজেকে যুক্ত করেছেন। যে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় তিনি যুক্ত হয়েছেন সেটির নাম ‘আলি সেন্টার’।           
আভিজাত্যের চেতনার মান সাংস্কৃতিক মানদণ্ডে দেখলাম কিছুটা। আর্থিক পরম্পরা দেখা যাক। ভারত নামক দেশটা নাকি আধুনিক গণতন্ত্রের স্বাধীনতা ভোগ করছে। অনুভব করছে। চেতনার মান বেড়েছে। কোটিপতির সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়ছে। জাতীয় আয়ও নাকি বাড়ছে। করের টাকায়। কর কারা দেয়? কি ভাবে দেয়? একটা পরিসংখ্যান পাচ্ছি। ২০১৪-২০১৫ অর্থবর্ষে ভারতের মোট জন সংখ্যার মাত্র চার শতাংশ আয়কর রিটার্ন জমা করেছেন। ২০১২-১৩ সালে এই হার ছিল জনসংখ্যার এক শতাংশ মাত্র। সূত্রটি বলছে ভারতে মাত্র ১১ লক্ষ মানুষ নিজেদের বাৎসরিক আয় দশ লক্ষ টাকার বেশি বলে ঘোষণা করেছেন। আভিজাত্যের পরম্পরা দেখার আরও ভারমুক্ত আধুনিক সমাজের ভাষা খুঁজতে হবে আমাদের। তবুও স্বপ্ন থাকে। বিশ্বাস থাকে। ভাবালুতা থাকবে। জেগে থাকবে আশা। যদি স্বাধীন অর্ধেক আকাশ দাও। বাতায়ন খুলে দেখি। আব্রাহাম লিঙ্কন বলেছেন, ‘’Freedom is the last, best hope of the earth.’’
এখন আমরা আছি ‘কফি হাউস’ এ। কলকাতা শহরের নামীদামী ব্যক্তি, ছাত্র, ছাত্রনেতা, লেখক, লেখিকা, বুদ্ধিজীবী সব্বাই আসে। আসতেই হয় আভিজাত্যের শ্মশান কাঠের উত্তাপে। কফি হাউসে আসতেই হয়। এখানে জাত নেই। ধর্ম নেই। বর্ণ নেই। সমস্ত হল ঘর জুড়ে কথা ছুটছে। কথা তো বলার জন্যই। আজ আমার সঙ্গে কমল আছে। কমল কোনদিনই নিয়মিত কফি হাউসে আসেনা। কমল নাগরিক ভাষা বা ভালো বাংলায় কথা বলতে জানে। কিন্তু এক একদিন ওকে ‘আলকাপ’ পালার নায়কের মেজাজে পাওয়া যায়। সেদিন ও আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। ওর চেনা ভাষা। কমলের নিজের ভাষা। গাঁ-গঞ্জের ভাষা। আজ সেই মেজাজে আছে। কমল বলল, ‘লেবু দিঙ লাল চা লয়। লাল কফি দিতে বুল ক্যানে।‘ বললাম, এখানে চা পাওয়া যায় না। হয় দুধ দেওয়া কফি না হলে দুধ ছাড়া কফি পাওয়া যায়। যেটাকে ‘ব্ল্যাক কফি’ বলে।
কমল বলল, ‘‘ঠিক আছে রে ভাই আমার। আচ্ছা একটা কথা বুল, ‘’এই যে তু নিজের কথা কাউকে বলিস না। ক্যানে? সালটো কত হবে? ১৯৭৯ অথবা ১৯৮০। ওই বছরে তু একটা পরিবারকে বাঁচালছিলি। কিছুলোক টিনে করি কেরোসিন লিং ওই বাড়িটোতে আগুন লাগাতে আলছিলো। তু সবার সামনে দাঁড়িঙ বুলাছিলি, ‘আগে আমার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগাও। তারপর ওই বাড়িতে আগুন লাগাবে।’ কেউ আর এগোতে চাইলে না। তুকে এত মানত সব। কি বুল ঠিক বুললাম? পরে আম্পুরহাটের এসডিও এসাছিল। থানা পুলিশ। তুর ইজ্জত বেড়ি গেল।‘’
আমি বললাম, ওসব সাধারণ বিষয়। থাক। আলোচনা করে কি হবে?
কমলকে থামাবে কে? উত্তর দিল, ‘’বিনয়ের ঝাউগাছ হছিস ক্যানে? এটাও সবাই জানে। ওই সময়ের লোকগুলান। ১৯৮৪ সালে একটা দল তুকে ৭ লাখ টাকা দিতে চাইলে। একদম নতুন একটা দল। মাত্র চার বছর বয়স তখন নতুন দলটোর। আজ সেটা কত বড় দল হলছে। বিনিময়ে ওই দলের হোলটইমার হতে হবে। তু কি করলি? চুপচাপ থাকলি। বাপরে বাপ। ভূতের বাপের নাম ভুলে যাওয়ার মত টাকা! তু কিনা ছেড়ি দিলি?’’
আমি চুপ করে থাকলাম। কমল বলতে থাকল, ‘’কিছু নেতাকে আমরা চার দশকধরি মানুষের সঙ্গে তঞ্চকতা করতে দেখল্যাম, অরা আমাদের কি করবে বুলতো? এই আমাদের জান (কমলের ডান হাত ওর বুকের কাছে।) হছে ‘কইমাছ’ এর জান। যত কাদায় ফেলবি তুরা আমরা লাফিং তুদের সাদা জামায় লেপ্টে যাব। কি বুলছিস তু?’’
আমি মুচকে হাসলাম। কফি খেতে খেতে বললাম, রাজ্যের ডান-বাম সব দলের কিছু নেতা সম্ভবত সৎ বামপন্থী, ডানপন্থী শিল্পী, লেখক, কবি, নাট্যকর্মী, নিজেদের দলের কর্মীদের ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’ সংস্কৃতিতে রাখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছিল।
কফির বিল মিটিয়ে আমরা নীচে নেমে আসতেই দেখি হুতোম একটা বইয়ের স্টলের চালে বসে আছে। আমাকে বলল, ‘তুই আবার কফি হাউসে এসছিস?’
বললাম, হ্যাঁ তিন বছর পর এলাম।
হুতোম বলল, ‘আর এসে কি করবি? কতজনকে আঁতেল বানালি,  নিজে এখন ‘বিড়ি চোর’ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস।’
কমল বলল,  ‘’অ্যাই দেখ দেখি কান্ড, আতের বেলার পাখিটো দিনের বেলায় চিল্লাচ্ছে ক্যানে?’’
হুতোম কি শুনতে পেল? কারণ ততক্ষণে রাতের পাখি উড়ে চলে গেছে।                                                                                           


                     

Tuesday, 12 July 2016

অচেনা চিরকূট

অচেনা চিরকূট

মৃত্যুর আগে হেঁটে যাওয়া
অন্ধকার দেখেছে যারা—
তাঁদের চেনা যায়।
চিনেছি বারে বারে।
শরতের কাশফুলের মত
সাদা বকেদের সঙ্গে ওরা আজও হাসছে।
মৃত্যুর আগে হেঁটে যাওয়া
আলো দেখেছে যারা—
অচেনা শ্মশানের কূট গন্ধ্যের ‘চিরকূটে’
তাঁরা ‘হিজবিজি’ কি সব লিখে রেখেছে।
পড়তে চেয়েছি,
পাশের বাগানে সেদিন ফুল ছিল না।
ফুলের বাগানে বক তুমি থেক।
মৃত্যুর আগে অন্ধকার দেখেছে যারা,

