Friday, 28 July 2017

ছন্দপতন

ছন্দপতন: 
গদ্যের ছন্দ থেকে মুক্ত বিহঙ্গ খুঁজে পেতে চায়,
কেউ কেউ হেসে ভেসে থাকে উত্তুঙ্গ মেঘ মল্লারে।
বলা না বলা কথথক সুরের ছন্দ-শৈলী...... 
জানা না জানায় বেসুর হয়ে আসে।
সাদা কবুতর নূপুর পায়ে অচেনা ঠিকানায়
নেচে যায়, ডেকে চলে এক সমুদ্র অহংকারে।
লাল-হলুদ-নীল গোলাপের পাশে......  
সাদা কবুতর হাসতে ভুলে গেছে। ওকে কি
মেঘের নীচে পথ বলে দেবে তোমরা?  
সাদা সাদা পেঁজা মেঘেদের সঙ্গে নূপুর বাজাবে?
শরৎ মেঘের সময় সব ঋতু বয়ে আনতে জানে না।
সাদা মেঘ হারিয়ে যায় অসময়ের অকাল ভৈরবী
প্রভাতি গানে, আজ গঙ্গায় প্লাবন নেই,
সাদা কবুতর নূপুর পায়ে অচেনা ঠিকানায়
এসে খোঁজে, হেমন্তের হিমেল বিকেল।
সাদা শিউলির বরণডালায় টুপ টুপ টুপ
হেমন্ত ভোরের শিশির ভাসে।
কেউ কেউ হেসে ভেসে থাকে উত্তুঙ্গ ঠুমরী গানের
পেয়ালা হাতে, বসন্ত এসে ফিরে গেছে,
বসন্ত ডাকে বারে বারে, ডাকে ‘কুহু কুহু রবে’, সাদা কবুতর বাসা খুঁজে নিতে চায়।    

Wednesday, 19 July 2017

পাশ্চাত্যের আয়না

পাশ্চাত্যের আয়না:

হাজারটা দুয়ার খুলে দিলেও ‘সম্রাট’ কি ফিরবেন?
চাল্লিশ চোরের নতুন গল্প লিখলেও কি ‘আলিবাবা’
বলবেন, ‘আমার বাড়ির দেওয়ালে আচড় কেটোনি!’
দাগ সাদা বা কালো যাই হোক
নজর পড়ুক, দেখা না যাক, প্রাচ্যের শৈশব হারিয়ে
যায়, তৈলাক্ত মরুভূমির শীতল রক্তের ধূসর প্রান্তরে।
কৈশোর খোজে হারিয়ে যাওয়া সময়ের......
শিশির ভেজা পাথরের আপ্যায়ন। 
হাজারটা দুয়ার খুলে দিলেও সম্রাট
কি আবার বলবেন? ‘আমি মুঘল সাম্রাজ্য, মৌর্য সাম্রাজ্য এবং
গৌর বাংলার অদ্বিতীয় গণিতবিদ!
প্রিন্স দ্বারকানাথ গঙ্গাতীরে সপ্তম নৌবহর ভেড়ালেন,
ব্রিটিশ, পর্তুগীজ বণিক ফিরে এলেন, হুতোম লিখতে চাইল।
সতীদাহপ্রথা রদ হয়েছে, বিধবা বিবাহের স্বীকৃতি এল,
স্ত্রী শিক্ষার প্রচলন হয়েছে!  
সধবার দল নগর সন্ন্যাসিনী হয়ে ‘মহানাগরিক’
খুঁজে রাজ্য রাজধানী চিনলেন।
একশত উপাখ্যান লেখা হল.........  
আলিবাবা ফিরলেন না।          
         


Wednesday, 5 July 2017

উপচিত উপঢৌকন সংস্কৃতি খুঁজতে খুঁজতে:

উপচিত উপঢৌকন সংস্কৃতি খুঁজতে খুঁজতে: 