তাঁদের তুমি চিনে রেখ।  

Friday, 8 July 2016

উন্নয়নের মুখোশ নয়, চাই মুখ

উন্নয়নের মুখোশ নয়, চাই মুখ

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়ার সংবাদ নেওয়ার চিরকালীন অভ্যেসটাও সম্ভবত বদলাচ্ছে। বিশ্বায়ন অর্থনীতির কল্যাণে যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যপক উন্নতি হয়েছে। সম্ভবত সেই কারণে বিলেতের সাহেবদের রীতি আর কেউ মানছে না। বা মানতে চাইছে না। আবহাওয়ার সংবাদটা এখন সন্ধ্যের সময় নিয়ে নেওয়া যায়। কালকের দিনটা কেমন যাবে?
সিপিএমের আসন্ন রাজ্য কমিটির বৈঠক নিয়ে কিছু লেখার অধিকার কতটা আছে জানিনা। তবে উদার গণতন্ত্রের দেশ ভারতে থেকে না লেখার অভ্যেস নামক সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দিতে যাব কেন? ১০ জুলাই, ২০১৬ রবিবার সিপিএম রাজ্য কমিটির পরবর্তী বৈঠক। যে বৈঠকে হাজির থাকবেন একঝাঁক পলিটব্যুরোর নেতা। বলা ভালো ১০ জুলাই কলকাতায় দলের সদর দপ্তরে একদিনের জন্য নতুন পাঠ্যক্রমের পাঠশালা বসতে চলেছে। এই পাঠশালায় দলের প্রধান শিক্ষক, প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক সহ অন্যান্য শিক্ষকরা রাজ্য কমিটির ছাত্রদের প্রশ্ন শুনবেন। কিছু প্রশ্নের উত্তর দেবেন। কয়েকটি বিষয় নিজেদের মত করে বলবেন। ইত্যাদি। পাঠক আপনারা বলতেই পারেন সিপিএম সহ বামপন্থী, দক্ষিণপন্থী দলে এরকমটা হয়েই থাকে। নতুন কিছু কি আছে? জরুরী কিছু কি আছে? হ্যাঁ আছে। রাজ্যের সিপিএম-কংগ্রেস জোটের এবং জটের ভবিষ্যত দিশা কি হবে? রাজ্যের বামফ্রন্টের কি হবে? এই বামফ্রন্ট থাকবে না বৃহত্তর বামফ্রন্ট গড়ে উঠবে? চিন্তাশুন্য অবশিষ্ট বৃদ্ধতন্ত্রের বোঝা আর কতদিন? (গোপন এজেন্ডা)। এবং সিপিএম নামক দলটা কি আদৌ  থাকবে? পুরনো তত্ত্ব,নীতি,কৌশল,মূল্যবোধ, সংস্কৃতির (ব্যক্তিগত কুৎসা, চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলা) বোঝা টেনে চলবে? না নতুন ভাষা? কিছু কিছু কমরেড এই সংস্কৃতি এখনও ঔদ্ধত্বের সঙ্গে ব্যবহারিক জীবনে মানতে অভ্যস্ত হয়ে রয়েছেন। এই পর্যবেক্ষণ আমার ব্যক্তিগত নয়। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ‘চুপিচুপি’ আগে বলেছে। এখন অনেকেই প্রকাশ্যে বলছে। এইসব যেমন চলছে তেমনই চলবে না নতুন ভাষা গড়ে উঠবে? গঠনমূলক চিন্তা করতে দেওয়ার অধিকারকে অনুমোদন দেওয়া হবে! এবং অবশেষে পুনর্মিলন উৎসব বা আরও বৃহত্তর ভারতীয় বাম দল? এসবের আমরা বেশিটাই জানতে পারব না। আমাদের আগ্রহ থাকল। জানতে চাই আমাদের বাংলায় সিপিএম কি ভূমিকায় থাকবে? এই বাংলার উন্নয়নে দলগতভাবে সিপিএম কতটা সরকারের পাশে থাকবে? যে প্রতিশ্রুতি ভোটের আগে ‘সিঙ্গুর’ থেকে ‘শালবনী’ পর্যন্ত পদযাত্রা দিয়ে শুরু হয়েছে। যে আবেদন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি করেছেন। তাঁর আবেদন, উন্নয়ন নিয়ে বিধানসভায় রাজনীতি করবেন না। আসুন বাংলাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সরকারপক্ষ এবং বিরোধীপক্ষ সবাই একসঙ্গে কাজ করি।
রাজ্যে সিপিএম দলটিকে শেষ পর্যন্ত নতুন রাজ্য সম্পাদক তথা পলিটব্যুরো সদস্য কমরেড সূর্যকান্ত মিশ্র  যোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে রাজ্যে কিছুটা গুরুত্ব ফিরিয়ে আনতে পেরেছেন। এবারের বিধানসভা ভোটে সিপিএম সহ অন্যান্য বামদল মিলে মোট ৩৩ টি আসন সুনিশ্চিত করেছে। এটা সম্ভব হয়েছে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে। বনেদী কংগ্রেসী পরিবার বামপন্থীদের ভোট দিয়েছে না ‘নোটা’য় ছাপ মেরেছে? এই নিয়ে চাপানউতোর ছিল। আগামীতেও থাকবে। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে যে তিন চারটি জনসভা হয়েছে সেইসব জনসভা ছিল কংগ্রেসের। সিপিএম রাজ্য স্তরের এবং কেন্দ্রীয় স্তরের নেতাদের কংগ্রেসের মঞ্চে পাঠিয়েছে। এ নিয়ে অভিজাত কংগ্রেসীদের অহংবোধ রয়েছে। যদিও সামনে প্রকাশ করা হয় না।  কারণ অবশ্যই বিধানসভায় ৪৪ টি আসন এবং বিরোধী দলের স্বীকৃতি। আবারও কি রকম কাকতালীয় বিষয় ভাবুন ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ৪৪ টি আসন পায়। পরে সম্ভবত কর্ণাটক থেকে একটি উপনির্বাচনে জিতে বর্তমানে লোকসভায় কংগ্রেসের আসন সংখ্যা ৪৫।
সম্প্রতি বিধানসভায় ‘পাব্লিক অ্যাকাউন্টস কমিটির’ (PAC) চেয়ারম্যান নির্বাচন নিয়ে যে কু-নাট্য বা সুনাট্য হয়েছে এটা খুব একটা স্বাস্থ্য সম্মত বলা যাবে কি? বিশেষত কংগ্রেস প্রধান বিরোধী দল হিসাবে ওই পদটির দাবিদার। বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে আসনটি সিপিএমকে ছাড়তে চেয়েছিল কংগ্রেসের বিরোধী দলনেতা আব্দুল মান্নান? সিপিএম দলের একাধিক কর্মীর অভিযোগ ওরা আমাদের পদটি উপঢৌকন  দিলেই নিতে হবে? সিপিএমের এতটাই দুর্দশা? আবার পদটি না পাওয়ার প্রতিবাদে ওয়াক আউটও করতে হবে? কেন? কংগ্রেস দলের কোন বিধায়ক ওই পদটি পাবে না পাবে সেটা কংগ্রেস পরিষদীয় দলের আভ্যন্তরীণ বিষয়। রাজ্যে কংগ্রেস দলে এই ধরণের ঘরানার সঙ্গে আমরা রাজ্যবাসী বেশ কিছুদিন হল পরিচিত। তাই কংগ্রেস দলে এই মাত্রার পেশাদারি রাজনৈতিক লড়াই আমরা দেখতে অভ্যস্ত। এসবে আর বিভ্রান্ত হওয়ার মত কিছু থাকে না।
রাষ্ট্র বিঞ্জানের শিক্ষক, রাজনৈতিক বিশেষঞ্জরা বলছেন সিপিএমকে পথে নামতে হবে। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা সমর্থদের দাপটের বিরুদ্ধে সব বামপন্থীদের একসঙ্গে প্রতিবাদে পথে নামতে হবে। এবং সেই সঙ্গে আমরা সংবাদ মাধ্যমে সিপিএম নামক একটি বৃহত্তর ভারতীয় বামপন্থী দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য পাচ্ছি। চলুন আমরাও পিছনে হাটি। দলের কর্মসূচি থেকে দু’একটি ধারা খুঁজে পাওয়া যায় কিনা দেখি। ভারতের মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টীর ১৯৬৪ সালে যে সপ্তম পার্টী কংগ্রেস হয় সেই কংগ্রেসে গৃহীত কর্মসূচীর ৭২ নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘’যখন জনগন তাঁদের স্বার্থকে এগিয়ে নেবার জন্য পার্লামেন্টিয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করতে শুরু করেন এবং যখন তাঁরা প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া ও জমিদারের প্রভাবের থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন, তখন এইসব শ্রেণী পার্লামেন্টিয় গণতন্ত্রকে পদদলিত করতে দ্বিধা করে না, যেমন দেখা গিয়েছিল ১৯৫৯ সালে কেরালায়। যখন নিজেদের স্বার্থের প্রয়োজন হয়, তখন তাঁরা পার্লামেন্টিয় গণতন্ত্রকে সরিয়ে দিয়ে তাঁর জায়গায় সামরিক একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করতে দ্বিধা করে না। আমাদের দেশ এই ধরণের সমস্ত বিপদ থেকে মুক্ত- এ  কল্পনা করা হবে একটি গুরুতর ভুল ও বিপজ্জনক মোহ। এই ধরণের বিপদের বিরুদ্ধে জনগণের স্বার্থে পার্লামেন্টিয় ও গণতান্ত্রিক সংস্থা সমূহকে রক্ষা করা এবং ঐ সব সংস্থাকে পার্লামেন্ট বহির্ভূত কার্যাবলীর সহযোগে সুকৌশলে ব্যবহার করা অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ।‘’
এই ধারাকে সামনে রেখে সিপিএম তাদের দলের গঠনতন্ত্র সময় এবং কালউপযোগী করতে সচেস্ট হয়। ১৯৯২ সালের চতুর্দশ পার্টী কংগ্রেস থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত পরিমার্জিত পার্টী কর্মসূচী দল গ্রহণ করে। স্বাভাবিকভাবেই সিপিএম তাঁদের কর্মসূচিকে ধারাবাহিকতা মেনে বর্তমানে আরও আধুনিক করে নিতে চাইছে সম্ভবত। ২০১২ সালের মতাদর্শগত সিদ্ধান্তের ১০.৩ প্যারায় বলা হয়েছে, ‘’বর্তমান পরিস্থিতিতে সংসদীয় ও সংসদ-বহির্ভূত কাজের একটি যথোপযুক্ত সমন্বয় গড়ে তোলাটাই পার্টীর সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পাশাপাশি প্যারা ১০.৫ এ বলা হয়েছে, ‘’গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও  নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষণ ও প্রসারণের লড়াই হচ্ছে বুর্জোয়া-জমিদার রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ও জনগণতন্ত্রের অধীনে উচ্চতর পর্যায়ে উত্তরণেরই অঙ্গ।‘’
২০১৫ সালের পার্টী কংগ্রেসে দলের মতাদর্শগত সিদ্ধান্ত আরও উদার হয়েছে বলেই জানি। কারণ রাজ্যে শিল্পায়ন না হলে বিপুল বেকার সমস্যার ভার লাঘব হবে না। আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিও টাল মাটাল হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতকে মনে রেখে সিপিএম দলগতভাবে শিল্পায়নকে ১৯৯৫ সালের পর থেকেই গুরুত্ব দেওয়া শুরু করে। ১৯৯৫ সালে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু আমেরিকায় বঙ্গ সম্মেলনে গিয়ে মার্কিন পুঁজি পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগের জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। দলগত অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকা স্বাভাবিক। বিশেষত যদি দলটি সিপিএম হয়। কট্টরপন্থীদের সঙ্গে লড়াই করেই দলের আরও এক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রাজ্যে ‘শিপ্লায়ন’ এর সমর্থনে কলম ধরলেন। ২০০১ সালে ‘ন্যাশন্যাল বুক এজেন্সি’ থেকে প্রকাশিত তাঁর লেখা বহুল প্রচারিত বই ‘উন্নততর বামফ্রন্টের সন্ধানে’। ওই বইয়ের ১১ পৃষ্ঠায় কমরেড ভট্টাচার্য লিখলেন, ‘’বর্তমান সরকারের সামনে কয়েকটি জরুরি কর্তব্যের কথা বলা দরকার। রাজ্যে শিল্পায়নের অগ্রগতির সঙ্গে সমতা রেখে উন্নত সড়কপথের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে আমরা কলকাতা-শিলিগুড়ি, কলকাতা-হলদিয়া ও কলকাতা-কুলপি (যেখানে একটি বন্দর ও শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠবে) দ্রুত গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর জন্য দেশ-বিদেশ থেকে আমাদের ঋণও নিতে হবে, ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্প সংস্থা গুলিকেও যুক্ত করতে হবে। নগর-উন্নয়নের জন্য ও সামাজিক পরিকাঠামো (আবাসন, সেতু, জলপ্রকল্প ইত্যদি) গড়ে তোলার জন্য যৌথ মালিকানার ভিত্তিতে আমরা ব্যক্তিগত পুঁজিকেও স্বাগত জানাচ্ছি। রাজ্যে তথ্য প্রযুক্তি বিস্তারের জন্য ফাইবার অপটিক্যালের জাল বিস্তার করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন শিল্প সংস্থার অংশগ্রহণ।‘’
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একা নন ‘সিঙ্গুর’ পূর্ববর্তী সময়ে দলের একাধিক শীর্ষনেতা শিল্পায়নকে সমর্থন করে কলম ধরেছেন। বর্তমান সাধারণ সম্পাদক কমরেড সীতারাম ইয়েচুরি ২০০৫ সালে ১৩ সেপ্টেম্বর ‘গণশক্তি’ দৈনিকে লিখলেন, ‘’আমাদের দলের কেউ কেউ ভাবেন বিশ্বায়ন একটি সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত। এটা অর্ধসত্য। বিশ্বায়নের আরও একটি দিকও আছে। পুঁজি বেশি হলে আরও লাভের জন্য তা বিনিয়োগ করতে হবে। তাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ মিলবে। আমাদের সেই সুযোগ নিতে হবে।‘’ তিনি আরও বললেন, ‘’বিশ্বায়নের যুগে পুঁজির অবাধ যাতায়াতের বিরুদ্ধে যাওয়াই সম্ভব নয়। দেখতে হবে, সেই পুঁজি পরিকাঠামো উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রযুক্তির উন্নতি বা কর্মসংস্থানের সহায়ক হচ্ছে কিনা। আর্থিক সার্বভৌমত্ব বিসর্জন না দিয়ে উন্নয়নের জন্য বিদেশি পুঁজিকে আমন্ত্রণ জানানোই আমাদের সিদ্ধান্ত।
কমরেড ইয়েচুরি বিচ্ছিন্নভাবে এই বক্তব্য লেখেননি। এর আগে পার্টি কর্মসূচীতে ৬.৬ (iii) ধারা যুক্ত করে দল জানিয়ে দিয়েছে যে, ‘’উন্নত প্রযুক্তি সংগ্রহ ও উৎপাদন ক্ষমতার উন্নয়নের স্বার্থে নির্বাচিত ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়া হবে।‘’ ৬.৫ ধারায় বলা হয়েছে ‘’বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরাট পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশ দৃঢ়ভাবে তার স্বনির্ভরতার ভিত্তিকে জোরদার করার চেষ্টা চালাবে ও সেইসঙ্গে বিদেশ থেকে আনা অগ্রসর প্রযুক্তিকে ব্যবহার করবে।‘’
বিশ্বায়ন বাস্তবতা মেনেও উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে ভারতীয় মানদণ্ডে সামাজিক ক্ষেত্রগুলিকেও সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ বলেই মনে হয়। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংহ তাঁর ইউপিএ সরকারের মাধ্যমে উদার অর্থনীতির সুযোগকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি ভারতীয় আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটকে মাথায় রেখেছিলেন। ইউপিএ জমানায় ৬৬ টা কেন্দ্রীয় প্রকল্প ছিল। এনডিএ সরকার ২৬ এ নামিয়ে এনেছে। আইসিডিএস, মিড-ডে মিল সহ ১৭ টি ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পে বরাদ্দ কমিয়েছে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার। পশ্চিমবঙ্গেও সামাজিক প্রকল্পগুলিকে বেছে নিয়ে ব্যপকভাবে কাজ করার অবকাশ রয়েছে। রাজনৈতিক বিষয় সবসময় থাকে। পথে নামার জন্য সরকারে না থাকলে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার অনেক অনেক সুযোগ পাওয়া যায়। সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে না পারলে ঝাঁ চক চকে নতুন প্রজন্ম আলাদাভাবে বামপন্থীদের অনুসরণ করবে কেন?
২০১৪ সাল থেকে কংগ্রেস নামক দলটি দু’পা পিছিয়ে শুরু করেছিল। কংগ্রেসের সহ-সভাপতি রাহুল গাঁধির নেতৃত্বে একঝাঁক উচ্চ শিক্ষিত তরুণ সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। লোকসভায় বিভিন্ন দপ্তরে ছায়া মন্ত্রীসভা গঠন হয়েছে। ভুল ঠিকের মধ্যে দিয়ে ‘সিনিয়র’ নেতৃত্বের গাইড লাইন মেনে সারা দেশে কংগ্রেস দলগতভাবে বিশ্বাস যোগ্যতা ফেরাতে পেরেছে বলেই মনে হয়। কংগ্রেস আগে বামপন্থীদের কাছে চিন্তা ধার করত। সময় বলছে বাংলার বামপন্থীদের ‘থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়’ নামক বহুল প্রচলিত প্রবাদ থেকে দলছুট হওয়াটা বর্তমান সময়ে অনেক গর্বের হবে। নতুন চিন্তার বাতায়ন খুলুক। ভারতীয় গণতন্ত্র সমৃদ্ধ হোক। ভারতীয় ‘সোশ্যাল ডেমোক্রেসী’ কালের নিয়মেই বাংলাকে পথ দেখাবে। রাজ্যের বিবেক চেনাতে বামপন্থীদের প্রয়োজনকে অস্বীকার করা যাবে না।   পশ্চিমবঙ্গ নামক পিছিয়ে থাকা একটি রাজ্য, ধারাবাহিকভাবে ঋণের বোঝা টেনে যাওয়ার মত একটি রাজ্যে উন্নয়নের মুখোশ নয় মুখ চাই। বাংলার গ্রামসভ্যতা সময়ের দাবীতেই অনেক অনেক সামনে এগিয়ে এসেছে।               

                                                       

Friday, 1 July 2016

Modern India, Conventional Govt.

.
Prime Minister Narendra Modi has taken his challenge on the green field of the Foreign Direct Investment.  He has taken his responsibility with glorious declaration after taken oath as Prime Minister of India on 2014, which announcement was ‘Reform of India’. After two years of the NDA ruling, as such Prime Minister Narendra Modi more dynamic on the above subject. He used the back ground music of Dr. Raghuram Rajan, governor of the Reserve Bank of India’s closed chapter. Prime Minister Modi also joined the Indian market symbolically after Dr. Raghuramram Rajan issue and before Brexit heat. Let’s see what time he has chosen. What was view of Dr. Raghuram Rajn?
‘’Some of the actions I take will not be popular. The governorship of the Central Bank is not meant to win one votes or Facebook ‘likes’.’’ (Raghuram Rajan, September 2013, The Telegraph, Calcutta quoted on 19 June 2016.) And from his book ‘Fault Lines’, published in 2012 ‘’Politician today vow, ‘Never again’! But they will naturally focus only on dealing with a few scapegoats, not just because the system is harder to change, but also because if politicians traced the fault lines, they would find a few running through themselves.’’
Subramanian Swamy has had make the six major allegation against famous economist of Dr. Rajan. His last one ‘’Rajan is a member of the Group of 30, an international grouping that, according to Swamy, is striving to defend the US’s dominant position in the global economy.’’
Congress vice president Rahul Gandhi has made his counter voice against Subramonian Swamy and Prime Minister Narendra Modi. He told ‘’ Prime Minister Narendra Modi knows everything. He has no need for experts like Raghuram Rajn. Thank you Dr Rajan for steering the economy in difficult times. People like you make India great.’’ (Courtesy:  The Telegraph, 19 June, 2016.) In an interview to Times Now, the PM said, ‘’I believe Raghuram Rajan’s patriotism is no less than any of ours...whatever post he holds, wherever he is, he will serve the country.’’ (Courtesy: Times of India, June 28, 2016.                
 According to the media, NDA Govt. famously said that ‘we can’. Yes, NDA govt. does their work with necessary decision about modernization of India after long time for shake up employment generation. Prime Minister Narendra Modi proudly declared that, India is the only liberal country which nation can successfully able to allowed foreign investment in compare with other nation. But Indian trade and commerce lobby not satisfied in the year of the 25th anniversary of the reforms. Industry has been hoping ‘Big bang’ reforms since the Modi government came to power in May 2014.   
Is it second generation reform? Sorry to say not at all. We have no rights to consider any freedom from narrowness. How, we could be believed that India not updated to overcome the modern reform scale of deepest tone?  It was require more dynamic political leadership and risk taking responsibility. We know which has decided by former Prime Minister Dr. Manmohan Sing.  Who has introduced his first liberal budget as Finance Minister in India on 1991? Obviously who was Dr. Manmohan Sing as world famous Indian economist and finance minister, India got first trade policy package on July, 1991, New Industrial policy tabled in the Lok Sabha on July 24, 1991. Dr Sing also tabled Second trade policy in the Lok Sabha on August 13, 1991 under the shadow of Indian unstable market.
After 25 years we have a stable market as a 2nd largest economy in Asia. India can make the successful platform for the domestic Industrialist and for the Small traders, if govt take major role for ‘BIMSTEC’ (Net Work of Think Tank) movement in the Indian subcontinent.  
I think this is facsimile story of ‘BIMSTEC’. What I have learned from this larger study? I have taken above issues to extend few views which have been used on this value added seminar. BIMSTEC, CSRID and IFPS organized two days International conference on ‘BIMSTEC at 20:’ agenda for 2017 and Beyond on 28-29 March, 2016 at Kolkata. I was invited but sorry to say that first day on 28th March I was not able to attend the program. 29th March I have able to follow the Seminar with distinguished speaker. Panellists was Prof Ratan Khasnabis, Professor of Economics, University of Calcutta, Prof. PV Rao, Adjunct Professor, NALSAR University of Law, Hyderabad, Prof. Surath Horachikul, Chulalongkorn University,  Bangkok, Ms. Deepti Pant/ ASSOCHAM Representative, Prof. Ajitava Raychaudhury, Department of Economics, Jadavpur University, Kolkata, Prof. Posh Raj Pandey, Executive Chairman, South Asia Watch on Trade, Economies and Environment (SAWTEE), Kathmandu, Nepal, Amb. Dago Tsharing, former Ambassador of Bhutan to India, Dr. Rajeev Sing, ICC,  Summery Report by Dr. Binoda K. Mishra, Director, CSIRD,  Shri Subir Bhaumik, Senior Fellow, CSIRD and many others. Special address was by Dr. Saman Kelegama, Executive Director, Institute of policy studies (IPS) of Sri Lanka, Colombo.
BIMSTEC may have to look into use economic Corridor of SAARC and Asian cross border trade and Energy cooperation. So, I have found that South East Asia got ‘Look East policy’ which introduced by UPA govt.
What is ‘BIMSTEC’?
Preface of BIMSTEC cooperation Report, 2008, ‘’As far as the names of regional blocs go, the Bay of regional Initiative for Multi-Sectoral  Technical and Economic cooperation (BIMSTEC) is possibly the largest in terms of characters used-69, to be precise. If only the list of effective measures it has initiated so far had been as long as that! That would have made life for the 1.3 billion people who come under its umbrella- of whom a large number happen to be the poorest living on the surface of the earth- a whole lot different.
At the same time, there is no denying that what it has achieved in just 11 years of its existence has not been inconsiderable. Actions germinate from ideas, and BIMSTEC stands out as a great idea, a natural idea that is shared by each of the seven member nations who have seen their history, existence and ethos spun around one of the most beautiful water bodies of the world, the Bay of Bengal, which sadly has now been overlaid by accretions from the complex, contemporary mathematics of conflicting equations. Yet, the very fact that the bloc is having a second summit within five years of the first indicates a sense of purpose, a feeling of urgency, and the constant hammering of overarching common aspirations.(Partly)’’
Prof. Ratan Khasnabis remind us, he said on seminar that, ‘’The BIMSTEC is a economic and political issue. The biggest economy of the globe USA and China has picked up. China GDP (Purchasing power parity) $ 19, 510 million in compare with USA $ 17, 968 million.’’ Prof. Khasnabis have no objection about FDI in Indian retail market. He have had consider his views during the question and answer session,  after facing common questions from international media correspondent.
I would like to follow above mentioned distinguished speaker’s outlook that, we need to secretariat exchange about trade and commerce. For better trade and industry, initially we have needed more energy collaboration between Bangladesh and India, India and Nepal. External funding needs from outside the region. We have also valued record with Indian foreign chapter that former Prime Minister Rajiv Gandhi visited China. It was a positive initiative regarding foreign policy of India. Rajib Gandhi was a major leader of the Indian responsible party. He believed in ethical practice from political wing.
Recently PM Narendra Modi has made his statements about relationship between India and China. He said, ‘’we don’t have one problem with China, we have a whole lot of problems pending with them. Three days ago I met the Chinese president. I told him clearly about India’s interests.’’ (Times of India, June 28, 2016)       
‘US withdrawal worry from economic stage’. Says, Jonathan weisman with his column of New York Times on April 18, 2015. He wrote ‘’As world leaders converge here for their semi-annual trek to the capital of what is still the world’s most powerful economy, concern is rising in many quarters that the US is retreating from global economic leadership just when it is needed most. ......... Experts say that is giving rise to a more chaotic global shift, especially toward China, which even Obama administration officials worry is extending its economic influence in Asia and elsewhere without following the higher standards for environmental protection, worker rights and business transparency that have become the norms among western institutions.
President Obama, while trying to hold the stage, clearly recognise the challenge, Pitching his efforts to secure major trade accord with 11 other pacific nations, he told reporters: ‘The fastest-growing markets, the most populous markets, are going to be in Asia, and if we do not help to shape the rules so that our business and our workers can compete in those markets, then China will set up the rules that advantage Chinese workers and Chinese business.’ Even the US export-Import Bank, a lending agency similar to export financing arms in countries around the world.’’ 

We don’t have need any conventional government. Post Brexit, if time is ‘End of ideology’ India may have to win the diplomatic trophy for new ‘Euro-Asia’ lobby to hold the new block as second growing economy in Asia. Like last decade of 20th century. It was popular as decade of Hayek. I didn’t read ‘The Road to Serfdom’ (1944) by Friedrich Von Hayek. But I have read one article about the above book.      