যৌথ সমাজ নামক সোনার পাথর বাটির গল্প বর্তমানে কেউ কি আর বলে? যৌথ পরিবার এখনও কোথাও কোথাও আভিজাত্যের অভিজাত প্রাসাদে ঝাড় বাতির ঝাঁপটায় ঝাঁপতাল বাজাচ্ছে। বলতে চাইছি উল্টোদিকে হাঁটতে চাইলে কেন প্রশ্ন ওঠে? প্রশ্ন তোলার অধিকার তাঁরা পায় কোথায়? ভেলা ভাসিয়ে দিলে ভেলা জানে না কোথায় কোন তীরে গিয়ে ভীড়বে। কয়েকদিন আগে উল্টোরথ ছিল। মাসির বাড়ি থেকে জগন্নাথদেব ফিরলেন নিজের বাড়িতে। সঙ্গে ভাই বলরাম এবং বোন সুভদ্রা। জগন্নাথদেবের এই সময় ভাই ফোঁটা হয় হয়ত। সোজা পথে এসে উল্টো পথে ফেরেন তিনি, সেই কারণেই কি উল্টো রথ? বেশ কয়েক বছর আগে ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ নামক যৌথ পরিবার এবং যৌথ সমাজ তথা যৌথ সংস্কৃতির সদস্য হিসাবে প্রশ্ন তুলেছিলাম। বাংলা সাহিত্য, সঙ্গীত সহ সংস্কৃতি ক্ষেত্রে  আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করবে কারা? লেখাটি শব্দ এবং ভাষার কোমর নাচানোর চেষ্টা থাকলেও আবেগের আধিক্য কয়েক চামচ বেশি ছিল। আধুনিক পণ্য বাংলা সিনেমা প্রসঙ্গে কিছুদিন আগে বাংলা সিনেমার এক প্রবীণ অভিনেতা কয়েকটি প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমা তথা মূল ধারার সিনেমা আজও পথ হাতরাচ্ছে। খুব খারাপ সময় বাংলা চলচ্চিত্রের। বর্তমান সময়ের দুই জনপ্রিয় প্রথম সারির নায়ক অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযোজনায় নেমেছেন। কতদিন? আধুনিক প্রযুক্তি ‘ডাবিং’ নামক চলচ্চিত্রকে যৌথ সমাজে প্রবর্তিত করতে পেরেছে। ফল কি  দাঁড়াল? বাংলার কি লাভ হইল? যদিও কৌশিক গাঙ্গুলী, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো (আমার সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। তৈলাক্ত মাথায় বাংলা ব্রান্ডের তেল দিচ্ছি না।) পরিচালক চেষ্টা করছেন পণ্য সংস্কৃতির ভীড়ে বাঙালির মূল্যবোধ, যৌথ পরিবারের স্মৃতি, যৌথ সমাজের বন্ধনের কথা মনে করিয়ে দিতে। অন্য ধারার গল্পকে দর্শকদের সামনে এনে হেচকাটানে আমাদের অন্য ধারার ছবি দেখাতে চাইছেন তাঁরা দুজনে। যে ছবি আজকের বাস্তবতায় খুব বেশি প্রয়োজন। এ ছাড়াও দু’একজন পরিচালক মেধার দৈন্যতায় ‘আঁতেল’- বাঙালিবাবুদের জন্য কিছু সিনেমা করেছেন এবং করছেন। কিছু বেশি রকমের ‘রিমেক’ নয় কি সেগুলি? সেইসব ছবি করতে যে শ্রম, মেধা, অর্থ খরচ হয় সেই যৌথ প্রচেষ্টা গবেষণায় দিলে ছবির ‘কনটেন্ট’ আরও ভালো হতে পারে বলেই মনে হয়। অতপর? হুতোম ফিচেল হেসে কয় বিশ বছর সিনেমা, নাটক না দেইখা, বাংলা ধ্রুপদী বই না পইড়া তর এসব লেখা ক্যান দরকার? হুতোমের সব কথার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।  
পণ্য উৎসবের মেজাজে ঝাঁকে ঝাঁকে নতুন উত্তর আধুনিক মেধার অভিনেতা অভিনেত্রীরা এসেছেন। অদৃশ্য অর্থের প্রাচুর্য এইসব নব্য যুবা সম্প্রদায়কে টেনে এনেছে। এদের মধ্যে অবশ্যই অনেকে আছেন যাঁদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কিছু নেই। প্রশ্ন হচ্ছে কোন পরিচালক সৃষ্টিশীল সিনেমার জন্য এদের সুযোগ করে দিতে পারবেন? গল্প কোথায়? চিত্রনাট্য কে লিখবে? নতুন ভাষায়? নতুন আঙ্গিকে? আজকের সিনেমাওয়ালারা উল্টো রথে চড়তে আগ্রহী নন। রথের দিন বা উল্টোরথের দিন জগ্ননাথ দেবের মতো ভাইফোঁটা করতে আগ্রহী নন তাঁরা? তবে আমাদের মত ছিঁচ কাদুনি কাঁদার মতো আম বাঙালি উত্তম-সুচিত্রার স্বর্ণ সময়েও ছিল বর্তমানেও আছে। ২০০২ সালে একটি টিভি চ্যানেলের অফিসে বার কয়েক বাংলা সিনেমার অন্যতম ব্যতিক্রমী অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে গল্প করার সুযোগ হয়েছিল। সে সময়েও তিনি বলেছিলেন, ভালো গল্প বলার মতো পরিচালক এসেছেন। ভালো ছবি নতুনদের কেউ কেউ করছেন। কিন্তু ভালো আধুনিক সামাজিক সাহিত্য আমরা পাচ্ছি না। এই কারণে বর্তমানের ভালো পরিচালকরা সাহিত্য নির্ভর গল্প থেকে সিনেমা করতে চাইছেন না। মননশীল চিন্তার দুর্বলতাও আর একটা কারণ হতে পারে। মাধবীদি বলেছিলেন। অদৃশ্য পুঁজির বিনিয়োগের ঢল যত কমে আসবে বাংলা চলচ্চিত্র ততই নিজের শক্ত পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে। দক্ষিণের ছবি যদি রমরমিয়ে চলতে পারে হিন্দি ছবির সঙ্গে তাল রেখে। বাংলা ছবি কেন পারবে না? সমস্যা যেটা থেকে যাচ্ছে বাংলা আধুনিক মননশীল সাহিত্য।
বাংলা সঙ্গীত তবু বলতে হয় তুলনা মূলকভাবে নিজের পায়ে হাঁটতে পারছে। যে সব নতুন সঙ্গীত শিল্পীদের আমরা পাচ্ছি তাঁরা যথেষ্ট চর্চা করে নিজস্বতা গড়ে তুলেছেন। রবীন্দ্রনাথের গানে যেমন সেইসব শিল্পী আলাদা আসন করে নিতে পেরেছেন। লোকসঙ্গীতেও তাঁরা আমাদের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলা সঙ্গীতে জয়তি চক্রবর্তী, ইমন চক্রবর্তী আলাদা দাবি নিয়ে বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছে এসে হাজির হয়েছেন। তাদের গানের গায়কি এবং আবেদন আমাদের কাছে অন্য মাত্রা পেয়েছে। রবীন্দ্রসঙ্গীতে অগ্নীভ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুপ্রতীক দাস রবীন্দ্রনাথের গানকে বর্তমান সময়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন তাদের নিজস্ব ঘরানায়। লোকসঙ্গীত শিল্পী অমর পালের সুযোগ্য ছাত্র প্রাণেশ সোমকে পেলাম প্রভাতি গানে এবং লোকগানে। বিশেষত প্রাণেশের গলায় ‘’ভ্রমর কইও গিয়া শ্রীকৃষ্ণ বিহনে অঙ্গ যায় জ্বলিয়া, কইও কইও কইও গিয়া......’’ এই গানটি জয়তি চক্রবর্তীর গলাতে শুনেও আমরা লোকগীতিকে আপন করে নিতে পারি। এই সময়ের একজন জনপ্রিয় লোকগীতি শিল্পীকে আমরা হারালাম। কালীকাপ্রসাদ যে দায়িত্ব নিয়েছিলেন লোকগানে নতুন করে সেই দায়িত্ব কাউকে নিতে হবে।
বাংলা নাটক নিয়েই বরং আমরা গর্বিত। উৎপল দত্ত, অজিতেশ, শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, কেয়া চক্রবর্তী, মনোজ মিত্র, বিভাস চক্রবর্তী, শাঁওলী মিত্র, মেঘনাদ ভট্টাচার্য, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, সীমা মুখোপাধায়দের পরে নতুন যারা এসেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম দেবশঙ্কর হালদার, মনীশ মিত্র, দেবেশ চট্টোপাধ্যায়, অর্পিতা ঘোষ, সোহিনী সেনগুপ্ত সহ একঝাঁক নাট্য ব্যক্তিত্ব এবং নাট্য কর্মী। রাজনৈতিক থিয়েটার আজ থেকে পঞ্চাশ ষাট বছর আগেও ছিল বর্তমানেও আছে। বাংলা নাটকে শুরুর সময়ে রামণারায়ণ-মাইকেল-দীনবন্ধু প্রমূখের নাটকে জমিদার প্রথা তথা সামন্ত ব্যাবস্থার বিরুদ্ধে লেখা বিষয় বস্তু যেমন আমরা পেয়েছি। আবার বিভিন্ন কৃষকের চরিত্রও পেয়েছি। পরবর্তী সময়ে গিরিশ-অমৃতলালের যুগের নাটকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার বিষয়বস্তু আমাদের দেশমাতৃকার আরাধনায় ডেকে নিতে পেরেছে। সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পেরেছিল ওইসব নাটক। স্বাধীনতার পক্ষে সেই নাটক সামাজিক দায়িত্ব পালন করত। আবার বিষয়বস্তু, আঙ্গিক প্রভৃতি বিষয় বংলা নাটককে সমৃদ্ধ করেছে। প্রগতি ধারার জয়গাঁথা শুনিয়েছে আমাদের। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটেও আমরা প্রচুর ভালো নাটক পাচ্ছি। সমীক্ষকরা বলতে পারবেন বাংলা সাহিত্যের তুলনায় নাটকের দর্শক এবং আলোচকের সংখ্যা বেশি কেন?                
গত দু দশকে যে সব নতুন সাহিত্য আমরা পড়েছি সেই সব গল্প উপন্যাস থেকে কোনও একটি স্ত্রী চরিত্র বা নারী চরিত্র কে আলাদা করে চেনা যাবে? যে চরিত্র আজও আমরা মনে রেখে সেই চরিত্রের নামের সঙ্গে পরিবারে কোনও মেয়ের নাম করণ করেছি। যেমনটি সত্যবতী, সুবর্ণলতা, মাধবীলতার নাম আমরা মনে করতে পারি। অথবা আরও আগে বিমলা, চারুলতা, সর্বজায়া, দুর্গার কথা আমরা মনে করতে পারি। একই কথা বলা যায় পুরুষ চরিত্রের ক্ষেত্রেও। শ্রীকান্ত, ইন্দ্র, দেবদাস, গোরা, সন্দীপ, অনিমেষ, অপু, হরিহর, ঢোঁড়াই, করালি ইত্যাদি। এইসব নামগুলি আমাদের বাঙালি তথা ভারতীয় সমাজের পরিবারগুলিতে ছড়িয়ে আছে। আমরা যারা মননশীল সাহিত্যের পাঠক তাঁরা মিথ হয়ে যাওয়া সেইসব চরিত্রগুলির নাম মনে রেখেছি। সাহিত্যের আড্ডায় ওইসব নাম ঘুরে ফিরে আসে। বছর খানেক আগে আমার সঙ্গে সদ্য পরিচিত একটি তরুণের নাম শুনে জানতে চেয়েছিলাম বাড়িতে কে সাহিত্য পড়ে? সে বলেছিল আমার বাবা। সেই তরুণটির নাম শাম্ব। শাম্ব একটি তথ্য প্রযুক্তি সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মী। ব্যঙ্গালোরে আছেন। তার কথায়, ‘আমার বাবা সমরেশ বসু মানে কালকূটের ‘শাম্ব’ পড়েই আমার নাম রেখেছিলেন।’
গোয়েন্দা উপন্যাসেও সেই ‘ব্যোমকেশ’-এর সময় ধরে কিরীটি, অজিত, দীপক, ফেলুদা হয়ে নতুন চরিত্র আর কোথায়? সুনীল- শীর্ষেন্দু তাদেরমতো করে চেষ্টা করেছেন। ঘনাদা, টেনিদার মতো জনপ্রিয় চরিত্র বাংলার পাঠক আর খুঁজে না পাওয়ার কারণ কি?    