Friday, 10 June 2016

ভাঙ্গা-গড়ার সংস্কৃতি

আবার এ বছর ২০১৬ সালে সমস্ত জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নামক দলটি সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে রাজ্যে দ্বিতীয়বারের জন্য সরকার গঠন করেছে। এই বিষয়টা কিছুটা পুরনো হয়ে গেছে। কাকতালীয় বিষয়টা হচ্ছে। ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ আসন সংখ্যার নিরিখে ২১১ তে এসে থামল। একটা সময় নয় অনেকগুলি বছরেরে যোগ-বিয়োগের ফসল ২০১৬ সাল। বিশেষত এই বাংলায়। কী রকম কাকতালিয় ঘটনা দেখুন। ২০১১ সালে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের জমানার অবসান হয়েছে। আবার ২০১৬ সালের ষোড়শ বিধানসভা নির্বাচনে ২১১ টি আসন পেল 'তৃণমূল কংগ্রেস'। 
 নির্বাচন চলাকালীন আমি নিয়মিত ‘নেট’ ব্যবহার করলেও মধ্যে কিছুদিন ‘নেট’ ব্যবহার করিনি। এই সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় চাপানউতর  ভালোই চলেছে বলে মনে হয়।
ওই সময় তীব্র গরম ছিল। প্রখর তাপপ্রবাহ চলছে। আমরা যে বাড়িটায় ভাড়া থাকি, সেটা তিন তলা বাড়ি। আমরা তিন তলায় থাকি ‘আম-জাম’ আদমির মত প্যাঁচ পেঁচে গরম সহ্য করে থাকি। ছাদের কিছুটা অংশ ফাঁকা। মাথায় প্লাস্টিকের ছাউনি। ছাদের রেলিঙে কাক, শালিক, বুলবুলি, টুনটুনি পাখি এসে বসে। ছায়ায় বিশ্রাম নেয়। আবার চলে যায়। আমি ঘরের জানলা দিয়ে ওদের দেখি। মাস খানেক আগের কথা। দুটো শালিক জোড়া পায়ে হাটতে হাটতে জানলার কাছে এসে খুব চেচামেচি করল। জানলার পর্দা তোলা ছিল। আমার স্ত্রীকে বললাম, ‘’গরমে ওরা জল খেতে পারছে না। একটা পাত্রে ওদের জল দিয়ে দ্যাখতো। ওরা সম্ভবত জল চাইছে। সেদিন থেকে একটা প্লাস্টিকের ছোট বাটিতে ওদের পরিষ্কার জল দিচ্ছি। শালিক পাখি দুটি এখন শীস দেয়। জানলার পর্দা তোলা থাকলে জানলার কাছে এসে ঘাড় কাত করে অবুঝ ভাষায় আনন্দ প্রকাশ করে। কখনো কখনো আবার জোড়া পায়ে নাচে। ওরা আমার বন্ধু হয়ে গেছে। কিন্তু একদিন বিড়ম্বনায় পড়তে হল। ‘হুতোম’ সেদিন ছাদের রেলিঙ-এ বসে বলল, ‘’এবার আমাকে ভুলে যাবি নাতো?’’
আমি বললাম, ‘’না ভুলব কেন? ওরা জল চাইছিল। এই গরমে ওদের জল দিলাম।‘’
হুতোম বলল, ‘’এটা ভালো কাজ সবাই জানে। এতে ‘বাহবা’ কুড়োবার মতো কিছু হয়নি। যাই হোক এবার বল ভোটের ফল প্রকাশের পর তুই ইন্টারনেট ব্যবহার করলি না কেন?’’
আমি বললাম, ‘’সেটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়। আমি সবাইকে বলব কেন?’’
হুতোম বলল, ‘’ঠিকই। তোকে বলতে হবে না। কিন্তু তুই ‘ফেসবুকে’ ‘ট্যুইটারে’ অনেক মেসেজ মিস করেছিস। আমার একটা মেসেজ খুব ভালো লেগেছে। কেউ একজন লিখেছিল, ’১২ কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী রেখেছ বাঙালি করে ‘বামপন্থী ভোটার’ করনি।‘’ আমি রবি ঠাকুরের ‘জীবনস্মৃতি’ পড়তে পড়তে হুতোমের কথা শুনছিলাম। বললাম, ‘’আমি এসবের মধ্যে নেই।‘’ মুখ তুলতেই দেখলাম হুতোম চলে গেছে। একটা কাক বাটির জল খেয়ে বাটিটা উলটে দিয়ে চলে গেল।
ভাঙ্গা গড়ার সংস্কৃতি কী একেই বলে? গণতন্ত্রে এটা হয়েই থাকে। ‘মসনদ সংস্কৃতি’র বয়ান আমরা চিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তার উজ্জ্বল উদাহারণ। কিন্তু ভারত নামক একটি গণতান্ত্রিক দেশে ‘মসনদ সংস্কৃতি’ খুব বেশিদিন টেনে নিয়ে যাওয়া কি সম্ভব? ‘দলদাস সংস্কৃতি’ অথবা মধ্যমেধার সংস্কৃতি? ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংস্কৃতি বলে কী কিছু হয়? নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নেত্রী বলেছিলেন, ‘’সাংস্কৃতিকভাবে আগে বাংলাকে এগিয়ে নিতে হবে। সঙ্গে থাকবে ছাত্র যুব।‘’ আর পরে কি বললেন তিনি? মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার পরে তিনি বিধানসভায় বললেন, ‘’যাদের একজন সদস্য আছেন আমি তাদেরও অভিনন্দন জানাচ্ছি। বিধানসভায় আমরা অনেক প্রয়োজনীয় বিষয়ে আলোচনা করব।‘’ মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘’কটূক্তি, কুৎসা করবেন না, যাতে একে অপরের সঙ্গে তিক্ত সম্পর্ক হয়। যা হওয়ার হয়েছে। সুন্দর সীমারেখা রেখে সকলের বোঝাপড়া, ভালোবাসার মধ্য দিয়ে শুভ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে নজির সৃষ্টি করতে হবে। যা পশ্চিমবঙ্গ, ভারতকে পথ দেখাবে।‘’ তিনি এরপরও থামেননি। গত পাঁচ বছরের অভিঞ্জতার মান দন্ডে বিরোধীদের কাছে নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে  চেয়েছেন। দেশ নিয়ে যারা ভাবেন। রাজ্যের উন্নয়নের কথা যারা ভাবেন। সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের কথা মনে রেখে তিনি আস্থার সঙ্গে বলেছেন, ‘’হয়তো বলে যাব। হয়তো হবে না। কিন্তু চেষ্টা করতে ক্ষতি কী?’’ সময়ের পরম্পরায় কূটনীতি বাস্তবকে চিনে নিতে চায়। বাস্তব সব সময় সামগ্রীক স্বার্থের কথা বলে সম্ভবত। ইতিহাস যে তথ্য সযত্নে ভবিষ্যতে আমাদের সামনে চয়ন করে আনে।
২০১৬ হাটি হাটি পায়ে এই বাংলায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বাংলার মানুষ গণতন্ত্রকে কি ফিরিয়ে আনছে? গ্রাম বাংলার আটচালায়, উঠনে, নাগরিক সভ্যতার ‘বহুতল’ বাড়িগুলির গাড়ির শান বাঁধানো ঝা চক চকে চাতালে, দুর্গা মণ্ডপে কি নতুন মহালয়ার সুর বাংলার মানুষ শুনতে পাচ্ছে? এবার এই রাজ্যের বিধানসভার চালচিত্রটা দেখুন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ‘ওরে বিহান হল’ বলে বিধানসভায় বিরোধী আসনে বসল। ১৫ বছর পর। আনুপাতিক হারে ২০১৬ সালের ষোড়শ বিধানসভা নির্বাচনের পরে মুসলিম বিধয়কের সংখ্যা বেড়েছে। ২০১১ সালে মোট মুসলিম বিধায়ক সংখ্যা ছিল ৫৯ জন। ২০১৬ সালে তুলনামুলকভাবে অনেকটা বেড়েছে। এবারের বিধানসভায় তৃণমূল, বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেসের মিলিত মুসলিম বিধায়ক সংখ্যা সর্বমোট ৬১ জন। বামফ্রন্টকে নিয়ে ভারতীয় বামপন্থীদের যে চিন্তা ছিল, সেটার অনেকটা উত্তর মিলেছে। কমরেড সীতারাম ইয়েচুরির নেতৃত্বে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটি দায়িত্ব নিয়েছিল বলেই হয়ত এই ছবি আমারা দেখতে পেলাম। রাজ্যের পোড় খাওয়া নেতা কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং কমরেড সূর্যকান্ত মিশ্রের নেতৃত্বে রাজ্য কমিটি নতুন পরিষদীয় নেতৃত্ব তুলে আনতে পেরেছেন। সময় বলবে এই নেতৃত্ব মানুষের জন্য, এই বাংলার জন্য কতটা দায়িত্ব নিতে পারছেন। পাশাপাশি বিজেপি তাঁদের দলের নতুন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের নেতৃত্বে একের জায়গায় তিনজন বিধায়ক নিয়ে বিধানসভায় হাজির। গণতন্ত্রের সার্বিক বিতর্ক উপভোগ করার অপেক্ষায় বাংলার মানুষ। কিন্তু এরপরও বলতে হয় পঞ্চাশ বছরের পুরনো বামপন্থীদের ভূমিকা এবগ দায়িত্ব আর সকলের থেকে আজ এই রাজ্যে অনেক অনেক বেশী নয়? যেহেতু তাদরে অতীত ছায়া আমরা বয়ে বয়ে বেড়াচ্ছি।           
তথাকথিত একটা তীব্র সাংস্কৃতিক অভিঘাত এই রাজ্যকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কম বেশি প্রায় চল্লিশ বছরের ‘বামপন্থী’ সংস্কৃতি এই রাজ্যে অন্য একটা মনন দিয়েছিল। শুধু এই রাজ্যে নয় সারা দেশে তার প্রভাব বিস্তার করেছিল। গণনাট্যের সময়কালকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু তারপর? কিছুটা তাত্ত্বিক। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত, কখনও আদর্শগত কারণে বাংলার উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক নক্ষত্রদের আমরা অপাংক্তেয় করে দিয়েছিলাম। এবং কিছু বেনোজল এসে প্রথম সারির সাংস্কৃতিক নেতৃত্বকে ‘স্তাবক’ করতে না পেরে বাংলার উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিল। নামগুলি মনে পড়ছে। দেবব্রত বিশ্বাস, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, বিজন ভট্টাচার্য, তৃপ্তি মিত্র, ঋত্বিক ঘটক, শম্ভু মিত্র, সতীনাথ ভাদুড়ী, তারশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র এবং আরও অনেকে। আমি ‘জি নিউজ’ এ চাকরি করার সময় এক সাংবাদিকের কাছে শুনেছিলাম সে সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘জাগরী’ পড়েছে কিন্তু ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস এর’ নাম শোনেনি। আমার কাছে শোনার পরে প্রেস ক্লাবে বসে সে আমাকে বলেছিল, ‘আমি বামপন্থী পরিবারের ছেলে অথচ দাদা দেখ,  আমাকে এই বইটার নাম কোনওদিন বলা হয়নি। তোমার কাছে শুনে বইটা পড়লাম। অসাধারণ উপন্যাস।‘’
জেলে বসে তিনি জাগরী লিখেছেন। পরাধীন ভারতের অন্যতম সৈনিক সতীনাথ। দেশে স্বাধীনতা এল। নতুন সরকার। সতীনাথ ভাদুড়ীর নাম সাংস্কৃতিক জগতে ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে বিপুল জনপ্রিয় তিনি। মন্ত্রিত্বের জন্য তাঁকে প্রস্তাব দেওয়া হল। তিনি সম্মানের সঙ্গে পরিহার করলেন। সতীনাথ বললেন, ‘’আর কী দরকার? দেশ স্বাধীন করার জন্য লড়াই করেছিলাম, দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে, এবার রাজনীতিতে থাকলে ক্ষমতার লোভ আসবে মনে।‘’
আর তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়? যে বিশাল ক্ষেত্র জুড়ে তার কাজ সেখানে একজন ব্যক্তি মানুষের পক্ষে সবটা মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। সত্তরের দশকে আমার থেকে বয়সে আট বছরের বড় এক অধ্যাপক দাদা বলেছিলেন। ‘আরোগ্য নিকেতন’ নোবেল পেতে পারত। ভদ্রলোকের দেশ-বিদেশের ধ্রুপদী সাহিত্য অনেকটা পড়া ছিল। আমার যতদূর মনে পড়ছে ‘আরোগ্য নিকেতন’ জীবন মশাইয়ের প্রস্থানের গল্প। নতুন সময়কে, নতুন কালকে,  বর্তমান সময়ের চিকিৎসা বিঞ্জানকে মেনে নেওয়ার সময়ের কথা তিনি বলেছেন। পাশাপাশি ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসে একই রকমভাবে বা একই ছন্দে তারশঙ্কর ‘করালী’র নেতৃত্বের কথা আমাদের বলে গেছেন। তিনি শিল্পের (ইন্ড্রাস্ট্রী) আহ্বানের কথা বলেছেন। বনোয়ারির ভূমিকার বেলা যে শেষ হয়ে যাচ্ছে সেই কথা আমরা শুনেছি। কালউত্তীর্ণ উপন্যাস।
গোপাল হালদার একটি প্রবন্ধে লিখছেন, ‘’......নরেনবাবু বলেছিলেন তারাশঙ্করের কথা—‘কংগ্রেসের আন্দোলনে (১৯৩১-এ) জেলে গিয়েছিল। আর যাবে না বলেছে। ওর দেশবোধ যাবে কোথায়? ঠিকই, সাহিত্যের কামড়ই শুধু কচ্ছপের কামড় নয়, ওই রাজনীতির কামড়ও কচ্ছপের কামড়—যাকে ধরে তাকে আর ছাড়ে না। ছাড়লেই কি ঘা শুকোয়?’ তারাশঙ্করের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে বুঝেছিলাম—বাইরের ঘা শুকিয়েছে, কিন্তু মনের ঘা শুকোয়নি, না ভেবে পারেন না—দেশের কী হচ্ছে কী হওয়া চাই।‘’ (পশ্চিমবঙ্গ, ১ অগাস্ট, ১৯৯৭)।
রাজ্যের বামপন্থীদের কাছে আমাদের যে প্রত্যাশার কথা আমরা বললাম, সেই অবস্থান থেকে চিনের বিতর্কিত সাংস্কৃতিক বিপ্লব প্রসঙ্গে মাও ৎসে তুং যে দীর্ঘ বক্তব্য রেখেছিলেন (২রা মে, ১৯৪২), ‘সাহিত্য ও শিল্পকলা প্রসঙ্গে’ (ইয়েনানের আলোচনা সভায় প্রদত্ত ভাষণ) নামে পরিচিত। কিছু অংশ উল্লেখ করা যাক। ‘’.........চীনা জণগনের মুক্তির জন্য পরিচালিত আমাদের সংগ্রামে বিভিন্ন ফ্রন্ট আছে; সেগুলির মধ্যে লেখনী ও বন্দুকের ফ্রন্ট, অর্থাৎ সাংস্কৃতিক এবং সামরিক, এই দুটি ফ্রন্টই রয়েছে।...... মনোভাবের সমস্যা। শ্রেণী দৃষ্টি থেকেই যে কোনো বিষয়ের প্রতি আমাদের বিশেষ মনোভাব প্রকাশ পায়। দৃস্টান্তস্বরূপ ধরা যাক, কাউকে প্রশংসা করতে হবে, না তার স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে হবে? এ প্রশ্নটি হচ্ছে মনোভাবের প্রশ্ন। কোন মনোভাবের আমাদের প্রয়োজন? আমি বলি, উভয় মনোভাবেরই প্রয়োজন আছে। কাদের নিয়ে কাজ সেটাই হল প্রশ্ন ।‘’ আধুনিক চিনের রূপকার দেং জিয়াওপিং এর নেতৃত্বে চিনের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৮১ সালে ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’কে ভুল বলে সেই অধ্যায় মুছে ফেলেছে। উন্নয়ন কে হাতিয়ার করেই ‘নতুন চিন’ এর বুনিয়াদ গড়ে তুলতে চাইছেন বর্তমান চিনা নেতৃত্ব।  সমাজ বিঞ্জানীরা বলছেন ‘সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি’। তাই অতীতের যে অংশটা অপ্রয়োজনীয় সেটা ফেলে দেওয়ায় বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু যে ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপাদান আছে সেটাকে কাজে লাগাতেই হবে। বৃহত্তর সমাজের স্বার্থে।
আমেরিকান এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকপ্রাপ্তির যুগ কি বলছে? ‘’অষ্টাদশ শতকে আমেরিকান এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকপ্রাপ্তির প্রধান ঝোঁক ছিল ঐতিহ্যের বদলে যুক্তি, প্রশ্নহীন ধর্মীয় বিশ্বাসের বদলে বৈঞ্জানিক অনুসন্ধান এবং রাজতন্ত্রের বদলে নির্বাচিত সরকারের ওপর। আলোকপ্রাপ্ত চিন্তাবিদ ও লেখকরা ছিলেন ন্যায়, স্বাধীনতা, সমানাধিকার ও মানুষের প্রকৃতিদত্ত অধিকার রক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ।‘’ (মার্কিন সাহিত্যের রূপরেখা, মার্কিন বিদেশ দপ্তর, আন্তর্জাতিক তথ্য কর্মসূচি ব্যুরো)
ভারতেও নববই দশকের পর ‘বাজার অর্থনীতি’র ন্যায্য দাবি আমরা মেনে নিয়েছি। সেই মানদণ্ডে এই রাজ্যেও তার প্রভাব অস্বীকার করা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রয়োজন এক ঝাঁক ঝাঁ চক চকে ছাত্র-যুব। ১৯৮৭ সালে শান্তিনিকেতনে সমাবর্তনে এসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গাঁধি কি   বলেছিলেন। আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় ‘দেশ’ (৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৭) সংখ্যায় লিখছেন, ‘’শান্তিনিকেতনে এসে প্রধানমন্ত্রী তাঁর এই মতামত অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন। আগেও তাঁর এই মত জানা ছিল এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষা নীতিতেও এই মত কিছুটা প্রতিফলিত হয়েছে ঠিকই; কিন্তু শান্তিনিকেতনে এসে তিনি এত তীব্রভাবে কথাগুলো বলেছেন যে, এবার বোধহয় সকলেরই নড়েচড়ে বসার কথা। তিনি নিঃসংকোচে জানিয়েছেন, সমাজবাদের নামে মাঝারিয়ানাকে আর বরদাস্ত করা হবে না। মাঝারি মাপের মানুষ নয় বড় মাপের প্রতিভাবান চাই। রাজীব বলেছেন, তিনি ‘’ইনটেলেকচুয়াল এলিটিজম’’ চান। এ ব্যাপারে কোনও আপসে তাঁর বিশ্বাস নেই।.........রাজীবও বারবার বলছেন, অনুগত, বাধ্য, দীনাতিদীন, ছাত্র চাই না; ছাত্রদের আক্রমণাত্বক, বৈপ্লবিক, সাহসী ও অশান্ত হতে হবে।‘’                         