প্রথমত সাহিত্যের ফর্ম নিয়ে ‘সবুজ পত্র’-এর সময় থেকেই বিভিন্ন আলোচনা আমরা শুনি। সে প্রমথ চৌধুরী হোক অথবা ‘কবিতা’ পত্রিকার বুদ্ধদেব বসু। এবং ‘শনিবারের চিঠি’ এর সজনীকান্ত দাস। শিল্প সাহিত্যের ভাষা যতই উন্নত, ভাবগর্ভ, ব্যঞ্জনাময়, অপ্রয়োজনীয় অলঙ্কারযুক্ত হোক আপত্তি কেউ করবে বলে মনে হয় না। সে সব শিল্প নৈপুণ্যে উচ্চস্তরের হলেও বিষয়বস্তু যদি দুর্বল হয়? তাতেও সমাজের বা সাহিত্যের কিছু এসে যাবে না। সব কিছুর উর্ধে বিষয়বস্তুটাকে সম সাময়িক হতে হবে। বিষয় বস্তুর মধ্যে সূক্ষমতা থাকতে হবে, জটিলতা থাকতে হবে, টান টান উত্তেজনা, ব্যতিক্রমী ঋজু চরিত্র গড়ে না উঠলে সেই সাহিত্য কালোত্তীর্ণ হতে পারে না। সেই সাহিত্যসৃষ্ট চরিত্রগুলিও বাদাবনে হারিয়ে যেতে বাধ্য। বাজার চলতি বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলিই আমাদের কালজয়ী সৃষ্টিশীল উপন্যাস দিয়েছে। চার পাঁচ বছর আগে একটি বহুল প্রচলিত এবং বাংলা প্রকাশনার অন্যতম সংস্থার পাক্ষিক পত্রিকার ‘শারদীয়’ সংখ্যায় নারীপাচার বিষয়কে কেন্দ্র করে একটি উপন্যাস লেখা হয়েছিল। অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য লেখা। লেখক এবং উপন্যাসের নাম আজ আর আমার মনে নেই।                                              
‘বিবর’, ‘রাতভোর বৃষ্টি’-এর সময় পেরিয়ে বাংলা সাহিত্য পণ্য হলেও পণ্য সাহিত্যের পাঠক বর্তমানে কতজন? আমরা পণ্য সাহিত্য পড়ব? না পর্ণ মুভি দেখব? ‘সোশ্যাল মিডিয়া’-এর সৌজন্যে বাংলা সহ সব ভাষার ছবি আরও সহজলভ্য হয়েছে। হাতে একটি স্মার্টফোন থাকলেই হল। সাহিত্যের অশ্লীলতা নিয়ে তাবড় তাবড় ব্যক্তি বিভিন সময়ে লিখে গেছেন। কিছুদিন আগে উর্দু সাহিত্যের বিখ্যাত লেখক সাদাত হোসেন মানটোর একটি বাংলা অনুবাদ লেখা পড়ছিলাম পুরনো একটি পত্রিকায়। লেখাটির অনুবাদ করেছেন জাফর আলম। মানটো সাহেব লিখছেন,
‘’আজকের নূতন সমস্যা অতীতের পুরাতন সমস্যার মধ্যে মূলত বিশেষ তারতম্য নেই। আজকের দুষ্কর্মের বীজ হয়তো অতীতেই বপন করা হয়েছে। যৌন-সমস্যা যেমন আধুনিক লেখকের সম্মুখে রয়েছে তেমনি অতীতেও প্রাচীন লেখকদের কাছে একই সমস্যা বিদ্যমান ছিল। অতীতে লেখকরা প্রাচীন নীতিতে এই সমস্যাকে তুলে ধরেছেন, আমরা একে নিজস্ব ঢং-এ লিপিবদ্ধ করছি।
আমি জানি না আমাকে কেন বার বার যৌন সমস্যা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। কারণ লোকেরা আমাকে প্রগতিবাদী লেখক নামে আখ্যায়িত করেছে, কারণ আমার কয়েকটি গল্প যৌন সমস্যা নিয়ে লিখিত। নতুবা কেন জানিনা আজকের তরুণ লেখকদেরকে কিছু সংখ্যক লোক ‘’যৌন বিকারগ্রস্ত’’ বলে সাহিত্য ধর্ম ও সমাজ থেকে কলমের খোঁচায় বহিস্কার করতে চান। কারণ যাই হোক না কেন, আমি আমার দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব ব্যাখ্যা করছি। রুটি আর পেট, নারী ও পুরুষের সম্পর্ক সনাতন ও চিরস্থায়ী। রুটি ও পেটের মধ্যে কোনটি বেশী গুরুত্বপূর্ণ এবং নারী-পুরুষের মধ্যেকার প্রয়োজনীয়তা কার বেশী তা বলা মুশকিল। কারণ আমার ক্ষুধার্ত পেট রুটি চায়। কিন্তু পেটের ন্যায় গমও আমার পেটের জন্য লালায়িত কিনা জানি না। তবে যখন ভাবি, জমিতে গম বেকার উৎপন্ন হয়নি বরং আমার উদর পূর্তির জন্য বিস্তৃত মাঠে এই সোনালী গমের চাষ করা হয়েছে তখন বেশ আনন্দ পাই। হয়তো আমার উদর প্রথমে সৃষ্টি হয়েছে আর গমের বীজ পরে।‘’
শ্রদ্ধেয় সাদাত হোসেন মানটোরমতো লেখক এই সময়ে উর্দু সাহিত্য কেন প্রায় যে কোনও ভাষায় পাওয়াটা বিরল। তারমতো উন্নত চিন্তার মননশীল লেখক উর্দু সাহিত্যকে মর্যাদার আসন দিয়ে গেছে। নিপীড়িত মানুষের কথা মনটো সাহেবের মরমী কলমে ক্ষুরধার ভাষায় উঠে এসেছে। যে সব জীবন গাঁথা তিনি আমাদের জন্য রেখে গেছেন আজ সেসব ধ্রুপদী সাহিত্য হয়ে আছে। তার সঙ্গে সমকালের লেখকদের এক আসনে বসানো যাবে না।   
বর্তমান সময়ে এই বাংলায় দু’একজন লেখক কতটা সাহিত্য ধর্মে দীক্ষিত সেটা পরবর্তী সময় বলবে। তাদের লেখা এবং তাদের গল্প উপন্যাস সম্পর্কে সমালোচকরা লিখছেন, কোনও জাতক যদি বাজারি পণ্য সংস্কৃতিকে ‘পর্ণ’ সাহিত্যের আঙ্গিকে ভাষা দিতে চায় আমাদের আপত্তি করার কি আছে? নিশ্ছিদ্র আর্থিক এবং সামাজিক নিরাপত্তায় পণ্য হোক বা পর্ণ হোক সেইসব লেখকের কাছে পাঠক অস্থায়ি বিনোদন পাচ্ছে। যে সংস্থা ওইসব লেখকদের সম্মানিত করে বাজারে পৌঁছে দিচ্ছে সেই সংস্থার ব্যবসা হওয়া নিয়ে দরকার। প্রকাশনা সংস্থার সাহিত্যের জাতকদের তীর্থঙ্কর ভাষায় দীক্ষা থাকতে হবে এমন বাধ্য বাধকতার কি আছে? পণ্য তারকারও প্রয়োজন। পর্ণ তারকাদের জন্য বাজার খোলা থাকে। ধ্রুপদী সাহিত্যের ভাষা, চরিত্র, সময়কাল যুগ পরম্পরায় পাঠকমণ্ডলীকে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিয়ে যায়। সত্যকে আরও চিরসত্য করে রেখে যায় ধ্রুপদী সাহিত্যের চরিত্ররা। প্রকৃতি আসে কবিতার শব্দের মতো উপন্যাস নির্মাণের সহায়ক ভাষা হিসাবে।
বাংলা সাহিত্য আলোচনায় যে নামগুলি চিরন্তন হয়ে আছে তারমধ্যে অন্যতম বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। লেখকের সর্বকালের পাঠকের জন্য শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’। এই উপন্যাস সম্পর্কে আলোচনায় সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় একটি প্রবন্ধে লিখছেন, ‘’.........‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের প্রথম বিস্ময়কর দুঃসাহস এর প্রকৃতিপট নির্মাণে নয়। প্রকৃতিপট নির্মাণে তিনি রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করেননি— করার চেষ্টাও করেননি। তিনি শুধু তীক্ষ পর্যবেক্ষণে অধিকতর সানুপুঙ্খ হয়েছেন। তা নইলে ‘ছিন্নপত্রাবলী’-র চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ যেমন প্রকৃতির সঙ্গে তার অস্তিত্বের সজীব সম্পর্কের কথা বলেন, প্রকৃতির যে টান তিনি তার রক্তধারায় অনুভব করেছেন, হাডসন সম্বন্ধে যে কথা উনিশশো ষোল সালে গলসওয়ারদি বলেছেন— তা এখানে স্মরণীয়। Hampshire Days থেকে গলসওয়ারদি উদধৃত করেছেন এই অংশ— ‘The blue sky, the brown soil beneath, the grass, the trees, the animals, the wind and rain, the stars are never strange to me; for I am in and am one with them; and my flesh and the soil are one, and the heat in my blood and in the sunshine are one, and the winds, and the tempests and my passions are one.’  আমরা মিলিয়ে নিতে চাইব না, কিন্তু মনে করতে পারি ‘ঊর্মিমুখর’-এর এই অংশঃ ‘আজ রবিবার দিনটা দুপুরে একটু ঘুমিয়ে উঠেচি- কি পরিপূর্ণ ঝলমলে শরতের দুপুর। এর সঙ্গে জীবনের কি যে একটা বড় যোগ আছে— ভাদ্র মাসের এই রোদভরা দুপুরে কেন যে আমায় পাগল করে তোলে। বনে বনে মটর লতার কথা মনে পড়ে, ইছামতীর ঘোলা জল, পাখীর ডাক— মনটা যেন কোথায় টেনে নিয়ে যায়। ‘’পথের পাঁচালী’’ কিন্তু এসবের জন্য বিশিষ্টমাত্র একথা বললে সবটা বলা হল না । ‘’পথের পাচালী’’-র একমাত্রতা এবং অনন্যতা তার কেন্দ্রীয় চরিত্র নির্বাচনে।’.........’’
এই লেখার যখন পরিকল্পনা করি তখন আমার কাছে একটি খবর আসে। এই বছর আমেরিকায় বঙ্গ সম্মেলন হবে ৭-৯ জুলাই। নর্থ আমেরিকান বেঙ্গলি কনফারেন্স (এনএবিসি)-এর উদ্যোগে এবছর ৩৭তম বঙ্গ সম্মেলন। আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো শহরে সান্টা ক্লারায় হবে এবছরের সম্মেলন। একটি বাংলা দৈনিকের উদ্যোগে দু’ই বাংলার বিভিন্ন ক্ষেত্রের পাঁচজন সেরা বাঙালিকে এবার বেছে নেওয়া হয়েছে ‘সেরা বাঙালি’ হিসাবে। তাদের সম্মানিত করা হবে এবারের প্রবাসী বাঙালিদের পীঠস্থান আমেরিকায়। এর থেকে গর্ব আর কিছু হয় না। যে পাঁচজনকে বেঁছে নেওয়া হয়েছে তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে এক একজন নক্ষত্র। নামগুলি আশা করি ইতিমধ্যে বিশ্বের আপামর বাঙালি স্বজনেরা জেনে গেছেন। আত্মার আত্মীয়তার অনুভবে।
কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি বহুল প্রচারিত দৈনিক পত্রিকার ৫ জুলাই, ২০১৭ সংখ্যায় একটি খবর পড়লাম। মার্কিন মুলুকের ১৪ জন শিক্ষক আসছেন কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়াতে নয়। পড়তে আসছেন নিউ ইয়র্ক শহরের বিভিন্ন স্কুল থেকে ওই ১৪ জন শিক্ষক। তাঁরা আসছেন বাংলা ভাষা শিখতে। বাংলা সংস্কৃতি জানতে আসছেন। ফিরে গিয়ে তাঁরা আমেরিকার অভিজাত শহর নিউ ইয়র্কের প্রবাসী অভিজাত ভারতীয় তথা বাঙালিদের সাহায্য করতে পারবেন। এমনটাই খবরে প্রকাশ। নিউ ইয়র্ক শহরের ১৪ জন শিক্ষক আসছেন এই বাংলায়। বাংলা ভাষা এবং বাঙালি সংস্কৃতির ছাত্র হয়ে। আমি প্রশ্ন তুলতে চাইছি বিশ্বের অভিজাত দেশ, সুশিক্ষিত দেশ, মেধা চর্চার দেশ, উন্নত বিঞ্জানের দেশ, উন্নত প্রযুক্তির দেশ, মিশ্র সংস্কৃতির দেশ, উন্নত গণতন্ত্রের দেশ আমেরিকা। জ্ঞান চর্চার অন্যতম পীঠস্থান সেই আমেরিকার অভিজাত শিক্ষাবিদেরা এদিন পর্যন্ত এই বাংলার বাঙালিদের নিয়ে এত উদাসীন ছিলেন কেন? এই বাংলার বাঙালি দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকে  ইউরোপ আমেরিকার সহ বিভিন্ন দেশের ঞ্জান আহরণ করেছে। সভ্যতার আধুনিকতম মেধা প্রবাসী আমেরিকান বাঙালিরা আমাদের পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু আমেরিকার সাহিত্য আমরা বাঙালিরা কতটা চিনি? আমেরিকার ধ্রুপদী সাহিত্য আমরা বাংলা ভাষায় কতটা অনুবাদ সাহিত্যে পেয়েছি? এই দায়িত্ব কোন দেশ বা কারা নেবে? এবছরের বঙ্গ সম্মেলনে কেউ কি থাকবেন এই প্রশ্ন তোলার জন্য? অথবা গর্বিত বাঙালি উল্লেখিত বিষয়ে ধ্রুপদী ঘরানায় এবং ঐতিহাসিক ভাবনায় তার্কিক মেজাজে একটা সেমিনার করবেন কি তিনদিনের অভিজাত সম্মেলনে?                  
 

অপরাহ্ণ বেলায়

অপরাহ্ণ বেলায়: 

সহাস্য আগুনে হাত দিলে শিশু প্রথম
চেনে-জানে আগুন দেহের তাপ উত্তাপ।
যুগান্তের দিগন্তে প্রচলিত সামাজিকতায়—
ছাই হয়ে যাওয়া নিভন্ত চুল্লি আছে—
কয়েকশত যোজন হেঁটেও
শ্রীকান্ত পৌঁছে যায় রাধাচূড়ার পড়ন্ত বিকেলে।
‘রিনা ব্রাউন’-এর ঝাপসা শহর থেকে দূরে.........
ভ্রমরের ‘বঁ’ ‘বঁ’ ‘বঁ’ শব্দে গ্রাম জীবনের
রাখাল বালকের উচ্ছলতা? তিরপিতা, ব্রহ্মাণী, ময়ুরাক্ষী
অজয়ের ঢেউয়ের কথাব্রত কোন অজান্তে হারিয়ে যায়...
শহর উপকণ্ঠের ‘চূনীবাবু’-দের জলসায় ঘুরে ঘুরে।
বিশ্ব অয়নের ভাষা ছিনিয়ে নিতে চায়
শ্রীকান্তের শরৎ জ্যোৎস্না.........
প্রৌঢ় পথিকের গ্রন্তিত সঞ্চায়নে
অপরাহ্ণ বেলায়, ফুল মেলার
হোলি শেষে, হেঁটে চল, হেঁটে যাও......
হাঁটতে দাও শিশুর হাতের নরম স্পর্শে
উচ্চ-নীচ সব প্রাঞ্জনে।
অনিমেষ আজও অপেক্ষায় থাকে,  
সামাজিক সামিয়ানার নীচে ‘উত্তরাধিকার’
আসবে কোনও একদিন.........
‘সত্যবতী’, ‘সুবর্ণলতা’, মাধবীলতা -‘ন হন্যতে’  
ভাষার প্রাপ্ত স্বাধীনতায়। 
         


Thursday, 22 June 2017

গ্রবাচভের ভারত 'অবর' কূটনীতিতে পিছিয়ে পড়ল?