                            

Thursday, 2 June 2016

সামপ্রতিক এবং নিকট অতীত

  নিকট অতীতঃ  
সময় ছুটতে ছুটতে পেছন ফিরে তাকাতে চায়। ব্যক্ত কথার অভিঘাত অব্যক্ত শব্দের আলিঙ্গন খোঁজে। তাই আমার আবেদন হোক প্রত্যায়িত আমন্ত্রণের অভিঘাত। এখানে জনান্তিকে বলে রাখা ভালো, একথা সে কথার পরই শুরু হয় কথপোকথন। মার্জনা করবেন। আবেদন কেন প্রতিবেদন হবে? নিজেকে নিজের মত করে পাইনি দীঘৎ দীঘৎ সময়কাল। আমেরিকার প্রশ্রয়ে আন্তর্জাতিক উঠোন পেয়েছি। মুক্ত গণতন্ত্রের স্বাদ উপভোগ করছি। সেই প্রশ্রয়ে নিকট অতীত নিয়ে ফিরে বসা। এসবের কোনও প্রয়োজন ছিল না। কয়েকজন বলল কিছুটা যখন প্রকাশ হয়েছে আরও কিছুটা হোক। যথা আঞ্জা বলে শুরু করি।
হয়ত বামপন্থা আমাকে অনেকটা গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। আমার গড়ে ওঠা মননের প্রায় ৯০ শতাংশ ওরা ওদের তথাকথিত কুশলী পরম্পরায় ফিরিয়ে নিতে চাইল। পেরেছে কি? সম্ভবত নয়। কারণ গান্ধি-নেহরুর চিন্তা তথা ভারতীয় জাতীয়তাবাদ আমার প্রাথমিক ভিত গড়ে দিয়েছিল। সেই জাতীয়তাবাদী হারিয়ে যাওয়া মননের ধূসর হয়ে যাওয়া পাতার পৃষ্ঠা থেকে চেনা অক্ষরগুলো ফিরতে চাইছে। ফিরতে চাইছে জাতীয়তাবাদী চেতনার রঙ মশালের আলোয়। 
আমি ১৯৭৫ সালের উচ্চমাধ্যমিকের ব্যাচ। মিলন ঘোষ হাজরা এবং ডাঃ নবদ্বীপ সেনদের সঙ্গে আমি প্রাথমিক স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছি। পারিবারিক এবং আর্থ-সামাজিক সীমাবদ্ধতা আমাকে বারে বারে থমকে দিয়েছে। তাই ওদের থেকে একবছর পিছিয়ে পরলাম। মিলন ঘোষ হাজরা (বাবুন) শৈশবের বন্ধুত্বের মর্যাদা আমাকে দিয়েছে। ১৯৭৯ সালে নলহাটি ‘মিলনী সংঘ’ এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবার পর মিলন (বাবুন) স্মরণিকা প্রকাশের সিধান্ত নেয়। সে বছর ছিল ৪৪ তম প্রতিষ্ঠা দিবস। (১৯৭৯)। এবং ৪৪ বছরে প্রথম স্মরণিকা। মিলন ঘোষ হাজরা আমাকে ‘স্মরণিকা’ সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছিল। প্রকাশকাল ছিল ১৫ আগস্ট, ১৯৭৯। বাবুনকে আমার কৃতঞ্জতা জানাই।