গর্বাচভের ভারত ‘অবর’ কূটনীতিতে পিছিয়ে পড়ল?: 
  
এটা নিউইয়র্ক শহরের ম্যাডিসন স্কোয়ার। তিন বছর আগের ঘটনা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভা। অতি উৎসাহী অনাবাসী ভারতীয় এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের ভিড়ে কোনও একটা দুর্ঘটনা হওয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। বরাতজোরে রক্ষা পায়। পুরনো সংবাদপত্রের ভাষা বলছে প্রায় একই অবস্থা হয়েছিল তার পরের বছর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমেরিকা সফরে। সিলিকন ভ্যালির সভাতে ভিড় সামলাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের জবুথবু অবস্থা। চলতি মাসের ২৪ তারিখ আমেরিকার উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ( প্রাসঙ্গিকঃ গত ১৫ জুন এনডিটিভি ডট কম সন্ধ্যের সময় খবরটি আমার ডেস্কটপে পাঠায়। আমি তখন কম্পিউটার বন্ধ করছি। তাই খবরটি আমার পক্ষে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা সম্ভব হয়নি। একটি খবর শেয়ার করতে না পারা মানে আমি ইচ্ছাকৃতভাবে আসাংবাদিক আচরণ করিনি। আমার কম্পিউটার ব্যবহার করার জন্য যে টেবিল ব্যবহার করা হয় সেই টেবিল আমার নেই। পুরনো টেবিলে কিবোর্ড রেখে লিখতে হয়। তারপর তিন তলার অসহনীয় গরম। সর্বপরি সোশ্যাল মিডিয়া সদা সতর্ক, সব সময় সব খবর শেয়ার করতে দেয় না। অনেক সময় ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অন্যান্য সীমাবদ্ধতাগুলি বারবার উল্লেখ করাটা অসৌজন্য দেখাতে পারে। তাই উল্লেখ করছি না। আমার ভাষায় আমি ‘নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার’ ভোরের সাগর। দিল্লীর এক খ্যাতনামা সাংবাদিকের ভাষায় আমি ‘ডেডিকেটেড সাংবাদিক’।) আগামী ২৬ জুন আমেরিকার রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ করবেন আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ওয়াশিংটন শহরের ম্যরিয়ট সভাঘরে এই বারের সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অনাবাসীদের নিয়ে সভা করার কথা ছিল। ম্যারিয়ট সভাঘর এবং আমেরিকার অন্যান্য বিখ্যাত স্কোয়ারে ভারতের পূর্বতন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীরা এবং প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী, ডঃ মনমোহন সিংহের মতো ব্যক্তিত্বরা অনাবাসী ভারতীয়দের সঙ্গে একাধিক সভা করেছেন। কিন্তু রিপাবলিকান প্রশাসনের সিদ্ধান্তমতো সেই সভা এবার ওয়াশিংটন শহরের পাশে ভার্জিনিয়ার টাইসন স্কোয়ারে রিৎস কার্লটন হোটেলের বলরুমে হবে। সংবাদ মাধ্যম সূত্রে খবর, বিদেশ মন্ত্রকের এক কর্তা জানিয়েছেন, ‘’আমেরিকায় বসবসকারী অমার্কিন নাগরিকদের সম্পর্কে ট্রাম্প যে নীতি নিয়ে চলছেন, তাতে এই মুহূর্তে সেখানকার অনাবাসী ভারতীয়দের শক্তি প্রদর্শনের ব্যাপারটা করতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। এর আগে ডেমোক্রাট নেতৃত্ব ম্যাডিসন স্কোয়ারে প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ভারতীয় সামাজিক বৈচিত্রের উদযাপন হিসাবেই তাঁরা দেখেছিলেন বিষয়টি। কিন্তু এই সরকার গোটা বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিতে পারে।‘’
আমরা সূত্র এখান থেকেই নিতে পারি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী তিনি আমেরিকা যাচ্ছেন নতুন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন রাষ্ট্র এবং তাঁর প্রস্তাবিত নতুন বিশ্ব ব্যাবস্থার (প্রাক্তন ডেমোক্রাট প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে ওবামা কেয়ার, অভিবাসন নীতি সহ একাধিক নীতি এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বাতিল) হালহকিকত সমঝে নিতে। আফগানিস্থানকে কেন্দ্র করে রাশিয়া, চিন এবং পাকিস্তান একটি নতুন অক্ষ গড়ে তুলতে চাইছে। সেই অক্ষ এবং উন্মুক্ত বিশ্ব বাণিজ্যের সুযোগে চিন যে ‘অবর’ (‘ওয়ান বেল্ট অয়ান রোড’) প্রকল্পের সূচনা করল সেটা ভারতের কাছে কূটনীতির প্রয়োজনে বড় সুযোগ ছিল। কিন্তু ভারতের গর্বাচভ নামে অভিহিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতক করিডর’ বা সংক্ষেপে ‘সিপিইসি’ নামক এক দৈত্যতুল্য প্রকল্পের চ্যালেঞ্জ নিতে চাইলেন না অথবা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলেন। ‘অবর’ নামক সম্মেলনে তিনি নিজে যেমন অনুপস্থিত থাকলেন পাশাপাশি তার সরকারের কোনও প্রতিনিধি পাঠালেন না আধুনিক ভারতের গর্বাচভ।  ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে লোকসভার অধিবেশন চলাকালীন কংগ্রেস নেতা তথা সাংসদ রাহুল গাঁধী তাঁর বক্তৃতার শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রশংসা করেন। রাহুল বলেন, ‘’কাল বিকেলে কংগ্রেস সভানেত্রীর কক্ষে টাইম ম্যাগাজিনের একটা কপি দেখলাম। শুনে আপনারা খুশি হবেন, দেখি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর খুব প্রশংসা করেছেন। আমেরিকা বড় বড় কর্পোরেটের দেশ। তার প্রেসিডেন্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করছেন, এটা কম কথা নয়। গত ষাট বছরে কোনও রাষ্ট্র নেতাকে এই প্রথম এত প্রশংসা করল আমেরিকা। এর আগে শেষ বার তারা গর্বাচভের এমন প্রশংসা করেছিল।’’ প্রাক্তন রুশ প্রেসিডেন্ট সার্গেই মিখাইল গর্বাচভ এক শতাব্দী ধরে চলতে থাকা সোভিয়েত ইউনিয়নের হাল ধরেছিলেন শক্ত হাতে। সোভিয়েত ইউনিয়নকে তিনি ‘’আমাদের ইউরোপীয়ান’ গৃহে ফিরিয়ে আনার কথা বলেছিলেন। ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত পার্টি কংগ্রেসে এই রকম একটি প্রস্তাব তিনি দিয়েছিলেন।
এর আগে আমরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্পর্কে আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশস্তি কাগজে পড়েছি। ২০১৫ সালে এক মার্কিন পত্রিকায় ১৬৬ শব্দের ‘ভারতের সংস্কারের কান্ডারী’ শিরোনামে এক লেখায় বারাক ওবামা লেখেন, ‘’ছোটবেলায় বাবাকে চা বিক্রিতে সাহায্য করতেন নরেন্দ্র মোদী। আজ তিনি দেশের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের নেতা। দারিদ্র থেকে প্রধানমন্ত্রীত্বে উত্তরণের এই কাহিনিই ভারতের পরিবর্তনশীলতা ও উত্থানের সম্ভবনা তুলে ধরে।‘’ উল্লেখিত পত্রিকা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ওই বছরে বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় রেখেছিল।                   
অবিভক্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের মিখাইল গর্বাচভের আমলেই ‘আফগানিস্তান’ নিয়ে ভারতকে এশিয়া তথা ভারতীয় উপমহাদেশের আর্থরাজনীতি এবং আর্থসামাজিক পরিস্থিতি সামলাতে হয়। তৎকালীন ভারতের অর্থমন্ত্রী ছিলেন বিশ্বের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ ডঃ মনমোহন সিংহ। ২০০৮ সালে আর্থিক মন্দার সময় ভারতের হাল ধরেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ। ভারতকে নিঃশব্দে এই সঙ্কট থেকে উতরে দিয়ে সমস্ত বিশ্বকে নতুন রাস্তা বাতলে দিয়েছিলেন। সেই রাস্তায় হেঁটে চিন বর্তমান শতাব্দীর বিশ্বের অন্যতম তথা বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে আমেরিকা, জাপান, জার্মানি, ব্রিটেন সহ সমস্ত উন্নয়নশীল দেশের কাছে চ্যালেঞ্জ হিসাবে পৌঁছে দিতে পেরেছে। এমনটা দাবি করছেন চিন বিষয়ক আলোচকরা। ‘চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর’ সংক্ষেপে ‘সিপিইসি’ নামক প্রকল্পে ঠিক কি আছে? আমরা জেনে নিতে পারি মে মাসে চিনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে উপস্থিত ‘ডন পত্রিকা’-এর প্রতিনিধি খুররম হুসেনের কলম থেকে। খুররম ১৫ মে লিখছেন,

Details from original documents laying out the CPEC long term plan are publicly disclosed for the first time.
KHURRAM HUSAIN, Dawn, May 15, 2017
Plan eyes agriculture 
Large surveillance system for cities 
Visa-free entry for Chinese nationals
The floodgates are about to open. Prime Minister Nawaz Sharif arrived in Beijing over the weekend to participate in the One Belt, One Road summit, and the top item on his agenda is to finalise the Long Term Plan (LTP) for the China-Pakistan Economic Corri­dor. [See next tab for details on how the plan was made].
Dawn has acquired exclusive access to the original document, and for the first time its details are being publicly disclosed here. The plan lays out in detail what Chinese intentions and priorities are in Pakistan for the next decade and a half, details that have not been discussed in public thus far.
For instance, thousands of acres of agricultural land will be leased out to Chinese enterprises to set up “demonstration projects” in areas ranging from seed varieties to irrigation technology. A full system of monitoring and surveillance will be built in cities from Peshawar to Karachi, with 24 hour video recordings on roads and busy marketplaces for law and order. A national fibreoptic backbone will be built for the country not only for internet traffic, but also terrestrial distribution of broadcast TV, which will cooperate with Chinese media in the “dissemination of Chinese culture”.
The plan envisages a deep and broad-based penetration of most sectors of Pakistan’s economy as well as its society by Chinese enterprises and culture. Its scope has no precedent in Pakistan’s history in terms of how far it opens up the domestic economy to participation by foreign enterprises. In some areas the plan seeks to build on a market presence already established by Chinese enterprises, eg Haier in household appliances, ChinaMobile and Huawei in telecommunications and China Metallurgical Group Corporation (MCC) in mining and minerals.
In other cases, such as textiles and garments, cement and building materials, fertiliser and agricultural technologies (among others) it calls for building the infrastructure and a supporting policy environment to facilitate fresh entry. A key element in this is the creation of industrial parks, or special economic zones, which “must meet specified conditions, including availability of water…perfect infrastructure, sufficient supply of energy and the capacity of self service power”, according to the plan.
But the main thrust of the plan actually lies in agriculture, contrary to the image of CPEC as a massive industrial and transport undertaking, involving power plants and highways. The plan acquires its greatest specificity, and lays out the largest number of projects and plans for their facilitation, in agriculture.
Highlights by Dawn
Two versions of the Long Term Plan are with the government. The full version is the one that was drawn up by the China Development Bank and the National Development Reform Commission of the People’s Republic of China. It is 231 pages long.
The shortened version is dated February 2017. It contains only broad brushstroke descriptions of the various “areas of cooperation” and none of the details. It was drawn up for circulation to the provincial governments to obtain their assent. It is 30 pages long. The only provincial government that received the full version of the plan is the Punjab government.
চিন যে সময় তাদের দেশের বৃহত্তম বাণিজ্য প্রকল্প ‘অবর’ সম্মেলন করছে। যে প্রকল্পকে চিন মনে করে সিল্করুট মেগা প্রকল্প। সেই সম্মেলনে আমেরিকা সহ বিশ্বের ২৯ টা দেশকে পাশে নিয়ে এশিয়ায় নতুন এক বৃত্ত গড়ে তুলতে চাইছে এশিয়ার ড্রাগন অর্থনীতি।
চার লক্ষ কোটি টাকা খরচ করে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকার আনুমানিক সত্তরটা দেশকে এক বন্ধনীতে আনতে চাইছে চিন। সড়ক এবং সমুদ্র পথে আধুনিক সিল্করুট গড়ে তুলতে চাইছে তারা। বিশ্বের অর্ধেক অংশকে স্বপ্নের এই বাণিজ্যপথে আনতে আগ্রহী সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতির আধুনিক ড্রাগনের দেশ।
বেজিং শহরে যে সময় ‘অবর’ সম্মেলন চলছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তখন ৬ দিনের সফর করলেন জার্মানি, স্পেন, রাশিয়া এবং ফ্রান্সের মতো দেশে। তার স্বপ্নের প্রকল্প ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-এর জন্য শিল্প আনতে এই সফর ছিল। সূত্রের খবর আমেরিকা এবং ভারতের সঙ্গেও অতীতে বাণিজ্য পথ বা সিল্করুট ছিল। যে প্রসঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রথম দফার বিদেশ সচিব হিলারি ক্লিন্টন ভারত সরকারকে জানিয়েছিলেন। ভারতের বন্ধুদেশ আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শপথ নেওয়ার পরে পরেই পাকিস্তান এবং চিনের বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিয়েছিলেন। ভারতের সঙ্গে একসঙ্গে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ (অবর) প্রকল্পের বিরোধিতাও করেছিলেন ট্রাম্প সাহেব। হোয়াইট হাউসে শপথ নেওয়ার ছ’দিনের মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীকে ফোন করে বলেছিলেন, ভারতই আমেরিকার প্রকৃত বন্ধু। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হঠাৎ সিদ্ধান্ত বদলে বেজিঙের সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠালেন। কেন তিনি তার প্রতিনিধি পাঠালেন? এটাই কি বিশ্বের অন্যতম উন্নত গণতন্ত্রের সঠিক সিদ্ধান্ত? বিশ্ব কূটনীতির ময়দানে অন্যতম চমক? ভারতীয় উপ মহাদেশের অর্থনৈতিক করিডরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেধা থাকবে না এটা কেমন কথা? আমরা জানি এই প্রকল্পটি ভারত তথা ভারতীয় উপমহাদেশের সমস্ত অঞ্চলে নিরাপত্তার বিষয়ে কতটা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে যাচ্ছে সেই বিষয়ে আমেরিকা সহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে গেছেন মোদী। ভারতের অন্যতম অভিযোগ এই করিডর গড়ে উঠলে কাশ্মীর সমস্যা আরও বাড়বে। বেজিং শহরে অবর সম্মেলন চলাকালীন চিনের শীর্ষ নেতৃত্ব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উপস্থিত প্রতিনিধিদের এই মর্মে আশ্বস্ত করেছে এই প্রকল্পের ফলে কাশ্মীর সমস্যার ক্ষেত্রে কোনও প্রভাব পড়বে না। হিন্দুস্থান টাইমসের প্রতিনিধি সুতীর্থ পত্রনবিস সম্মেলন চলাকালীন বেজিং থেকে ১৫ মে লিখছেন,
‘’The China-Pakistan Economic Corridor (CPEC) , which passes through Pakistan-occupied Kashmir (PoK), is not aimed at “third parties” and doesn’t affect Beijing’s position on the Kashmir issue, the foreign ministry said on Monday.
President Xi Jinping initiated the Belt and Road Initiative (BRI) as a roadmap for peace and  he has said countries should respect each other’s sovereignty and territorial integrity, the foreign ministry added.
Referring to India’s decision to skip the two-day Belt and Road Forum (BRF) in Beijing, the ministry said in a statement: “Regarding the issue of Kashmir which the Indian side is concerned about, we have been stressing that the issue was left over from history between India and Pakistan, and should be properly addressed by the two sides through consultation and negotiation.’’
“The CPEC is an initiative on economic cooperation. It is not directed at any third parties, not relevant to disputes over territorial sovereignty and does not affect China’s position on the Kashmir issue.”