১৯৭৬ সালে পেলাম অমিতাভ ধর (মিঠু), অমিত পাল (বাপী), দেবেশ তালুকদার, শান্তিলাল জৈন। আমরা এই চারজন একসঙ্গে স্কুল যেতাম। দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত আমরা ছিলাম পরস্পরের পরিপূরক। শৈশবের বিহানবেলা থেকে সাঁঝবেলার মাধুকরী করতাম ওদের সহায়তায়। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় অমিত আমাদের ছেড়ে সূদূর আকাশে চলে গেল। দীঘায় স্নান করতে গিয়ে ডাঃ মধুসূধন পালের দ্বিতীয় সন্তান বাবা-মায়ের সামনে মারা যায়। আমার একজন প্রিয় বন্ধুকে তখনই হারাই। অমিত ধর (মিঠু) আমাদের ক্লাশে বরাবর ফাস্টবয় ছিল। বাপী সেকেন্ড হত আর চন্দ্রনাথ দত্ত থার্ড হত। ১৯৭৬ সালে মিঠু উচ্চমাধ্যমিক ভালো ফল নিয়ে পাশ করার পর নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে পড়ত। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হল মিঠু। মানসিকভাবে অসুস্থ হল। মিঠুর মাকে আমি কাকিমা বলতাম। কাকিমা আমাকে বললেন, সমস্ত কথা। ওকে সাহায্য করার কথা। যেহেতু শৈশব থেকে ওদের বাড়িতে আমার যাতায়াত ছিল। আড়াল থেকে ও আমাকে সাহায্য করতে চাইত। মিঠু আমার অন্যতম প্রিয় বন্ধু ছিল। 
২০১৫ সালে জানতে পারলাম রাজ্য সচিবালয়ের এক উচ্চ পদস্থ আইএ এস আধিকারিক অমিতাভ ধর (মিঠু)এর সঙ্গে একসঙ্গে নরেন্দ্রপুর মিশনে পড়তেন। উল্লেখিত আই এ এস অফিসার ভদ্রলোক ১৯৮৭ সালে আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন। আমি তখন ‘দৈনিক বসুমতি’ পত্রিকায় মুক্ত সাংবাদিকতা করি। সেই সময় তাঁর বন্ধু সেই সাংবাদিক বন্ধুকে অনুরোধ করেছিল মিঠু। আমাকে আনন্দবাজার পত্রিকায় নেবার জন্য। তিনি যথেষ্ট চেস্টাও করেছিলেন। কিন্তু ১৯৮৭ সালে আনন্দবাজারের চাকরিটা রাজনৈতিক দাদাদের সন্তর্পণ আলতো ছোঁয়ায় আর হল না। একেই কি বলে বিধির বিধান। যা আজও টেনে নিয়ে যাচ্ছি। আমার প্রিয় বন্ধু মিঠুর আত্মার শান্তি কামনা করছি। মিঠু যেখানে আছ সেখানে আমাদেরও যেতে হবে। তাই তোমাকে আর কৃতঞ্জতা জানাতে চাইছি না মিঠু।
       
১৯৭৯ সালেই নলহাটিতে আমাদের পাড়ায় আমি বয়স্কদের জন্য নৈশ বিদ্যালয় শুরু করি। প্রায় পাঁচ বছর স্কুলটা চালিয়েছিলাম। শ্রমিক, মজদুর, রিকশা চালক অনেককেই অত্যন্ত লড়াই করে শিক্ষিত করেছিলাম। এই বিদ্যালয় সম্ভবত বীরভূম জেলায় প্রথম স্কুল ছিল। দুঃস্থ মানুষদের কলকাতায় নিয়ে এসে চিকিৎসা করানোর কথা আগেই বলেছি। ব্যক্তি হিসেবে কি করেছি বা কি পেয়েছি এটা অত্যন্ত গৌন বিষয়। আমি সমাজ থেকে কি আহরণ করতে পারলাম সেটাই ময়ূরপঙ্খী স্মৃতি হয়ে থাক। আবেগের সযত্ন ঘনঘটা আমাকে প্রজন্ম উত্তর মানবতার প্রশ্রয় দিক। মনে পড়ছে সেই শিক্ষক ভদ্রলোকের কথা। ১৯৮৩-১৯৮৬ সাল পর্যন্ত আমি বৌ বাজারের মেসে থেকেছি। 
এক ভদ্রলোককে দেখতাম প্রতি ইংরেজি মাসের দুতিনদিন রাত ৯।৩০ থেকে ১০টার সময় মদ্যপ অবস্থায় একটি বিলেতি মদের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ইংরেজিতে ভাষণ দিচ্ছেন। কিছুক্ষণ পরে ভদ্রলোকের পরিবারের কেউ একজন এসে তাঁকে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন। শুনেছিলাম তিনি থাকতেন শিয়ালদহ অঞ্চলে। অবিভক্ত ২৪ পরগণা জেলার কোনও একটি শহরের উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে প্রধান শিক্ষকের চাকরি করতেন। তাঁর স্ত্রী স্কুলের বেতন নিজে গিয়ে নিয়ে আসতেন। সেই টাকা থেকে কিছু টাকা স্বামীকে দিতেন মদ খাওয়ার জন্য। ওই টাকায় দুতিনদিন বিলেতি মদ খাওয়া যেত।

গল্প এখানেই শেষ নয়। ভদ্রলোক প্রতি সন্ধ্যায় বাড়ির কাছে একটি ফুটপাথে ‘পথশিশুদের’ স্কুল চালাতেন বিনা পারিশ্রমিকে। এটাই সম্ভবত ঠিক। এটাকেই বলে ‘কাজ’ করে যাওয়া। আমাকেও কাজ করতে দিন।

১৯৭৮ সালের বন্যার সময় নলহাটিতে আমি স্থানীয় বামপন্থী নেতাদের ‘দুর্নীতি’ নিয়ে খবর করি। ‘চণ্ডীদাস’ সাপ্তাহিক পত্রিকার সাংবাদিক হিসাবে। কয়েকজন বামপন্থী নেতা আমাকে মারে। এবং থানায় নিয়ে য়ায়। ১৪ ঘণ্টা আমাকে থানায় আটকে রাখা হয়। আমি তখন রামপুরহাট কলেজের ছাত্র। আমাদের বাংলার অধ্যাপক আশিস বন্দ্যপাধ্যায় (তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান বিধায়ক) আমাকে আক্রমনের প্রতিবাদে রামপুরহাট এসডিও অফিসের সামনে কলেজের ছাত্রদের নিয়ে প্রতিবাদ সভা করেন। এবং ‘ডেপুটেশন’ দেয়। ওই আন্দলনে আমিও ছিলাম।
  ১৯৮৫ সাল। নলহাটি ফিরলাম। প্রথমে ৩০০ টাকা বেতনে দু’মাস ইট ভাঁটায় চাকরি নিলাম। সেই টাকায় মায়ের চোখের ছানি অপারেশন করলাম। সেই সময় আমি প্রাথমিক স্কুলে শিখস্কতার চাকরি পেলেও রাজনৈতিক কারণে আমার চাকরি হল না। সিপিএমের গণ সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন এমন দু’একজনের কথা বলছি। যারা আমাদের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন বীরভূম জেলায়। তাঁরা বললেন তুই নলহাটিতে থাকিস না।এই সময়ে আমি নলহাটিতে ‘প্রগতি মঞ্চ’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তুলি। স্থানিয় ক্ষেত্রে ব্যপক সাড়া পড়ে আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। নলহাটিতে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করি। তিনটে ছবি কলকাতা থেকে নিয়ে যাই। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘পথের পাঁচালি’, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত পরিচালিত ‘গৃহযুদ্ধ’ এবং উৎপলেন্দু চক্রবর্তী পরিচালিত ‘চোখ’। নলহাটির ‘শঙ্কর টকীজে’ ছবি তিনটে দেখানো হয়েছিল। 

জীবীকার প্রয়োজনে আবার কলকাতায় ফিরলাম। কলকাতাতে এসেই বসুমতিতে ‘ফ্রি লান্স’ সাংবাদিকতার চাকরি। ছ’মাস কাজ করার পরও বেতন পেলাম না। এই সময় ‘আনন্দ বাজার’ পত্রিকা থেকে চাকরির প্রস্তাব পাই। কোনও এক অঞ্জাত কারণে চাকরিটা হয়নি। সালটা ১৯৮৭। তারও আগে ১৯৮৪ সালে ‘আজকাল’- এ চাকরি পাক্কা হয়েছিল। সাহিত্যিক সন্দীপনদা আমকে তৎকালীন সম্পাদক পূষন গুপ্তের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। এবং সব কথা ঠিক হয়ে যায়। আমি বিনোদনের পাতায় (বীভাগে) সাংবাদিকতা করব। ১৯৮৪ সালে ‘বর্তমান’ ‘পত্রিকাতে’ও সুযোগ পাই। অদৃষ্টের কি পরিহাস কোনও চাকরি আমাকে করতে দেওয়া হয়নি। খুব সম্ভবত আমাদের জেলার দু’ই স্বনামধন্য ব্যক্তি আমাকে এইভাবে আটকে রাখলেন।
 
১৯৮৬ সালে কলকাতা এসেই একটি ছোট বিঞ্জাপণ সংস্থায় ৬০০ টাকার চাকরি। ৪০০ টাকা নিজের জন্য রেখে ২০০টাকা মাকে পাঠাতাম। এক বছর চাকরি করে পরের বছর থেকে আবার ‘ফ্রি লান্স’ লেখা লেখি এবং অন্যান্য কাজ করে জীবীকা চালিয়ে নিচ্ছিলাম। ১৯৮৮ সালের ২৪ নভেম্বর বিয়ের সিদ্ধান্ত। একটি প্রথম সারির বামপন্থী রাজনৈতিক দল প্রস্তাব দিল বিধানসভা ভোটে দাঁড়ানোর। তাঁরা ফ্ল্যাট সহ কলকাতা শহরে সব দেবে। আমি প্রস্তাব সসম্মানে প্রত্যাখ্যান করলাম। আমার স্ত্রী সাহিত্যিক মনোজ বসুর সম্পর্কে নাতনি।  তাঁর নাগরিক মূল্যবোধ কিছুটা আহত হয়। ১৯৭৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার আগে ১৯৭৪ সালে আমার স্ত্রীর বাবা মারা যান। ওর বাবা বিড়লা সংস্থার পদস্থ কর্মী ছিলেন। মা এবং দাদার সঙ্গে থাকলেও দাদার কাছ থেকে সে রকম সাহায্য পায়নি। তাই তাঁকেও নিজের চেস্টায় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়। কলকাতা শহরে ‘জনঅরন্য’ ‘চৌরঙ্গী’ বা ‘সীমাবদ্ধ’ এর নায়কদের মত ছুটতে শুরু করলাম। সাংবাদিক, লেখক হওয়ার সাধ তখন সলিল সমাধি (‘রেখ মা দাসেরে মনে’)। 
        