 প্রতিনিধি এনডিএ সরকার তিন বছর প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেতৃত্বে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-এর মতো প্রকল্প নিয়ে উন্নয়নের নতুন ভাষায় কথা বলতে চাইলেও কাশ্মীর সমস্যার কোনও সুরাহা এ পর্যন্ত আমরা দেখতে পাচ্ছি না। বিশেষত গত কয়েক মাস ধরে উপত্যকায় যে অশান্তি চলছে সেই অশান্তি কমার কোনও ইঙ্গিত আমরা দেখতে পাচ্ছি না। অথচ জম্মু কাশ্মীরে জোট সরকার চলছে। যে সরকারের অন্যতম শরীক এনডিএ। সেই কারণেই কি কংগ্রেসের সহ সভাপতি রাহুল গাঁধী বলেছেন, ‘’কাশ্মীর এতদিন ভারতের শক্তি ছিল। কিন্তু মোদী সরকার এঁকে ভারতের দুর্বলতা বানিয়ে ছাড়ছে।‘’
সংবাদ সংস্থা সূত্রে খবর চিনের ‘অবর’ প্রকল্প তৈরির আগে রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে ওই অঞ্চলের সামাজিক এবং পরিবেশগত মূল্যায়ন নিয়ে তাদের বক্তব্য জানতে চেয়েছিল চিনের শীর্ষ নেতৃত্ব। রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘ইকনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া প্যাসিফিক’ (এসক্যাপ) সম্প্রতি একটি রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, ‘’কাশ্মীর নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। যে হেতু এই করিডর ওই অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, ফলে ভারতে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। এই কারণে আরও বেশি রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।‘’ (এবিপি)
৯৪ পাতার যে রিপোর্ট রাষ্ট্রপুঞ্জ দিয়েছে সেখানে আরও সতর্ক করা হয়েছে, ‘’দক্ষিণ এবং পূর্ব আফগানিস্তানের মধ্যে দিয়ে এই করিডর যাওয়ার কথা। কিন্তু কতটা বাণিজ্যিক সুফল পাওয়া যাবে তাতে সন্দেহ রয়েছে। কারণ এই সব এলাকায় সন্ত্রাসবাদীরা সক্রিয়।‘’ (এবিপি)
বালুচিস্থানে এই করিডরের ফলে কি ধরণের প্রভাব পড়তে পারে সেই বিষয়েও সতর্ক করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। সম্মেলন মঞ্চে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ বলেন, ‘’সিপিইসি একটি অর্থনৈতিক প্রকল্প। সব দেশের জন্যই এর পথ খোলা। এটা রাজনীতি করার মতো কোনও বিষয় নয়। এশিয়া ও ইউরোপকে জুড়বে বেজিংয়ের এই মহাসড়ক প্রকল্প। উপকৃত হবে সব দেশ।‘’    
আধুনিক গণতন্ত্রের ভারত কি অতীত থেকে কোনও শিক্ষা নিতে চাইছে না? না ভুলে যাচ্ছে? নব্বইয়ের দশকে কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে যে টানাপড়েন চলছিল সেটা পাকিস্তান আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যায়। রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারতের নামে নালিশ ঠুকে দিয়ছিল পাকিস্তান। মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে এই অভিযোগ এনে। সেই সময়কার বিরোধী দলের নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে জেনেভায় কংগ্রেস সরকার এক প্রতিনিধিদলকে পাঠায়। বিরোধী দলনেতা অটল বিহারী বাজপেয়ী তার প্রত্যুৎপন্ন বুদ্ধিতে ক্ষুরধার ভাষায় বক্তব্য রেখে দেশের সম্মান রক্ষা করেছিলেন। আমাদের উন্নত গণতন্ত্রের দেশে এই ঘটনা কোনও ব্যতিক্রম নয়। কংগ্রেসের ষাট বছরের শাসন  পর্বে বিরোধী দলের সঙ্গে আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বা সংঘাত যতই থাক, আন্তর্জাতিক বিষয়ে ঐক্যের বাতাবরণ গড়ে তোলা হত। সৌজন্যের সেই সংস্কৃতি কি আজকের বাস্তবতায় প্রশ্নের মুখে? দেশে নির্বাচনী সাফল্যই কি একমাত্র সাফল্য?  
‘চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর’ (সিপিইসি) প্রকল্প বিষয়ক লেখায় আমাদের জেনে নিতে হবে কেন্দ্রীয় সরকার কি বলছে? এনডি টিভির প্রতিনিধি মিহির স্বরূপ ১৯ মে লিখছেন,                     
The Narendra Modi government's decision to not send an envoy to China's big Belt and Road Forum (abbreviated, incredibly, BARF) has been the cause of much wailing and gnashing of teeth in New Delhi. Given the fact that India is practically the only large economy to not be represented there - and that dozens and dozens of countries have sent representatives, many the heads of their governments - it has come across to some people as the Modi government deliberately choosing to isolate India. It has been criticised thus as stubborn opposition to an initiative that has seized the world's imagination.

Well, if Modi has isolated India on this issue, so be it. He and his foreign policy establishment deserve praise for taking a bold stand of dissent on grounds that are both principled and realist.

The government's thinking on this issue is unusually clear and well-articulated. The Ministry of External Affairs released a statement that "connectivity initiatives must follow principles of financial responsibility to avoid projects that would create unsustainable debt burden for communities; balanced ecological and environmental protection and preservation standards; transparent assessment of project costs; and skill and technology transfer to help long term running and maintenance of the assets created by local communities." It is worth noting that India's legitimate objections to the path of the China Pakistan Economic Corridor, or CPEC - one of the sub-initiatives of One Belt One Road or OBOR - also got a mention, but were clearly rhetorically subordinate to the larger, principled objection about the sustainability issues involved. 


Monday, 12 June 2017

ভাঙড়ে কি নতুন অধ্যায় শুরু হবে?

ভাঙড়ে কি নতুন অধ্যায় শুরু হবে?:  
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাহাড় থেকে নেমে এসে ভাঙড় যাচ্ছেন। বিশ্বব্যাঙ্কের ঋণের টাকায় কেন্দ্রীয় সরকারের ওই প্রকল্পে ভাঙড়ের টোনা মৌজায় ৪০০/২০০ কেভির দুটি সাব-স্টেশন এবং ২৮টি টাওয়ার বসানোর পরিকল্পনা আছে। গ্রিড কর্পোরেশনের এক কর্তার দাবি ২০১৪ সালে সাব-স্টেশন এবং টাওয়ারের জন্য প্রয়োজনীয় অধিগৃহীত জমির টাকা চেক মারফৎ জমি মালিকদের দেওয়া হয়। সেই সময় স্থানীয় বিডিও সহ রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের পদস্থ অফিসাররা উপস্থিত ছিলেন। ইউপিএ সরকারে দ্বিতীয় দফায় ২০১১ সালে ১৩.৪৪ একর জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংহের উন্নয়নের  শ্লোগানকে সামনে রেখে। এবং তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল দেশের সমস্ত গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে হবে। একটি গ্রামও যেন বিদ্যুৎহীন না থাকে। সেই সিদ্ধান্তমতই জমি অধিগ্রহণ হয়। সংস্থা সূত্রে খবর, ১৩.৪৪ একর জমি অধিগ্রহণের সময় প্রতিটি জমি মালিকদের সঙ্গে আলাদা আলাদা করে বৈঠক করা হয়েছিল। পাওয়ার গ্রিড কর্পোরেশন  কর্তাদের দাবি কোথাও কোনওরকম ফাঁক ফোঁকর রাখা হয়নি। সিঙ্গুরের অভিঞ্জতার কারণে গ্রিড কর্তারা অনেক বেশি সতর্ক ছিলেন।  সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক ভাঙড়ের জমি মালিকদের একর প্রতি ১ কোটি ৪১ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় ক্ষেত্রে তৎকালীন বাজার দর ছিল প্রতি একরে মাত্র ৩০ লক্ষ টাকা। সূত্রের খবর এক একটি টাওয়ার বসানোর জন্য জমি মালিকদের প্রায় চার লক্ষ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। ভাঙড়ে জমি অধিগ্রহণে এখনও পর্যন্ত ১৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।   
গত সাতমাস ধরে ভাঙড়ে পাওয়ার গ্রিড প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ‘ভাঙরে জমি, জীবিকা, বাস্তুতন্ত্র, পরিবেশ রক্ষা কমিটি’ আন্দোলন করছে। গত ১৭ জানুয়ারি পাওয়ার গ্রিড কর্পোরেশন প্রকল্পের বিরোধিতায় আগুন জ্বলেছিল ভাঙড়ের ওই অঞ্চলে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ কিছু ক্ষেত্রে নিয়ম না মেনে জোর করে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের খণ্ডযুদ্ধ হয়। এলাকার পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। বিরোধী দলেনেতা আব্দুল মান্নান, সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র পরে অঞ্চলে পৃথক পৃথকভাবে সভা করেন। বিজেপির থেকেও জনসভা করা হয়। তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষনেতৃত্ব দলীয় স্তরে নিজেদের ব্যার্থতা মেনে নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা শুরু করে। সাতমাস ধরে চলতে থাকা সেই আন্দোলন বর্তমানে কি অবস্থায় আছে সেটা এলাকার মানুষ ভালো টের পাচ্ছেন। আন্দোলনের আঁচ যে এখনও রয়েছে তাঁর প্রমাণ রাজ্য পুলিশ প্রশাসন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনসভা প্রকল্পের কাছে তপোবন মাঠে না করে সরিয়ে নিয়ে গেছে বাসন্তী হাইওয়ের কাছে ‘ভোজেরহাট’ মাঠে।  কারণ রাজ্য প্রশাসন ভাঙড়ে যে কোনও ধরণের হিংসাত্বক আন্দোলন বন্ধ করতে চাইছে। তাই কোনও ঝুঁকি না নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর জনসভার নিরাপত্তার কথা ভেবে জায়গা পরিবর্তন। রাজ্যে উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে গেলে এই ধরণের আন্দোলনকে মুখ্যমন্ত্রী বরদাস্ত করবেন না। গত ছ বছরের অভিঞ্জতায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সরকারের দিশা রাজ্যবাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। সম্প্রতি দার্জিলিং নিয়েও মুখ্যমন্ত্রী কতটা কঠোর হতে পারেন সেই উদাহরণ রাজ্যবাসী অনুভব করছেন। যদিও বিরোধীরা মুখ্যমন্ত্রীর পদক্ষেপকে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখছেন। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত মুখ্যমন্ত্রী নিচ্ছেন না অথবা নিতে চাইছেন না। কারণ হিসাবে তাঁদের বক্তব্য রাজ্য প্রশাসন মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে ভাঙড় থেকে কয়েকজন আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের মধ্যে থেকে বেছে বেছে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ইউএপিএ আইনে মামলা করা হয়েছে। বিরোধীদের এমনই অভিযোগ। চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল ভাঙড়ের জমি নিয়ে যারা আন্দোলন করছেন তাঁদের নেতৃত্বে একটি ফোরাম দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা শাসকের বাড়ির সামনে বিক্ষোভ এবং ডেপুটেশন কর্মসূচীতে সামিল হয়। সেদিন দুপুর ১টা নাগাদ আলিপুরে রাজ্য পুলিশের ডিজি-র বাড়ির সামনের রাস্তা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে যায়। গাড়ি চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। সংবাদ সংস্থা সূত্রে খবর ওইদিনের বিক্ষোভ কর্মসূচীতে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী এবং বিভিন্ন বামপন্থী দলের নেতৃত্ব অংশগ্রহণ করেন। ওইদিনের বিক্ষোভ সমাবেশে ভাঙড়ে গুলিকান্ডে নিহত মফিজুলের বাবা শুকুর আলি বলেন, ‘’কোটি কোটি টাকা চুরি করে নেতারা ঠান্ডা ঘরে থাকবে আর যারা মাঠে ক্ষেতে ঘাম ঝরিয়ে শ্রম দেবে তাদের জমি জীবিকা রক্ষার সংগ্রাম দমন করতে জেলে ঢোকানে হবে এটা চলতে পারে না।‘’ ওইদিন সমাবেশ থেকে ৯ সদস্যের এক প্রতিনিধিদল জেলা শাসকের কাছে স্মারকলিপি জমা দেয়। ওইদলে ছিলেন জমি জীবিকা বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশ রক্ষা কমিটির পক্ষে শুকুর আলি, রুহুল আমিন, মহাদেব মণ্ডল, ভাঙড় সংহতি কমিটির পক্ষে দিবাকর ভট্টাচার্য, অনুরাধা দেব, স্বপন গাঙ্গুলি, গৌতম চৌধুরী, সিপিএম নেতা শমীক লহিড়ী এবং তুষার ঘোষ।    
মুখ্যমন্ত্রী ইতিপূর্বে ভাঙড় প্রসঙ্গে যে কথা বলেছিলেন সেই কথার সঙ্গে আমরা শুকুর আলির কথার মিল কি খুঁজে পাচ্ছি না? মুখ্যমন্ত্রীর কথা যতদূর মনে করতে পারছি। তিনি বলেছিলেন ভাঙড়ে জমি মাফিয়াদের খুঁজে বের করতে হবে। কৃষকদের একছটাক জমিও রাজ্য প্রশাসন অধিগ্রহণ করবে না। তাঁর ভাষায় ‘আমার কাছে সব খবর থাকে। কে বা কারা এইসব জমি মাফিয়াদের সাহায্য করছে সেইসব খবরও আমি জানি। আমারদের দল এসব অনুমোদন করে না। বাংলার উন্নয়ন নিয়ে আমি রাজনীতি করতে দেব না। সে বিরোধীদল করুক অথবা আমাদের দলের কেউ। কোনও সমঝোতার জায়গা নেই।’  
দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা আজও কতটা পিছিয়ে আছে সেটা জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরলে বুঝতে পারা যায়। আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি ভাঙড়ে একটি বেসরকারি হাসপাতাল এবং মেডিক্যাল কলেজ হবে। এতদঅঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য যেটা অত্যন্ত প্রয়োজন। এত বড় একটি কর্মযঞ্জ শেষ হলে খুব স্বাভাবিকভাবেই ওই অঞ্চলে একটি উপনগরী গড়ে উঠবে। অঞ্চলের সমাজ সচেতন মানুষের বক্তব্য এইজন্যই কি ভাঙড় অঞ্চলে কেউ কেউ অথবা কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে গণ্ডগোল তৈরি করতে চাইছে? যাতে এলাকার উন্নয়ন না হয়। পাপাপাশি তাঁদের আরও বক্তব্য উন্নয়নের নামে কেউ যেন বঞ্চিত না হয়। প্রকৃত জমির মালিকরা যেন ন্যায্যমূল্য পায়। মুখ্যমন্ত্রীকে সেদিকেও নজর দিতে হবে। আমরা অপেক্ষায় আছি আজ মুখ্যমন্ত্রী ভাঙড়ে নতুন কোন অধ্যায় শুরু করেন?