কসবায় আমরা থাকতে শুরু করি। আমাদের কিছুটা স্বচ্ছলতা আসতেই তিনজন ভাইপো, একজন ভাগ্নে সহ মাকে কলকাতায় নিয়ে এলাম। এরপর আমার সঙ্গে সেই বিখ্যাত নেতার দেখা হল। তখন একটি ছোট গল্পের বই প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। সালটা ১৯৯৬-১৯৯৭।

সংযোজন পৃষ্ঠাঃ (৩) 
‘সুবর্ণরেখা’ থেকে বইটি প্রকাশ করার সব ব্যবস্থা হয়ে গেল। তারপর আবার সব এক এক করে হারিয়ে গেল। বইটি আজও প্রকাশ করা গেল না। অভিযোগ শুনলাম। আমি ভাইপোদের ব্যবহার করেছি। আজ কলকাতায় সবাইকে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছি। কলকাতায় সব কিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে নলহাটি ফিরলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম সাংবাদিকতা করব। ‘জি নিউজ’ এর তৎকালীন বাংলা চ্যানেল ‘আলফা’ বাংলা থেকে অফারও পেয়ে গেলাম। কপর্দকশূন্য অবস্থায় নলহাটিতে আমি, আমার স্ত্রী, আমার ভাইপো (আমার ছোড়দার একুশ দিনের ছেলেকে আমরা বড় করেছি। কারণ আমার বৌদি ওকে একুশ দিনের রেখে মারা যায়। পরে আমার ওই দাদা আবার বিয়ে করে এবং তাঁর প্রথম পক্ষের দুই ছেলেকে আমাকেই দেখতে হয়।) এগ রোল, ‘মোগলাই পরটার’ ব্যবসা করলাম। পাশাপাশি আমি ‘লেখালেখি’ বজায় রাখলাম। লিটিল ম্যগাজিন করলাম ‘আর্থ-সামাজিক’ নামে।‘জি নিউজের’ ডাকে কলকাতায় আসতে হল। এক দশক আগে যে আভিজাত্য নিয়ে কলকাতায় ছিলাম সে সব এখন ধূসর। ১৯৯১ সালের কঠিন কঠোর বাস্তব চিনেছি। মানুষ, অথবা তাঁরা মুখোশ ব্যবহার করা তথাকথিত ‘কমরেড’। ‘বিপ্লবে’র নামে শপথ নিয়ে তাঁরা মানুষ ঠকায়। চেনা আবেগ দিয়ে এই সব ‘নাগরিক সভ্যতা’ কে আমরা গ্রামীন সভ্যতার মানুষেরা ভুল ঠাউরে বসি। ওদের অট্টহাসির উৎসব চলে। সৌজন্য আছে এমন মানুষদের এঁরা অনন্য এক ভাষায় অচ্ছ্যুত করে রাখে। ওদেরই পরিকল্পিত ‘চক্রব্যুহে’ টেনে আনে। তারপর সময় মত ব্যবহার করে। মসৃণ এক অভিজাত চিত্রনাট্যের চরিত্র করে গড়তে চায় এঁরা। এইসব লোকেদের ‘অহং’ কে চিহ্নিত করা যায় না। এরপরও যদি থেমে থাকি নিজের কাছে নিজেকে ‘ক্লাউন’ মনে হবে। তাই আরও এক ‘পদাতিক’ এর নেশায় আজও ‘মানবতা’ চিনতে চাইছি। 
        
সাম্প্রতিক
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলির যে অঞ্চলে আমরা থাকি সেটাকে ঠিক শহর বলা যাবে না। শহরের উপকণ্ঠ বলা যেতে পারে। বিশেষত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের জন্য। সাংবাদিকতার সুবাধে গত ১৪-১৫ বছর এই অঞ্চলে আছি। আমি এই শহরে জন্মগ্রহণ করিনি। এখানকার স্কুল কলেজে পড়িনি। স্থানীয় দাদাদের নেতৃত্বে সংগঠিত অপ্রয়োজনীয় প্রচার হয়েছিল। কারণ আমার সত সাংবাদিকতায় অনেকে পদচ্যুত হয়েছেন। অনেকের মুখোশ খুলে গেছে। আরও অনেকের মতো শ্রদ্ধেয় তৃণমূল নেত্রী এবং বর্তমানে রাজ্যে তাঁর দলের দ্বিতীয় বারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০০৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ এ জয়েন করার কথা বলেছিলেন। কেন্দ্রীয় কমিটিতে নিয়ে নেবার কথাও বলেছিলেন। আমি সম্মানের সঙ্গে আমার অনিচ্ছার কথা জানাই। তখন আমি ‘Zee News’ এ চাকরি করি। পরবর্তীতে তাঁর কাছ থেকে অকৃত্রিম সাহায্য পেয়েছি। আমি রাজনীতির লোক নই। বাংলা তথা ভারতীয় সংস্কৃতির ‘সেবাদাস’ হয়ে কাজ করতে পারলেই আনন্দ পাব।
২০০৯ সাল থেকে যে ধারাবাহিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়লাম, এটা অনেকে জানতে চাইছেন। ২০০৯-২০০১১ পর্যন্ত তিন তিন বার ‘২৪ ঘণ্টা’ বাংলা ‘নিউজ চ্যানেলে’ চাকরির সুযোগ হল। তারপর ২০১১ সালে আনন্দবাজার পত্রিকাতে। ২০১২ সালে ‘এই সময়’ দৈনিকে। কিন্তু না নাগরিক কলকাতা আমাকে মানতে পারল না। 
দিন কয়েক আগে একাডেমী যাচ্ছিলাম। রঙরূপের ‘অব্যক্ত’ নাটক দেখতে। অবিশ্রান্ত বৃষ্টি পড়ছে। যেন মুসল পর্ব শেষ হচ্ছে। ধুয়ে দিচ্ছে। শিশির মঞ্চের পেছনের দিকটায় (নন্দনের উল্টোদিকে) একটা বন্ধ দড়জা শেডের তলায় আমরা দাঁড়িয়ে। জনপ্রিয় নাট্য ব্যক্তিত্ব দেবশঙ্কর হালদার আর আমি। দেবশঙ্করদা আমাকে চেনেন বুঝলাম। তিনি ‘বহুরূপী’ এর প্রযোজনায় একটি ঐতিহাসিক নাটকের কথা বলছিলেন। সেই নাটককে কেন্দ্র করে একটি বিতর্কের প্রসঙ্গ এল। আমিও সাংবাদিক, লেখক, শিল্পীদের সীমাবদ্ধতার কথা বললাম। প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের আলাপ চারিতায় পরস্পরে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে, কাজ করতে গিয়ে বাঁধা, বিঘ্ন, সমস্যা, সামাজিক, পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা, জটিলতা, কূটিলতা আসবেই, তবু বৃত্ত পরিপূর্ণ করতে ‘কাজ’ আমাদের করে যেতেই হবে। পারিবারিক বৃত্ত। পারিবারিক দায়বদ্ধতা, অনুভূতি, আবেগ আরও সন্নিকটে চিনলাম। সম্প্রতি ‘নাটক বিষয়ক’ একটি লেখার জন্য নাটক সংক্রান্ত কয়েকটি বই পড়তে হচ্ছে। শ্রদ্ধেয় নাট্য ব্যক্তিত্ব দেবাশিস মজুমদার সম্পাদিত শূদ্রক থেকে প্রকাশিত ‘তৃপ্তি মিত্র’ বইটি পড়লাম। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক বাসু ভট্টাচার্য লিখছেন, ‘’............... শম্ভু মিত্র তার স্বরচিত নাটক ‘চাঁদ বণিক’ এর পালাটি শেষ অবধি মঞ্চস্থ করলেন না-। ওই নাটকটা বেশ কয়েকবার শম্ভুদার মুখেই শুনেছি। ওই নাটকটা তৃপ্তিদি থাকতে থাকতে মঞ্চস্থ হবার প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন ছিল চাঁদ বণিক, সনকা, এবং বেহুলার ভূমিকায় শম্ভু-তৃপ্তি-শাওলীর একত্রিত হওয়ার—এক সাথে। একই মঞ্চে। এঘটনাটা যদি ঘটত তাহলে আমাদের সৌভাগ্য হত এমন একটা নাটক দেখার, যে নাটক আজ অবধি অনেক অনেক না দেখা নাটকের—না জানা নাটকীয়তার—অনেক না বোঝা দৃষ্টিকোণের অনেক ঝাপসা বক্তব্যের সামনে থেকে পরদা তুলে দিত।‘’
এই জীবনবোধের পরে। অথবা এই উপলব্ধির একাগ্রতায় পারিবারিক বৃত্ত কে কোন অহমিকায় বিসর্জন দিতে চায় আহাম্মকের দল? যেখানে গদ্য থেমে যায়। কবিতার মাদকতায় প্রেম চুপি চুপি বলে আমি সাদা ফুলে আছি। আমি লাল ফুলে ছিলাম। আমি ভালবাসায় আছি। আমি সমাজে থাকতে চাই আমাকে সমাজে থাকতে দাও। তোমরা অর্থ নাও। যশ নাও। মান নাও। আমাকে পরিবারে থাকতে দাও।